ন্যায়বিচারের ফল / সৈয়দা সুফিয়া খাতুন

ই ঘটনাটিকে শাম দেশের প্রসিদ্ধ লেখক ও প্রবন্ধকার শায়খ আলী তানতাবী রহ. লিখিত কিতাব “কাসাস মিনাত তারীখ” থেকে সংক্ষিপ্ত করে ও কিছু আগে পিছে করে উল্লেখ করা হয়েছে।
সমরকন্দের এক ব্যক্তি প্রচ- শীত ও গভীর অন্ধকার রাতে তার বাড়ি থেকে বের হয়। তার যাত্রা শাহী ভবনমূখী। অন্ধকারে অতি কষ্টে শেষ পর্যন্ত সেই রাজমহলে এসে পৌঁছে। সেই ভবনের এক পাশে উপাসনালয়। এর দরজায় অনেক বড় ও ভারী পাথর রাখা আছে যার উপর মূর্তি খোদিত আছে। সে ভীত, জীবনে প্রথমবার এই উপাসনালয়ে প্রবেশ করতে যাচ্ছে। এর আগে কখনো তার এই সুযোগ হয়নি।
এই হালকা-পাতলা যুবক কাপুরুষ নয়; বরং অত্যন্ত বাহাদুর ও বীর পুরুষ। তার উচ্চতা বেশ লম্বা, অত্যন্ত তীক্ষè বুদ্ধির অধিকারী, চিন্তা-চেতনা অনেক উর্ধ্বের এবং বাস্তবমুখী পরিকল্পনাকারী। স্থানীয় ভাষা তার মাতৃ ভাষা; কিন্তু আরবী ভাষার উপর তার গভীর জ্ঞান আছে এবং অনর্গল আরবী ভাষা সে বলতে পারে। তাকে উপাসনালয়ের সর্ববৃহৎ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা সাক্ষাতের জন্য ডেকেছেন। এই সাক্ষাত তাকে এক আশ্চর্যজনক পরিবেশের সম্মুখীন করেছে। তার শরীর কাঁপছিল, এই উপাসনালয়ে অনেক কম লোক প্রবেশ করতে পারে। আর যারা এর দায়িত্বে রয়েছে তারা একবার প্রবেশ করে আর বের হতে পারে না এবং সারা জীবনে সূর্যের আলো তাদের ভাগ্যে জোটে না। সে আস্তে আস্তে সামনের দিকে অগ্রসর হল। তার জন্যে দরজা খুলে দেয়া হয়েছে। সামনের রুমে বিশাল দেহের অধিকারী এক ব্যক্তিকে দেখতে পেল। তার রয়েছে লম্বা সাদা দাঁড়ি। সে তাকে তার নাম ধরে ডাকল এবং নিজের পিছনে আসতে বলল। সে বুঝতে পারল যে, এই উপাসনালয়ের পাহারাদার। সে তার পেছনে চলতে লাগল। বেশ ক’জন দাসকে অতিক্রম করে জ্যোতিষীদের প্রধানের কাছে পৌঁছল। তাকে কেউ দেখতে পায় না। সে উপাসনালয় থেকে বের হয় না। অনেক কম ব্যক্তিই তার সাথে সাক্ষাৎ করতে পারে। এই রাজ্যের প্রকৃত রাজা এই জ্যোতিষীই ছিল। কেউ তার বিরোধিতা করার সাহস পেত না। লোকদের মাঝে এই ধারণা বদ্ধমূল ছিল যে, তার নির্দেশ অমান্য করা মূলত প্রভুর নাফরমানী এবং এমন ব্যক্তি অভিশাপের উপযুক্ত। এই যুবক সবকিছুই অবাক দৃষ্টিতে দেখছিল। সে ডান-বাম দেখল। জ্যোতিষীগণ এক কাতারে দাঁড়িয়ে ছিল। বড় জ্যোতিষীর নিকট গিয়ে তার আস্তে আস্তে বলা কথা শ্রবণ করা শুরু করল, সে সমরকন্দের ইতিহাস বর্ণনা করে বলছিল, কিভাবে মুসলমানেরা এই রাজ্য দখল করে নিল। আমরা এই দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে কত নিষ্ফল চেষ্টা করেছি; কিন্তু তাদের রাজত্ব আরো মজবূত হতে যাচ্ছে। এখন আমরা নতুন এক পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি আর তা হল এই, আমরা শুনেছি যে, এই সম্প্রদায়ের বাদশাহ অত্যন্ত ন্যাপরায়ন ব্যক্তি। তিনি দামেস্কে থাকেন। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, আমরা আমাদের দূতের মাধ্যমে অভিযোগ পেশ করব। আমরা দেখব তিনি এ বিষয়ে কি ফায়সালা দেন। যেহেতু তুমি আরবী ভাষা জান এজন্য আমরা তোমাকে নির্বাচন করেছি। তুমি বুদ্ধিমান ও সাহসীও আছো। কথা-বার্তার কৌশলও তুমি জান। তুমি কি একাজের জন্য প্রস্তুত আছ? যুবক মাথা নেড়ে হ্যাঁ বোধক উত্তর দিল। বড় জ্যোতিষী বলল তাহলে এই মুহূর্তে সফরে বের হয়ে যাও। তোমার সফরের সকল প্রকার প্রয়োজনীয় সামান তোমাকে দেয়া হবে। যুবক সেখান থেকে খুশি ও আনন্দে বের হল। আজ যে তাকে বড় জ্যোতিষী বিশাল এক সম্মানের দায়িত্ব অর্পণ করেছে। এবার যেন আমার যোগ্যতা বাস্তবরূপ দেয়ার উপযুক্ত সময়। সমরকন্দকে স্বাধীন করতে আমার অংশগ্রণ থাকবে। সে বাড়ি ফিরে সফরের প্রস্তুতি নিতে লাগল। উপাসনালয় থেকে দ্রুতগামী ঘোড়া তার সাথে ছিল। সে কয়েক মাসের সফর কয়েক সপ্তাহে অতিক্রম করে হালাব পৌঁছল। দামেস্ক তার শেষ গন্তব্যস্থল ছিল, যা এখন খুবই নিকটবর্তী, শেষ পর্যন্ত দামেস্ক পৌঁছল। যা মুসলিম রাজ্যগুলোর প্রধান রাজধানী যাকে দারুল খেলাফা বলা হয়। শহরটির সৌন্দর্য ও আয়তন ও পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতায় এবং সভ্যতায় তার কাছে এই শহর অনেক অগ্রসর মনে হল।
সে এক আবাসিক স্থানে নামল এবং তার মালিককে জিজ্ঞেস করল, আমীরুল মুমিনীনের সাথে সাক্ষাতের কি উপায়? বাসার মালিক বলল, আমাদের আমিরুল মুমিনীনের সাথে সাক্ষাত করা খুবই সহজ। তুমি মসজিদের উমভীর দিকে চলে যাও, সেখানে কারো কাছে খলীফার বাসস্থানের কথা জিজ্ঞেস করে নিবে। সেখানে কোন পাহারাদার নেই আর সাক্ষাতের কোন পাবন্দি নেই।
সে মসজিদে উমভীতে প্রবেশ করল। এমন সুন্দর ভবন সে আজ পর্যন্ত কোথাও দেখেনি। সে ভাবল এটাই শাহী মহল হতে পারে। সুতরাং সে এক ব্যক্তিকে জিজ্ঞেসই করে ফেলল, তার গড়নে ও কণ্ঠে মনে হচ্ছিল যে, সে এই শহরে একজন আগন্তুক। সেই ব্যক্তি বলল, খেলাফত ভবনের কথা জানতে চাচ্ছো?
তাহলে কি এটা খেলাফত ভবন নয়? সে আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করল। সেই ব্যক্তি মৃদু হেসে বলল, না, হে মুসাফির বন্ধু! এটা আল্লাহর ঘর। এটা মসজিদ। তুমি কি নামাজ পড়ে নিয়েছ?
নামাজ আমি কিভাবে আদায় করতে পারি? আমি তো সমরখন্দের জ্যোতিষী ধর্মের লোক। সেই দ্বীন সম্পর্কে জ্যোতিষীদের ছাড়া আর কেউ জানে না, আর তা রহস্যভরপুর!
সেই ব্যক্তি দ্বিতীয়বার প্রশ্ন করল, অতঃপর সে বলল আমি নামায কিভাবে পড়ব?  আমি তো নামাজের নিয়ম জানি না।
সেই ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল, তোমার ধর্ম কি?
যুবক উত্তর দিল, আমার জানা নেই।
সেই ব্যক্তি প্রশ্ন করল, তোমার প্রভু কে?
যুবক উত্তর দিল, উপাসনালয়ের খোদা।
সেই ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল, তোমরা কার উপসনা কর?
যুবক উত্তর দিল, উপাসনালয়ের খোদাকে।
এবার সে পরবর্তী প্রশ্ন করল, যদি তুমি তার কাছে কিছু চাও তবে কি সে দেয়। আর যদি তুমি অসুস্থ হও তবে কি সে উপাস্য তোমাকে সুস্থ করে দেয়?
যুবক বলল, তা আমি জানি না।
সেই ব্যক্তি মনে করল এটা উপযুক্ত সময় তাকে ধর্মের মৌলিক বিষয় জানানোর। সুতরাং তার কাছে ইসলামের উত্তম আদর্শের কথা বর্ণনা করল এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই সমরখন্দীর মনের ময়লা-আবর্জনা দূর হয়ে গেল এবং সে কালেমায়ে তাওহীদ (একত্ববাদের পবিত্র বাক্য) পড়ে নিল। আর ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নিল।
এখন সেই ব্যক্তি নওমুসলিম ভাইকে বলল, চল আমরা আমিরুল মুমিনীনের সাক্ষাতে যাই। যদিও তিনি তার এই সময় পরিবার-পরিজনের জন্যে নির্ধারণ করেছেন, তবুও তিনি অত্যন্ত দয়াশীল ও নম্র। মসজিদ থেকে বের হয়ে রাস্তায নেমে সাধারণ এক বাড়ীর দিকে ইঙ্গিত করে লোকটি বলল, এটা আমিরুল মুমিনীনের বাড়ি। সে আশ্চর্যবোধ করল যে, সে ভেবেছিল যে তা বিশাল সুউচ্চ প্রাসাদ হবে; কিন্তু এতো খুবই সাধারণ বাড়ি। সে দরজায় আওয়াজ করল। ন্যায়ের প্রতীক খলীফা উমর বিন আবদুল আজীজ তার অবস্থা জিজ্ঞেস করলেন এবং আগমনের উদ্দেশ্য জানতে চাইলেন, বল কি ব্যাপার?
সে মহা বীরবিক্রম সেনা প্রধান কুতাইবা বিন মুসলিমের বিরুদ্ধে অভিযোগ করল যে, আমাদের রাজ্য মুসলমানরা দখল করে নিয়েছে। এটা প্রতারণার মাধ্যমে করেছে, যুদ্ধের কোন ঘোষণা দেয়া হয়নি আর না ইসলামের দাওয়াত পৌঁছানো হয়েছে। আমাদের সাথে অন্যায় করা হয়েছে।
উমর বিন আবদুল আজীজ বলতে লাগলেন, আল্লাহর নবী আমাদেরকে অন্যায় জুলুম করতে নির্দেশ দেননি; বরং আমাদেরকে ন্যায় ও ইনসাফ করতে শিখিয়েছেন। এর মধ্যে মুসলিম ও অমুসলিমের কোন ভেদাভেদ নেই। তিনি নির্দেশ করলেন, কাগজ-কলম হাজির কর। গোলাম কাগজের এক টুকরো ও কলম নিয়ে হাজির হল। তাতে দু’লাইন লিখে মহর মারলেন এবং সমরকন্দীর হাতে দিয়ে বললেন, এটা তোমাদের শহরের বিচারকের কাছে নিয়ে যাও।
সমরকন্দী ফিরে গেল। এখন তার আত্মা তাওহীদের আলোয় আলোকিত ছিল। যেখানেই অবস্থান করত সেখানেই মসজিদে প্রবেশ করে নামাজ পড়ত এবং নিজ মুসলিম ভাইদের সাথে সাক্ষাত করে আবার গন্তব্যস্থানের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হত। সফরে সে অন্যরকম তৃপ্তি পাচ্ছিল। এখন আর তার কাছে কোন ব্যক্তিই পর ছিল না সবাইকে তার আপন মনে হচ্ছিল। যেখানেই সে নামাজ আদায় করত সেখানকার লোকজনকে কার আগে তার আপ্যায়ন করতে পারে এই চেষ্টায় থাকত। এভাবে ইসলামের অসংখ্য আদর্শের কথা জানতে পারছিল। এরপর একদিন আসল যখন, সে সমরকন্দে প্রবেশ করছিল। সে সোজা উপসনালয়ে গেল। এখন সে আগের মত ভীত ছিল না। এখন সে পাথরের মূর্তি সম্পর্কে জানে যে এই মূর্তি হাতের তৈরি যা মানুষের লাভ-ক্ষতি কোনটাই করতে পারে না। সে এসবের দিকে তুচ্ছ দৃষ্টি দিয়ে প্রধান দরজায় পৌঁছলে পাহারাদার দরজা খুলে দিল। আর সে কয়েক মিনিট পরেই প্রধান জ্যোতিষীর সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। জ্যোতিষী বিশ্বাস করতে পারছিল না। সে ভাবছিল তাকে হয়ত হত্যা করে দিয়েছে। সে তাদের সামনে সফরের বিস্তারিত বলল; কিন্তু ইসলাম গ্রহণের কথা ইচ্ছা করেই গোপন করেছে। তারা তার কথায় আনন্দিত হল, এখন আমাদের স্বাধীনতার সময় এসেছে। খলীফার পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট নির্দেশ যে, বিচারকের সামনে এই মুকদ্দমা পেশ করা হবে। জ্যোতিষীরা তাদের দাবীর পক্ষে প্রমাণ পেশ করতে পারলেই সম্পূর্ণরূপে স্বাধীন হবে। বিবাদী কুতাইবা আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াবে এবং বিচারক যে ফায়সালা দিবে তা বাস্তবায়িত হবে।
এরপর নির্ধারিত দিনে সমরকন্দবাসী এই ঐতিহাসিক রায় শোনার জন্যে হাজির হল। মসজিদের মধ্যে আদালত বসে। সেই জ্যোতিষী যাকে কেউ দেখেনি মোকদ্দমার জন্য আজ সেও এখানে হাযির। মুসলমানদের সেনাপতি, আমীর গাজী কুতাইবাও সেখানে উপস্থিত। সকলেই বিচারকের অপেক্ষায় আছে। এরপর হালকা-পাতলা এক ব্যক্তি সাধারণ পোশাক পরিহিত, মাথায় পাগড়ী দরজা দিয়ে প্রবেশ করলেন। তার পেছনে তার গোলাম। লোকজনের মধ্যে নীরবতা ছেয়ে গেল। আচ্ছা এই ব্যক্তি মুসলমানদের বিচারক। সেই সেনাপতি কুতাইবা বিন মুসলিমের বিরুদ্ধে ফায়সালা দিবে।
বিচারক মসজিদের এক কোণায় আসন গ্রহণ করেন। তার গোলাম তার পাশে দাঁড়ানো। বিনা উপাধিতে শুধু আমীরের নাম নিয়ে আহ্বান করা হল, আদালতের সামনে হাজির হওয়ার জন্যে। শহরের শাসক হাযির হলেন। আদালত তাকে বসার ইঙ্গিত করল। এবার গোলাম জ্যোতিষীদের প্রধানকে আহ্বান করল, আমীরের এক পাশে বসে গেল। এরপর আদালতের কার্যক্রম শুরু হল।
বিচারক অতিন¤্রতার সাথে জ্যোতিষীর উদ্দেশ্যে বললেন, বল তুমি কি বলতে চাও?
সে বলল, যুগের শ্রেষ্ঠ সেনাপতি কুতাইবা বিন মুসলিম আমাদের রাজ্যে প্রতারণা করে প্রবেশ করেছেন। যুদ্ধের কোন ঘোষণা দেননি, আর না আমাদের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছানো হয়েছে?
বিচারক আমীরের উদ্দেশ্যে বললেন, তুমি কি বলতে চাও? নিশ্চয় যুদ্ধ হল প্রতারণা। এটি একটি বিশাল শহর আল্লাহ তাআলা এই শহরকে কাফেরদের থেকে রক্ষা করেছেন এবং তা মুসলমানদের হাতে ন্যস্ত করেছেন।
বিচারক, তুমি কি প্রথম সমরকন্দবাসীকে ইসলামের দাওয়াত দিয়েছিলে অথবা কর আদায় করতে বলেছিলে অথবা দুটি বিষয়ের কোনটিই স্বীকার না করলে যুদ্ধের ঘোষণা করেছিলে?
সেনাপতি, না এমনটিতো হয়নি।
বিচারক বললেন, আপনি আপনার ভুল স্বীকার করলেন। বিচারক আরো বললেন, আল্লাহ তাআলা এই মুসলিম উম্মতকে সাহায্য এজন্যেই করেছেন যে, তারা দ্বীনের অনুসারী এবং প্রতারণা থেকে দূরে থাকে।
আল্লাহর কসম! আমরা আমাদের ঘর-সংসার ত্যাগ করে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের জন্যে বের হয়েছি। আমরা ভূখ- দখলের উদ্দেশ্যে বের হইনি।
আর না অন্যায়ভাবে রাজত্ব করা আমাদের উদ্দেশ্য। আমি ফায়সালা দিচ্ছি যে, মুসলমান এই শহর থেকে বের হয়ে যাবে। আর শহরের প্রকৃত বাসিন্দাদের কাছে শহরটি ফিরিয়ে দেয়া হোক। অতঃপর তাদেরকে দ্বীনের দাওয়াত দেয়া হোক অথবা যুদ্ধের চ্যালেঞ্জ করা হোক।
সমরকন্দবাসী ও জ্যোতিষীগণ এই ফায়সালা যা শুনছিল তাদের বিশ্বাস হচ্ছিল না। তারা ভাবল আমরা কোন স্বপ্ন দেখছি না তো। বিচারক সরকারের বিরুদ্ধে ফায়সালা দিয়ে দিল। অনেকেই সেখানে বসে কল্পনার জগতে হারিয়ে গেল, তারা উপলব্ধিও করতে পারছে না, আদালত সমাপ্ত হয়েছে এবং বিচারক ও আমীর সেখান থেকে বিদায় নিয়েছে।
আমাদের সমরকন্দী (মুসলিম) দূত অবাক দৃষ্টিতে প্রধান জ্যোতিষীর দিকে তাকিয়ে আছে। দেখতে পেল যে, জ্যোতিষী প্রধানের চেহারার রং পাল্টাচ্ছে। সে গভীর চিন্তায় মগ্ন। সে তার চোখ দুটো বন্ধ করে তার অতীত ভাবতে থাকে। নিজের আকীদা ও বিশ্বাসের কথা ভাবে। এর বিষয় বস্তু শুধুমাত্র জ্যোতিষীদের নিয়ে। আর ইসলামের পরিম-ল কত বিশাল ও বড়। কত সুন্দর ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার দ্বীন। আজ আদালতের সামনে গভর্নর কিভাবে মাথা নিচু করে বসেছিল। আমাদের বাদশাহ কি কখনো এরূপ আদালতে বসতে পারবে? সে এখনো ভাবছিল এমন সময় সে ঘোড়ার চলার আওয়াজ শুনতে পেল। লোকজন হৈ হুল্লা করছিল। সে তার সাথীকে জিজ্ঞেস করল এই আওয়াজ কিসের?
তাকে বলা হল, বিচারকের ফায়সালা কার্যকর করা হচ্ছে। সেনাদল ফিরে যাচ্ছে। হ্যাঁ, সেই বিশাল সেনাবাহিনী যাদেও সামনে ইয়াসরিব থেকে নিয়ে সমরকন্দ পর্যন্ত কোন বাঁধা সৃষ্টি হতে পারে না। যাদের দ্বারা পরাশক্তি রোম ও পারস্যের শক্তি-সামর্থ সব বিনাশ হয়েছে; কিন্তু আজ ইসলামী সেনাদল এক দুর্বল হালকা-পাতলা শরীরে অধিকারী বিচারকের ফায়সালার সামনে আত্মসমর্পণ করল। আজ সকালের কথা এক ব্যক্তি যার সাথে শুধু একটি গোলাম ছিল। তিনি দু’পক্ষের বর্ণনা শুনেন। সেনাপতির স্বীকারোক্তির পর দু’তিন লাইনের লেখা ফায়সালা যাতে মুসলমানের আমীরকে শহর খালি করতে নির্দেশ দিয়েছেন। আদালতের নির্দেশানুযায়ী তিনি নিয়মানুযায়ী চ্যালেঞ্জ করবেন এবং দ্বিতীয়বার যুদ্ধ করবেন। জ্যোতিষী নিজের সাথীদের কথা শুনছিলেন অতঃপর নিজের কাছেই নিজে প্রশ্ন করলঃ সমরকন্দী এই প্রবল ¯্রােতের সামনে টিকে থাকতে পারবে? তাদের কি মোকাবেলা করার শক্তি আছে? বিশ্বের কত দেশ তাদের সামনে টিকে থাকতে পারেনি। আমাদের অসত্য ধর্ম কি তাদের সামনে দাঁড়াতে পারবে? না, কখনো না। প্রভুর ফায়সালা এসে গেছে। এই অন্ধকারাচ্ছন্ন রাতের শেষ হয়ে প্রভাতের আলো বিশ্বে উদ্ভাসিত হচ্ছে। সে তার সাথীদের দিকে তাকাল এবং জিজ্ঞেস করল, তোমাদের কি মতামত? আমাদের কি করা উচিত? আমরা কি তাদের মোকাবেলা করতে পারব? আরে কেন উত্তর দিচ্ছ না? সমরকন্দী মুসলিম দূত জোরে বলতে লাগল, সাথীরা! আমার সিদ্ধান্ত ও পরামর্শ শোন! সবাই তার দিকে কান দিল।
সে বলল, নিঃসন্দেহে আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোন সত্য উপাস্য নেই এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর বান্দা ও রাসূল।
এবার জ্যোতিষী প্রধানের এই বাক্য বলার পালা ছিল, আর আমিও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোন সত্য উপাস্য নেই আর মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বান্দা ও রাসূল।
এরপর আকাশে-যমীনে দেখে যে, সমরকন্দের গলি-গলি ও বাজারে বাজারে আল্লাহু আকবার ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে গেল। লোকজন দলে দলে ইসলামে প্রবেশ করছে। তারা মুসলমানদের ঘোড়ার রশি ধরে থামিয়ে তাদের বলতে লাগল এই দেশ থেকে যেয়ো না। আমাদের ইসলামের ন্যায়বিচার ও ইনসাফের প্রয়োজন। আমরা আমাদের রাজত্ব দেখেছি। তাদের অন্যায় ও অত্যাচার সম্পর্কে আমরা ভালভাবেই জানি। আপনার সকলেই ফিরে আসুন। আমরাও তোমাদের ধর্মকে গ্রহণ করেছি। এরপর কিছুক্ষণের মধ্যেই মুসলমান সেনাবাহিনী বিনা যুদ্ধে বিজয় করে শহরে প্রবেশ করল। কেউ আর শাসক রইল না আর শোষকও রইল না, আর কেউ জয়ীও রইল না, পরাজিতও রইল না। আল্লাহর জন্যে সকলেই ভাই ভাই হয়ে গেল।
কোন আরবীয় ব্যক্তির কোন প্রাধান্য নেই অনারবীয়ের উপর। কোন শক্তিশালী ব্যক্তি দুর্বল ব্যক্তির উপর প্রাধান্য নেই। হ্যাঁ, তবে পার্থক্য সৃষ্টিকারী কেবল তাকওয়া (আল্লাহভীতি)
এভাবে সমরকন্দের ভূখণ্ডে ইসলাম এক মহা সম্পদ হয়ে প্রবেশ করল। অতঃপর এই নেয়ামত আর কখনো বের হয়নি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight