নীলের তীরে মরুকন্যা : নজিবুল্লাহ সিদ্দিকী

শেষ পর্ব..
এরপর তিনি হাততালি দিলে প্রধান পরিচারিকা ভয়ে হাপাতে হাপাতে এসে বলল, মনিবা! কিছুক্ষণপূর্বে শত্র“পক্ষের একজন সৈনিক বাসভবনে ঢুকে পড়েছে। আমি তাকে এই মাত্র দেখে এসেছি। কিন্তু সে ঢুকেই মহলের ভিতরে লুকিয়ে পড়েছে।
বিনতে ইখশীদ বললেন, ভয় পেয়ো না। এই সৈনিকটিই আমাদের জন্য নিরাপত্তার ঝাণ্ডা নিয়ে এসেছে। তুমি এখনই সালামার কামরায় গিয়ে এ মুহূর্তে তাকে এখানে আসতে বলো।
প্রধান পরিচারিকা গিয়ে আবার ফিরে এসে কাঁপাকাঁপা স্বরে বলল, মনিবা! সেখানে তো সালামাকে পাইনি। তার কামরায় দেখলাম আত্মগোপনকারী ওই সৈনিকটি। তাকে দেখেই ভয়ে ফিরে এসেছি।
হুসাইন বলল, আমাকে ওই সৈনিকের কাছে নিয়ে চল।
এবার শাহজাদী, হুসাইন ও পরিচারিকা সকলেই লিময়ার কামরায় গেল। সেখানে পৌঁছে দেখল যে, সৈনিকটি জানালার কাছে দাঁড়িয়ে যুদ্ধাদের আগমণের দৃশ্য দেখছে।
হুসাইন এগিয়ে তার বরাবর পিছনে দাঁড়াল। সৈনিকটির কাঁধে হাত রেখে বলল, তুমি কে?
তখন সৈনিকটি হঠাৎ ঘুরে দাঁড়াল। হুসাইনের চোখাচোখি হতেই সে মাথানত করে ফেলল, তার কোন উত্তর দিল না।
এবার বিনতে ইখশীদ তার কাছে গিয়ে বললেন, আরে এতো দেখছি সালামা। বেটি হুসাইনের সামনে তোমার ঘোমটাটা একটু খোলো। সে তো যা ওয়াদা করেছিল তা এখন পূর্ণ করেছে।
কিন্তু এতেও কোন কাজ হলো না। শাহজাদী তখন নিজেই হাত বাড়িয়ে তার মুখ থেকে ঘোমটা সরিয়ে ফেললেন।
ফলে সে তার মুখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে নেয় যেন হুসাইন তাকে দেখতে না পায়।
কিন্তু হুসাইন তাকে একপলক দেখেই চিনে ফেলে এবং আনন্দে চিৎকার করে উঠে, লিময়া! এরপর সে আরো নিশ্চিত হওয়ার জন্য তার হাত ধরে নিজের দিকে ঘুরালো। কিন্তু এবারও সে লজ্জায় চেহারা ফিরিয়ে নিল।
হুসাইনের মুখে লিময়া নাম শুনে শাহজাদী তার হাত ধরে বললেন, তাহলে তুমি সালামাহ নও, লিময়া। এই বাহাদুর নওজোয়ান তোমার বাগদত্তা। আর আমাদেরকে বলেছো তুমি একজন নগন্য দাসী।
লিময়া তখনও নীরব দাঁড়িয়ে আছে। লজ্জায় সে কাচুমাচু হয়ে আছো। শাহজাদী বিনতে ইখশীদ তা আঁচ করতে পেরে ওদের দু’জনকে একাকী রেখে কক্ষ ত্যাগ করলেন।
বিনতে ইখশীদ চলে গেলে লিময়া চোখ তুলল। তখন দু’জনার চোখের মিলন হল।
লিময়া বলল, মিসর কী বিজিত হয়েছে?
চোখেমুখে আনন্দের দ্যুতি নিয়ে হুসাইন বলল, আলহামদুলিল্লাহ। মিসর বিজিত হয়েছে। কিন্তু লিময়া! আমাদের কাক্সিক্ষত সেই আনন্দ কবে পূর্ণ হবে?
লিময়া দৃষ্টি অবনত করে বলল, আপনি কি ভুলে গেছেন?
–    আমি কি ভুলে গেছি?
–    প্রতিশোধ!-মাফ করো লিময়া। আসলে আনন্দে বিহবল হয়ে আমি তা প্রায় ভুলতে বসেছিলাম। এখন থেকে আমি ওই দুই গাদ্দারকে তন্নতন্ন করে খোঁজে বেড়াবো।
–    না, আপনার আর কষ্ট করার দরকার নেই। আমি ওদের ঠিকানা জানি।
–    সত্যি! ওরা কোথায়? এখনি চলো!
তেইশ
হুসাইন ও লিময়া তখনই সরাইখানার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিল। তারা সেখানে পৌঁছে সরাইখানার মালিককেও পেয়ে গেল। সে তাদেরকে দেখে স্বাগত জানাল। লিময়া পূর্বে যে কামরায় ভাড়া থাকত, সে কামরায় নিয়ে যাওয়ার জন্য তাকে বলল।
সরাইখানার মালিক বলল, আপনি তো পূর্বেই দেখে গিয়েছিলেন যে, কামরাটি দু’জন লোক ভাড়া নিয়েছে; তারা এখনও চলে যায়নি। আমি আপনাদেরকে সেখানে কীভাবে নিয়ে যাবো?
লিময়া হুসাইনের দিকে তাকিয়ে বলল, শীঘ্রই আমাদের বিজয় আনন্দ পূর্ণতা লাভ করবে। এরপরই সে দৌঁড়ে সেই কামরাটির আছে গেল। হুসাইনও তার পিছুপিছু গেল। দরজার কাছে লিময়া প্রচণ্ডভাবে কড়া নাড়তে লাগল।
আবু হামেদ দরজা খুলল। তাদের দু’জনকে একনজর দেখেই সে চিনে ফেলল। ফলে তৎক্ষণাৎ দরজা বন্ধ করে দিল। এবার হুসাইন আরো জোরে কড়া নাড়াতে লাগল। একপর্যায়ে শুনতে পেল, আবু হামেদ ভিতর থেকে বলছে, আমি স্বীকার করি আমার কৌশল ব্যর্থ। তবে জান গেলেও দরজা খুলবো না। এটি আমার জানের ভয়ে নয়। বরং আমি তোমাদের উভয়ের কারো হাতে মরতে চাই না। সালিমের জন্যও না। এই শোনো আমি তার হৃৎপিণ্ডে আঘাত করছি। এরপরই মর্মবিদারী এক চিৎকার শুনা গেল এবং যমীনে কোন কিছু পতিত হওয়ার আওয়াজ পাওয়া গেল।
তারপর আবু হামেদ বলল, এবার আমি নিজের বুকে খঞ্জর বিঁধিয়ে দিচ্ছি। তখন তারা দ্বিতীয়বার যমীনে কারো পতিত হওয়ার শব্দ শুনলো।
হুসাইন তখন প্রচণ্ড আঘাত করে কামরার দরজা ভেঙে ফেলল। কামরায় ঢুকে দেখল যে, আবু হামেদ ও সালিম রক্তে গড়াগড়ি খাচ্ছে।
কিন্তু লিময়া এ ভয়াবহ দৃশ্য দেখে সহ্য করতে পারল না। দু’চোখে হাত দিয়ে সে বাইরে বেরিয়ে গেল। হুসাইনও তার সাথে বেরিয়ে এল।
লিময়া বলল, আমাদের মিশন তো এখন শেষ। চলুন এবার আমাদের সেনাপতি বীর জাওহারের সেনাশিবিরে ফিরে যাই।
হুসাইন তার সাথে চলতে চলতে বলল, আমার ইচ্ছা ছিলো যে, আমি নিজহাতে ওদেরকে হত্যা করবো।
লিময়া বলল, যেভাবেই হোক ওরা নিহত হয়েছে। ব্যর্থতা ও নৈরাশ্যই ওদের আত্মহত্যার মূল কারণ।
সরাইখানা থেকে তারা সেনা শিবিরের দিকে রওয়ানা দিল। পথে তারা অনেক বড় অস্ত্রসজ্জিত একটি সেনাদল দেখতে পেল। হুসাইন বুঝতে পারল যে, এই বাহিনীর অভ্যন্তরেই তার পিতা জাওহার রয়েছেন। একটু পরই দেখা গেল, জাওহার আসছেন। তার চারপাশে পতাকা উড়ছে এবং তবলা বাজছে। তিনি রেশমী কাপড় পড়ে হলুদ রঙের একটি তেজি ঘোড়ায় আরোহণ করে আসছেন।
লিময়া ও হুসাইন এই শোভাযাত্রায় শরীক হলো। শোভাযাত্রাটি শহরে প্রবেশ করল।
এক জায়গায় গিয়ে জাওহার তাঁর ঘোড়া থামালেন এবং ওখানেই যাত্রা বিরতি দিয়ে তাবু গাড়লেন। সময়টি ছিল ৩৫৮ হিজরীর ১৭ই শা‘বানের আসরের সময়। এস্থানেই তিনি বর্তমান কায়রো নগরী নির্মাণ করেন।
এদিকে হুসাইন ও লিময়া বহুকষ্টে অনেকদূর পথ মাড়িয়ে সেনাপতি জাওহারের তাবুতে গিয়ে পৌঁছলো। ওরা প্রবেশের অনুমতি চাইল। প্রথমে লিময়া প্রবেশ করল। জাওহার তাকে দেখেই কুরসি থেকে উঠে জড়িয়ে ধরলেন।
ইতোমধ্যে হুসাইন ঢুকল। তাকে দেখেই পিতার দু’চোখ অশ্র“সজল হয়ে উঠল। জাওহার তাঁর বাহু ছড়িয়ে দিলে হুসাইন পিতার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল। পিতা-পুত্রের এই মিলনে এক আবেগঘন পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল।
তারপর জাওহার কুরসিতে বসে পড়লেন। তার ডানপাশে বসল লিময়া আর বামপাশে হুসাইন। এরপর ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন প্রতিনিধিদল জাওহারকে মিসরে তাঁর এমন বিরোচিত আগমণের জন্য অভিনন্দন জানাতে লাগল।
একপর্যায়ে তাদের আসা-যাওয়া যখন শেষ হলো, তখন তিনি লিময়ার দিকে ফিরে বললেন, বেটি! তোমার কথাই সত্যায়িত হলো এবং তোমার স্বপ্নই বাস্তবায়িত হয়েছে। এই তো আমরা সকলে ফুসত্বাত্বে মিলিত হয়েছি। এখন তো হুসাইনের সাথে তোমার বাগদানের কোন অন্তরায় নেই।
লিময়া তখন দৃষ্টি অবনত করে লাজনম্র স্বরে বলল, কিন্তু আমার আকাঙক্ষা হলো বিবাহ নীলনদের তীরে আমীরুল মুমিনীনের প্রাসাদে হোক!
জাওহার হেসে বললেন, তার মানে আমীরুল মুমিনীন আসার পূর্বপর্যন্ত তুমি বিয়ে বিলম্ব করতে চাচ্ছ। আসলে লিময়া তুমি এরই উপযুক্ত। বরং এটি তোমার অধিকার।
পরদিনই জাওহার নীলনদের তীরে বিশাল ও দৃষ্টিনন্দন অট্টালিকা নির্মাণ করার নির্দেশ দিলেন। প্রাসাদ নির্মাণ শেষ হলে আমীরুল মুমিনীন মুঈয লিদীনিল্লাহর আল ফাতেমীকে আসার আমন্ত্রণ জানালেন। তিনি বিশাল বাহিনী, আমীর-উমারা, নেতৃত্বাস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ নিয়ে মিসর (৩৬২ হিজরীতে) আগমণ করলেন এবং তাঁর জন্য নির্মিত প্রাসাদে উঠলেন। মিসরে এসে সর্বপ্রথম তিনি হুসাইন ও লিময়ার শুভবিবাহের কাজটি সম্পন্ন করলেন। এর জন্য এমন একটি জমকালো ও আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করলেন। ইতোপূর্বে এ রকম অনুষ্ঠান এখানকার লোকেরা উপভোগ করেনি।
সমাপ্ত

একটি মন্তব্য রয়েছেঃ নীলের তীরে মরুকন্যা : নজিবুল্লাহ সিদ্দিকী

  1. নাজীবুল্লাহ সিদ্দীকী says:

    আলহামদুলিল্লাহ এই অনুবাদকের আরেকটি চমকপ্রদ ও এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেলার মত গল্পের বই শীঘ্রই বাজারে আসছে৷ ঝরঝরে ভাষা এবং সম্পূর্ণ সূড়সূড়িমুক্ত একটি গল্প৷ নাম সম্ভাব্য “রক্তভেজা হিন্দুকুশ”/রক্তঝরা হিন্দুকুশ— এ জাতীয় কোন একটি হবে৷ দক্ষ সম্পাদকের কলমে সম্পাদিত হয়ে এখন কুরিয়ারে হাতে পৌঁছার অপেক্ষায়৷
    আর হ্যা, নীলের তীরে মরুকন্যা পাঠক নন্দিত হয়ে এখন তার কপি ফুরিয়ে গেছে৷ আশা করি আল জান্নাত পাঠকদেরও খারাপ লাগেনি৷ লেখকের জন্য সবার দুআ কামনা রইলো৷

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight