পথশিশুর দরুন কুরআন-হাদীসের বাণী: জামিল আহমদ

“আমার খেতে ভাল লাগছে না, আমি এখন কিছু খাব না” বলে একটু চুপ রইল মেছবাহ। অনন্তর বলল, বর্তমান সময়টা আমার ভাল যাচ্ছে না, কিছু ভাল লাগছে না। আব্বু বাসায় না আসা পর্যন্ত আমি কিছুই মুখে দিব না। আম্মু হিসাবে মমতাজ বেগমের যতটুকু চেষ্টা করা দরকার তাতে তিনি  ত্রুটি করেন নি। আপু মারিয়াম এবং বড় ভাইয়া মুয়াজও কত কী কৌশল করেছে তাকে খাওয়ানোর জন্য । তবু মেছবাহ নিজ কথায় অটল, এক ফোঁটা পানিও মুখে তোলোনি সে।
“এতদিন তো মেছবাহ ভালই ছিল। সর্বদা তার ঠোঁটে হাসি লেগে থাকত। ‘মন খারাপ কী জিনিস’ সে যেন বুঝতই না। তাহলে গতরাত থেকে এমন মনমরা হয়ে আছে কেন? কিছু খাচ্ছে না কেন? এভাবে থাকলে তো ও দুর্বল হয়ে পড়বে”। বসে বসে এসব কথা ভাবছেন মমতাজ বেগম।  কালবিলম্ব না করে তিনি মেছবাহর আব্বুকে ফোন দিয়ে বললেন…………..।  সুতরাং এুণি বাসায় আপনার উপস্থিতি প্রয়োজন।
মেছবাহর আব্বু নড়াইল জেলায় অবস্থানরত লোহাগড়া থানার একটি কওমী মাদ্রাসার মোহতামিম সাহেব। গোলাম মর্তুজা সাহেব (মেছবাহর আব্বু) দুই বা তিন সপ্তাহ পর পর বাসায় আসেন।  বিনা প্রয়োজনে তিনি বাসায় অভ্যাগমন করেন না। কেননা, তার উপরই নির্ভর করে পুরো মাদ্রাসাটি। তবে স্ত্রীর মুখে ‘আদরের সন্তানের মন খারাপ’ শুনে আজ তিনি বাসায় ফিরতে ব্যাকুল।  কাশ শেষে যোহরের পর বাসার উদ্দেশ্যে রওনা হলেন মোহতামিম সাহেব। প্রকৃতি কাল চাদর মুড়ি দিতেই তিনি পৌঁছে গেলেন নিজ গৃহে। আব্বুকে দেখেও মেছবাহ তেমন খুশি নয়। সালাম বিনিময়ের পর শুকনো হাসি দিয়ে বলল-আব্বু ! ভাল আছেন? “আল-হামদু লিল্লাহ, ভাল আছি” বলে জবাব দিলেন গোলাম মর্তুজা সাহেব। অতঃপর জানতে চাইলেন, তুমি ভাল আছ তো, আব্বু? তেমন সন্তুষ্টমূলক উত্তর পেলেন না তিনি।  মেছবাহ শুধু মাথা ঝুঁকিয়ে হ্যাঁ বলল।
মাগরিবের নামাজের পর মা’মূলাত শেষ করে মেছবাহকে নিয়ে বসলেন পিতা মাতা উভয়ে। ভাইয়া মুয়াজ ও আপু মারিয়াম পাশেই উপস্থিত। আদরযতœ করে তারা মেছবাহর মুখে তুলে দিলেন এক লুকমা খাবার। হাঁ, এবার মেছবাহ খেতে রাজি হয়েছে। সংপ্তি নাস্তা শেষ করে গোলাম মর্তুজা সাহেব জানতে চাইলেন, তুমি গতরাত হতে কিছু খাচ্ছ না, মুখ ভার করে বসে আছ প্রভৃতি।  এসবের হেতু কী? কিছুণ নীরবতা পালন করল মেছবাহ, কিছুই বলল না মুখফুটে। গোলাম মর্তুজা সাহেব ও মমতাজ বেগম দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলেন। তারা বিষয়টিকে অনেক গভীরে নিয়ে ভাবতে লাগলেন। কিন্তু মেছবাহ একেবারেই সহজ-সরল একটি জবাব দিল।  সে বলল, আপনারা আমাকে কতটা ভালোবাসেন, স্নেহাদর করেন শুধু তাই দেখছিলাম, অন্য কোন কারণ নেই মন খারাপের।
মেছবাহর মুখে এমন কথা শুনে মারিয়াম হেসে উঠল, মুয়াজ ও মুখ চেপে হাসতে লাগল। হাসলেন না মেছবাহর আব্বু-আম্মু । তারা বুঝতে পারলেন, মেছবাহর এ কথার পিছনে নিশ্চয় কিছু না কিছু লুকিয়ে আছে। তাই তারা ব্যাপারটি বিশদভাবে জানতে চাইলেন। এবার মেছবাহ বলতে শুরু করল, গতরাতের একটি বিষয় আমাকে চিন্তার জালে আবদ্ধ করছে। গতকাল মুজিবনগর (মেহেরপুর) থেকে ফেরার পথে  বসে আছি আমরা (বন্ধুরা)।  সহসা পাশের বগি থেকে একটি বালক এসে  আমার সামনে হাত পাতল। আমি তাকে আমার পাশে বসিয়ে জানতে চাইলাম,
তোমার বাসা কোথায়?
আমার কোন ঘর-বাড়ি নেই।
তোমার আব্বু কী করেন? কোথায় থাকেন?
জানি না।
তোমার মা?
জানি না।
তুমি কি তোমার মা-বাবাকে চিন?
না।
তাহলে তুমি কোথায় থাক?
যেখানে সেখানে।
মানে?
সকালে চিত্রা এক্সপ্রেসে উঠেছিলাম। আজ এখানে থাকব। ২/৪ দিন পর এখান থেকে চলে যাব অন্যত্র।
কোথায়?
জানি না।
‘জানি না’ বলেই হাঁটতে শুরু করল বালকটি। পুনরায় কাছে ডেকে তার হাতে পঞ্চাশ টাকা তুলে দিলাম। টাকা পেয়ে তার মুখখানা উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে আমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করল, জনসম্মুখে আমার জন্য দু’আ করল। এই কৃতজ্ঞতা ও দু’আর মাঝে আমি তার সুখের অন্ত খুঁজে পাইনি। সে হাসতে হাসতে চলে গেল।
আমার সাথে সহপার্ঠীরাও অবাক হল। আমরা পরস্পর বলতে লাগলাম, এজগতে বালকটির এমন কেউ নেই যে তাকে ভালোবাসবে, একটু আদর করবে, একমুঠো অন্ন মুখে তুলে দিবে, সুখ-দুঃখে পাশে দাঁড়াবে। আমাদের তো সবই আছে। আমরা যে কত সুখে আছি তার কোন ইতি খুঁজে পাওয়া যাবে না! পান্তরে এরূপ বালকদের অবস্থা কত করুণ! কথাবার্তা শেষ করে আমরা বালকটিকে অনেক খুঁজেছি; কিন্তু পাইনি তার কোন পদচিহ্ন। আব্বু! ঐ সহায়হীন বালকটির স্থানে আমাকে দাঁড় করিয়ে অভিমানের ভান করেছিলাম। আমি তো আপনাদের কত আদর পাই; বিপরীতে ঐ বালকটি কী পায়?! এ জগতে আপন বলতে তো তার  কেউ নেই।
মেছবাহর কাহিনীটি শুনে মুয়াজ ও মারিয়ামের হাসিতে তালা পড়ল। তারা মেছবাহর ব্যাপারটি বুঝতে সম হল। এবার গোলাম মর্তুজা সাহেব বলতে লাগলেন, মেছবাহ যেমন ঐ বালকটিকে টাকা দিয়েছে তেমন আমাদেরও উচিত হল অসহ্য়া লোকদেরকে বেশী বেশী দান-সদকা করা। ইহাতে অনেক ফজিলাত রয়েছে। পবিত্র কুরআন মাজীদে এ সম্পর্কে আল্লাহর কালাম, “নিশ্চয় দানশীল পুরুষ ও মহিলা তাদের জন্য আল্লাহ মাগফিরাত এবং মহাপ্রতিদান প্রস্তুত করে রেখেছেন”। [সূরা আহযাব: আয়াত নং ৩৫]
আমাদের প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালাম অসহায়দেরকে ভালোবাসতেন এবং অনেক অনেক দান করতেন। দানের েেত্র আমার নবীর অভিধানে কোন ‘না’ শব্দ ছিল না। কেউ তার নিকট কোন কিছু চাইলে তিনি তাকে তা দান করতেন। দান করার মতো তেমন কিছু না থাকলে পরবর্তীতে আসতে বলতেন। তবু ‘না’ বলে ফিরিয়ে দিতেন না। তাইতো নবীজীর এই দানশীলতা সম্পর্কে ইবনে আব্বাস রা. বর্ণনা করেন, “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালাম সর্বাপো দানশীল ছিলেন। রমজান মাসে জিবরীল আলাইহিস সালাম যখন তার সঙ্গে সাাৎ করতেন তখন দানশীলতা আরও বেড়ে যেত। আর তিনি রমজানের প্রতি রাতে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালামের সঙ্গে সাাৎ করে কুরআন দাওর করতেন। আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালাম উন্মুক্ত বায়ূর চেয়েও দানশীল ছিলেন”। [বুখারী শরীফ: হাদীস নং ০৬]
দানÑসদকার ফজিলাত সম্পর্কে আলাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালামের এক সাহাবী রা. নবীজীর থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, “কিয়ামত দিবসে (কঠিনতম অবস্থায়) মুমীনের ছায়া হবে তার সদকা।” [মুসনাদে আহমাদ: হাদীস নং ২৩৯৭৩]
দানÑসদকা করার সাথে সাথে আরেকটি বিষয় আমাদের খেয়াল রাখতে হবে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদেরকে স্বচ্ছল করেছেন। তিনি ইচ্ছা করলে আমাদেরকেও ঐ ছোট্ট বালকটির মত সহায়হীন বানাতে পারতেন। তাই আল্লাহ তায়ালার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে হবে, অকৃতজ্ঞ হওয়া যাবে না। আলাহ তা’আলা এ সম্পর্কে ইরশাদ করেন, “তোমরা সত্যিকারের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলে আমি তোমাদেরকে আরও বেশী দান করব। আর যদি অকৃতজ্ঞ হও, তবে জেনে রেখ-আমার শাস্তি বড় কঠিন”। [সূরা ইবরাহীম: আয়াত নং ০৭]
তাছাড়া শোকরগুজার ব্যক্তিদেরকে আল্লাহ তা’আলা পুরস্কার দান করেন। পুরস্কারের সুসংবাদ সম্বন্ধে অন্য আয়াতে দয়াময় আল্লাহ বলেন, “আমি তাদের প্রতি প্রস্তর বর্ষণকারী প্রচ- ঘূর্ণিবায়ু প্রেরণ করেছিলাম; কিন্তু লূত আলাইহিস সালামের পরিবারবর্গের উপর নয়। তাদেরকে আমি রাতের শেষপ্রহরে উদ্ধার করেছিলাম। এটা ছিল আমার প থেকে এক নিয়ামত। যারা কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে, আমি তাদেরকে এভাবেই পুরস্কৃত করে থাকি”। [সূরা ক্বামার: আয়াত নং ৩৪ ও ৩৫] সুখে-দুঃখে সর্বাবস্থায় আমাদেরকে আল্লাহ তা’আলার প্রতি সন্তুষ্ট থাকতে হবে, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে হবে। ইহার মাঝেই আমাদের জন্য কল্যাণ নিহীত। ছুহাইব রা. থেকে বর্ণিত আছে যে, হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালাম বলেন, “মুমিন ব্যক্তির ব্যাপারে আমার আশ্চর্য লাগে। মুমিনের যাবতীয় বিষয়াদী তার জন্য কল্যাণকর। এমনটি শুধু মুমিনের েেত্রই হয়ে থাকে। মুমিনের যখন খুশির হালাত আসে তখন সে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। এটা তার কল্যাণের কারণ বনে। আর যদি কষ্টের সম্মুখীন হয় তখন শোকর করে। এটাও তার জন্য কল্যাণকর হয়”। [মুসনাদে আহমাদ: হাদীস নং ১৯২৪২]
কুরআন-হাদীস থেকে এই তাৎপর্যপূর্ণ আলোচনা শ্রবণে উপস্থিত সকলের হৃদয়ে ঊষার রবি উদিত হল। তারা অসহায়দের পাশে দাঁড়াতে উৎসুক হল, শপথ করল সহায়তা করার। আর মেছবাহ দান-সদকার প্রতি আরও অগ্রসর হল, সমভিব্যাহারে নেয়ামতের শুকরিয়াও। অধুনা সে ঐ নিঃসহায় বালকটির অনুসন্ধান করে শহরের গলিতে গলিতে। হৃদয়ের কুটিরে স্থান দিয়ে স্মরণ করে তার কথা। কেননা, এই মহামূল্যবান কুরআন-হাদীসের বাণী তারা শুনতে পেয়েছে শুধুমাত্র ঐ অসহায় বালকটির দরুন। ঐ বালকটির কারণেই তারা কুরআন-হাদীসের আলোকে জীবন গড়ার স্বপ্ন বুনেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight