ন্যায় বিচারক মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম / এইচ. এম. শহীদুল ইসলাম মামুন

 

মক্কার কাবা ঘর। যাকে বায়তুল্লাহ বা আল্লাহর ঘর বলা হয়। প্রাচীনকাল হতেই এ ঘরটি সারা পৃথিবীর মানুষের অতি পরিচিত। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দাদা আব্দুল মুত্তালিব ছিলেন এই ঘরের সংরক্ষক। প্রতিটি মুসলমান পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের সময় কাবা ঘরের দিকে মুখ করে দাঁড়ায়। আমাদের মহানবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আবির্ভাবকালে কাবা ঘরের অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় ছিলো। কাবা ঘরের চারপাশে প্রাচীরবেষ্টিত না থাকায় বর্ষার সময় পানি ঢুকে পড়ত। তা ছাড়া উপরে কোন ছাদ ছিল না বলে সময়ে সময়ে উহার আসবাবপত্র ও ছুরি হয়ে যেত। এসব কারণে কোরেশগণ অনেক দিন যাবৎ কাবা ঘর মেরামতের জল্পনা-কল্পনা করে আসছিল। এমন সময় আরবের জেদ্দা বন্দরে হঠাৎ একখানি জাহাজ নষ্ট হলে কোরেশদিগের কাবা ঘর মেরামতের আগ্রহ আরো বেড়ে যায়। জাহাজের তক্তাগুলি তালা সস্তাদরে কিনে আনলেন এবং তা দিয়ে মেরামতকার্য আরম্ভ করলেন। কোরাইশ দবপতিগণ সবাই মিলেমিশে কাজ করছিলেন, হঠাৎ একটি ঝামেলা বাধলো।কাবা ঘরের ভেতরে যে হজরে আসওয়াদ (কালো পাথর)টি ছিলো, তা তুলে এনে নির্দিষ্ট স্হানে কারা স্হাপন করবে, এ বিষয়ে দলপতিগণের মধ্যে বিরোধ দেখ দিলো। হাজরে আসওয়াদের সাথে সামাজিক ও বংশগত মর্যাদার বিষয় জড়িত ছিলো। কাজেই প্রত্যেক গোত্রই তা তুলবার আগ্রহ দেখাল। প্রথমে তর্ক-বিতর্ক তারপর তুমুল-দ্বন্দ্ব কলহে লিপ্ত হলো। চার দিন এভাবে কেটে গেলো। কিন্তু কোনই মীমাংসা হলো না।অবশেষে প্রথানুসারে সবাই যুদ্বের জন্য প্রস্তুত হলো। যুদ্ধ যখন একেবারে অনিবার্য হয়ে উঠলো,তখন জ্ঞানবৃদ্ধ আবু উমাইয়া সবাইকে আহ্বান করে বললেন, ক্ষান্ত হও, আমার কথা শোন। সামান্য কারণে কেন রক্তপাত করবে? ধৈর্য ধরে অপেক্ষা কর। আমার প্রস্তাব এই যে ব্যক্তি আগামী কাল সর্বপ্রথম কাবা ঘরে প্রবেশ করবে তার উপরেই বিবাদের ফায়সালার ভার অর্পণ করা হোক। সে যে সিদ্ধান্ত দিনে, তাই আমারা মেনে নিবো।এতে তোমরা রাজি আছো? বৃদ্ধের প্রস্তাবে সবাই সম্মত হলেন। সবাই প্রথম আগন্তুকের প্রতিক্ষায় উদগ্রীব।প্রত্যেকের মনে কত চিন্তার উদ্রেক।যে আসবে সে কেমন লোক হবে,কোন পক্ষে সে রায় দিবে,তাঁর সিদ্ধান্ত যদি সবার মনঃপূত না হয়,তখন কী ঘটবে ইত্যাদি নানা চিন্তা সবার মনে খেলতে লাগলো।এমন সময় সবার কন্ঠে ধ্বনিত হলো ‘এই যে আমাদের আল-আমীন’ আসছে। আমরা তাঁর সিদ্ধান্ত নিশ্চয়ই মেনে নিবো। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন তরুণমাত্র। কিন্তু তবুও মক্কাবাসীদের কী অগাধ বিশ্বাস ছিলো তাঁর উপর। মুহাম্মাদ আসলে সবাই তাঁকে সমস্ত ব্যাপার বুঝিয়ে বললো।তখন তিনি বললেন, ‘বেশ, ভালো কথা। যে সকল গোত্রে হাজরে আসওয়াদ (কালো পাথর) তুলবার দাবী করছেন,তাঁদের প্রত্যেকের নিজেদের মধ্যে হতে এক একজন প্রতিনিধি নির্বাচন করুন। তাই করা হলো। তখন মুহাম্মাদ সাল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতিনিধিদেরকে সঙ্গে নিয়ে কালো পাথরের কাছে গেলেন। একখানি চাদর বিছিয়ে নিজে সে পাথরখানা উহার মাঝখানে রাখলেন।তারপর প্রতিদিধিদেরকে বললেন, এইবার আপনারা সবাই এই চাদরখানার এক এক প্রান্ত ধরে পাথরখানাকে যথাস্থানে নিয়ে চলুন। সবাই তা করলেন। গন্তব্যস্থানে উপনীত হলে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পুনরায় পাথরখানা নিজ হাতে তুলে যথাস্থানে রাখলেন। এই বিচারে সবাই সন্তুষ্ট হলেন। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিচক্ষণতায় সবাই মুগ্ধ হলেন। বেঁচে গেলো আরবভূমি একটি ভয়াবহ যুদ্ধ হতে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight