পবিত্র কুরআন-হাদীসের আলোকে ঘুষের ভয়াবহতা: মাওলানা আহমদ মায়মূন

আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বলেন, “আর তোমরা নিজেদের মধ্যে একে অন্যের অর্থ-সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না এবং মানুষের ধন-সম্পত্তির কিছু অংশ জেনে শুনে অন্যায়রূপে গ্রাস করার উদ্দেশ্যে তা বিচারকগণের নিকট পেশ করো না”। [সূরা বাকারা: আয়াত ১৮৮]
হাদীস শরীফে বলা হয়েছে, “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘুষদাতা ও ঘুষগ্রহীতার প্রতি অভিসম্পাত করেছেন”। [সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ৩৫৮০; সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ১৩৩৬, ১৩৩৭; মুসনাদে আহমদ, হাদীস নং ৬৫৩২, ৬৫৩৩]
অপর এক বর্ণনায় এসেছে, আল্লাহ তাআলা ঘুষদাতা ও ঘুষ গ্রহীতার প্রতি লানত করেছেন। [মুসনাদে আহমদ, হাদীস নং ৬৭৭৭]
অন্য একটি হাদীসে রাসূল কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ঘুষদাতা ও ঘুষগ্রহীতা জাহান্নামে যাবে। [তাবরানী, আদ-দুআ, হাদীস নং ২০৯৪, ২০৯৮; আল-মুজামুল আওসাত, তাবারানী, হাদীস নং ২০২৬; আল মুজামুস সগীর, তাবরানী, হাদীস নং ৫৮]
আর এক হাদীসে রাসূল কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, বিচারকার্যে ঘুষগ্রহণ কুফরী, আর তা মানুষের মধ্যে হারাম। [আল-মুজামুল কাবীর, তাবরানী, হাদীস নং ৯১০০] হাদীসটি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত।
রাসূল কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, হে কা’ব ইবনে উজরা! এটা নিশ্চিত, হারাম উপার্জন থেকে উৎপন্ন (শরীরের) মাংস জান্নাতে প্রবেশ করবে না।
জাহান্নামের আগুনই তার জন্য উপযুক্ত। [মুসনাদে আহমদ, হাদীস নং ১৪৪৪১, ১৪৪৪২]
পবিত্র কুরআনের অপর এক আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন, “আর আপনি তাদের অনেককেই দেখতে পাবেন পাপ কাজে ও সীমালংঘনে এবং তাদের হারাম উপার্জন আহরনে তৎপর। তারা যা করত নিশ্চয় তা নিকৃষ্ট”। [সূরা মায়েদা: আয়াত ৬২]
ঘুষের শাস্তি কেবল আখেরাতেই ভোগ করতে হবে এমন নয়, সামাজিক জীবনেও এর ভোগান্তি রয়েছে। এক হাদীসে রাসূল কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “যে জাতির মধ্যে ঘুষের প্রচলন দেখা দেয় তারা ভীতির শিকার হয়”। [মুসনাদে আহমদ, হাদীস নং ১৭৮২২]
ঘুষের প্রাদুর্ভাব যে কোনো দেশের জাতীয় উন্নয়নকে ব্যাহত করে। ঘুষের কারণে মানুষের যোগ্যতার মূল্যায়ন হয় না। ঘুষ যখন অফিসে-আদালতে সর্বত্র জেঁকে বসে তখন কোনো কাজই আর সঠিকভাবে পরিচালিত হয় না। ঘুষ সমাজদেহের জন্য কর্কট ব্যাধি স্বরূপ। সকল নীতি-আদর্শ, আইন-কানুন, ও বিধি-বিধানকে ধ্বংস করে দেওয়ার জন্য ঘুষ গ্রহণের প্রবণতাই যথেষ্ট। কোনো সমাজে ঘুষের প্রচলন সে সমাজের সকর ব্যবস্থাপনাকে ধ্বংস করে দেয়। যে সমাজ এ অভিশাপ থেকে মুক্ত হতে পারে না তারা দুনিয়া ও আখেরাতে চরম দুর্ভোগের শিকার হবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
যারা সুদ-ঘুষ, দুর্নীতি ও অসদুপায় অবলম্বন করে অবৈধ পথে অধিক অর্থ উপার্জনের চেষ্টা করে তাদের সম্পর্কে রাসূল কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “কোনো ব্যক্তি তার রিজিক পূর্ণ না করা পর্যন্ত কখনও মারা যাবে না। সাবধান! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সুন্দরভাবে ও সঠিকপথে রিজিক অন্বেষণ কর। রিজিক আগমনের ধীরগতি তোমাদেরকে যেন আল্লাহর নাফরমানির মাধ্যমে রিজিক অন্বেষণে উদ্বুদ্ধ না করে। কারণ, আল্লাহর নিকট যা আছে তা তাঁর আনুগত্য ছাড়া লাভ করা যাবে না”। [শারহুস সুন্নাহ, বাগাবী, হাদীস নং ৪১১২; আল-মুজামুল কাবীর, তাবারানী, হাদীস নং ৭৬৯৪]
ইসলামে হালাল ও হারামের যাচাই করা এবং হালালকে গ্রহণ ও হারামকে বর্জন করার প্রতি অত্যাধিক গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, আল্লাহ তাআলার নিকট ইবাদত কবুল হওয়ার পূর্ব শর্ত হল হালাল জীবিকা গ্রহণ হালাল উপার্জন। হালাল উপার্জনের জন্য চেষ্টা করাও ইবাদতের শামিল। এক হাদীসে বলা হয়েছে, ফরয ইবাদতের পর অন্যতম ফরয হল হালাল উপার্জনের অন্বেষণ করা। [আল-মুজামুল কাবীর, তাবারানী, হাদীস নং ৯৯৯৩, আস-সুনানুল কুবরা, বায়হাকী, হাদীস নং ১১৬৯৫; শুআবুল ঈমান, বায়হাকী, হাদীস নং ৮৩৬৭]
মানুষের উপার্জন যদি হালাল না হয় তবে তার কোনো ইবাদতই আল্লাহ তাআলার নিকট গ্রহণযোগ্য হবে না। তাই আল্লাহ তাআলা অনুগ্রহ করে মানুষের জন্য হালাল ও হারামকে সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করে দিয়েছেন। হাদীস শরীফে বলা হয়েছে, হালাল জিনিস সুস্পষ্ট এবং হারাম জিনিস ও সুস্পষ্ট। আর এ দুয়ের মধ্যে রয়েছে কিছু সন্দেহযুক্ত জিনিস, যা অনেক মানুষ জানে না। সুতরাং যে সন্দেহযুক্ত বিষয়াদি থেকে বেঁচে থাকে সে তার দীন ও সম্মান রক্ষা করতে পারে। আর যে ব্যক্তি সন্দেহযুক্ত বিষয়ে লিপ্ত হয় সে এমন রাখালের মতো, যে সংরক্ষিত এলাকার আশে-পাশে গবাদি পশু চরায়, ফলে সে সংরক্ষিত এলাকার ভিতরে (অসাবধানতাবশত) ঢুকে পড়তে পারে। জেনে রাখ, প্রত্যেক স¤্রাজ্যের একটি নির্দিষ্ট সংরক্ষিত এলাকা থাকে। আর আল্লাহর পৃথিবীতে আল্লাহর সংরক্ষিত পরিম-ল হল তার নিষিদ্ধ বিষয়াদি। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৫২; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৫৯৯]
ঘুষ গ্রহণ সুস্পষ্ট হারাম। এটা কুরআন ও হাদীস থেকে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত। সুতরাং এ হারাম উপার্জনকে সম্পূর্ণরূপে পরিহার করে চলা কর্তব্য, আমাদের দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণের প্রয়োজনে। এ ছাড়া সন্দেহযুক্ত বিষয়াদি থেকেও বেঁচে থাকতে বলা হয়েছে অপর একটি হাদীস শরীফে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যখন কোনো বিষয় তোমার অন্তরে খটকা লাগে, তখন তা পরিহার কর। [মুসনাদে আহমদ, হাদীস নং ২২১৬৬]
হালাল আহার্য গ্রহণ করার প্রতি উদ্বুদ্ধ করে আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বলেন, “আল্লাহ তোমাদেরকে যে হালাল ও উৎকৃষ্ট জীবিকা দান করেছেন, তা থেকে তোমরা আহার কর, আর ভয় কর আল্লাহকে, যার প্রতি তোমরা বিশ্বাসী”। [সূরা মায়েদা, আয়াত ৮৮]
অপর এক আয়াতে বলা হয়েছে, “ হে মানবজাতি! পৃথিবীতে যা কিছু বৈধ ও পবিত্র খাদ্যবস্তু রয়েছে, তা থেকে তোমরা আহার কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। নিশ্চয় সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু”। [সূরা বাকারা: আয়াত ১৬৮]
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, “সুতরাং আল্লাহ তোমাদেরকে হালাল ও পবিত্র যে জীবিকা দান করেছেন, তা থেকে তোমরা আহার কর এবং আল্লাহর অনুগ্রহের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর, যদি তোমরা কেবল তাঁরই ইবাদত করে থাক”। [সূরা নাহল: আয়াত ১১৪]
যে হারাম খাদ্য গ্রহণ করে তার দোয়া কবুল হয় না। এ সম্পর্কে রাসূল কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “কোনো ব্যক্তি দীর্ঘ পথ সফর করে, তার মাথার চুল উষ্কখুষ্ক ধুলিমলিন, সে তার হাত আকাশের দিকে সম্প্রসারিত করে দোয়া করে, হে আমার রব! হে আমার রব! অথচ তার খাদ্য হারাম, তার পানীয় হারাম, তার পোশাক-পরিচ্ছদ হারাম। হারাম খাদ্য দ্বারা সে লালিত-পালিত হয়েছে। সুতরাং এরূপ ব্যক্তির দোয়া কী করে কবুল হবে”! [সহীহ মুসলিম, হাদীস নং (২৩৪৬) ৬৫-(১০১৫); মুসনাদে আহমদ, হাদীস নং ৮৩৪৮]
রাসূল কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অপর এক হাদীসে বলেন, “কোনো বান্দা এমন হারাম অর্থ উপার্জন করবে না, যা থেকে সে ব্যয় করবে, যাতে সে বরকতপ্রাপ্ত হয় এবং তা থেকে সে সদকা করবে, যাতে তার নিকট থেকে তা কবুল করা হয়। এরূপ লোক মৃত্যুর পর যা রেখে যাবে তা তার জন্য জাহান্নামে যাওয়ার পাথেয় হবে”। [মুসনাদে আহমদ, হাদীস নং ৩৬৭২]
ঘুষ গ্রহণ করা বা না করা মানুষের নিজের ইচ্ছার ব্যাপার। যে ঘুষ খায় সে নিজের ইচ্ছায় ঘুষ খায় এবং অন্যকে ঘুষ দিতে বাধ্য করে। কেউ কাউকে ঘুষ খেতে বাধ্য করে না। কেননা, প্রত্যেকে চায় অতিরিক্ত খরচ না দিয়ে নিজের কাজ উদ্ধার করতে। যেখানে ঘুষদাতা কোনো অবৈধ সুবিধা আদায়ের জন্য কাউকে ঘুষ গ্রহণ করতে প্রভাবিত করে সেখানেও গ্রহীতার ইচ্ছার স্বাধীনতা থাকে। সে ইচ্ছা করলে ঘুষ গ্রহণ করে অন্যকে অবৈধ সুবিধা দিতে পারে, যা তার জন্য অন্যায়, অবৈধ ও হারাম। আর সে ইচ্ছা করলে বিরতও থাকতে পারে, যা তার জন্য নীতি-আদর্শ ও শরীয়তের দৃষ্টিতে অবশ্য কর্তব্য। পক্ষান্তরে যারা ঘুষ দেয় তাদের অধিকাংশই বাধ্য হয়ে ঘুষ দেয়। অনিচ্ছা সত্ত্বেও অনেককে তাদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের জন্য কোনো কোনো ক্ষেত্রে ঘুষ দিতে হয়। অন্যথা ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হতে হয়। অথচ হাদীস শরীফে ঘুষদাতা ও ঘুষ গ্রহীতা উভয়কে অভিশপ্ত ও জাহান্নামী বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে শরীয়ত বিশেষজ্ঞ উলামায়ে কেরাম বলেন, ঘুষদাতা তখনই অভিশপ্ত হবে, যখন সে ঘুষ প্রদানের মাধ্যমে অন্যের ক্ষতি সাধনে সচেষ্ট হবে অথবা অন্যায় ও অবৈধভাবে কোনো সুবিধা পেতে চেষ্টা করবে। পক্ষান্তরে কেউ যদি নিজের কোনো ন্যায্য প্রাপ্য আদায়ের জন্য অথবা কারও জুলুম থেকে আত্মরক্ষার জন্য ন্যায্য পথে চেষ্টা-তদবীর করার পর কোনো সুফল না পেয়ে নিরুপায় হয়ে অনিচ্ছা সত্ত্বেও ঘুষ দেয় তবে সে আশা করা যায় যে, অভিশপ্ত হবে না এবং এজন্য তাকে দোষারূপ করা যাবে না। এমতাবস্থায় ঘুষদাতাকে গুনাহগার বলা যাবে না।

এ সম্পর্কে উলামায়ে কেরাম হযরত উমর রা. থেকে বর্ণিত একটি হাদীসকে দলিল স্বরূপ উল্লেখ করেন। তাতে বলা হয়েছে, রাসূল করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যুগে কিছু লোক সদকার মাল পাওয়ার জন্য রাসূল করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ঘিরে ধরত। তারা সদকার মাল না নিয়ে ফেরত যেতে চাইত না। অথচ তারা তা পাওয়ার উপযুক্ত ছিল না। তবু তাদের যারপরনাই পীড়াপীড়িতে বাধ্য হয়ে রাসূল করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে কিছু দিয়ে দিতেন। হযরত উমর রা. থেকে বর্ণিত হাদীসটিতে রাসূল কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “তোমাদের কেউ কেউ আমার নিকট থেকে সদকার মাল নিয়ে বগলে চেপে বের হয়ে যায়। অথচ সেটা তার জন্য আগুন স্বরূপ। হযরত উমর রা. বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি যখন জানেন যে, সেটা তার জন্য আগুন স্বরূপ, তখন আপনি তাকে তা দেন কেন? উত্তরে রাসূল কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি কী করব? তারা এমনভাবে চাইতে থাকে যে, তারা ফিরে যেতে চায় না। আর আল্লাহ তাআলা চান না যে, আমি কৃপণতা করি”। [মুসতাদরাকে হাকেম, হাদীস নং ১৪৪; মুসনাদে আহমদ, হাদীস নং ১১০০৪, ১১১২৩]
উক্ত হাদীস শরীফ থেকে জানা যায় যে, সদকার মাল আবেদনকারীদের ন্যায্য প্রাপ্য না হওয়া সত্ত্বেও এবং তাদের জন্য তা আগুন স্বরূপ, এটা জেনেও তাদের পীড়াপীড়ি করার কারণে রাসূল কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে কিছু সদকার মাল দিয়ে দিতেন। এ হাদীসের উপর ভিত্তি করে শরীয়তের বিধান সম্পর্কে অভিজ্ঞ আলেমগণ বলেন, যারা ঘুষ দেওয়া ও ঘুষ নেওয়া হারাম জেনেও ঘুষ ব্যতীত কাজ করতে প্রস্তুত হয় না, তাদেরকে যদি নিজের ন্যায্য হক আদায়ের জন্য অথবা তাদের জুলুম থেকে বাঁচার জন্য বাধ্য হয়ে কেউ ঘুষ দেয় তবে আশা করা যায় যে, এতে তার গুনাহ হবে না এবং এজন্য সে হাদীস শরীফে বর্ণিত অভিশপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে না।
অপর দিকে যারা ঘুষদাতা ও ঘুষগ্রহীতাকে ঘুষের আদান-প্রদানে সহযোগিতা করবে তারাও শরীয়তের দৃষ্টিতে অভিশপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে। কারণ, নিজে পাপ কাজ করা অথবা পাপ কাজে কাউকে সাহায্য করা উভয়ই এক সমান অপরাধ। অবশ্য সাহায্যকারী ব্যক্তি যদি ঘুষদাতা ব্যক্তির অসহায় কর্মচারী হয়, যার ফলে সে নিজের কোনো ন্যায্য প্রাপ্য আদায় করার জন্য অথবা জুলুম থেকে আত্মরক্ষার জন্য নিরুপায় হয়ে ঘুষের আদান-প্রদানে সহযোগিতা করে তবে সে আশা করা যায় যে, অভিশপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে না। কিন্তু সে যদি কোনো অবৈধ ও নিয়ম-বহির্ভুত সুযোগ-সুবিধা লাভের জন্য ঘুষের আদান-প্রদানে সহযোগিতা করে তবে সেও ঘুষদাতা ও ঘুষগ্রহীতার ন্যায় অভিশপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।
এমনিভাবে সাহায্যকারী ব্যক্তি যদি ঘুষদাতা বা ঘুষগ্রহীতার নিযুক্ত কর্মচারী না হয় এবং ঘুষের আদান-প্রদানে সহযোগিতা করতে বাধ্য না হয়, এতদসত্ত্বেও ঘুষের আদান-প্রদানে সহযোগিতা করতে থাকে তবে সেও ঘুষগ্রহীতার মতোই অভিশপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।
কোনো ব্যক্তি যদি কোনো প্রতিষ্ঠানে বেতনভুক্ত কর্মচারী হিসাবে চাকরী করে এবং সে তার দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত কোনো কাজ করে দিয়ে কাজের মালিকের নিকট থেকে কোনো বিনিময় নেয় তবে তা হবে দুর্নীতি ও ঘুষের অন্তর্ভুক্ত। সেটা বখশিশ বা হাদিয়া যে নামেই নেওয়া হোক না কেন।
তবে সে যদি তার চাকরির সময়ের বাইরে এবং দায়িত্বভুক্ত কাজের অতিরিক্ত কোনো কাজ করে এবং চাকরির প্রতিষ্ঠানের মালিকও জানেন এবং সেই কাজের জন্য আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারিত বিনিময় গ্রহণ করে তবে তা ঘুষের অন্তর্ভুক্ত হবে না। এটা হবে তার পারিশ্রমিক।
কিছু লোক আছে, যারা নামায, রোযা ইত্যাদি ইবাদত-বন্দেগী করে, আবার ঘুষও খায় এবং দুুর্নীতিও করে। তারা কুরআনের কিছু অংশ মানে, আর কিছু অংশ মানে না। প্রকৃত মু’মিন কখনও এভাবে কুরআনের কিছু অংশকে অমান্য করতে পারে না। যারা কুরআনের কিছু অংশকে বিশ্বাস করে, আর কিছু অংশকে বিশ্বাস করে না তাদের সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, “তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর, আর কিছু অংশকে প্রত্যাখ্যান কর? সুতরাং তোমাদের মধ্যে যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল পার্থিব জীবনে হীনতা। আর কেয়ামতের দিন তারা কঠিনতম শাস্তির দিকে নিক্ষিপ্ত হবে। আর তারা যা করে সে বিষয়ে আল্লাহ অনবহিত নন। তারা আখেরাতের বিনিময়ে পার্থিব জীবন ক্রয় করে নিয়েছে। সুতরাং তাদের শাস্তি লাঘব করা হবে না। আর তারা সাহায্যপ্রাপ্তও হবে না। [সূরা বাকারা: আয়াত ৮৫-৮৬]
পরকালের শাস্তি যে কত ভয়াবহ তার বর্ণনা আল্লাহ তাআলা কুরআন কারীমে দিয়েছেন, “তাদের প্রত্যেকের জন্য পরিণামে রয়েছে জাহান্নাম এবং তাদেরকে পান করানো হবে গলিত পুঁজ, যা সে অতি কষ্টে এক এক ঢোক করে গলাধঃকরণ করবে এবং তা গলাধঃকরণ প্রায় সহজ হবে না। সর্বদিক থেকে তার নিকট আসবে মৃত্যু যন্ত্রণা, কিন্তু তার মৃত্যু ঘটবে না এবং এরপর কঠোর শাস্তি ভোগ করতেই থাকবে। [সূরা ইবরাহীম: আয়াত ১৬-১৭]
আল্লাহ তাআলা অন্য এক আয়াতে বলেন, “অতঃপর হে বিভ্রান্ত অস্বীকারকারীরা! তোমরা অবশ্যই (জাহান্নামে) যাক্কুম বৃক্ষ থেকে আহার করবে এবং তা দ্বারা তোমাদের উদরপূর্ণ করবে, পরে তোমরা পান করবে তার উপর ফুটন্ত পানি, আর পান করবে তোমরা তৃষ্ণার্ত উটের মতো। কেয়ামতের দিন এটাই হবে তাদের আপ্যায়ন”। [সূরা ওয়াকিয়া: আয়াত ৫১-৫৬]
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, “নিশ্চয় যারা আমার নিদর্শনসমূহকে অস্বীকার করে এবং সে সম্পর্কে অহঙ্কার করে, তাদের জন্য আকাশের দরজাসমূহ উন্মুক্ত করা হবে না (অর্থাৎ, তাদের কোনো নেক আমল (সৎকাজ) অথবা দোয়া কবুল করা হবে না) এবং তারা জান্নাতেও প্রবেশ করতে পারবে না, যতক্ষণ না সুঁইয়ের ছিদ্রপথে উট প্রবেশ করে। (অর্থাৎ, জান্নাতে তাদের প্রবেশ অসম্ভব।) আর এভাবেই আমি অপরাধীদেরকে প্রতিফলন দেব।
তাদের শয্যা হবে জাহান্নামের এবং তাদের উপরের আচ্ছাদনও। আর এভাবেই আমি জালিমদেরকে প্রতিফল দিব। [সূরা আ’রাফ: আয়াত ৪০-৪১]
আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে তাঁর অসন্তুষ্টি থেকে দূরে থেকে জাহান্নামের আগুন ও তার ভয়াবহ শাস্তি থেকে বেঁচে থাকার তৌফিক দান করুন। আমীন।
লেখক:  সিনিয়র মুহাদ্দিস, জামেয়া শারইয়্যাহ মালিবাগ, ঢাকা। গ্রন্থ প্রণেতা, অনুবাদক ও গবেষক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight