নামাযই আত্মার সর্বশ্রেষ্ঠ খোরাক

নামায বান্দা ও তার রবের মধ্যে একটি বন্ধন—এই বন্ধন থেকে অন্তর শক্তি লাভ করে এবং আত্মা স্থিরতা ও প্রশান্তি অনুভব করে। নামায আত্মার মেরাজ, মুমিনের আত্মা নামাযের মাধ্যমে উৎকর্ষ ও উন্নতি লাভ করে।
এ-বিষয়টিই হযরত আনাস রা. থেকে বর্ণিত একটি হাদিসের সারমর্ম। হযরত আনাস রা. বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন—“তোমাদের কেউ যখন নামাযে দাঁড়ায় তখন সে তার পরওয়ারদিগারের সঙ্গে কথোপকথনে লিপ্ত থাকে।”  [সহিহ বুখারি, প্রথম খ-, পৃষ্ঠা ১০৭; সহিহ মুসলিম : হাদিস ৫৫১]
সম্ভবত এটাই প্রতিদিন পাঁচবার ফরজ নামায পুনরাবৃত্তির অন্যতম রহস্য। নামাযের মধ্যে বান্দা তার আত্মাকে পৃথিবীর বন্ধন থেকে ছিন্ন করে; মাটির পৃথিবীতে যা-কিছু কলুষ ও কদর্য—হিংসা ও বিদ্বেষ, মনোমালিন্য ও হানাহানি ইত্যাদি থেকে তাঁর আত্মাকে পবিত্র রাখে। সে তখন তার প্রকৃত মনিবের সামনে দাঁড়ায়, বিনম্রতা ও একাগ্রতার কয়েকটি মুহূর্তের জন্য; এই সময়টুকুতে সে তার আত্মাকে মুক্তি দেয় পার্থিব জীবনযন্ত্রণা ও বৈষয়িক দুর্ভাবনা থেকে; এই সময়টুকুতেই তার আত্মা তার অস্তিত্ব থেকে খোরাক গ্রহণ করে। মহান আল্লাহর মারেফাত (পরিচয়), তাঁর সঙ্গে দৃঢ়বন্ধন, তাঁর সঙ্গে বিনম্রতা ও একাগ্রতার সঙ্গে গোপনীয় আলাপচারিতা ও সৎকাজের মাধ্যমে তার নৈকট্যলাভ ব্যতীত আত্মা খোরাক গ্রহণ করতে পারে না, প্রশান্তি পেতে পারে না।
আমরা এই অনন্য মুনাজাত বা আলাপচারিতার একটি দৃশ্য অনুধাবন করার চেষ্টা করি, যে-মুনাজাতে হৃদয় আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয় এবং এরই মাধ্যমে সৌভাগ্যের চূড়ান্ত পর্যায় অনুভূত হয়।
হযরত আবু হুরায়রাহ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, (তিনি বলেছেন)—‘আমি নামাযকে ভাগ করেছি আমার ও আমার বান্দার মধ্যে আধাআধি করে। আর আমার বান্দার জন্য রয়েছে যা সেই চাইবে।’ যখন বান্দা বলে, ‘আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামিন (সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর যিনি জগৎসমূহের প্রতিপালক)’, তখন আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমারা বান্দা আমার প্রশংসা করছে। ’ যখন বান্দা বলে, ‘আররাহমানির রাহীম (তিনি পরম করুণাময়, দয়ালু)’, তখন আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমার বান্দা আমার গুণাবলি প্রকাশ করেছে।’ যখন বান্দা বলে, ‘মালিকি ইয়াওমিদ্দীন (তিনি বিচারদিবসের মালিক)’, তখন আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমার বান্দা আমার মর্যাদা বর্ণনা করেছে।’ বান্দা যখন বলে, ‘ইয়্যাকা না’বুদু ও ইয়্যাকা নাস্তাঈন (আমরা কেবল তোমরাই ইবাদত করি এবং তোমারই কাছে সাহায্য প্রর্থনা করি)’, তখন আল্লাহ তাআলা বলে এটা আমার ও আমার বান্দার মধ্যে আধাআধি (ইবাদত আমার জন্য এবং সাহায্য বান্দার জন্য) এবং আমার বান্দার জন্য তা-ই রয়েছে যা সে চেয়েছে।’ বান্দা যখন বলে, ‘ইহদিনাস সিরাতাল মুস্তাকীম, সিরাতাল লাযীনা আনআমতা আলাইহিম, গাইরিল মাগদুবি আলাইহিম ওয়ালাদ্দোয়াল্লীন (আমাদেরকে সরলপথে পরিচালিত করো, ওইসকল লোকের পথে যাদের প্রতি তুমি অনুগ্রহ করেছো, ওইসকল লোকের পথে নয় যারা ক্রোধে-নিপতিত ও পথভ্রষ্ট)’, তখন আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমার বান্দা যা চেয়েছে তা তার জন্য রয়েছে।’ [সহিহ মুসলিম : হাদিস ৩৯৫]
এ-কারণে ইমাম ইবনুল কায়্যিম আল-জাওযিয়্যাহ রহ. বলেন, ‘মুসল্লির উচিত সুরা ফাতেহা পাঠ করার সময় প্রতিটি আয়াত পাঠ করার পর সামান্য থামা, এই সময়টুকুতে সে তার রবের জবাবের প্রতীা করবে, যেনো সে তা শুনছে।’ [ দেখুন : আল-মুওয়াযানাতু বাইনা যাওকিস সিমাহ ওয়া যাওকিস সালাত]
এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, আত্মশুদ্ধি, ঈমান শক্তিশালীকরণ ও সৌভাগ্যের পথে পৌঁছার জন্য এই মুনাজাত, আল্লাহর সঙ্গে এই গোপনীয় আলাপচারিতা সর্বশ্রেষ্ঠ উপায়। তবে এর জন্য বান্দার নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে এবং সে নামাযের মধ্যে দুনিয়ার বৈষয়িক চিন্তার মশগুল হতে পারবে না। জবাব-প্রদানকারী প্রতিপালকের সামনে দণ্ডায়মান হবার জন্য প্রচণ্ড আগ্রহ নিয়ে নামাযে উপস্থিত হতে হবে। তাঁর রহমত ও করুণার ভিখিরি হতে হবে। সকল বিষয়ে ও সকল কাজে একমাত্র মহান আল্লাহর কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করতে হবে।
যখন আগ্রহ ও উদ্দীপনা এং শওক ও যওক নিয়ে বান্দা নামাযে দাঁড়ায়, রবের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতা ও অনুনয়-বিনয়ের তীব্র অনুভূতিতে তার অভ্যন্তর কাঁপতে থাকতে এবং এভাবে নামায শেষ করা হয়—এমন নামায বান্দার আত্মার খোরাক জোগায়, আত্মিক শক্তি ও প্রশান্তি বৃদ্ধি করে, জীবনযন্ত্রণার মুখোমুখি হওয়ার েেত্র তাকে সাহায্য করে। এ-কারণে আল্লাহ তাআলা মানসিক প্রশান্তি নিশ্চিত করার েেত্র নামাযের গুরুত্বের প্রতি বান্দার দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেছেন—“হে মুমিনগণ, ধৈর্যও  সালাতের মাধ্যমে তোমরা সাহায্য প্রার্থনা করো। নিশ্চয় আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।” [সুরা বাকারা : আয়াত ১৫৩]
সুতরাং জীবনের দঃখ-যন্ত্রণা ও বিপদাপদের েেত্র নামায সবচেয়ে বড় সহায়। নামাযের মধ্য দিয়ে সঙ্কটগ্রস্ত বান্দা তাঁর প্রতিপালকের আশ্রয় গ্রহণ করে। সে স্বস্তি ও প্রশান্তি অনুভব করে, বুঝতে পারে যে, আল্লাহর সাহায্য ও রহমত তার সঙ্গে রয়েছে।
হযরত হুযায়ফাহ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন—“রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে যদি কোনো বিষয় উদ্বিগ্ন করে তুলতো, তিনি নামাযে দাঁড়িয়ে যেতেন।” [সুনানে আবু দাউদ : হাদিস ১৩১৯]
হযরত আনাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন—“আমার চুর শীতলতা রাখা হয়েছে নামাযে।” [সুনানুন নাসায়ি : হাদিস ৩৯৪০; মুসনাদে আহমদ : হাদিস : ১৪০৬৯।] অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলার ইবাদতের মধ্যে নামাযে যে-তৃপ্তি ও প্রশান্তি অনুভূত হয়, তা অন্য ইবাদতে হয় না।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলতেন—“হে বেলাল, তুমি ওঠো এবং নামাযের মাধ্যমে আমাদেরকে তৃপ্ত করো।”  [সুনানে আবু দাউদ : হাদিস ৪৯৬৪; মুসনাদে আহমদ : হাদিস : ২৩১৫৪।] অর্থাৎ, নামাযের ব্যবস্থা করো, যাতে আমরা কর্মব্যবস্তা ও দৈনন্দিন জীবনযন্ত্রণা থেকে মুক্তি ও স্বস্তি লাভ করি। যেমন, কান্ত-শ্রান্ত ব্যক্তি তার আশ্রয়ে ফিরে, ঘরে ফিরে শান্তি ও তৃপ্তি লাভ করে।
এভাবেই মুমিন নামাযে স্বস্তি, তৃপ্তি ও প্রশান্তি লাভ করে। নামাযের মধ্যে সে আশ্রয় গ্রহণ করে যেভাবে ভীতসন্ত্রস্ত ব্যক্তি শক্তিশালী ও নিরাপদ স্থানে গিয়ে আশ্রয় নেয়।
এ-কারণে নামায কেবল ফরজের েেত্রই সীমাবদ্ধ নয়, সুন্নত নামায রয়েছে, নফল নামায রয়েছে। নামায রবের সঙ্গে বান্দার সম্পর্ক ও বন্ধন দৃঢ় করে, আল্লাহর নৈকট্যলাভে সাহায্য করে। নামাযের মধ্যে আত্মা শান্তি পায়, অন্তর সুখ পায়। এভাবে নামায বান্দার সার্বণিক অস্ত্র এবং যাবতীয় দুশ্চিন্তা ও মুশকিল আসানের চাবি হয়ে ওঠে।
এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, সালাতুল ইস্তিসকা (বৃষ্টি-প্রার্থনার নামায), সালাতুল খুসুফ (চন্দ্রগ্রহণের সময় নামায), সালাতুল হাজাত (প্রয়োজনপূরণের নামায) ও সালাতুল ইস্তিখারা (সঠিক দিকনির্দেশনা কামনা করার নামায)-এর গভীর রহস্য নিয়ে যাঁরা চিন্তা করেন তাঁরা অবশ্যই এ-েেত্র মহান আল্লাহর প্রজ্ঞা অনুধাবন করতে পারেন। তাঁরা বুঝতে পারবেন যে, মুসলমানের ভীতি ও আশঙ্কার অনুভূতি নিয়ন্ত্রণ এবং যে-মুমিন সঙ্কট ও বিপদাপদের সময় নামাযে দাঁড়িয়ে যান, নামাযের আশ্রয় গ্রহণ করেন তাঁর  মানসিক স্বস্তি ও শান্তি নিশ্চিতকরণের েেত্র মহান আল্লাহর কী হেকমত রয়েছে। এসব কারণেই আমাদের সৎকর্মপরায়ণ পূর্বসূরিগণ বেশি বেশি নফল নামায আদায় করতেন, বিশেষ করে রাতের বেলায়, যখন গাফেলরা ঘুমিয়ে থাকে আর মত্ততাপ্রিয়রা মত্ত করে।
নামাযের প্রতিটি কাজে আল্লাহর প্রতি আনুগত্য ও বিনয়ের উজ্জ্বল প্রকাশ ঘটে, রবের প্রতি বান্দার আগ্রহ ও ঐকান্তিকতা মূর্ত হয়ে ওঠে, তাওহিদ ও ঈমানের শক্তি বৃদ্ধি পায়। আর ঈমানই আত্মশুদ্ধির মূল ভিত্তি, ঈমানের সজীবতাই নামাযের অন্যতম ফল। নামায বান্দার জন্য তার জীবনের পথকে আলোকিত করে তোলে, তাকে প্রদান করে চিত্তের পবিত্রতা ও আত্মার প্রশান্তি।
বান্দা যখন নামায আদায় করে এবং নামাযের দ্বারা তার অন্তর শান্তি ও তৃপ্তি লাভ করে, তখন তার এক সক্রিয় শক্তি অর্জিত হয় যা তাকে সৎকাজ করতে ও অসৎকাজ থেকে বিরত থাকতে উদ্বুদ্ধ করে। নামায বান্দার অন্তরে আল্লাহর দর্শনানুভূতি ও তার বিধিনিষেধের প্রতি সমীহবোধ জাগ্রত করে। বান্দাকে চিন্তার বিকৃতি ও গোমরাহি থেকে দূরে সরিয়ে রাখে, হেদায়েত ও ন্যায়নিষ্ঠায় দৃঢ় করে। যে-নফ্স মন্দ কাজের প্ররোচনা দেয় সেই নফ্সকে নিয়ন্ত্রণ করে। নামায বান্দার জন্য এক মজবুত প্রাচীর, যা তাকে অপরাধ ও গর্হিত কাজে লিপ্ত হওয়া থেকে বিরত রাখে। মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা ইরশাদ করেছেন—“এবং সালাত কায়েম করো। সালাত অবশ্যই বিরত রাখে অশ্লীল ও গর্হিত কাজ থেকে। আর আল্লাহর স্মরণই তো সর্বশ্রেষ্ঠ। তোমরা যা করো আল্লাহ তা জানেন।” [সুরা আনকাবুত : আয়াত ৪৫]
নামাযের এই প্রভাব ও আছরের দ্বারা তা বিভিন্ন ব্যাধি থেকে আত্মার চিকিৎসার েেত্র এক উচ্চতর ভূমিকা পালন করে। চিত্তের পবিত্রতা ও সৎকাজের মধ্য দিয়ে অন্তরের পরিশুদ্ধতার েেত্রও নামায একই ভূমিকা পালন করে। নামায উত্তম চরিত্রের বীজ রোপণ করে, মানুষের সঙ্গে আচার-ব্যবহার ও লেনদেনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে, কল্যাণকর কাজের প্রতিযোগিতার মনোভাব সৃষ্টি করে।
কিন্ত আজকের বাস্তবতা ভিন্ন; বর্তমানে নামাযের েেত্র মুসলমানদের মনোভাব ও কর্মপদ্ধতি বিপরীতমুখী। এখন তারা নামায আদায় করে কেবল দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দিয়ে, হৃদয় ও আত্মা দিয়ে নয়। এমনকি অনেকেরে মনেই নামাযের প্রভাব ও ফল সম্পর্কে সন্দেহ দানা বেঁধেছে।
সুতরাং আমাদের উচিত একাগ্রতা, বিনম্রতা ও একনিষ্ঠতার সঙ্গে নামায আদায় করা। যাতে আমাদের নামায হয় আমাদের আত্মার খোরাক, চিত্তের প্রশান্তি ও অন্তরের স্বস্তি। যাতে তা আমাদেরকে বিকৃতি ও গোমরাহি থেকে বাঁচানোর ঢাল হয়, জীবনযাত্রা সৌভাগ্য ও সফলতার চাবি হয়।
[লেখার সূত্র : দালিলুকা ইলাস সাআদাহ ওয়ান নাজাহ ফিল হায়াত]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight