পবিত্র আশুরার তাৎপর্য

মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহর বিধান ও গণনায় মাস বারটি, আসমানসমূহ ও পৃথিবী সৃষ্টির দিন থেকে। তন্মধ্যে চারটি সম্মানিত।’ [সুরা তাওবা : আয়াত ৩৬] সম্মানিত চারটি মাস হলো- রজব, জিলকদ, জিলহজ ও মুহাররম। এ চার মাসে ঝগড়া বিবাদ, যুদ্ধ বিগ্রহ ইত্যাদি করা নিষিদ্ধ। মুহাররম উপরিউক্ত চার মাসেরই অন্যতম। আল্লামা জাস্সাছ তাঁর লিখিত গ্রন্থ আহকামুল কুরআনে বলেন, ‘এই চার মাসের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো- যারা এ মাসগুলোতে ইবাদত বন্দেগি করবে, রাব্বে কারিম তাদেরকে বাকি আট মাস ইবাদত করার হিম্মত ও তাওফীক দান করবেন। এমনিভাবে যারা এ চার মাসে চেষ্টা সাধনা করে গুনাহ থেকে বিরত থাকতে পারবে, তার জন্য অবশিষ্ট আট মাস গুনাহ থেকে বিরত থাকা সহজ হয়ে যাবে।’ [আহকামুল কুরআন : ১/৪৪৭]
মুহাররম মাসের দশ তারিখ দিনটি হলো আশুরার দিন। দশ বুঝাতে আরবি ভাষায় ‘আশারা’ ব্যবহার করা হয়। আশারা থেকে আশুরা বা দশম দিবস। ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক ঘটনা প্রবাহ বিবেচনায় এ দিনটি আমাদের কাছে স্মরণীয় ও বরণীয়। এ দিনটি একদিকে যেমন নাজাত বা শুকরিয়ার দিবস। তেমনি অন্যদিকে কারবালার মরুপ্রান্তরে হযরত ইমাম হুসাইন রা. ও তাঁর সাথীদের শাহাদাতের ঘটনাও এ দিনে সংঘঠিত হওয়ায় তা আমাদের কাছে শোকাহত  ঘটনার স্মারক। তাই এ দিনটি শোক দিবস হিসেবেও পরিচিত। কৃতজ্ঞতা ও শোক দিবসের মৌলিক তফাৎটি অনেকের কাছে সুস্পষ্ট না থাকায় তারা আশুরার মূল শিক্ষার বিকৃতি ঘটাচ্ছে। অনেকে মনে করে আশুরা মানে কারবালা দিবস। বিষয়টি কিন্তু এমন নয়। তবে এ কথা সত্য যে, কারবালার ঘটনার দুঃখ বেদনা ও শিক্ষণীয় বিষয়গুলো ভুলে যাওয়ার মতো নয়। কিন্তু আমাদের সামগ্রিক ও সামষ্টিক চিন্তা চেতনার ক্ষেত্রে একটি মারাত্মক ভুল হবে যদি আমরা কারবালার আলোচনায় আত্মনিয়োগ করে এ দিনের অন্যান্য স্মরণীয় ও পালনীয় বিষয়গুলো থেকে দূরে সরে যাই। অতীতে আশুরা দিবসে যেসব স্মরণীয় ঘটনা ঘটেছে সেগুলো থেকে কিছুতেই আমাদের চোখ বন্ধ করে রাখা সমীচীন হবে না। অনুরূপভাবে এ দিনে যেসব ফজিলত ও পালনীয় বিষয় রয়েছে সেগুলো থেকে কোনোভাবেই বিরত থাকা ঠিক হবে না।
হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন, রমজানের পর আল্লাহর মাস মুহাররমের রোজা হলো সর্বশ্রেষ্ঠ। আর ফরজ নামাযের পর রাতের নামাযই হলো সর্বোত্তম। [সহীহ মুসলিম- ২/৩৬৮]
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুল সা. কে রমজান ও আশুরায় যেরূপ গুরুত্বের সাথে রোজা রাখতে দেখেছি, অন্য সময় তা দেখিনি। [সহীহ বুখারি- ১/২১৮] হযরত ইবনে আব্বাস রা. বর্ণিত অন্য এক হাদিসে এসেছে- নবী কারিম সা. মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করার পর ইয়াহুদীদেরকে আশুরার দিনে রোজা রাখতে দেখে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমরা এ দিনে কিসের রোজা রাখ? জবাবে তারা বললো, এ দিন আল্লাহ তায়ালা হযরত মুসা আ. এবং তাঁর কওম বনি ইসরাইলকে ফেরাউনের হাত থেকে মুক্তি দেন, আর এ দিনেই ফেরাউন স্ব-দলবলে লোহিত সাগরে ডুবে মারা যায়। অতএব, আমরা এর শোকর আদায়ের লক্ষ্যে এবং উক্ত গৌরবময় দিনটির সম্মান জ্ঞাপনার্থে এ দিনটিতে রোজা রেখে থাকি। তাদের কথা শুনে হুজুর সা. বললেন, আল্লাহর নবী হযরত মুসা আ. এর অনুসরণের দাবিদার তোমাদের চেয়ে আমরা বহুগুনে বেশি। অতঃপর (হুজুর সা. নিজে আশুরার রোজা রাখেন এবং) তাঁর উম্মতগণকেও এ দিনে রোজা রাখার নির্দেশ প্রদান করেন। [সহীহ বুখারি- ১/২৬৮] রাসুল সা.-এর এক সাহাবি থেকে আরেকটি বর্ণনায় এসেছে- রাসুল সা. ইরশাদ করেন, যদি কেউ মুহাররম মাসে রোজা রাখে, তাহলে প্রতিটি রোজার পরিবর্তে ত্রিশটি রোজার সওয়াব লাভ করবে। [তবরানি- ১১/৭২] অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, রাসুল সা. জনৈক সাহাবির প্রশ্নের উত্তরে বললেন, রমজানের পর যদি তুমি রোজা রাখতে চাও তবে মুহাররম মাসে রাখ। কারণ এটি আল্লাহর মাস। এ মাসে এমন একটি দিন আছে, যে দিনে আল্লাহ তায়ালা একটি জাতির তওবা কবুল করবেন। [জামে তিরমিজি- ১/১৫৭] উল্লেখ্য যে, এ হাদিসে রোজার পাশাপাশি তওবা ও ইস্তেগফারেরও ইঙ্গিত এসেছে।
হযরত আবু কাতাদা রা. থেকে বর্ণিত, রাসুল সা. ইরশাদ করেন, আমি আশাবাদি যে, আশুরার রোজার অসিলায় আল্লাহ পাক অতীতের এক বছরের (ছগিরা) গুনাহ মাফ করে দিবেন। [সহিহ মুসলিম, হাদিস ১১৬২]
এই হাদিসগুলোর আলোকে আশুরার দিনের রোজাটির গুরুত্ব ও ফজিলত সম্পর্কে জানা জায়। তবে যেহেতু আশুরার দিন রোজা রাখলে দৃশ্যত ইয়াহুদিদের আমলের সাথে সাদৃশ্যতা বুঝা যায় তাই আশুরার দিনের আগের দিন অথবা পরের দিন আরো একটি রোজা মিলিয়ে রাখা উচিৎ। এ ব্যাপারে হাদিসে পাকেও নির্দেশনা এসেছে। হাদিসটি সাহাবি ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুল সা. বললেন, তোমরা আশুরার রোজা রাখ এবং ইয়াহুদিদের সাদৃশ্য বর্জন কর; তাই আশুরার আগে বা পরে আরো একটি রোজা রাখ। (মুসনাদে আহমদ ১/২৪১)
উপরিউক্ত হাদিসগুলোর আলোকে আশুরার দিনে করণীয় হিসেবে আমরা দুটি জিনিস পেলাম- এক. রোজা রাখা এবং দুই. তওবা-ইস্তেগফার করা। আশুরার দিনে এ দুই আমল ছাড়া অতিরিক্ত অন্য কোনো আমল কুরআন হাদিসে পাওয়া যায় না। আশুরার দিনে রোজা ও তওবা ইস্তেগফার ছাড়া যেহেতু অন্য কোনো আমল পাওয়া যায় না তাই আমাদের দেশে আশুরার দিনে যে সমস্ত রেওয়াজ রুসম রয়েছে, যেমন : মিলাদ মাহফিল করা, খিচুড়ি পাকানো, ঢাকঢোল ও বাদ্যযন্ত্র বাজানো, হায় হুসাইন হায় হুসাইন বলে মাতম করা, ছুরি মেরে নিজের বুক পিঠ থেকে রক্ত বের করে বুক চাপড়ানো, শোকের পোশাক পরা ইত্যাদি অবশ্যই বর্জনীয়। এ সব করা যেমন হারাম তেমনি এ সব অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করাও হারাম। আল্লাহ তায়ালা নিজ দয়ায় আমাদেরকে আশুরার পবিত্রতা ও তাৎপর্য থেকে উপকৃত হওয়ার এবং তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনে দিনটি অতিবাহিত করার তাওফিক দান করুন। আমীন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight