নারী ও সমাজ-সংস্কৃতি মীযান মুহাম্মাদ হাসান

মানুষ সামাজিক জীব। জীবন-যাপনের জন্য পরস্পরে সম্মিলিত হয়ে একে অপরের প্রতি নির্ভরশীল হয়ে আদিকাল থেকে যে সংঘবদ্ধ সংগঠনটি এখনও টিকে আছে, তাকে আমরা পরিবার বলে চিনে থাকি। সমাজ স্বীকৃত নিয়মে মা-বাবা, ভাই-বোন মিলে সংঘবদ্ধ বসবাসই হলো পরিবার।
তবে এ পরিবার প্রথাই আজ বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে আমাদের সমাজজীবন থেকে। যতই দিন গড়াচ্ছে, শিক্ষার নামে মনুষ্য মানবতাবোধ লোপ পাচ্ছে সমাজ থেকে। আমরা শিক্ষিত, জ্ঞানী বলে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি লাভ করছি বটে, তবে সত্যিকারের মানুষ কি হতে পেরেছি? বিদুষীরা এখন ব্যক্তি পরিবার ও সমাজের জন্য ভয়াবহ আতংকের কারণ। চিরাচরিত সামাজিক রীতি-নীতি এবং ঐতিহ্যের পরিবার প্রথা ক্রমশই ভেঙে গিয়ে মিনি পরিবার, তালাক-ডিভোর্স, দাম্পত্য-কলহ প্রভৃতি রূপ গ্রহণ করছে। ভেঙে যাচ্ছে গৃহ পরিবার স্বামী সংসার। কতক শিশু হারাচ্ছে মাতৃত্বের ¯েœহ-আদর। দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে দাম্পত্যজীবনে কলহ-বিদ্বেষ। অতি উন্নত ও আধুনিকতার বুলি কপচিয়ে আমরা চলেছি পশুত্বের পিছে। তবে কি সে দিন খুব নিকটেই, বাংলার মাটিই যে দিন আত্মপ্রকাশ করবে ইউরোপ-আমেরিকা রূপে।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনিস্টিটিউট-র সহযোগী অধ্যাপক ডা. জিল্লুর রহমান খান রতনের মতে, স্বাধীনতা সচেতনতা ও উপার্জন ক্ষমতা বাড়ায় তারা খুব সহজেই বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। ২০০৯-র আইনে যখন নারীরা বিচ্ছেদের অধিকার পেল। বাড়তে লাগল বিবাহ বিচ্ছেদ। এই হলো অধিকারের ফলাফল। বিস্তারিত বলার অবকাশ নেই।
গত ০৯.০১.১৮ বাংলাদেশ প্রতিদিনও একটি শিরোনাম করেছিল, লক্ষ করুন কি ছিল তাতে! ‘শিক্ষিত স¦াবলম্বী নারীরাই ডিভোর্সের শীর্ষে’। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, পরস্পর শ্রদ্ধাশীল, ভালোবাসা ও সম্মানবোধ না থাকার কারণেই বিবাহ বিচ্ছেদ বৃদ্ধি পাচ্ছে। স্বামী-স্ত্রী দুজনই যখন ক্যারিয়ার নিয়ে ব্যস্ত। তখন পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সহনশীল মনোভাব যে কতটুকু বহাল থাকে তা ভুক্তভোগীই ভালো জানেন। এ সত্য আর অস্পষ্ট নয়! ছেলে-সন্তান ঘর-সংসার দেখার তাদের সময় কই? ফলে যা হবার তাই হচ্ছে!
মার্কিন প্রধানমন্ত্রী উইলিয়াম গ্লাডস্টোন (১৮৮২)-এর কথা মনে পড়ে গেল, যে বলেছিল, মুসলমানদেরকে পরাজিত করতে হলে দুটো কাজ করতে হবে। ১. কুরআনকে গিলাফ দ্বারা আবদ্ধ করতে হবে। ২. হিজাব খুলে নারীদেরকে বাইরে বের করতে হবে। আমরা তার বক্তব্যের বাস্তবতা উপলব্ধি করছি।
দেশীয় সমাজ সংস্কৃতি ও সভ্যতাকে উপেক্ষা করে আমরা কি সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের পথেই পা বাড়াচ্ছি না! পশ্চিমা বিশ্বে এখন গৃহপরিবার সমাজ সংসার ভেঙে ‘সিংগেল মাম’ ও ‘পিতৃপরিচয়হীন’ সন্তান সংসারের ব্যাপক সমারোহ চলছে। সম্পর্ক পরিচয় সম্বন্ধ ভেঙে ওখানে এখন জগাখিচুড়ি অবস্থা।
স্বামী-স্ত্রী। ছেলে-সন্তান। ভাই-বোন এসব চিরন্তন সামাজিক প্রথা পরিচয় ও সংস্কৃতিই এখন যাদের বিলুপ্তির শেষ প্রান্তে পৌঁছবার অপেক্ষায়। তাদের অনুকরণেই আমরা নারীদেরকে বেপর্দা স্কুল-কলেজ হাট-বাজার অফিস-আদালত সর্বত্র ছেড়ে দিয়েছি। এমনকি পুরুষের প্যান্ট-শার্ট কেনার জন্যেও তারা মার্কেটে ছুটছে। আর বলছি, এসব নারী অধিকার।
বিজ্ঞাপনে শেভিং ক্রিম বা ব্লেড-রেজারের জন্যও নারীর উপস্থিতিকে আবশ্যক গণনা করা হচ্ছে। এসব অধিকার না নারীপণ্য তা আরেকবার ভেবে দেখতে হবে। পণ্যের কাটতিই উদ্দেশ্য কিনা তাও ভাবুন! সুশীলসমাজের অনেকেই খুব জোরেশোরে হাকডাক ছেড়ে বলে থাকেন, “অর্ধেক জনশক্তিকে ঘরে অলস বেকার বসিয়ে রেখে কী করে উন্নয়ন সম্ভব”? তাদের উদ্দেশেই বলতে চাই। তবে কি নারীর গৃহস্থালি কর্মের কোনো মূল্য নেই। গৃহপরিবার সন্তান লালন-পালন বয়স্কদের সেবাযতœ দেখভালের মতো কর্মের মূল্য তারা বেমালুম ভুলে গেলেন!
অর্থনীতিবিদদের বিবেচনায় এ দেশের নারীদের গৃহস্থালি কর্মের বার্ষিক মূল্য বছরে ৬৯-৯১ বিলিয়ন ডলার। ৯ই মার্চ ০৪ইং এর এক জরিপ থেকে জানা যায় যে, (তখনকার সময়ে) বাংলাদেশে মোট নারীর সংখ্যা ৫৩.১ মিলিয়ন। দৈনিক কর্মসময় ১৬ ঘণ্টা ও প্রতি ঘণ্টা কর্মমূল্য ১০ টাকা ধরে এ উপাত্ত বের করা হয়।
এ ছাড়া মানবাধিকার কর্মীরাও শিশুর যতœ, রোগীর সেবা ও গৃহের যাবতীয় কর্ম সম্পাদনকে নারীর অনেক দায়িত্বশীল ও গুরুত্বপূর্ণ কাজ বলে উল্লেখ করেছেন।
পাঠক! আমার একটি প্রশ্ন, সত্যিকার অর্থেই কি আমরা নারীদের এ অবদানকে মূল্যায়ন করি?
যদি এর জন্য বাড়তি অর্থ গুণতে হতো, তবে হয়তো আজকে আমরা যারা নারীদেরকে বাইরে বের করার ঢালাও পক্ষপাত করছি এক চেটিয়া যুক্তির ধোয়া ছড়াচ্ছি, তাদের অচেতন ঘোর কেটে যেত। এখন নিশ্চয়ই বলতে বাধ্য হবেন, অর্ধেক জনশক্তির মূল্য তো আমরা দিই না। এখনও কি বলা হবে আমাদের অর্ধেক জনশক্তি অলস-বেকার? তবে আপনার গৃহ সংসার সন্তান দেখভালের মূল্য কত তা আপনিই ভেবে দেখুন!
তবুও বলি, আরেকবার ভেবে দেখুন! নারী অধিকার নামে নারীকে ভোগ্যপণ্য বানানোই কি তথাকথিত নারী অধিকার? এ ছাড়া দেশের শিক্ষিত যুবক বেকারের সংখ্যা কি কম? তাদের কর্মসংস্থান, শিক্ষার মূল্য, মেধা ও প্রতিভার যথাযথ মূল্যায়নে আমাদের ভূমিকা কতটুকু তাও জানতে ইচ্ছে করে! কোটি বেকারের কর্মসংস্থানেরই যখন কোনো ব্যবস্থা নেই। সেখানে সর্বত্র নারীকে দাঁড় করিয়ে কর্মসংস্থান সংকুচিত হচ্ছে; না সম্প্রসারিত হচ্ছে তাও ভেবে দেখবেন। পাশাপাশি এটাও জরিপ করে দেখুন, অধিকারের অতি বাড়াবাড়ির ফলাফল আমাদের সমাজ সংস্কৃতির ওপর কী অবদান রাখছে? কোথায় গিয়ে মিশছে আমাদের পরিবার, পরিচয় ও প্রাচীন ঐতিহ্যের ধারা? এই কি আধুনিকতা?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight