পবিত্র কুরআনের আকর্ষণ / মুহাম্মদ শরীফুল আলম

মহান আল্লাহর অবিনশ^র কালাম হচ্ছে পবিত্র কুরআন। এটি অমর অজর অব্যয় অক্ষয়। বিশ^বাসীর কাছে এক মহাবিস্ময়। এ গ্রন্থের বাণী, মর্ম, আহ্বান ও আবেদন অতুলনীয়। তার অসাধারণ সৌন্দর্য ও আশ্চর্য আকর্ষণে যুগ যুগ ধরে পথহারা মানুষ পেয়েছে মুক্তির পথ ও সত্য-ন্যায়ের সঠিক দিশা। কী আছে এই কুরআনে? কীভাবে এতো আকর্ষণ করে আমাদের?  বক্ষ্যমাণ এ প্রবন্ধটিতে আমরা এ প্রশ্নেরই জবাব খুঁজব।
পবিত্র কুরআন এক অনন্য অসাধারণ গ্রন্থ। তাতে এমন কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা আমাদেরকে শুধু আকর্ষণই করে না, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা সৃষ্টি করে এবং মুগ্ধতায় অশ্রুসিক্ত করে। নি¤েœ উল্লেখযোগ্য কিছু বৈশিষ্ট্য ধারাবাহিকভাবে উল্লেখ করা হলো।
তিলাওয়াত :  পবিত্র কুরআনের বৈশিষ্ট্যগুলোর মাঝে প্রথমেই আসে তার তিলাওয়াতের কথা। তাতে যে মিষ্টতা আর মধুরতা আছে অন্য কোন কিতাবে তা নেই। শুধু কুরআনের তিলাওয়াত শুনেই  কত পথহারা আর কত কঠিন হৃদয় যে পেয়েছে সত্যের পথ! আর বিগলিত হয়েছে তাদের হৃদয়! তা লিখে শেষ করা যাবে না।
হযরত উমর রা. ছিলেন অত্যন্ত কঠিন হৃদয়ের মানুষ। ইসলাম গ্রহণের পূর্বে তিনি ছিলেন আল্লাহর দুশমন ও তার রাসূলের ঘোরতর শত্রু। অথচ পবিত্র কুরআনের তিলাওয়াত শুনে তার সেই কঠিন হৃদয় বিগলিত হয়েছিলো এবং নবীজির দরবারে এসে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন।
আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন গভীর রাতে নামাযে দাঁড়তেন আর সুমধুর কণ্ঠে পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত করতেন তখন মক্কার কাফেররাও তার সেই তেলাওয়াত শুনার লোভ সামলাতে পারতো না। কুরআন তিলাওয়াতের সেই মধুরতা, সেই মিষ্টতা এখনো আছে। এখনো আছে কুরআন তিলাওয়াতের মুগ্ধ-অশ্রুসজল শ্রোতা। এখনো মানুষ ছুটে যায় কুরআনের কাছে এবং আহলে কুরআনের কাছে তিলাওয়াত শুনতে ও শোনাতে। ক্বিরাত মহফিলগুলোই তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
ভবিষ্যদ্বাণী : পবিত্র কুরআনে অনেক ভবিষ্যদ্বাণী রয়েছে। তার মাঝে কিছু ভবিষ্যদ্বাণী বাস্তবায়িত হয়েছে। আর কিছু বাস্তবায়নের অপেক্ষায় আছে। যেমন : রোম সা¤্রাজ্যের বিজয়ের ভবিষ্যদ্বাণী। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যামানায় বিশে^র পরাশক্তি ছিলো রোম ও পারস্য। তাদের মাঝে দীর্ঘদিন যাবৎ যুদ্ধ-বিগ্রহ চলছিলো। পারস্য ছিলো অগ্নিপূজারী। আর রোম ছিলো আহলে কিতাব, যাদের ঈমান আকীদা মুসলমানদের ঈমান আকীদার কাছাকাছি ছিলো। ইতোমধ্যে রোম পরাজয় বরণ করে। তাই মক্কার মুশরিকরা খুব খুশি হয়। কিন্তু মুসলমানরা হয় অত্যন্ত মনঃক্ষুণœ। তখন পবিত্র কুরআনে ভবিষ্যদ্বাণী অবতীর্ণ হয় যে, আগামী তিন থেকে নয় বছরের মাঝে আবার এই রোম বিজয় লাভ করবে। ইতিহাস সাক্ষী, এ ঘোষণার সাত বছরের মাথায় রোম বিজয় লাভ করেছিলো। [ইবনে কাসীর, খ. ৬, পৃ. ৩১৫; কাশশাফ, পৃ. ৪২৯]
অনুরূপভাবে মক্কাবাসীদেরকে প্রবলভাবে পাকড়াও করা এবং তাদের শাস্তি দেওয়ার ও ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে পবিত্র কুরআনে। ইরশাদ হচ্ছে, ‘যে দিন আমি প্রবলভাবে ধৃত করব, সে দিন পুরোপুরি প্রতিশোধ গ্রহণ করবই। [সূরা দুখান : ১৬] এ ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী বদরের যুদ্ধের দিন তারা শাস্তি পেয়েছিলো। এবং শোচনীয়ভাবে তারা পরাজয় বরণ করেছিলো। তারা যখন ইসলামের বিরোধিতা ও নবীজির অবাধ্যতায় সীমা ছাড়িয়ে যায় তখন তিনি তাদের জন্য হযরত ইউসুফ আ. এর যামানার দুর্ভিক্ষের মতো দুর্ভিক্ষ দিয়ে শাস্তি দেয়ার বদদোয়া করেছিলেন। তাই আল্লাহ তাআলা তাদের জন্য আকাশকে ধূম্রাচ্ছন্ন করার ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। সেই ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী কিছু দিন পর দুর্ভিক্ষ চলে আসে। তখন তাদের অনেকেই মারা যায়। আর জীবিতরা ক্ষুধা ও কষ্টের জ¦ালায় আকাশকে ধূ¤্রাচ্ছন্ন দেখছিলো। তবে নবীজীর দোয়ার ফলে তারা আবার এ আযাব থেকে মুক্তি লাভ করেছিলো। [তাফসীরে ইবনে কাসীর, পৃ:২৪৭; খ:৭]

বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক সূত্র
সাড়ে চৌদ্দশত বছর পূর্বের কুরআনে বর্ণিত এমন কিছু বৈজ্ঞানিক থিউরি আছে যাকে আধুনিক বিজ্ঞান দীর্ঘ চেষ্টা-সাধনার পর বিংশ শতকে এসে আবিষ্কার করেছে তা বিশ^বাসীকে সত্যিই হতবাক করে দিয়েছে। যেমন বিগ ব্যাং থিউরি। এ থিউরির প্রবক্তা হলেন বেলজিয়াম জ্যোতির্বিজ্ঞানী জর্জ এদুয়ার ল্যমেত্র্। তিনি ১৯২৭ সালে এ তত্ত্ব প্রস্তাব করেন। এর মানে হলো এমন একটি ঘটনা যার আগে নভোম-ল, ভূ-ম-লম, চন্দ্র-সূর্য, গ্রহ-নক্ষত্র, গ্যালাক্সি, কোয়াসার, পালসার কিছুই ছিলো না। অর্থাৎ বর্তমানে মহাবিশে^র পদার্থ শক্তি ও স্থান-কাল একটি বস্তুপি-ে কেন্দ্রীভূত ছিলো। তারপর এক সময় এর মহাবিস্ফোরণ ঘটে। [আল-কুরআন অল সাইন্স, পৃ. ৫০]
লক্ষ করে দেখুন, সূরা আম্বিয়ার ৩০ নং আয়াতের সাথে এ তত্ত্বের কী আশ্চর্য মিল পাওয়া যাচ্ছে! ‘অবিশ^াসীরা কি পর্যবেক্ষণ করে দেখে না নভোম-ল এবং ভূ-ম-ল একটি বস্তুর মতো পরস্পর সংযুক্ত ছিলো। তারপর আমি তাদের পৃথক করেছি।’
বিজ্ঞানের আরেকটি থিউরি হলো সকল প্রাণের অস্তিত্ব পানি থেকে। পবিত্র কুরআনও তাই বলে। ইরশাদ হচ্ছে, আমি প্রতিটি জীবন্ত জিনিসকে পানি থেকে সৃষ্টি করেছি। [আম্বিয়া : ৩০]
পবিত্র কুরআন দুই সমুদ্রের মিলনস্থলে অদৃশ্য আড়ালের কথাও উল্লেখ করেছে যা একে অপরকে ভেদ করে না। ইরশাদ হচ্ছে, ‘তিনি পাশাপাশি দুই দরিয়া প্রবাহিত করেছেন। উভয়ের মাঝখানে রয়েছে এক অন্তরাল, যা তারা অতিক্রম করে না। [আর-রাহমান : ১৯-২০] আধুনিক বিজ্ঞানও তা আবিষ্কার করেছে। তা ছাড়া মাতৃগর্ভে সন্তানের জন্মবৃত্তান্ত, পৃথিবী ও সৌরজগতের গতি,  মানব দেহের ত্বকে অনুভূতি প্রবণতা, পৃথিবীতে প্রাণের সঞ্চার ও বহুমুখিতা,  লোহার অবতীর্ণ হওয়া ইত্যাদি সহ আরো অনেক বিষয় পবিত্র কুরআনে আছে। অথচ কিছু দিন পূর্বেও বিজ্ঞান এ সব ব্যাপারে ছিলো একেবারে অন্ধকারে। অতীতের সকল গ্রন্থ আজ উন্নত আধুনিক বিজ্ঞানের কষ্টি পাথরে টেকে না। কিন্তু কুরআনই একমাত্র ব্যতিক্রম। বিজ্ঞানের নির্ভুল কোন উদ্ভাবন ও অনুসন্ধানই কুরআনে বর্ণিত বাস্তবতার বিপরীত হতে পারে না। কেননা বিজ্ঞানময় এই কুরআন যার বাণী, সেই শক্তিমান আল্লাহই বিজ্ঞানের ¯্রষ্টা।

চ্যালেঞ্জ
পবিত্র কুরআনের প্রতি মানুষের আকর্ষণের আরেকটি কারণ হলো দৃঢ়তার সাথে চ্যালেঞ্জ  ছুঁড়ে মারা। এবং কেউ তার মোকাবেলা করতে না পারা। শুরুতেই পবিত্র কুরআন চ্যালেঞ্জ দিয়েছে যে এতে কোন সন্দেহ নেই। এ কুরআন আল্লাহর কালাম এতে যদি কারো কোন সন্দেহ থাকে তাহলে সে অনুরূপ একটি সূরা রচনা করে নিয়ে আসুক। ইরশাদ হচ্ছে ‘আমি আমার বান্দার প্রতি যা অবতীর্ণ করেছি তাতে তোমাদের কোন সন্দেহ থাকলে তোমরা এর অনুরূপ কোন সূরা আনয়ন করো এবং তোমরা যদি সত্যবাদী হও তবে আল্লাহ ব্যতীত তোমাদের সাহায্যকারীদের আহ্বান করো। [বাকারা : ২৩]
অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে, ‘বলুন, যদি মানব ও জি¦ন এই কুরআনের অনুরূপ রচনা করে আনয়নের জন্য জড়ো হয়, এবং তারা পরস্পরের সাহায্যকারীও হয়; তবুও তারা কখনো এর অনুরূপ রচনা করে আনতে পারবে না। [সূরা বনী ইসরাইল; ৮৮]
মানুষ সাধারণত দু’চারটি ছোটÑ খাটো বিষয়ে চ্যালেঞ্জ করতে পারে। কিন্তু তার দুর্বলতার কারণে সবসময় চ্যালেঞ্জ রক্ষা করতে পারে না। অথচ অশ্চর্য! এই মহাকুরআন তার বিশালতা সত্ত্বেও শুরুতে চ্যালেঞ্জ  ছুড়ে দিয়েছে। তা যদি আল্লাহ বাণী না হতো তাহলে কীভাবে এতো দৃঢ়তার সাথে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে মারলো? তার মোকাবেলা করতে সমস্ত মানুষ অক্ষম হলো?

অতীতের সত্য সংবাদ
পবিত্র কুরআন যে মানুষকে আকর্ষণ করে তার আরেকটি কারণ হলো সে হাজার বছর পূর্বের অনেক ইতিহাস নির্ভুলভাবে বর্ণনা করে। যেমনঃ আসহাবে কাহফের ঘটনা, জুলকারনাইনের ঘটনা, হযরত ইউসুফ আ. এর ঘটনা ইত্যাদি। অথচ আমাদের নবী কোন ইতিহাসবিদ ছিলেন না। তাদের কোন শিষ্যও ছিলেন না। একদিন মক্কার কুরাইশরা ভাবলো, ইহুদিদের কাছে তাওরাত আছে। তাই তাদের কাছে মুহাম্মাদের ব্যাপারে সঠিক সিদ্ধান্ত জানা যাবে। তাই তারা নজর ইবনে হারেস এবং উকবা ইবনে আবি মুঈতকে পাঠালো মদীনার ইহুদি প-িতদের কছে। তারা গিয়ে বললো, তোমরা আহলে কিতাব। তোমাদের কাছে তাওরাত আছে। তাই আমরা মুহাম্মাদের [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] ব্যাপারে জানতে এসেছি নবুয়্যাতের ব্যাপারে তার দাবী সঠিক কি না। তখন তারা বললো, আমরা তোমাদেরকে তিনটি প্রশ্ন শিখিয়ে দিব। তোমরা তাকে সেই প্রশ্নগুলো করবে। যদি তিনি তার উত্তর দিতে পারেন তাহলে বুঝতে তিনি সত্য নবী যার আনুগত্য করা তোমাদের কর্তব্য। আর যদি তা না পারেন তাহলে তোমরা তার ব্যাপারে যা ধারণা করছো তিনি তাই। প্রশ্ন তিনটি এই :
১। সেই যুবকদের ঘটনা বলুন যারা পূর্ব কালে ঈমান রক্ষার্থে দেশ থেকে পালিয়ে গিয়ে ছিলেন। এবং তাদের আশ্চর্য ঘটনাও ঘটেছিলো।
২। সেই মহান ব্যক্তির ঘটনা বলুন যিনি পৃথিবীর পূর্ব-পশ্চিম প্রান্ত ভ্রমণ করেছিলেন।
৩। রূহ কী? [তাফসীরে ইবনে কাসীর, সূরা কাহফের তাফসীর]
তারপর এ মুশরিকদ্বয় মক্কায় এসে নবীজিকে এ প্রশ্নগুলো করে। এরই প্রেক্ষাপটে আল্লাহ তাআলা সূরা কাহফ অবতীর্ণ করেন। যেখানে শত শত বছর পূর্বের ইতিহাস রয়েছে।
তো এই কুরআন যদি আল্লাহর কিতাব না হতো তাহলে কীভাবে শত শত বছরের পূর্বের ইতিহাস নির্ভুলভাবে বলা সম্ভব হলো?

উন্নত সাহিত্য
কলুষতা মুক্ত উন্নত সাহিত্যের কারণেও পবিত্র কুরআন মানুষকে আকর্ষণ করে। কোন সাহিত্যিক যদি পবিত্র কুরআনের আলংকারিক সৌন্দর্য নিয়ে ভাবেন তাহলে তিনি অলংকারের আশ্চর্য সৌন্দর্য দেখে বিস্ময়াভিভূত হবেন। এবং মুগ্ধতায় অশ্রুসজল হবেন। সহজ-সরল অথচ অসাধারণ এই পবিত্র কুরআন কী যে মধুর ভাষাশৈলীতে প্রাঞ্জল তা লিখে শেষ করা যাবে না। শুধু মাত্র সূরা ইউসুফকে নিয়েও যদি কেউ চিন্তা করেন তাহলেও তিনি অবনত মস্তকে স্বীকার করবেন যে এটা মানুষের কালাম নয়। জীবনের বাঁকে বাঁকে হাসি-কান্না ও আনন্দ-বেদনার কথাগুলো কী জীবন্ত হয়ে উঠেছে সেখানে! তারই ফাঁকে ফাঁকে মহান ¯্রষ্টার উপদেশ হৃদয়কে একেবারে ছুঁয়ে দেয়। এটাকে যদি মানব রচিত কোন গ্রন্থের সাথে তুলনা করা হয় তাহলে সেখানে আকাশ-পাতাল ব্যবধান ধরা পড়বে। একটি আদর্শ গল্প লিখতে একজন গল্পকার কত শ্রম দেন! কত সাধনা করেন! কত নির্ঘুম রাত কাটিয়ে দেন! তারপরও তো সর্বাঙ্গিন সুন্দর হয় না। কিন্তু সূরা ইউসুফ যা সম্পূর্ণ একবারে অবতীর্ণ হয়েছিলো তা যদি আল্লাহর কালাম না হয় তাহলে কীভাবে একজন উম্মি লোকের পক্ষে এতো অল্প সময়ে এমন উন্নত সাহিত্যের একটি গল্প বলা সম্ভব হলো?

আশ্চর্য সংরক্ষণ
পবিত্র কুরআনের আশ্চর্য সংরক্ষণ মানুষের হৃদয়কে স্পর্শ করে। কত শত বছর পার হয়েছে এ কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে অথচ তাতে কোন বিকৃতি স্পর্শ করে নি! কোন আয়াত পরিবর্তন হয় নি। এমন কি কোন শব্দ ও হরকতও পরিবর্তন হয় নি। তা ছাড়া লক্ষ লক্ষ হাফেজে কুরআনের সিনায়ও তা সংরক্ষিত আছে। পৃথিবীতে আর কোন কিতাব আছে যা এভাবে সংরক্ষিত! নেই। আর একটিও নেই। একে বিকৃত করার চেষ্টা কম তো হয় নি; কিন্তু কেউ তা পারে নি। ইমাম কুরতুবি রহ. কুরআন বিকৃতির চেষ্টার একটি ঘটনা উল্লেখ করেছেন। ঘটনাটি বাদশা মামুনের দরবারের। মাঝে মাঝেই শিক্ষা সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সেখানে তর্ক-বিতর্ক ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হতো। এতে জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় প-িত ব্যক্তিগণের অংশ গ্রহণের অনুমুতি ছিলো। এমনি এক আলোচনা সভায় জনৈক ইহুদি প-িত আগমন করলো। আকার-আকৃতি, পোশাক-আশাক ইত্যাদির দিক থেকেও তাকে একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি মনে হচ্ছিলো। তদুপরি তার আলোচনা ছিলো অত্যন্ত প্রাঞ্জল, অলংকারপূর্ণ এবং বিজ্ঞজনসুলভ। সভা শেষে মামুন তাকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কি ইহুদি?’ সে স্বীকার করল। বাদশাহ মামুন পরীক্ষার্থে তাকে বললেন, তুমি যদি মুসলমান হয়ে যাও তবে তোমার সাথে চমৎকার ব্যবহার করা হবে। সে উত্তরে বললো, আমি পৈতৃক ধর্ম বিসর্জন দিতে পারি না। কথাবার্তা এখানেই শেষ হয়ে গেলো। লোকটি চলে গেলো। কিন্তু এক বছর পর মুসলমান হয়ে আবার দরবারে আগমন করলো। এবং আলোচনা সভায় ইসলামী ফেকাহ সম্পর্কে সারগর্ভ বক্তৃতা ও যুক্তিপূর্ণ তথ্যাদি উপস্থিত করলো। সভা শেষে মামুন তাকে ডেকে বললেন, ‘আপনি কি ঐ ব্যক্তি যে বিগত বছর এসেছিলো?’ সে বলল, ‘হাঁ, আমি ঐ ব্যক্তিই বটে।’ মামুন জিজ্ঞেস করলেন, ‘তখন তো আপনি ইসলাম গ্রহণ করতে অস্বীকৃত ছিলেন। এরপর এখন মুসলমান হওয়ার কী কারণ ঘটলো?’ সে বললো, ‘এখান থেকে ফিরে যাওয়ার পর আমি বর্তমান কালের বিভিন্ন ধর্ম সম্পর্কে গবেষণা করার ইচ্ছা করি। আমি একজন হস্তলেখা বিশারদ। স্বহস্তে গ্রন্তাদি লিখে উঁচু দামে বিক্রয় করি। আমি পরীক্ষার উদ্দেশ্যে তাওরাতের তিনটি কপি লিপিবদ্ধ করলাম। এগুলোতে অনেক জায়গায় নিজের পক্ষ থেকে বেশ-কম করে লিখলাম। কপিগুলো নিয়ে আমি ইহুদিদের উপাসনালয়ে উপস্থিত হলাম। ইহুদিরা অত্যন্ত আগ্রহসহকারে কপিগুলো কিনে নিলো। তারপর এমনিভাবে ইঞ্জিলের তিন কপি কম-বেশ করে লিখে খ্রিস্টানদের উপাশনালয়ে নিয়ে গেলাম। সেখানেও খ্রিস্টানরা খুব খাতির যতœ করে কপিগুলো আমার কাছ থেকে নিয়ে নিলো। এরপর কুরআনের বেলাও আমি তাই করলাম। এরও তিন কপি সুন্দরভাবে লিপিবদ্ধ করলাম। এবং নিজের পক্ষ থেকে কম-বেশ করে দিলাম। এগুলো নিয়ে যখন বিক্রয়ার্থ বের হলাম, তখন যেই দেখলো সেই প্রথমে আমার লেখা কপিটি নির্ভুল কি না যাচাই করে দেখলো। তদ্রƒপ বেশ-কম দেখে কপিগুলো ফেরত দিয়ে দিলো। এ ঘটনা দেখে আমি এ শিক্ষাই গ্রহণ করলাম যে, গ্রন্থটি হুবহু সংরক্ষিত আছে এবং আল্লাহ তাআলা নিজেই এর সংরক্ষণ করেছেন। এরপর আমি মুসলমান হয়ে গেলাম।’ [তাফসীরে মারেফুল কুরআন, পৃ.৭২৬]
মহান আল্লাহ সত্যিই বলেছেন, ‘আমি স্বয়ং এ উপদেশ গ্রন্থ অবতারণ করেছি এবং আমি নিজেই এর সংরক্ষক। [সূরা হিজর : ৯]

পূর্ণাঙ্গতা
পবিত্র কুরআন এমন একটি গ্রন্থ যাতে মানব জীবনের সকল জিজ্ঞাসার জবাব রয়েছে। সকল সমস্যার সমাধান রয়েছে। ইহজগৎ ও পরজগৎ উভয় জগতেরই সমাধান রয়েছে। ব্যক্তি জীবনে, পারিবারিক জীবনে, সামাজিক জীবনে, রাষ্ট্রীয় জীবনে ও আন্তর্জাতিক জীবনের সকল জিজ্ঞাসার জবাব রয়েছে। তাছাড়া, রাষ্ট্রনীতি, অর্থনীতি সমরনীতি সকল নীতির পূর্ণাঙ্গতা রয়েছে। তাই বিবেকবান মানুষ মাত্রই তার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন।

বৈপরীত্যহীনতা
মানুষের স্বভাব হলো কথা যখন বেশি বলে কিংবা লেখা যখন বেশি লেখে তখন এক কথা অপর কথার সাঙ্ঘর্ষিক হয়ে যায়। এক লেখা অপর লেখার বিরোধী হয়ে যায়। কিন্তু আশ্চর্য! এতো বিশাল কুরআনের মাঝে কোন বৈপরিত্য নেই। উত্তরাধিকারের মাসআলা কত জটিল, অথচ তাতে কোন স্ববিরোধিতা নেই। এ যদি আল্লাহর কিতাব না হতো তাহলে কী এমন হতো?

উম্মী বা নিরক্ষর হওয়া
পবিত্র কুরআনের আকর্ষণের আরেকটি কারণ হলো আমাদের নবীজির নিরক্ষর হওয়া। যিনি এ পৃথিবীর কোন শিক্ষকের থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেন নি, যিনি কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গমন করেন নি তার পক্ষে কীভাবে সম্ভব হলো এমন অমর বাণী উচ্চারণ করা, যা হাজার বছর পার হলেও মানুষ ভুলতে পারে না? বরং জীবনকে সফল করতে তা বিকল্পহীন?

মধ্যপন্থা
পবিত্র কুরআনের প্রতি মানুষের আকর্ষণের আরেক কারণ হলো সব ক্ষেত্রে মধ্যমপন্থা অবলম্বন। বাড়াবাড়ি কিংবা ছাড়াছাড়ি নয়। সবকিছুতেই কুরআনে কারিম মধ্যমপন্থা অবলম্বন করেছে। রাজনীতি, অর্থনীতি, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও ইবাদাত-বন্দেগীসহ সব ক্ষেত্রেই মধ্যমপন্থা অবলম্বন করেছে। বর্তমান বিশে^ উল্লেখযোগ্য তিনটি অর্থনীতি প্রচলিত রয়েছে। পুঁজিবাদী অর্থনীতি, সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি ও ইসলামী অর্থনীতি। পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে রয়েছে অবাধ ব্যক্তিমালিকানা। যেখানে উপার্জনের ক্ষেত্রে হালাল-হারামের কোন নীতি নেই। ধনীর টাকায় গরীবের কোন অধিকার নেই। এমন কি ধনী যদি সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলে আর তারই গরীব প্রতিবেশী যদি ক্ষুধার জ¦ালায় মৃত্যুর মৃত্যুর মুখে পতিত হয় তবু ধনী লোক সেই গরীবকে সাহায্য করতে বাধ্য নয়। তাই এ নীতিতে গরীবরা আরো গরীব হয় আর ধনীরা আরো ধনী হয়। ফলে এ দুই শ্রেণির মাঝে জিঘাংসা সৃষ্টি হয়।
নাগরিকদের ব্যক্তিমালিকানা থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত করা হয়েছে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতিতে। এবং সেখানে সবার জন্য সমান অধিকারের কথা বলা হয়েছে। ফলে যোগ্য-অযোগ্য, মেধাবী-অমেধাবী, কর্মঠ-অলস সবাই এক কাতারে পড়ে গিয়েছে। পরিণতিতে যোগ্যরা যথাযোগ্য মূল্যায়ন না পেয়ে হতাশায় ভোগে এবং কর্ম ছেড়ে দেয় যা একটি দেশকে মেধাশূন্যতার দিকে ঠেলে দেয়।
কিন্তু কুরআনে বর্ণিত ইসলামী অর্থনীতি এ দুইয়ের মাঝখানে একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান গ্রহণ করেছে। সেখানে নাগরিকদেরকে ব্যক্তিমালিকানা দেয়া হয়েছে। তাই যোগ্য-মেধাবী ও কর্মঠ লোকেরা তাদের যথাযোগ্য মূল্যায়ন পেয়ে কর্মের প্রতি আরো উৎসাহী হয়। তবে প্রয়োজনের অতিরিক্ত উপার্জন থেকে একটা নির্দিষ্ট অংশ গরীব অসহায়দের দেয়ার আদেশ দিয়েছে যা সমাজের ধনী-গরীবের মাঝে ভারসাম্য রক্ষা করেছে।
এভাবে প্রত্যেকটি ক্ষেত্রেই কুরআন মানুষের স্বভাবজাত বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়েছে। তাই যুগ যুগ ধরে মানুষ তার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে।

উপসংহার
আসলে পবিত্র কুরআনে বর্ণিত প্রতিটি বাণীতেই মানব জাতির কল্যাণ রয়েছে। তাই যুগে যুগে এ পবিত্র কুরআন মানুষকে সত্যের পথে টেনে এনেছে। আমরাও  যদি সত্যের  সন্ধানী হই, তাহলে এ কুরআনের প্রতি আমাদের হৃদয়ে আকর্ষণ সৃষ্টি হবে। মহব্বত ও ভালোবাসা সৃষ্টি হবে। যা আমাদের জন্য জান্নাতে যাওয়ার উসিলা হবে। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে জান্নাতে যাওয়ার তৌফিক দান করুন। আমীন।

একটি মন্তব্য রয়েছেঃ পবিত্র কুরআনের আকর্ষণ / মুহাম্মদ শরীফুল আলম

  1. মুহাম্মদ শৱীফুল আলম says:

    আলহামদুলিল্লাহ৷ সুন্দৱ লেখা৷ আল্লাহ তায়ালা আৱো ভালো লিখাৱ তাওফিক দিন৷ আমীন৷

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight