নূহ আ. এর কাহিনী : সংকলন – আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ জোবায়ের

Sristi jogot

তিনি হলেন নূহ ইবনু লামাক ইবনে মুতাওশশালিখ ইবনে খানুখ। আর খানুখ হলেন ইদরীস ইবন য়ারদ ইবন মাহলাইল ইবন কীনান ইবন আনূশ ইবন শীছ ইবন আবুল বাশার আদম আ.। ইবন জারীর প্রমুখের বর্ণনা মতে, আদম আ. এর ওফাতের একশ ছাব্বিশ বছর পর তার জন্ম। আহলে কিতাবদের প্রাচীন ইতিহাস মতে নূহ আ. এর জন্ম ও আদম আ. এর ওফাতের মধ্যে একশ ছেচল্লিশ বছরের ব্যবধান ছিল। দুজনের মধ্যে ছিল দশ করন [যুগ] এর ব্যবধান। যেমন হাফিজ আবু হাতিম ইবন হিব্বান রহ. তার সহীহ গ্রন্থে আবু উমামা রা. সূত্রে বর্ণনা করেন যে, এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করল, হে আল্লাহর রাসূল! আদম আ. কি নবী ছিলেন? রাসূলুল্লাহ সা. বললেন, হ্যাঁ, আল্লাহ তার সঙ্গে কথা বলেছেন। লোকটি পুনরায় জিজ্ঞাস করল, তার ও নূহ আ. এর মাঝে ব্যবধান ছিল কত কালের? রাসূলুল্লাহ সা. বললেন, দশ যুগের। বর্ণনাকারী বলেন, এ হাদীসটি মুসলিমের শর্ত অনুযায়ী সহীহ; তবে তিনি তা রিওয়ায়াত করেননি। এখন করন বা যুগ বলতে যদি একশ বছর বুঝানো হয় – যেমনটি সাধারণ্যে প্রচলিত তাহলে তাদের মধ্যকার ব্যবধান ছিল নিশ্চিত এক হাজার বছর। কিন্তু এক হাজার বছরের বেশি হওয়ার কথাও উড়িয়ে দেয়া যায়না। কেননা ইবনু আব্বাস রা. তাকে  ইসলামের সঙ্গে সম্পৃক্ত করেছেন। আর তাদের দুজনের মধ্যবর্তী সময়ে এমন কিছু যুগও অতিবহিত হয়ে থাকবে, যখন লোকজন ইসলামের অনুসারী ছিলনা। কিন্তু আবু উমামার হাদীস দশ করন এ সীমাবদ্ধ হওয়ার কথা প্রমাণ করে আর ইবনু আব্বাসা রা. একটু বাড়িয়ে বলেছেন, তারা সকলে ইসলামের অনুসারী ছিলেন। এসব তথ্য আহলে কিতাবদের সে সব ঐতিহাসিক ও অন্যদের এ অনুমানকে বাতিল বলে প্রমাণ করে যে, কাবীল ও তার বংশধররা অগ্নিপূজা করতো। আল্লাহ সর্বজ্ঞ। আর যদি করন দ্বারাপ্রজন্ম বুঝানো হয়ে থাকে, যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নূহের পর আমি কত প্রজন্মকে ধ্বংস করেছি।’ [১৭ঃ১৭] তারপর তাদের পরে আমি বহু প্রজন্ম সৃষ্টি করেছি। [২৩ঃ৪২] আবার যেমন রাসূলুল্লাহ সা. বলেন, উত্তম প্রজন্ম আমার প্রজন্ম। এ যদি হয়, তাহলে নূহ আ. এর পূর্বে বহু প্রজন্ম দীর্ঘকাল যাবত বসবাস করেছিল। এ হিসাবে আদম আ. ও নূহ আ. এর মধ্যে ব্যবধান দাঁড়ায় কয়েক হাজার বছরের। আল্লাহই সর্বজ্ঞ। মোটকথা, যখন মূর্তি ও দেব দেবীর পূজা শুরু হয় এবং মানুষ বিভ্রান্ত ও কুফুরীতে নিমজ্জিত হতে শুরু করে, তখন আল্লাহ তাআলা নূহ আ. কে রহমত স্বরূপ প্রেরণ করেন। নবুওয়াত লাভের সময় তার বয়সের ব্যাপারে মতানৈক্য রয়েছে। কেউ কেউ বলেন, নবুওয়াতের সময় তার বয়স ছিল পঞ্চাম বছর, কেউ বলেন, তিনশ পঞ্চাশ, কারো মতে চারশ আশি। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন স্থানে নূহ আ. এর কাহিনী ও তার সম্প্রদায়ের যারা তাকে অস্বীকার করেছিলো তাদের প্লাবন দ্বারা শাস্তি আর যারা তার কথায় ঈমান এনেছিল তথা নৌকার অধিবাসীদের কিভাবে মুক্তি দিয়েছিলেন সে ব্যাপারে  বর্ণনা দিয়েছেন। সূরা আরাফে আল্লাহ তাআলা বলেন- আমি তো নূহকে পাঠিয়েছিলাম তার সম্প্রদায়ের নিকট এবং  সে বলেছিল, হে আমার সম্প্রদায়! আল্লাহর ইবাদত কর, তিনি ব্যতীত তোমাদের কোন ইলাহ নেই। আমি তোমাদের জন্য মহাদিবসের শাস্তির আশংকা করছি। তার সম্প্রদায়ের প্রধানগণ বলেছিলেন, আমরা তো তোমাকে স্পষ্ট ভ্রান্তিতে দেখতে পাচ্ছি। সে বলেছিল, হে আমার সম্প্রদায়! আমাতে কোন ভ্রান্তি নেই। আমি তো জগতসমূহের প্রতিপালকের রাসূল। আমার প্রতিপালকের বাণী আমি তোমাদের নিকট পৌঁছে দিচ্ছি ও তোমাদেরকে হিতোপদেশ দিচ্ছি এবং তোমরা যা জান না আমি তা আল্লাহর নিকট হতে জানি। তোমরা কি বিস্মিত হচ্ছ যে, তোমাদেরই একজনের মাধ্যমে তোমাদের প্রতিপালকের নিকট হতে তোমাদের কাছে উপদেশ এসেছে, যাতে সে তোমাদেরকে সতর্ক করে, তোমরা সাবধান হও এবং অনুকম্পা লাভ কর। তারপর তারা তাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে। তাকে  ও তার সঙ্গে যারা নৌকায় ছিল আমি তাদেরকে উদ্ধার করি এবং যারা আমার নিদর্শন প্রত্যাখ্যান করেছিল তাদেরকে ডুবিয়ে দেই। তারা ছিল এক অন্ধ সম্প্রদায়। [সূরা আরাফ : ৫৯-৬৪] এমনি ভাবে আল্লাহ তাআলা আরো অনেক সূরাতে হযরত নূহ আ. ও তার সম্প্রদায়ের ব্যাপারে আলোচনা করেন। নূহ আ. বলেন, তারা কী করত তা আমার জানা নেই। তাদের হিসাব গ্রহণ তো আমার প্রতিপালকেরই কাছে, যদি তারা বুঝতো। মুমিনদের তাড়িয়ে দেয়া আমার কাজ নয়। আমি তো কেবল একজন স্পষ্ট সতর্ককারী। তারা বলল, হে নূহ! তুমি যদি নিবৃত্ত না হও তবে নিশ্চয় তুমি প্রস্তারাঘাতে নিহতদের শামিল হবে। নূহ বলল, হে আমার প্রতিপালক, আমার সম্প্রদায় তো আমাকে অস্বীকার করছে। সুতরাং আমার ও তাদের মধ্যে স্পষ্ট মীমাংসা করে দাও এবং আমাকে ও আমার সাথে যে সব মুমিন আছে তাদেরকে রক্ষা কর। তারপর আমি তাকে ও তার সঙ্গে যারা ছিল তাদেরকে রক্ষা করলাম বোঝাই নৌযানে। তারপর অবশিষ্ট সকলকে নিমজ্জিত করলাম। এতে অবশ্যই রয়েছে নিদর্শন, কিন্তু তাদের অধিকাংশই বিশ্বাসী নয় এবং তোমার প্রতিপালক, তিনি তো পরাক্রমশালী, পরম দয়ালু। [সূরা শুআরা] নূহ আ. এর সম্পর্কে কুরআনুল কারীমের অনেক স্থানে এমন আলোচনা করা হয়েছে যাতে তার প্রশংসা এবং হযরত নূহ আ. এর বিরুদ্ধাচারীদের নিন্দা করা হয়েছে। যেমন সূরা নিসায় আল্লাহ তাআলা বলেন, তোমার নিকট আমি ওহী প্রেরণ করেছি যেমন নূহ ও তার পরবর্তী নবীদের নিকট প্রেরণ করেছিলাম। ইবরাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক, ইয়াকুব ও তার বংশধরগণ ঈসা, আইয়ূব, ইউনুস, হারুন এবং সুলাইমানের নিকট ওহী প্রেরণ করেছিলাম এবং দাউদকে যাবুর দিয়েছিলাম। অনেক রাসূল প্রেরণ করেছি যাদের কথা পূর্বে তোমাকে বলেছি এবং অনেক রাসূল যাদের কথা তোমাকে বলিনি এবং মুসার সঙ্গে আল্লাহর সাক্ষাৎ বাক্যালাপ করেছিলেন। সুসংবাদবাহী ও সাবধানকারী রাসূলগণকে প্রেরণ করেছি যাতে রাসূলগণ আসার পর আল্লাহর বিরুদ্ধে মানুষের কোন অভিযোগ না থাকে এবং আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। [সূরা মায়েদা : ১৬৩-১৬৫]
কুরআন হাদীস ও বিভিন্ন রেওয়াতের তথ্য মোতাবেক আপন সম্প্রদায়ের সঙ্গে নূহ আ. এর যে সমস্ত ঘটনা ঘটেছিল তার সারমর্ম আমরা আগেই উল্লেখ করেছি যে, আদম আ. ও নূহ আ. এর মধ্যে ব্যবধান ছিল দশ করণ। তারা সকলেই ইসলামের অনুসারী ছিলেন। আর আমরা এও বলেছি যে, ‘করন’ বলতে তো প্রজন্ম কিংবা যুগ বুঝানো হয়েছে। তারপর এ সৎকর্মশীলদের করনসমূহের পর এমন কিছু পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় যার ফলে সে যুগের অধিবাসীরা মূর্তিপূজার দিকে ঝুকে পড়ে। আল্লাহর বাণী- ‘ও কালু লা তাযারুন্না’ এর তাফসীর প্রসঙ্গে ইবনু আব্বাস সূত্রে ইমাম বুখারী রহ. কর্তৃক বর্ণিত হাদীস অনুযায়ী ‘করন’ ছিল এই  যে, (ওয়াদ সূওয়া গাওছ ইত্যাদি) এসব হলো নূহ আ. এর সম্প্রদায়ের কয়েকজন পূণ্যবান ব্যক্তির নাম। এদের মৃত্যুর পর শয়তান তাদের সম্প্রদায়ে প্রতি মন্ত্রণা দেয় যে, এরা যে সব স্থানে বসতেন তোমরা সে সব স্থানে কিছু মূর্তি নির্মাণ করে তাদের নামে সে সবের নামকরণ করে দাও। তখন তারা তাই করে। কিন্তু তখনও এগুলোর পূজা শুরু হয়নি। তারপর যখন তাদের মৃত্যু হয় এবং ইলম লোপ পায় তখন থেকে এ সবের পূজা শুরু হয়। ইবন আব্বাস রা. বলেন, নূহ আ. এর সম্প্রদায়ের এ দেব দেবীগুলো পরে আরবেও প্রচলিত হয়। আর এই মূর্তির উদ্দিষ্ট ব্যক্তিগুলো হলো হযরত আদম আ.  নূহ আ. এর মধ্যবর্তী কালের পূণ্যবান ব্যক্তিবর্গ। তাদের বেশ কিছু অনুসারী ছিল। আর এগুলো তারা বানিয়েছিল মূলত তাদের কথা স্মরণ হলে তারা ইবাদত বন্দেগী আরো বেশি করে করতে পারবে এই আশায়। কিন্তু পরবর্তীতে ইলম শূন্যতার কারনে এর আকৃতি নেয় ভিন্ন রুপে। শয়তান পরবর্তী মানুষদের বুঝাতে লাগলো যে, এই সমস্ত মূর্তিগুলোর পূজা করে তোমাদের পূর্বপূরুষরা বৃষ্টি ও অন্যান্ন জিনিস প্রার্থনা করতো। সুতরাং তোমরাও তোমাদের মঙ্গলের জন্য এমনটা করো। তখন তারা তাদের পূজা শুরু দেয়। ইবনু আবু হাতিম উরওয়া ইবন যুবায়ের সূত্রে বর্ণনা করেন যে, উরওয়া ইবন যুবায়ের বলেন, ওয়াদ য়াগুছ যাউক সূওয়া ও নাসর আদম আ. এর সন্তান। ওয়াদ ছিল এদের মধ্যে সর্বাধিক পূণ্যবান ও প্রবীণ ব্যক্তি। এই মূর্তি ও তার পূজা নিয়ে সহীহ বুখারী ও মুসলিম শরীফে বলা হয়েছে, উম্মে সালামা ও উম্মে হাবীবা রা. রাসূলুল্লাহ সা. এর সামনে তাদের হাবশায় দেখে আসা মারিয়া নামক গির্জা এবং তার রুপ সৌন্দর্য ও তাতে স্থাপন করে রাখা প্রতিকৃতির কথা উল্লেখ করলে রাসূলুল্লাহ সা. বললেন, তাদের নিয়ম ছিল তাদের মধ্যে সৎকর্মপরায়ন কেউ মারা গেলে তার কবরের উপর তারা একটি উপাসনালয় নির্মাণ করত। তারপর তাতে তার প্রতিকৃতি স্থাপন করে রাখতো। আল্লাহর নিকট এরাই তার সৃষ্টির সব চাইতে নিকৃষ্ট জাতি। মোটকথা, বিকৃতি যখন পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে এবং তাদের মধ্যে মূর্তিপূজার ব্যাপক প্রসার ঘটে তখন আল্লাহ তাআলা তার বান্দা ও রাসূল নূহ আ. কে  প্রেরণ করেন। তিনি এক লা শরীক আল্লাহর ইবাদতের প্রতি আহবান জানান এবং আল্লাহ ব্যতীত অন্যদের উপাসনা করতে নিষেধ করেন। এ নূহ আ. পৃথিবীতে এসে জগৎবাসীকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করেন, কিন্তু অধিকাংশই তার কথা ও দাওয়াতে কর্ণপাত করেনি। যেমন পবিত্র কুরআনে আল্লাহ পাক বলেন, নূহ বলল, হে আমার সম্প্রদায় তোমারা আল্লাহর ইবাদত কর। তিনি ব্যতীত কোন ইলাহ নেই, তোমরা কি সাবধান হবেনা? তাদের অবাধ্যচারণের আরো বহু আয়াত রয়েছে কুরআনে, তবে তারা তার লম্বা দাওয়াতকে অল্পই মূল্যায়ন করেছে, যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন, নূহ তার সম্প্রদায়কে আল্লাহর প্রতি দাওয়াতের যত পদ্ধতি আছে তার সবই প্রয়োগ করেছেন। রাতে দিনে গোপনে প্রকাশ্যে কখনো উৎসাহ দিয়ে কখনও ভয় দেখিয়ে। কিন্তু এর কোনটিই তাদের মধ্যে কার্যকর ফল বয়ে আনতে পারেনি বরং তাদের অধিকাংশই গোমরাহী সীমালঙ্ঘন এবং মূর্তিপূজায় অটল থাকে এবং সর্বক্ষণ তার বিরুদ্ধে শত্র“তা করতে থাকে। তাকে ও তার ঈমানদার সঙ্গীদেরকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করতে থাকে। এবং তাদেরকে প্রস্তারাঘাতে মেরে ফেলার ও দেশ  থেকে বের করে দেয়ার ভয় দেখাতে থাকে। তারা তাদের ক্ষতি সাধন করে এবং এব্যাপারে সীমা ছাড়িয়ে যায়। আর নূহ আ. এর এ বিপদাপদ অবস্থায় আল্লাহর কাছে বিভিন্ন প্রার্থনার কথাও কুরআনে বর্ণিত আছে। আল্লাহ বলেন, নূহ তখন তার প্রতিপালকে আহ্বান করে বলেছিল, আমি তো অসহায় অতএব তুমি প্রতিধাবন কর [৫৪ঃ১০]। অনত্র বলেন, হে আমার প্রতিপালক আমাকে সাহায্য কর, কারণ  তারা আমাকে মিথ্যাবাদী প্রতিপন্ন করে [২৩ঃ২৯]। আর আল্লাহ রাব্বুল আলামীনও তার ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন। যেমন কুরআনে বণির্ত আছে- তাদের অপরাদের জন্য তাদেরকে নিমজ্জিত করা হয়েছিল এবং পরে তাদেরকে দাখিল করা হয়েছিল আগুনে, তারপর তারা কাউকে আল্লাহর মুকাবিলায় সাহায্যকারী পায়নি। নূহ আরো বলেছিলো, হে আমার প্রতিপালক পৃথিবীতে কাফিরদের মধ্য থেকে গৃহবাসীকে অব্যহতি দিবে না। তুমি তাদের কে অব্যহতি দিলে তারা তোমার বান্দাদেরকে বিভ্রান্ত করবে এবং জন্ম দিতে থাকবে কেবল দু®কৃতিকারী ও কাফির। [৭১ঃ২৫-২৭] তখন আল্লাহ তাআলা তার দোআ কবুল করেছিলেন, নৌকা বানাতে আদেশ দিলেন। যেমন আল্লাহ বলেন, যারা সীমালঙ্গন করেছে তাদের ব্যাপারে তুমি আমাকে কিছু বলোনা, তারা তো নিমজ্জিত হবে। সে নৌকা নির্মাণ করতে লাগল এবং যখনই তার সম্প্রদায়ের প্রধানরা তার নিকট দিয়ে যেত তাকে উপহাস করত। (নূহ আ. তাদেরকে যে আযাবের ভয় দেখিয়েছিলেন তা সংঘটিত হওয়া সুদূর পরাহত মনে করে তারা তাকে নিয়ে ঠাট্টা করত) [সূরা হুদ : ৩৭-৩৮] তখন আল্লাহ তাআলা বলেন, তোমরা অচিরেই জানতে পারবে কার উপর আসবে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি আর কার উপর আপতিত হবে স্থায়ী শাস্তি। [হুদ:৩৯] কোন কোন পূর্বসূরি আলিম বলেন, আল্লাহ তাআলা বলেন, যখন নূহ আ. এর দোআ কবুল করেন, তখন তাকে নৌকা নির্মাণের জন্য একটি বৃক্ষ রোপণ করতে আদেশ দেন। ফলে নূহ আ. একটি বৃক্ষ রোপণ করে একশ বছর অপেক্ষা করেন। তারপর পরবর্তী শতাব্দীতে তা কেটে কাঠ করে নেন। কারো কারো মতে চল্লিশ বছর পরে। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।
মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক রহ. বলেন, সে নৌকাটি শাল কাঠ দ্বারা নির্মাণ করা হয়েছিল। কেউ কেউ বলে, দেবদারু কাঠ দ্বারা। আর এটি হলো তাওরাতের বক্তব্য। ছাওরী বলেন, আল্লাহ তাআলা নূহ আ. কে আরো নির্দেশ দিয়েছিলো যেন নৌকাটি দৈর্ঘে আশি হাত, প্রস্থে পঞ্চাশ হাত করে তৈরি করেন। যার ভিতরে ও বাইরে আলকাতরা দ্বারা প্রলেপ দেন এবং তার এমন সরু গলুই নির্মাণ করেন, যা পানি চিরে অগ্রসর হতে পারে। কাতাদা বলে, তার র্দৈঘ ছিল তিনশ হাত আর প্রস্থ ছিল পঞ্চাশ হাত। আমি তাওরাতে এমনই দেখেছি। তবে এ ব্যাপারে আরো মত রয়েছে। আল্লাহ বলেন, তারপর যখন আমার আদেশ আসবে ও উনুন উথলে উঠবে, তখন তাতে তুলে নিও প্রতিটি জীবের এক এক জোড়া এবং পরিবার পরিজনকে তাদের মধ্যে যাদের পূর্বে সিদ্ধান্ত হয়ে আছে তারা ব্যতীত। আর জালিমদের সম্বন্ধে তুমি আমাকে কিছু বলো না, তারা তো নিমজ্জিত হবে। [সূরা মুমিনূন:২৭] অতঃপর যখন আদেশ হলো তখন তিনি তার সাথীদের এবং জীবজন্তু ও পশুপাখিগুলোকে নৌকায় তুলে নেন। কেউ কেউ বলেন এবং ইবন আব্বাস থেকেও এমন রেওয়াত আছে যে, পক্ষীকুলের সর্বপ্রথম নৌকায় যেটি প্রবেশ করেছিল তা হলো টিয়া আর প্রাণীকুলের মধ্যে সর্বশেষে যেটি প্রবেশ করেছিল তাহলো গাধা এবং ইবলিশ গাধার লেজ ধরেই নৌকায় প্রবেশ করে। ইবন আবূ হাতিম আসলাম রহ. সূত্রে  বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, নূহ আ. নৌযানে প্রতিটি জীবের এক জোড়া করে তোলা  হলে গৃহপালিত পশুরা অভিযোগ করে সিংহের সাথে আমরা কিভাবে নিরাপদ বোধ করবো? তখন আল্লাহ তাআলা সিংহকে জ্বরাক্রান্ত করে ফেলে। এহলো সর্বপ্রথম জ্বরের আবির্ভাব। এরপর ইদুরের ব্যাপারে অভিযোগ করল, তখন আল্লাহর নির্দেশে সিংহ হাঁিচ দেয়। এতে বিড়াল বেড়িয়ে আসে এবং তাকে দেখে ইদুররা সব আত্মগোপন করে। এ হাদীসটি মুরসাল। আল্লাহ বলেন, যখন তুমি ও তোমার সঙ্গীরা নৌযানে আসন গ্রহণ করবে তখন বলবে, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই যিনি আমাদেরকে জালিম সম্প্রদায় থেকে উদ্ধার করেছেন। আরো বলবে, হে আমার প্রতিপালক আমাকে এমনভাবে অবতরণ করাও যা হবে কল্যাণকর, আর তুমিই শ্রেষ্ঠ অবতরণকারী। [মুমিনূন:২৮-২৯] এখানে আল্লাহ তাআলা বিভিন্ন কাজের শুরুতে দোআ করার কথা বলে দিলেন, যেমন আমাদের নবী কে হিজরতের সময় বলেছিলেন, আপনি  বলুন, হে আমার প্রতিপালক আমাকে প্রবেশ করাও কল্যাণের সাথে এবং আমাকে বের করাও কল্যাণের সাথে এবং তোমার কাছ থেকে আমাকে দান কর সাহায্যকারী শক্তি। সূরা ইসরা : ৮০]  বলাবাহুল্য যে, আল্লাহ তাআলা নূহ আ. এর বদদোআ কবুল করেছিলেন। সমস্ত প্রশংসা ও অনুগ্রহ তারই। ফলে তাদের একটি প্রাণীও ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পায়নি। খুব কঠোর হয়েছিলেন সেদিন আল্লাহ তাআলা। কঠিনভাবে শাস্তি দিয়েছিলেন আল্লাহ নূহ সম্প্রদায়ের পাপীমানুষগুলোকে। উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা রা. এর বরাত দিয়ে ইমাম আবু জাফর ইবনে জারীর ও আবু মোহাম্মদ ইবনে আবু হাতিম আপন আপন তাফসীরে বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. বলেন, নূহ সম্প্রদায়ের কারো প্রতি যদি আল্লাহ দয়া করতেন, তাহলে অবশ্যই শিশুর মায়ের প্রতি দয়া করতেন। রাসূলুল্লাহ সা. বলেন নূহ আ. তার সম্প্রদায়ের মধ্যে পঞ্চাশ কম এক হাজার বছর অবস্থান করেন এবং বৃক্ষ রোপণ করে একশ বছর অপেক্ষা করেন, বৃক্ষটি বড় হয়ে পোক্ত হলে তা কেটে তা দিয়ে নৌকা নির্মাণ করেন। নৌকা নির্মাণকালে সম্প্রদায়ের লোকেরা তার নিকট দিয়ে অতিক্রম করত, তাকে ঠাট্টা করত এবং বলত, তুমি ডাঙ্গায় নৌকা নির্মাণ করছ? এ চলবে কিভাবে? নূহ আ. বলতেন, অচিরেই তোমরা জানতে পরবে। যখন তিনি নৌকা নির্মাণ শেষ করলেন এবং পানি উৎসারিত হলো ও তা অলিতে গলিতে ঢুকে পড়ল, তখন একটি শিশুর মা তার ব্যাপারে আশংকা বোধ করল। সে  তাকে অত্যন্ত স্নেহ করত। অগত্যা শিশুটিকে নিয়ে সে এক পাহাড়ের এক তৃতীয়াংশ উপরে গিয়ে উঠে। পানি বাড়তে বাড়তে তার পর্যন্ত পৌঁছলে এবার সে শিশুটিকে নিয়ে পাহাড়ের চূড়ায় গিয়ে ওঠে। এবার পানি তার ঘাড় পর্যন্ত পৌঁছলে এবার সে শিশুটিকে নিয়ে পাহাড়ের চূঁড়ায় গিয়ে ওঠে। এবার পানি তার ঘাড় পর্যন্ত তখন সে তার দু হাত দ্বারা শিশুটিকে উপরে তুলে ধরে। তারপর তারা দুজনই ডুবে যায়। আল্লাহ যদি তাদের কাউকে দয়া করতেন, তাহলে ঐ শিশুর মাকে অবশ্যই দয়া করতেন। এই হাদীসটি গরীব পর্যায়ের। মোটকথা, আল্লাহ কাফিরদের একটি গৃহবাসীকেও অবশিষ্ট রাখেননি। শুধুমাত্র মুমিনরাই বেচেঁ ছিল তখন, অতএব যত আদম সন্তান আজ ভূ পৃষ্ঠে আছে তারা সকলেই নূহ আ. এর তিন পুত্র সাম, হাম, ও য়াফিস এর বংশধর। আর এজন্যই নূহ আ. কে আদমে ছানী বলা হয়। ইমাম আহমদ রহ. বর্ণনা করেন, সামুরা রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, সাম আরবের আদি পূরুষ, হাম আবিসিনিয়ার আর য়াফিছ রুমের আদি পুরুষ। ইবনে মাজাহ রহ. নূহ আ. এর রোযা অধ্যায়ে বলেছেন যে, আবু ফিরাস রহ. বলেন, তিনি আব্দুল্লাহ ইবন আমর রা. কে বলতে শোনেছেন, আমি রাসূলুল্লাহ সা. কে বলতে শোনেছি যে, নূহ আ. ঈদুল ফিতর ও আযহার দিন ছাড়া সাড়া বছর রোযা রাখতেন। হাফিজ আবু ইয়ালা বর্ণনা করেন যে, ইবনু আব্বাস রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. হজ্জ করেন। এক পর্যায়ে তিনি উসফান উপত্যকয় এসে উপনীত হলে বললেন, আবু বকর! এ কোন উপত্যকা? আবু বকর রা. বললেন, এ হলো উসফান উপত্যকা। রাসূলুল্লাহ সা. বললেন, এ প্রান্তর দিয়ে নূহ আ. হুদ আ. ও ইবরাহীম আ. তাদের লাল রঙ্গের জওয়ান উটনীতে চড়ে অতিক্রম করেছেন। ওগুলোর লাগাম ছিল খেজুর গাছের তৈরি। তাদের পরনে তখন থাকতো চোগা ধরনের লুঙ্গি এবং গায়ে থাকতো চিত্র বিচিত্র চাদর। তারা আদিঘর কাবায় হজ্জ পালন করত। বর্ণনাটি গরীব পর্যায়ের। আহলে কিতাবগণ মনে করেন যে, নূহ আ. যখন নৌকায় আরোহণ করেন, তখন তার বয়স ছিল ছ’শ বছর। ইবনু আব্বাস রা. থেকে পূর্বে আমরা এরুপ একটি বর্ণনা উদ্ধৃত করেছি। তারপর তিনি তিন’শ বছর বেঁচে ছিলেন। কিন্তু এ বক্তব্যে আপত্তি রয়েছে। তাছাড়া এ অভিমত ও কুরআনের প্রতিপাদ্যের মাঝে যদি সমন্বয় সাধন করা সম্ভব না হয় তাহলে আহলে কিতাবদের অভিমত স্পষ্টতই ভ্রান্ত।  কেননা কুরআন প্রমাণ করে যে, নূহ আ, তার সম্প্রাদয়ের মাঝে নবুওয়াতের পর প্লাবনের পূর্বে পঞ্চাশ কম এক হাজার বছর অবস্থান করেছিলেন, তারপর প্লাবন তাদেরকে পাপাচারী হিসাবে গ্রাস করে। তারপর তিনি কতকাল বেঁচেছিলেন তা আল্লাহই ভালো জানেন। নুবুওয়াত প্রাপ্তির সময় তার বয়স ছিল চার’শ আশি বছর এবং প্লাবনের পর তিনি তিন’শ পঞ্চাশ বছর বেঁচে ছিলেন। এ মর্মে ইবনু আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত তথ্যটি যদি সঠিক  হয়ে থাকে তাহলে বলা যায় যে, তিনি এক হাজার সাতশ আশি বছর আয়ূ পেয়েছিলেন। এদিকে নূহ আ. এর কবর সম্পর্কে ইবনু জারীর ও আযরাকী আবদুর রহমান ইবনে সাবিত থেকে বা অন্য কোন তাবেয়ী সূত্রে মুরসালরুপে বর্ণনা করেন যে, নূহ আ. এর কবর হলো মসজিদুল হারামে। এ অভিমতটি সে অভিমত অপেক্ষা বেশি শক্তিশালী ও সুপ্রমাণিত যা পরবর্তী যুগের বেশ কিছু আলিম উল্লেখ করেন যাতে বলা হয়ে থাকে যে, নূহ আ. এর কবর সে ভূখণ্ডে অবস্থিত বর্তমানে যা করক-ই নূহ নামে পরিচিত এবং সেখানে তার কবরকে কেন্দ্র করেই একটি জামে মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

2 মন্তব্য রয়েছেঃ নূহ আ. এর কাহিনী : সংকলন – আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ জোবায়ের

  1. Rafik Rahman says:

    নবীদের কাহিনতে উম্মতের অনেক কিছু শিক্ষার আছে। সুন্দর হয়েছে রেখাটি।

  2. Rafik Rahman says:

    অনেক জ্ঞানগর্ব লেখা। লেখককে ধন্যবাদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight