নারী / হাজেরা সুলতানা হাসি

 

বিশ্বে যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর ॥
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের অনবদ্য সৃষ্টি ‘নারী’ কবিতার চরণদুটি বাস্তব সত্য। মানবেতিহাসের পরতে পরতে নারীর অনস্বীকার্য অবদান রয়েছে। তেমনি, ইসলামের ইতিহাসেও রয়েছে নারীর
ব্যাপক ভূমিকা। নব-ওহীপ্রাপ্ত রাসূল সা. যখন ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়লেন, তখন একজন নারীর (খদিজাতুল কুবরা রা.) আঁচলই হয়েছিল তাঁর আশ্রয়স্থল। একজন নারীর কথামালাই হয়েছিল তাঁর জন্য অভয়বাণী। রসূল সা. শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন একজন নারীর (হযরত আয়েশা রা.) কোলে। এভাবে,ইসলামের চরম সঙ্কটময় মুহূর্তগুলোতেও নারীরা ধৈর্য্য ও সাহসিকতার পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছে। নবীজীর মস্তকে কাফেররা যখন উঁটের নাড়িভুঁড়ি উঠিয়ে দিয়েছিল, তখন একজন নারীই (হযরত ফাতিমা রা.) কোমল হাতে তা সরিয়ে দিয়েছিলেন। ইসলামের জন্য সর্বপ্রথম যিনি আত্মত্যাগ করেছেন, তিনি একজন নারীই (হযরত সুমাইয়া রা.) ছিলেন। হিজরতের সময় কাপড়ের ফিতা খুলে দু টুকরা করে রাসূল সা. ও আবু বকর রা.-এর জন্য খাবার বেঁধে দিয়েছিলেন একজন নারীই (দুই ফিতাওয়ালী হযরত আসমা রা.)। জিহাদের ময়দানে পুরুষদের সাথে নারীরাও শরীক হত। তারা মুজাহিদদের উৎসাহ যোগাত, অস্ত্র মেরামত করত, আহতদের চিকিৎসা করত, পানি পান করাত। প্রয়োজনে তরবারি হাতে দাঁড়িয়ে যেত বীরপুরুষ সেজে। যেমন, উহুদ-প্রান্তরে যখন নবীজী সা. বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লেন, তখন হযরত নুসায়বা বিনতে কা‘ব রা. ও হযরত সাফিয়্যা রা. তাঁকে রক্ষা করতে এগিয়ে এসেছিলেন। খন্দক যুদ্ধের সময় ইহুদি গুপ্তচরকে হত্যা করার চরম সাহসিকতা দেখিয়েছিলেন রাসূল সা. এর ফুফু হযরত সাফিয়্যা রা.। এভাবে তাবেঈন-তাবে তাবেঈনের যুগেও আমরা দেখি রাবিয়া আদাবিয়া বসরি রহ. এর মত মহীয়সী রমণীদের। আব্দুল কাদের জিলানি রহ. ও ইমাম বুখারী রহ. এর মায়েদের মত জন্মদাত্রীগণকে, যাঁরা সন্তাদেরকে গড়ে তুলেছেন যুগশ্রেষ্ঠ বুজুর্গ। মুহাদ্দিস ও ফকীহ হিসেবে। আরো পরের যুগে এসে আমরা দেখি, আমাতুল হান্নান রহ. এর মত মহীয়সী রমণীকে, যিনি নিঃস্বার্থ দীনি তালীমের মধ্যে পুরো জীবন অতিবাহিত করেছেন। যাঁর মক্তবের সূচনা হয়েছে আল্লামা তকি ওসমানি দা.বা. এর মত সময়ের শ্রেষ্ঠ আলেমের শিক্ষা-দীক্ষা। এমনি আরো অসংখ্য মুসলিম মহীয়সী নারী রয়েছেন, যাঁদের কীর্তি হয়তো ইতিহাসে লিপিবদ্ধ হয়নি, কিংবা অবহেলিত কোন অধ্যায়ে পড়ে রয়েছে। তবুও, তাঁদের অবদান রয়েছে। তাঁদের অবদান অনস্বীকার্য। কবির ভাষায়, এ-বিশ্বে যত ফুটিয়াছে ফুল, ফলিয়াছে ফল, নারী দিল তাহে রূপ-রস-মধু-গন্ধ সুনির্মল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight