নেশা মদ ও জুয়ার কুফল : সৈয়দা সুফিয়া খাতুন কৃত “বিশ্ব নারী মুক্তির উপায়” থেকে গৃহীত

মহান আল্লাহ তাআলা সূরা বাকারার ২১৯ নং আয়াতে সূরা মায়েদার ৯০-৯১ নং আয়াতে এবং সূরা নিসার ৪৩ নং আয়াতে নেশা, মদ ও জুয়াকে হারাম ঘোষণা করেছেন।
হাদীস শরীফে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, সর্বপ্রকার অপকর্ম এবং অশ্লীলতার জন্মদাতা হল মদ, এটি পান করলে মানুষ নিকৃষ্টতর পাপে লিপ্ত হয়। নাসায়ী শরীফের হাদীসে বলা হয়েছে, শরাব ও ঈমান একত্র হতে পারে না। অন্য হাদীসে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ১০ শ্রেণীর ব্যক্তির উপর লানত। ১. (মদ তৈরির উদ্দেশ্যে খুরমা বা আঙ্গুর ইত্যাদি হতে) নির্যাস বেরকারী। ২. মদ প্রস্তুতকারক। ৩. মদ পানকারী। ৪. যে পান করায়। ৫. আমদানিকারক। ৬. যার জন্য আমদানী করা হয়। ৭. বিক্রেতা। ৮. ক্রেতা। ৯. সরবরাহকারী। ১০. লভ্যাংশ ভোগকারী। [তিরমিযী শরীফ]
আরেকটি হাদীসে আছে, শরাব সকল মন্দ ও অশ্লীলতার মূল।
কতিপয় মদ ও নেশাজাত দ্রব্যের নাম :
মদ, ফেন্সিডিল, হুইস্কী, বাংলা মদ, তারী, আফিম, গাজা, হাশীশ, হিরোইন, ইয়াবা, আইছফিল ইত্যাদি।
পর্যালোচনা :
নেশা, মদ, জুয়ার সমূহ ক্ষতি ও অকল্যাণের বিষয় উপলব্ধি করে হযরত ফারুকে আযম রা. হযরত মুআয ইবনে জাবাল রা. প্রমুখ সাহাবী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে সূরা বাকারার ২১৯ নং আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। মদ ও জুয়া অনেক বড় বড় পাপ কর্মের কারণ। এর যাবতীয় ক্ষতি হল শারীরিক ও বৈষয়িক। তাহলে সে ক্ষতির তুলনায় গোনাহগার হওয়ার বিষয়টি মানুষের জন্য অধিক ক্ষতিকর।
মদ পানে মানুষের সাময়িক আনন্দ লাভ হয়, সাময়িক উত্তেজনা ও শক্তি বৃদ্ধি পায়। জুয়ায় বিনা কেশে অর্থ লাভ হয়। কিন্তু এই যৎসামান্য উপকারের চেয়ে ক্ষতির দিকটি অনেক বিস্তৃত ও গভীর। উদাহরণত, মদ পানে অরুচি, ¯œায়ুবিক দুর্বলতা, শারীরিক অকর্মণ্যতা, ক্যান্সার, যক্ষা প্রভৃতি মারাত্মক রোগ সৃষ্টি হয়। সর্বাপেক্ষা ক্ষতির দিক হল মদ মানুষের চিন্তা ও বোধ শক্তিকে বিনষ্ট করে দেয়। ফলে মদ পানকারী নেশাগ্রস্ত অবস্থায় হত্যা, ব্যভিচার, জেনাসহ নানা রকম অপরাধ করে বসে এবং পরবর্তীতে এর প্রভাব ক্রিয়াশীল থাকে। অনুরূপভাবে জুয়া মানুষের অন্তরে অর্থ লোলুপতার জন্ম দেয়, মানুষকে কর্মবিমুখ করে তোলে, এতে সময় ও অর্থের অপচয় হয়। জুয়ারী জুয়ায় জয়লাভের আশায় ভিটে মাটি পর্যন্ত হারিয়ে বসে।
লটারী জুয়ারই অন্তর্ভুক্ত হারাম। ছক্কা, দাবা, পাঞ্জা জাতীয় খেলা যেগুলিতে বাজি ধরা হয়ে থাকে তা হারাম। জুয়া সামগ্রিকভাবে জাতির জন্য বিপর্যয় ডেকে আনে এবং মানব চরিত্রের অধঃপতন ঘটায়। যে ব্যক্তি এতে লাভবান হয় সে পরোপকারের ব্রত থেকে দূরে সরে গিয়ে রক্ত পিপাসুতে পরিণত হয়ে পড়ে। পক্ষান্তরে অপর ব্যক্তির মৃত্যু এগিয়ে আসে, অথচ প্রথম ব্যক্তি আয়েশ বোধ করতে থাকে এবং নিজের পূর্ণ সামর্থ এতে ব্যয় করে।
বর্তমান যুগ, যাকে মানুষ উন্নতির যুগ বলে অভিহিত করে থাকে, নতুন নতুন ও রকমারী শরাব বের করে নতুন নতুন নাম দেয়, স্বাদেরও নতুন পদ্ধতি আবিষ্কার করে নানা পদ্ধতিতে তার প্রচলন ঘটায়। অনুরূপভাবে জুয়ার নানা প্রকার পন্থা বের করা হয়েছে। এর মধ্যে অনেক দিক রয়েছে যা সামগ্রিকভাবে, এসব নতুন নতুন পদ্ধতিতে সম্মিলিতভাবে গোটা জাতির কাছ থেকে কিছু কিছু করে টাকা নেওয়া হয়ে থাকে এবং ক্ষতিটা সকলের মধ্যে বণ্টন করা হয়। ফলে তা ধরা পড়ে না, আর যে ব্যক্তি এ অর্থ পায় তার অর্থপ্রাপ্তি সকলের দৃষ্টিতে ধরা পড়ে, ফলে অনেকেই তার ব্যক্তিগত লাভ লক্ষ করে জাতির সমষ্টিগত ক্ষতির প্রতি ভ্রুক্ষেপ করে না।
এজন্য অনেকেই এ নতুন প্রকারের জুয়াকে জায়েয মনে করে অথচ এতেও সেসব ক্ষতিই নিহিত, যা সীমিত জুয়ায় বিদ্যমান। (যেমন, রেড ক্রিসেন্টের ৪০ লক্ষ টাকার প্রথম পুরষ্কার, প্রাইজব-, ডায়বেটিকস সমিতির লটারী, এ জাতীয় জুয়াগুলী) একদিক দিয়ে জুয়ার এই নতুন পদ্ধতি প্রাচীন পদ্ধতির জুয়া অপেক্ষা অধিক ক্ষতিকর এবং এর প্রতিক্রিয়ায় সুদূর প্রসারী ও সমগ্র জাতির পতনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
কারণ, এর ফলে জাতির সাধারণ মানুষের সম্পদ দিন দিন কমতে থাকে, আর কয়েকজন পুঁজিপতির মাল বাড়তে থাকে। এতে সমগ্র জাতির সম্পদ কয়েক ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রিভূত হওয়ার পথ খুলে যায়। যেটাকে আল কুরআন নিষেধ করে থাকে। এই নিষেধ বাণী না মানার কারনেই আজ সারা বিশ্বের অর্থনৈতিক বর্তমান এ হাহাকার অবস্থার উদ্ভব ঘটেছে। কয়েক ব্যক্তি শুধু পুঁজিপতি হয়েছে আর সমগ্র বিশ্ববাসীকে অর্থের অনিশ্চয়তায় ফেলে দিয়ে দুনিয়ায় অশান্তি সৃষ্টি করে ফেলেছে। বাংলাদেশে শেয়ার ব্যবস্থায় অস্থির চিত্র, সাধারণ ব্যবসায়ে অস্থিরতা, শিল্প ব্যবসায়ে যা সরকার সামাল দিতে ব্যর্থ হয়েছে, এসবই উক্ত আয়াতের আদেশ অমান্য করার কুফল।
জুয়ায় শরাবের মত পারস্পরিক ঝগড়া বিবাদ ও ফেৎনা ফাসাদ সৃষ্টি করে। পরাজিত ব্যক্তি জয়ী ব্যক্তির প্রতি ঘৃণা পোষণ করে এবং শত্রু হয়ে দাঁড়ায়। জুয়া সমাজ, জাতি ও সভ্যতার জন্য অত্যন্ত মারাত্মক ধ্বংসের বিষয়। আর শরাবের কুফল আরো ধ্বংসশীল। যেমন, মদ পান করলে প্রাথমিকভাবে শরীরের রক্ত গরম হয়, রক্তের গতি স্বাভাবিকের তুলনায় কয়েকশত গুণ বেড়ে যায়, এতে করে উক্ত পানকারীর মনে হয় আমি অনেক শক্তিশালী হয়েছি। জৈবিক চাহিদা মাত্রা ছাড়িয়ে যাবার দরুন সে তখন যৌন উন্মাদ হয়ে গিয়ে হিতাহিত জ্ঞান হারা হয়ে যাকেই কাছে পায়, তার সঙ্গেই যৌন চাহিদা মেটাতে চায়। তখন তার বাছ-বিচার থাকে না। অন্যের স্ত্রী, কি আপন বোন, কি শিশু কাউকে তার বাছ-বিচার করার সময় থাকে না।
এতে কেউ বাধা দিলে আর রক্ষা নেই, তাকে খুন করা, অশ্লীল ভাষায় গালি দেওয়া, মার ধর করা, স্ত্রীকে তালাক দেওয়া, এসব শুরু হয়ে যায়। এক পর্যায়ে যখন রক্ত নিস্তেজ হয় তখন তার মাথা স্বাবাবিকভাবে কাজ করে না ফলে সে শিশুর হাসির খোরাকে পরিণত হয়। এভাবে কিছুদিন মদ পানের ও নেশা করার পর তার রক্তের কণিকাগুলির অকাল মৃত্যু ঘটে। মস্তিষ্কের তন্ত্রীগুলি শুকিয়ে যেতে থাকে, স্বাস্থ্য ভেঙ্গে পড়ে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা থাকে না। এভাবে তারও অকাল মৃত্যু ঘটে। কি নারী, কি পুরুষ যেই নেশা করে তার একই অবস্থা হয়। এভাবে যৌনবাহী মরণব্যাধি এইডসে আক্রান্ত হয়। প্রাথমিক উন্মাদনার সময়টার মত পুলক, শিহরণ, ইনজয় করার জন্য সে বার বার চেষ্টা করে, এভাবেই আর্থিক ক্ষতির পাশা-পাশি চুরি, ডাকাতি, রাহাজানি বেড়ে যায় এবং অপরাধ-প্রবণতার বিস্তার ঘটে, যা এক সময় দূর্দমনীয় হয়ে যায়।
বর্তমান বাংলাদেশের যত মাস্তান, রংবাজ, ছিনতাইকারীর দৌরাত্মা সব এই নেশার দরুনই সৃষ্ট। আর এই নেশায় অভ্যস্ত হয় সবচেয়ে বেশি তরুণ-তরুণীরা। তাইতো, দেখা যায় এই সব যুব সমাজের করুণ চিত্র। স্কুল, কলেজ, ইংলিশ মিডিয়াম, ভার্সিটির ছেলেদের দ্বারা মেয়েদের শ্লীলতাহানির ঘটনা। অভিভাবকদের উপরও এসে চড়াও হয় ঐ সকল উন্মাদরা। সম্প্রতি দেশের পত্র-পত্রিকার খবরে এই চিত্র ফুটে উঠছে ব্যাপকভাবে। সরকার ইভটিজিং বা নারী উত্যক্তকারীদের দমন করতে আইন পাশ করেছে, তাতেও দেখা যায় প্রতিরোধ করতে সরকার ব্যর্থ হচ্ছে।
আর নাইট কাবগুলির কথা তো বলাই বাহুল্য। নেশার দরুন সেখানে অভিজাত ৫ তারা, ৭ তারা হোটেলগুলির চিত্র দেখে শয়তানেরও লজ্জায় দম বন্ধ হয়ে যায়। মানুষ সেগুলির গরমে দূর থেকেই পুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছে। ইয়াবা আমদানিকারক এজেন্টরা তো চায় এ দেশের যুব সমাজটাকে যত তাড়াতাড়ি ধ্বংস করা যাবে ততই তাদের সুদিন আসবে। এদের কাছে এদেশীয় আইনটা হল ফুলানো পটকার মতো, সুঁইয়ের একটু আচড়েই ফুঁষ। আইন শৃঙ্খলা বাহিনী তাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করতে একেবারেই অপারগ। এই যদি হয় বর্তমান দুনিয়ার বাস্তব চিত্র তাহলে এ ধরাতে ভবিষ্যত প্রজন্মের বাস করার নিশ্চয়তা কোথায়?
নেশামুক্ত সমাজ তথা আমাদের ফুলের মত সন্তানদের সুন্দর জীবনের নিশ্চয়তা কোথায়? তাই আসুন কুরআনের এ নির্দেশটা মেনে নিই, শয়তান, শরাব, মদ ও জুয়ার দ্বারা তোমাদের মধ্যে ঝগড়া বিবাদ, শত্রুতা ও ঘৃণা সৃষ্টি করতে এবং তোমাদেরকে আল্লাহর জিকির ও নামাজ থেকে বিরত রাখতে সচেষ্ট। সুতরাং বল, তোমরা কি (ওসব জিনিস থেকে) বিরত হবে? [সূরা মায়িদা : আয়াত ৯১]
আমাদের এ দেশকে মদ, জুয়া, নেশামুক্ত করে তার কুফল (যা উপরে উল্লেখ হল তা) থেকে জাতির তরুণ-তরুণী, যুবক-যুবতীদেরকে রক্ষা করতে হবে। আসুন আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রকে উদ্ধার করে গড়ে তুলি স্বপ্নের সোনার দেশে বেহেশতি প্রবেশ। যেখানে থাকবে না অশান্তি দুঃখ-কষ্ট, হিংসা-বিদ্বেষ। যে দেশে বয়ে যাবে বেহেশতি সমীরণ। আল্লাহ আমাদের সবাইকে এই স্বপ্ন পূরণ করার শক্তি দিন।
নেশামুক্ত সমাজ গড়তে আমাদের করণীয় :
আমাদের বুঝতে হবে যে, যারা নেশায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে তারা অবরাধী নয়, তারা ভুল ও অন্যায় করে ফেলেছে। তাদের দোষ না ধরে তাদেরকে নেশামুক্ত করতে হবে। যে কোন প্রকারেই হোক ডাক্তারের পরামর্শক্রমে ট্রিটমেন্ট করতে হবে। আল্লাহর নিকট নামাজ আদায়ের পর দোয়া এবং আল্লাহর রাস্তায় কিছু সদকা দিয়ে দিতে হবে। সু-কৌশলে আবেগ দিয়ে তাদেরকে বুঝিয়ে আদর-¯েœহ করে, পারলে হজে নিয়ে গিয়ে বা তাবলীগের চিল্লায় পাঠিয়ে সেখানে কিছুদিন অবস্থান করিয়ে নেশামুক্ত রাখতে পারলে আল্লাহ চাহে তো নেশার বদঅভ্যাস ছাড়াতে পারবেন। তাদের সাথে সহানুভূতি দিয়ে মমতা দিয়ে, তাদেরকে তিরষ্কার না করে ভালোবাসা দিয়ে বন্ধুসুলভ ব্যবহার করে, তাদের অন্তরে নেশার প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি করতে হবে। এভাবেই আমরা নেশামুক্ত সমাজ গড়তে পারি।
লেখিকা : গ্রন্থ প্রণেতা, সম্পাদক ও প্রকাশক ‘মাসিক আল জান্নাত’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight