পবিত্র রোযার বিধান : শিক্ষা ও উদ্দেশ্য / মাওলানা আহমদ মায়মূন

রমজানের রোযার বিধান দিতে গিয়ে আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বলেন, তোমাদের জন্য রোযা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছে তোমাদের পূর্ববর্তীদের জন্য; যাতে তোমরা মুত্তাকী হতে পার। [সূরা বাকারা: ১৮৩]
রোযাকে আরবীতে সওম বলা হয়। ‘সওম’ মানে বিরত থাকা, বেঁচে থাকা। রোযার মধ্যে পানাহারসহ কিছু একান্ত কর্মকা- থেকে বিরত থাকতে হয়, এজন্য রোযাকে ‘সওম’ বলা হয়। আর এ বিরত থাকা সুবহে সাদেক থেকে  সূর্যাস্ত পর্যন্ত নিয়ত সহকারে হতে হবে। না হয় রোযা শুদ্ধ হবে না। সুতরাং কেউ সুবহে সাদেকের পরে যে কোনো সময় অথবা সূর্যাস্তের এক মিনিট পূর্বেও এসব বিষয় থেকে বিরত না থাকে, অথবা বিরত থেকেও নিয়মিত না করে তবে রোযা শুদ্ধ হবে না। [মাআরিফুল কুরআন, ২য় খ. ২য় পারা, পৃ. ৯০]
উপরিউক্ত আয়াত থেকে জানা গেল যে, পূর্ববর্তী সকল ধর্মে রোযার বিধান ছিল। তবে সব ধর্মে রোযার ধরন, নিয়ম-পদ্ধতি, সংখ্যা, সময় ইত্যাদি বিষয় এক রকম ছিল না।
পবিত্র কুরআনে ইসলামসহ পূর্ববর্তী সকল ধর্মে রোযার বিধান থাকার কথা উল্লেখ করে রোযার বিধানের গুরুত্ব বুঝানো হয়েছে। কারণ রোযা মূলত রিপুকে নিয়ন্ত্রিত ও সংযত করার একটি প্রশিক্ষণ। সকল আসমানী ধর্মে যে ধরনের মানব জীবনের হেদায়েত ও দিকনির্দেশনা এসেছে, তার জন্য মানুষের রিপু তার জ্ঞান-বুদ্ধি ও বিবেকের নিয়ন্ত্রনে থাকা জরুরী। বলা বাহুল্য যে, রোযা সে নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করে।
দেহ ও আত্মার সমন্বয়ে মানুষ। দেহ হল সাকার ও স্থ’ূল, আর আত্মা অশরীরী ও সূক্ষ। আমরা যদি দেহের সব চাহিদা অবাধে পূর্ণ করি তবে এতে দেহ প্রবল হবে এবং আত্মার উপর প্রাধান্য বিস্তার করবে। দেহের এ লাগামহীন চাহিদা নিয়ন্ত্রনের অপর নামই রোযা। রোযা মানুষের দেহকে একটি সীমারেখার মধ্যে রেখে এরূপ অবস্থায় উন্নীত করে, যাতে তার আত্মা তার দেহের উপর ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয় এবং আত্মা দেহকে নিয়ন্ত্রনে রাখতে পারে।
রোযার বাহ্যিক রূপ অর্থাৎ, পানাহার ইত্যাদি থেকে বিরত থাকাই একমাত্র উদ্দেশ্য নয়। রোযার এ বাহ্যিক রূপ একটি প্রতিক মাত্র। এর মাধ্যমে আত্মিক ও নৈতিক উৎকর্ষ অর্জনের প্রশিক্ষণ দেওয়া মুখ্য উদ্দেশ্য।
ইসলাম রোযার মাধ্যমে যে শিক্ষাটি দিতে চায় তা এই যে, মানুষের উচিত জীবনের চলার পথে শুদ্ধ-অশুদ্ধ ও বৈধ-অবৈধ বিষয়ের মধ্যে পার্থক্য করা। সে শুদ্ধ ও বৈধ বিষয়কে গ্রহণ করবে এবং অশুদ্ধ ও অবৈধ বিষয় থেকে নিজেকে বিরত রাখবে। এ ভেদ বিচার তার আখেরাতের স্থায়ী জীবনকে সফল ও সুখময় করবে।
রোযা মূলত মানুষের নিজের জীবনকে সংযত করার গভীর অর্থবহ নীতি-পন্থা। দুনিয়াতে একজন ব্যবসায়ী নিজেকে অপচয় থেকে বিরত রাখে, একজন শিক্ষার্থী নিজের সময়কে অযথা নষ্ট করা থেকে বিরত থাকে, একজন শ্রমিক নিজেকে অলসতা ও দুর্নীতি থেকে রক্ষা করে। এভাবে প্রত্যেকের নিজের জীবনের জন্য ক্ষতিকর বিষয়াদি থেকে আত্মরক্ষা করে জীবন পরিচালিত করাকেই বর্তমান জগতে সফলতা বলে অভিহিত করা হয়। পক্ষান্তরে অলসতা, অপচয়, বিলাসিতা এবং সময় নষ্ট করা থেকে মানুষ যখন নিজেকে রক্ষা করতে না পারে তখন সে পরীক্ষার এ জগতে কোনোভাবে সফলতা লাভ করতে পারে না।
পরকালের বিষয়টিও এমনই। পরকালের জীবনে সফলতা পেতে হলে প্রত্যেক মু’মিনকে রোযাদারের আদলে দুনিয়ার জীবন পরিচালিত করতে হবে। মৃত্যুপূর্ববর্তী এ জীবনে মুত্তাকীসুলভ জীবন অবলম্বন করতে হবে এবং কিছু পরিত্যাজ্য বিষয় থেকে নিজেকে রক্ষা করে চলতে হবে।
পরকালের সুখময় জীবনকে নষ্ট করে এমন বিষয়াদি থেকে বেঁচে থাকা এবং শরীয়ত নির্দেশিত পরিম-লে জীবন অতিবাহিত করার প্রশিক্ষণ দানের উদ্দেশেই আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে রোযা ফরজ করা হয়েছে।
যে ব্যক্তি দিনের বেলায় রোযা রাখে সে সন্ধ্যাবেলায় খাবার গ্রহণের সময় খাবারে বেশ স্বাদ অনুভব করে। এমনিভাবে যে ব্যক্তি দুনিয়ার জীবনে আল্লাহ তাআলার নিষিদ্ধ বিষয়াদি থেকে নিজেকে দূরে রাখবে, সে পরকালের জীবনে সুখময় জীবনের প্রকৃত স্বাদ অনুভব করবে। দিনের বেলায় রোযা যদি দুনিয়ার জীবনের কষ্ট-কেশের প্রতীক হয় তবে রোযাদারের সন্ধ্যাবেলায় খাবার গ্রহণ পরকালীন জীবনের সুখময় জীবনের আলামত।
রোযা নিজেকে সংযত করার প্রশিক্ষণ। এ প্রশিক্ষণ প্রদানের জন্য এমন একটি বিষয়কে বেছে নেওয়া হয়েছে, যা মানুষের সকল প্রয়োজনের মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ খাদ্য ও পানীয়। রমযান মাসে পুরো মাস ব্যাপী সুবহে সাদেক থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত খাদ্য ও পানীয় থেকে বিরত রাখা হয়, যাতে মানুষের মধ্যে এ যোগ্যতা সৃষ্টি হয় যে, মনের চাহিদা থাকা সত্ত্বেও সে কোনো জিনিসকে পরিত্যাগ করতে পারে। যাতে সে দুনিয়াতে এভাবে জীবন-যাপন করে যে, সে কোনো জিনিস গ্রহণ করলে শরীয়তের বিধি-বিধান অনুযায়ী গ্রহণ করবে, আর কোনো জিনিস পরিত্যাগ করতে চাইলে তাও শরীয়তের বিধান মোতাবেক পরিত্যাগ করবে। তার মনের চাহিদা তার সচেতন সিদ্ধান্তের অধীনে পরিচালিত হবে, সচেতন সিদ্ধান্ত থেকে মুক্ত হয়ে নয়।
মানুষ সামাজিক মাখলুক। সে এ দুনিয়ায় নানা রকমের নারী-পুরুষের সাথে জীবন অতিবাহিত করে। এসব সামাজিক সম্পর্কের মাঝে চলতে গিয়ে তাকে নানা রকম প্রতিকুল অবস্থার সম্মুখীন হতে হয়। এ সকল অবস্থা মানুষের মধ্যে উত্তেজনা ও প্রতিক্রিয়ার মনোভাব সৃষ্টি করে।
এরূপ সময়গুলোতে মানুষ কী করবে, আর কী করবে না, তার দিক নির্দেশনা দেওয়ার জন্যই রোযা ফরজ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে রোযার শিক্ষা এই যে, মানুষ এরূপ পরিস্থিতিতে নিজেকে সংযত করবে। তখন তার অন্তরে কারও বিরুদ্ধে ক্রোধ জাগ্রত হবে অথবা কারও বিরুদ্ধে উত্তেজনা সৃষ্টি হবে তখন সে তার এসব প্রবণতাকে প্রতিহত করবে এবং নিজের মধ্যেই এগুলোকে চেপে রাখবে। এধরনের ক্ষেত্রে সে নিজের উত্তেজনাপূর্ণ মনেবৃত্তিগুলোকে প্রতিহতকারী হবে, প্রদর্শনকারী নয়।
এমনিভাবে মানুষের মধ্যে নানাধরনের মনেবৃত্তি রয়েছে। যেমন, লোভ-লালসা, হিংসা, দম্ভ-অহংকার, স্বার্থপরতা ইত্যাদি। এ মনেবৃত্তিগুলো মূলত মন্দ নয়। কারণ, এগুলো মানুষের মধ্যে কর্মচাঞ্চল্য ও কর্মস্পৃহা সৃষ্টি করে। সুতরাং এ মনেবৃত্তিগুলো যদি বৈধ সীমারেখার মধ্যে ব্যবহার করা হয় তবে তা কল্যাণকর। পক্ষান্তরে যদি এসব মনেবৃত্তিকে বৈধ সীমারেখার তোয়াক্কা না করে লাগামহীনভাবে ব্যবহার করা হয় তবে এগুলো সমাজের জন্য আপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
রোযা এ প্রশিক্ষণ দেয় যে, মানুষ যেন এ মনেবৃত্তিগুলোকে বৈধ সীমার মধ্যে রাখে এবং এগুলোকে বিধিসম্মত সীমার মধ্যে ব্যবহার করে। সে যেন এসকল মনেবৃত্তি ব্যবহারের একটি সীমাও মাত্রা নির্ধারণ করে। আর সেই সীমা হল, এ সকল মনেবৃত্তি যখন নিজের বৈধ ফায়েদা হাসিলের জন্য ব্যবহৃত হয় তখন এগুলোর ব্যবহার সঠিক বা অনুমোদনযোগ্য আর যখন এগুলো নিজের বৈধ ফায়েদা হাসিলের সীমা অতিক্রম করে অন্যের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তখন মানুষের কর্তব্য এসব মনেবৃত্তিকে প্রতিহত করা।
হাদিস শরীফে রমযান মাসকে সবর তথা ধৈর্যের মাস বলে উল্লেখ করা হয়েছে। [সহীহ ইবনে খুযায়মা, হাদীস: ১৮৮৭/৮৮; শুআবুল ঈমান, বায়হাকী, হাদীস:৩৩৩৬]
উক্ত হাদীসের উদ্দেশ্য হল, রোযা মানুষকে সংযত জীবন যাপনের প্রশিক্ষণ দান করে। রোযা মানুষকে এ পর্যায়ে উন্নীত করে, যাতে সে দুনিয়াতে সংযত ও নিয়ন্ত্রিত জীবন যাপন করতে পারে এবং লাগামহীন ও অনিয়ন্ত্রিত জীবন যাপন থেকে বেঁচে থাকতে পারে। রমজান মাস হল এ সংযত জীবন গড়ে তোলার প্রশিক্ষণকাল। রমজানের বাইরে বছরের অন্য মাসগুলোতে সেই প্রশিক্ষণ মোতাবেক জীবন অতিবাহিত করবে।
এক হাদীসে এসেছে যে, যে ব্যক্তি রোযা রেখে পানাহার পরিত্যাগ করে, কিন্তু মিথ্যা বলা পরিত্যাগ না করে, আল্লাহ তাআলা তার পানাহার পরিত্যাগ করার প্রতি ভ্রক্ষেপ করেন না।
এতে বুঝা যায় যে, রোযার বাহ্যিক রূপ তো পানাহার পরিত্যাগ করা, কিন্তু রোযার মূল আবেদন হল পানাহার পরিত্যাগের সাথে সাথে মিথ্যা, গীবত ইত্যাদি সকল মন্দকর্ম থেকে নিজেকে বিরত রাখা। সুতরাং রোযা হল মন্দকর্ম পরিত্যাগ করার প্রশিক্ষণ। কেউ যদি রোযার বাহ্যিক রূপ পালন করে, কিন্তু রোযার উদ্দেশ্য ব্যহত করে এবং রোযার প্রাণ বিনষ্ট করে এমন মন্দকর্মসমূহ পরিত্যাগ না করে তবে তার রোযা শরীয়তের দৃষ্টিতে পূর্ণ গ্রহণযোগ্যতা পায় না।
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে রোযার বিধান সম্পর্কিত আয়াতে রোযার উদ্দেশ্য ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেছেন, ‘যাতে তোমরা মুত্তাকী হতে পার’। যার মধ্যে তাকওয়া থাকে সেই ব্যক্তিকে বলা হয় মুত্তাকী। তাকওযা মানে বেঁচে থাকা। একটি কন্টকময় বা কেদাক্ত পথে চলতে গিয়ে যেমন মানুষ নিজের শরীর ও পোশাককে রক্ষা করে চলে, তেমনি একজন মু’মিন মন্দ কর্ম থেকে আত্মরক্ষা করে জীবন পথে চলে। তার এ আত্মরক্ষামূলক জীবনাবলম্বনের নাম তাকওয়া। রমজান মাস পুরো মাস ব্যাপী এ তাকওয়া অবলম্বনের প্রশিক্ষণকাল।
মূলত আল্লাহ তাআলার নিষিদ্ধ বিষয়াদিই যে কোন মু’মিন বান্দার আসল পরিত্যাজ্য বস্তু। পানাহার ইত্যাদি যেসব বিষয় মূলত পরিত্যাজ্য বস্তু নয়, যেগুলোকে সাময়িক সময়ের জন্য পরিত্যাগ করা আসলে নিষিদ্ধ বিষয়াদিকে সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাগের অভ্যাস গড়ে তোলার সাধনা মাত্র। কেননা, যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে বৈধ জিনিসকে পরিত্যাগ করত পারে সে অবশ্যই আল্লাহ তাআলার নিষিদ্ধ বিষয়াদিকে পরিত্যাগ করতে সক্ষম হবে।
এ দুনিয়া একটি পরীক্ষাগার। এখানে মুমিন বান্দার কর্তব্য হল, হালাল-হারাম তথা বৈধ-অবৈধ বিষয়াদির মধ্যে পার্থক্য করে চলা। ন্যায্য ও অন্যায়ের মধ্যে বিচার করে নিজের সঠিক পন্থা অবলম্বন করা। লাগামহীন জীবন পরিচালনার পরিবর্তে সংযত জীবনে অভ্যস্ত হওয়া। এ দায়িত্ব সচেতন জীবন গড়ে তোলার জন্য মু’মিন সম্প্রদায়ের জন্য রোযার বিধান ফরজ করা হয়েছে।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যুগে কিছু লোক রোযার উদ্দেশ্যে পানাহার পরিত্যাগ করেছিল, কিন্তু এর সাথে সাথে যে কোনো কারণে হোক, তারা গীবতে লিপ্ত হয়েছিল, যা ইসলামে নিষিদ্ধ কাজ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিষয়টি জানতে পেরে বললেন, তারা আল্লাহ তাআলার বৈধকৃত বস্তুসমূহ পরিত্যাগ করে রোযা রেখেছিল বটে, কিন্তু আল্লাহ তাআলার নিষিদ্ধ কাজ করে রোযা ভঙ্গ করেছে।
মুত্তাকীসুলভ জীবনের অপর নাম ভালো-মন্দের বাচ-বিচারের পন্থা অবলম্বনকারী জীবন। কোনো কোনো মানুষ আছে এমন, যারা নিজেদের জীবনে বাচ-বিচারে অভ্যস্ত নয়। তারা লাগামহীনভাবে কথায় ও কাজে যা মনে চায় করে। অপর পক্ষে এমনও মানুষ আছে, যারা নিজেদের জীবনে ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায়, বৈধ-অবৈধ সবকিছু যাচাই-বাছাই করে সতর্কতার সাথে সঠিকপথে চলতে চেষ্টা করে। এ দ্বিতীয় প্রকার জীবনই মুত্তাকীসুলভ জীবন। একজন মুত্তাকী ব্যক্তি নিজের কথা ও কাজকে আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি মুতাবিক পরিচালিত করে।
রোযা মানুষের মধ্যে তাকওয়া ও বাচ-বিচারের মানসিকতা গড়ে তোলে। রমযান মাসের পুরো মাস ব্যাপী সংযম ও সাধনার প্রশিক্ষণ মানুষকে সারা বছর বৈধ বিষয়কে গ্রহণ ও অবৈধ বিষয়কে বর্জন করতে প্রস্তুত করে।
রমজান মাস ইসলামী চান্দ্র বর্ষের নবম মাস। এ মাসকে ইসলামে রোযার মাস ধার্য করা হয়েছে। রমজান মাসের রোযা ইসলামের মৌলিক পঞ্চ স্তম্ভের একটি। হাদীস শরীফে রমজান মাসের রোযার অনেক ফযীলত বর্ণিত হয়েছে।
একটি হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, মানুষের প্রতিটি নেক আমলের সওয়াব দশগুণ থেকে সাতশত গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করে দেওয়া হবে। কিন্তু রোযার সওয়াব তার ব্যতিক্রম। আল্লাহ তাআলা বলেন, রোযা বিশেষভাবে আমার সন্তুষ্টির জন্য নিবেদিত। কাজেই আমি নিজেই রোযার পুরস্কার প্রদান করব। বান্দা আমার সন্তুষ্টির জন্য নিজের কামনা-বাসনাকে পরিত্যাগ করেছে এবং নিজের পানাহারকে পরিত্যাগ করেছে। রোযাদারের জন্য দুটি আনন্দের মুহূর্ত রয়েছে। একটি তার ইফতারের সময়। আর দ্বিতীয় আনন্দটি হবে তখন, যখন সে তার প্রতিপালকের সাক্ষাৎ লাভ করবে। আর রোযাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহ তাআলার নিকট মেশকের সুগন্ধের চেয়ে অধিক সুগন্ধময়। রোযা ঢাল স্বরূপ। যখন তোমাদের কারও রোযার দিন শুরু হয় তখন সে কাউকে গালমন্দ করবে না এবং শোরগোল করবে না। আর অপর কেউ যদি তাকে গালমন্দ করে অথবা তার সাথে লড়াই করতে উদ্যত হয়, তখন সে যেন বলে যে, আমি রোযাদার। [সহীহ বুখারী, হাদীস: ১৯০৪; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১১৫১]
অপর এক হাদীসে এসেছে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শাবান মাসের শেষ দিন সাহাবায়ে কেরামের সামনে বয়ান দেন। তাতে বলেন, হে লোকসকল! একটি মহান মাস তোমাদের সামনে অত্যাসন্ন। অতি বরকতময় মাস। এ মাসে এমন একটি রাত আছে, যা হাজার মাসের চেয়ে উত্তম। আল্লাহ তাআলা এ মাসে রোযা রাখা ফরজ করেছেন এবং এ মাসের রাতগুলোতে নফল ইবাদত (অর্থাৎ, তারাবীহসহ অন্যান্য নফল নামায) এর বিধান দিয়েছেন। যে ব্যক্তি এ মাসে একটি নফল ইবাদত করে সে ফরজ ইবাদত পালনকারীর মতো সওয়াব পাবে। আর যে ব্যক্তি এ মাসে একটি ফরজ ইবাদত পালন করে সে অন্য মাসে সত্তরটি ফরজ ইবাদত পালন করার সওয়াব পাবে। এটি সবরের মাস। আর সবরের বিনিময় জান্নাত। এটি সহমর্মিতার মাস এবং এ মাসে মুমিনের রিযিক বৃদ্ধি করে দেওয়া হয়। যে ব্যক্তি এ মাসে কোন রোজাদারকে ইফতার করাল, তার ইফতার করানো তার গুনাহের মাগফেরাত এবং জাহান্নামের আগুন থেকে তার মুক্তির কারণ হবে। আর রোযাদারের সওয়াব না কমিয়ে তাকে রোযাদারের সমান সওয়াব দেওয়া হবে। সাহাবায়ে কেরাম প্রশ্ন করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাদের সকলের তো রোযাদারকে ইফতার করাবার সামর্থ্য নেই। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহ তাআলা এ সওয়াব দান করবেন এমন যে কোন ব্যক্তিকে, যে কোন রোযাদারকে এক ঢুক পানি দ্বারা ইফতার করায়। আর যে ব্যক্তি কোন রোযাদারকে পরিতৃপ্তি সহকারে খাবার খাওয়াল, আল্লাহ তাআলা তাকে আমার হাউযে কাউসার থেকে এক ঢোক পানি পান করাবেন, যার ফলে জান্নাতে প্রবেশ করা পর্যন্ত তার আর তৃষ্ণা পাবে না। এ মাসের প্রথমাংস রহমত নাযিল হওয়ার সময়, মধ্যবর্তী অংশ মাগফেরাত দানের সময় এবং শেষাংশ জাহান্নাম থেকে মুক্তি দানের সময়। যে ব্যক্তি এ মাসে তার অধীন কর্মচারীদের শ্রম কমিয়ে দেয়, আল্লাহ তাআলা তাকে ক্ষমা করে দেবেন এবং তাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দান করবেন। [শুআবুল ঈমান, বায়হাকী, হাদীস: ৩৩৩৬; সহীহ ইবনে খুযায়মা, হাদীস: ১৮৮৭]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight