নবুওয়াতের শেষ সূর্যটি যেভাবে অস্তমিত হল! : মো: আবুল খায়ের (স্বপন)

পবিত্র কালামে পাকে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন, প্রত্যেককে মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করতে হবে। যুগে যুগে পথহারা মানব জাতিকে সৎ পথে পরিচালিত করার শুভ উদ্দেশ্যে পরম করুণাময় মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে যে সকল মহামানব এ ধরার বুকে তাশরীফ এনে জগতের পথভোলা, দিশেহারা মানুষজাতিকে সঠিক পথের সন্ধান দিয়ে ইতিহাসে অমর, অক্ষয় এবং অম্লান হয়ে আছেন। তাঁদের মধ্যে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ট মহামানব যিনি, তিনি হলেন বিশ্ব মানবতার মুক্তির দিশারী, নবীকুল শিরোমনি হযরত মোহাম্মদ সা.। হযরত মোহাম্মদ সা. এমন একটি শুভাসিত অন্যন্য নাম যে নাম জপে ধন্য হল সৃষ্টিজগতের সকল সৃষ্টিকুল, যে নাম জগতে বয়ে আনে শান্তি এবং প্রশান্তির এক ফল্গুধারা। যে নাম ধ্বনিত এবং প্রতিধ্বনিত হয় পৃথিবীর দিগদিগন্তে কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ের গভীরে। যে নামের মধুর গুঞ্জন পাখির কলরবে, নদীর কলতানে। মানবজাতির মুুক্তির লক্ষ্যে রাসূল সা. এর ৬৩ বৎসরের মহান জীবদ্দশায় অসংখ্য অগণিত ত্যাগ, তিতীক্ষা, তাঁর উপর সীমাহীন অত্যাচার, নির্যাতন, অসহনীয় দুঃখকষ্ট, জীবন চলার পথে বিভিন্ন ঘাত প্রতিঘাতের চড়াই উতরাই পেরিয়ে বিশ্বের বুকে শান্তি এবং কল্যাণের ধর্ম ইসলামকে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা হিসেবে সু-প্রতিষ্ঠা করেছেন। ১০ম হিজরিতে জীবনের শেষ হজ্জ পালন শেষে রাসূল সা. প্রাণপ্রিয় মদীনায় প্রত্যাবর্তন করেন। তারপর থেকেই মহান প্রভুর একান্ত সান্নিধ্য লাভের উদ্দেশ্যে তাঁর শরীর মোবারক আস্তে আস্তে অসুস্থতার রাজ্যে প্রবেশ করতে লাগল। সূরা নসর অবতীর্ণ হওয়ার মধ্য দিয়ে রাসূলের ওফাতের চুড়ান্ত ইঙ্গিত প্রদান করা হল যা সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. সর্বপ্রথম অনুধাবন করেন। যদিও অন্যান্য সাহাবীগণ উক্ত আয়াতের মর্মবাণী তৎক্ষণাৎ অনুধাবন করতে পারেন নাই। ১১ হিজরির সফর মাসের শেষের দিকের কোন এক রাতে রাসূল সা. তাঁর শয্যা ত্যাগ করে খাদেম আবু রাফে রা. কে সাথে নিয়ে “জান্নাতুল বাকী” কবরস্থানে গমন করে দীর্ঘসময় ধরে কবরবাসীদের রুহের মাগফিরাত কামনা করতে লাগলেন। “জান্নাতুল বাকী” থেকে ফিরে আসার পরপরই রাসূল সা. এর মাথা ব্যথা শুরু হয়ে যায়। মাথায় পট্রি বেঁধে দেয়া হয়। শরীর বিষন্ন এবং বিমর্ষ হতে লাগল। শারীরিক দূর্বলতা বৃদ্ধি পেতে লাগল। এমতাবস্থায় তিনি সকল বিবিদের কাছ হতে অনুমতি প্রাপ্ত হয়ে হযরত আয়েশা রা. এর হুজরায় অবস্থান করতে লাগলেন। কেননা হুজরাটির দরজা ছিল মসজিদের একেবারে বরাবর। শরীরের সামর্থ্য থাকা পর্যন্ত তিনি এ হুজরা থেকে আসা যাওয়া করে সালাতের ইমামতি করতেন। সম্ভবত ওফাতের পাঁচদিন পূর্বে কোন একদিন রাসূল সা. গোছল করার বাসনা প্রকাশ করলে তাঁকে একটি চৌবাচ্চায় বসায়ে মশক থেকে পানি তাঁর শরীর মোবারকে ঢেলে দেওয়া হয়। নবীজি সা. কিছুটা আরামবোধ করলেন। মাথায় পট্রি খুলে জোহরের নামাযের জামাত শেষ হওয়ার পর মসজিদের মিম্বরে উঠে যে অসিয়তকৃত ভাষণ দিলেন তা ছিল রাসূল সা. এর জীবনের সর্বশেষ বরকতময় ভাষণ। ভাষণের একপর্যায়ে তিনি দ্ব্যার্থকন্ঠে বললেন, “তোমাদের পূর্ববর্তী লোকেরা নবীগণ এবং নেককারদের কবরগুলোকে ইবাদতের স্থানে পরিণত করে ছিল; তোমরা কিছুতেই কবর কে সিজদা করার স্থানরুপে গ্রহণ করনা (মাজার বানিও না), আমি কঠোরভাবে তোমাদিগকে নিষেধ করিতেছি”। ভাষণের একপর্যায় তিনি আরো বলেন “আল্লাহ তার এক বান্দাকে আল্লাহর কাছে চলে যাওয়া কিংবা কিয়ামত পর্যন্ত দুনিয়াতে থাকার ইখতিয়ার দিলে তিনি আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে যাওয়াকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন।” হযরত আবুবকর রা. এই কথার মর্মবাণী উপলব্ধি করে অঝোর ভাবে কান্না শুরু করে দিলেন। রাসূলের সা. ওফাতের পূর্বে তাঁর জামাতকৃত সর্বশেষ নামায ছিল মাগরিব। মাগরিব নামাযের পর যখন এশার নামাযের ওয়াক্ত আসল তখন মসজিদে নববীতে উপস্থিত সকল সাহাবী রা. গণ রাসূলের আগমনের অপেক্ষায় থাকলেন। রাসূল সা. এসে নামাযে জামায়াতের ইমামতি করবেন, এটাই ছিল তাদের একান্ত আশা। কিন্তু মসজিদে আসার জন্য রাসূল সা. একে একে তিনবার উঠতে চেষ্টা করলেন, প্রতিবারেই চেতনা হারালেন। চতুর্থবার চেতনা ফিরে পেয়ে হযরত আয়েশা রা. কে উদ্দেশ্য করে বললেন “ আবুবকর রা. কে বল লোকদের ইমামতি করে নামায আদায় করুক”। তখন হযরত আয়েশা রা. নিবেদন করলেন, আবু বকর রা. কোমলমতি মানুষ, আপনার স্থানে দাঁড়ানো হয়ত তার পক্ষে সম্ভব হবেনা। নবীজি সা. দ্বিতীয়বার তার নির্দেশের পুনরাবৃত্তি করলে হযরত আয়েশা রা. পুনরায় তাঁর নিবেদন পেশ করেন। রাসূল সা. এবার একটু কঠোরভাবে বললেন। আবু বকর রা. কেই বল সালাতে ইমামতি করতে। অবশেষে হযরত আবু বকর রা. নামাযের ইমামতি করলেন। (এইভাবে হযরত আবুবকর রা. মোট সতের ওয়াক্ত নামাযের ইমামতি করেছেন।) হযরত আবুবকর রা. ইমামতিতে নামায শেষ হওয়ার পর মসজিদের সর্বত্র নিরবতার এক কালো অমানিশা নেমে আসে। সাহাবী রা. গণ অনুধাবন করেন যে, কিছুদিন পূর্ব থেকে রাসূল সা. এর মিম্বর শূন্য ছিল আর আজ থেকে তাঁর জায়নামায শূন্য হয়ে গেল। কুল মানবের সুপথের দিশারী রাসূল সা. ধীরে ধীরে দুনিয়ার বাধঁন হতে মুক্ত হতে চললেন। ১২ই রবিউল আউয়াল সোমবার ফজরের নামায আদায় করে হযরত আবুবকর রা. রাসূল সা. এর শারীরিক অবস্থা একটু ভালো থাকার কারণে তাঁর কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে পরিবারের খোঁজ খবর নেওয়ার জন্য বাড়ীর উদ্দেশ্যে বাহির হলেন। (আবু বকর রা. এর বাড়ীটি উহুদ পাহাড়ের নিকটবর্তী ছিল) পৃথিবীর আকাশের সুর্যটি ধীরে ধীরে উর্দ্ধগগনে উদিত হচ্ছে, ছড়িয়ে পড়ছে তাঁর লাল রক্তিম আভা। অন্যদিকে নবওুয়াতের শেষ সূর্যটি আস্তে আস্তে অস্তমিত হতে চলছে। আর কোনদিনই উদিত হবেনা এ ধরার বুকে। তাঁর তেজোদীপ্ত সোনালি আভায় পৃথিবীর আকাশ আর আলোকিত হবেনা। আহ! কি হৃদয় বিদারক সময়। সোমবার বেলা বাড়ার সাথে সাথে মহানবী সা. এর চেতনা হারাবার পালা ঘনঘন হতে লাগল। রাসূল সা. এর শারীরিক অবস্থা করুণ হতে লাগল। হযরত সা. এর এই হৃদয়বিদারক অবস্থা কন্যা ফাতেমা রা. এর জন্য অসহনীয় বোধ হইতেছে। অব্যক্ত বেদনা প্রকাশে তিনি বলে উঠলেন “হায়রে! আমার পিতার কষ্ট”। তখন হযরত সা. বললেন “ফাতেমা! আজকের দিনের পর তোমার পিতার আর কোন কষ্ট হবে না”। তখন ফাতেমা রা. কেঁদে উঠলে রাসূল সা. তাকে শান্ত্বনা দিয়ে বলল, হে ফাতেমা! তুমি কেঁদোনা, আমি চলে যাওয়ার পর জান্নাতে (কবরে) তোমার সাথেই আমার প্রথম দেখা হবে”। হযরত হাসান, হোসেন রা. দিগকে ডাকা হল তাদেরকে আদর করা হল, তাঁদের অসিয়ত করা হল। তাদের নিরাপত্তার জন্য সকল উম্মতকে অসিয়ত করা হল। হযরত আলী রা. কে ডেকে অসিয়ত করলেন এবং বারবার তাগিদ দিলেন “নামায! নামায! এবং তোমাদের দাসদাসীদের প্রতি লক্ষ্য রাখিও”। রাসূল সা. এর অন্তিম অবস্থা শুরু হয়ে গেল। যবান মোবারক ধীরে ধীরে চলছে। যবান থেকে বারবার উচ্চারিত হতে লাগল “আল্ল্াহ ব্যতীত কোন মাবুদ নেই, নিশ্চয়ই মৃত্যু যন্ত্রণা অতিকষ্টকর।” ওফাতের কিছুক্ষণ পূর্বে হযরত আয়েশা রা. এর ভাই হযরত আব্দুর রহমান ইবনে আবুবকর রা. রাসূল সা. কে দেখতে এলেন। তাঁর হাতে একটি তাজা মেসওয়াক ছিল। রাসূল সা. মেসওয়াকের দিকে এমনভাবে তাকালেন যেন তিনি মেসওয়াক করতে চান। রাসূল সা. এর স্বভাব পারদর্শিনী বিবি আয়েশা রা. রাসূল সা. এর অব্যক্ত অনূভূতি অনুধাবন করে ভাইয়ের কাছ থেকে মেসওয়াকটি নিয়ে নিজের দাঁত দিয়ে চিবিয়ে নরম করে রাসূল সা. এর পবিত্র মাথা মোবারক নিজের রানের উপর রেখে নিজের হাতে মেসওয়াক ঘুরাইয়া রাসূল সা. এর দাঁত মোবারক পরিষ্কার করে দিলেন। মেসওয়াক করার পর হযরত আয়েশা রা., রাসূল সা. এর মাথা মোবারক অধিক ভারী অনুভব করলেন। রাসূল সা. তাঁর দুই হাত উপরে তুলিলেন। আয়েশা রা. বলেন, আমি রাসূল সা. এর মুখে “এখন আর কোন কিছুই নয়! এখন শুধু সু মহান বন্ধুর সান্নিধ্য চাই” এই বাক্যটি তিনবার  শুনতে পেলাম। বলার পর তাঁর হাত মোবারক উপর থেকে নিচে পড়ে গেল এবং তার সাথে সাথেই পৃথিবীর কোটি কোটি উম্মত কে শোকের সাগরে ভাসিয়ে সত্যি সত্যি তাঁর পবিত্র মহান আতœা মহান বন্ধুর সমীপে পৌঁছে গেল। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া-ইন্না ইলাইহি রাজিউন) এই সংবাদ ছড়িয়ে পড়ল মদীনার দিগদিগন্তে। চারদিকে নেমে এল এক শোকের মাতম। সাহাবী রা. গণ দিশেহারা হয়ে পড়ল। তারা শোকে পাথর হয়ে গেল। হযরতের ওফাত কোন ভাবেই তাঁদের মন মেনে নিতে পারছেনা। হযরত উমর রা. কোষমুক্ত তরবারী নিয়ে বাহির হয়ে গেলেন এবং বলতে লাগলেন, যে বলবে রাসূল সা. নেই তাকে হত্যা করা হবে। হযরত আবুবকর রা. খোৎবা দিলেন তার খোৎবা শুনে উপস্থিত সাহাবায়ে কেরামগণ কিছুটা শান্ত্ব হল। তিনি পবিত্র কোরআনের আয়াত উল্লেখ করেন মোহাম্মদ সা. একজন রাসূল। তাঁর পূর্বে বহু রাসুল গত হয়েছেন। সুতারং তিনি যদি মারা যান কিংবা তাঁকে শহীদ করা হয় তবে কি তোমরা পৃষ্ট প্রদর্শন করবে? এবং কেউ পৃষ্ট প্রদর্শন করলে সে কখনই আল্লাহর ক্ষতি করতে পারবেনা; বরং যারা কৃতজ্ঞ আল্লাহ শ্রীঘ্রই তাদের পুর®কৃত করবেন”। মঙ্গলবার রাসূল সা. এর কাফন দাফনের প্রস্তুতি চলল। পরিধানের কাপড় যথাস্থানে রেখে রাসূল সা. কে উত্তমরুপে গোছল দেওয়া হল। রাসূল সা. এর চাচা হযরত আব্বাস রা. এবং তার দুই পুত্র ফাদল এবং কুসাম এবং হযরত আলী রা., রাসূল সা. এর গোছল দেওয়ার কাজ সমাধা করলেন। সাহুলে বয়নকৃত তিনখানা সাদা সুতি বস্ত্রে রাসূল সা. এর সম্পুর্ণ দেহ মোবারক আবৃত করে হযরত আয়েশা রা. এর হুজরা মোবারকে রাসূল সা. কে চিরদিনের জন্য সমাহিত করা হল। (নবী রাসূলগণ যেখানে ইন্তেকাল করেন বরাবর সেখানেই তাঁদের কে সমাহিত করা হয়) প্রত্যেক সাহাবী রা. গণ পৃথক পৃথক ভাবে রাসূল সা. এর দুআ জানাযা পড়লেন। এইভাবেই পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ট মহামানব কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ের নয়নমনি দুনিয়াবাসী থেকে চির বিদায় গ্রহণ করেন। যেই মহামানবের আগমনে একদিন এই পৃথিবীতে আনন্দের জোয়ার বয়েছিল, আজ সেই মহামানবের চিরবিদায়ে পৃথিবীতে শোকের কালো ছায়া নেমে এলো। রাসূল সা. এর বিদায়ের করুণ দৃশ্য যেন ফুটে উঠল অনন্ত আকাশে বাতাসে। চারদিকে শুধু এই হাহাকার আর ধ্বনি ভেসে আসতে লাগল রাসূল সা. নেই! রাসূল সা. নেই।
লেখক : ইতিহাসবিদ, প্রবন্ধকার

একটি মন্তব্য রয়েছেঃ নবুওয়াতের শেষ সূর্যটি যেভাবে অস্তমিত হল! : মো: আবুল খায়ের (স্বপন)

  1. শামছু্দিদন says:

    অনেক আবেগঘন লেখা। আল্লাহ আমাদের খাটি উম্মত বানাও।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight