নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি ভালোবাসা এবং নুর-বাশার প্রসঙ্গ / আবু লুবাবা

 

মুমিনমাত্রই প্রিয় নবীজি হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি হৃদয়ে লালন করে এক অকৃত্রিম ভালোবাসা। নবীজিকে ভালোবাসে না―এটি কোনো মুমিনের ক্ষেত্রে কল্পনাও করা যায় না। প্রতিটি মুমিন তাঁকে ভালোবাসে সবটুকু আন্তরিকতা দিয়ে। তাঁর নাম যখনই কোথাও উচ্চারিত হয়, আবেগ ও ভালোবাসার মিশেলে মুমিন বান্দার কণ্ঠে উচ্চারিত হয় ‘সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’―তাঁর ওপর বর্ষিত হোক আল্লাহর পক্ষ থেকে সালাত ও সালাম! যতবার উচ্চারিত হয় হোক, এই দরুদ পাঠে মুমিন ক্লান্ত হয় না। নবীজির গল্প, তাঁর জীবনের গল্প, দীন প্রচারের গল্প, জিহাদের গল্প, সামাজিকতার গল্প, দেশ পরিচালনার গল্প ইত্যাদি যে যেখানেই শোনে, যতবার শোনে, মুমিন হৃদয় ততবারই এতে তৃপ্তির খোরাক পায়। এ ভালোবাসা কেমন হবে―পবিত্র কুরআনে এর একটি স্বরূপ বর্ণিত হয়েছে এভাবে―‘(হে নবী! মুসলিমদের) বলো, তোমাদের বাবা, তোমাদের ছেলেসন্তান, তোমাদের ভাই, তোমাদের স্ত্রী, তোমাদের খান্দান, তোমাদের সেই সম্পদ যা তোমরা অর্জন করেছ, তোমাদের সেই ব্যবসা যার মন্দা পড়ার আশঙ্কা কর এবং তোমাদের বসবাসের ঘর যা তোমরা ভালোবাস তা যদি তোমাদের নিকট আল্লাহ, তাঁর রাসূল এবং তাঁর পথে জিহাদ করা অপেক্ষা বেশি প্রিয় হয়, তাহলে আল্লাহর নির্দেশ (অর্থাৎ শাস্তি) আসা পর্যন্ত তোমরা অপেক্ষা করো!’ [তওবা : ৯ : ২৪]
পবিত্র কুরআনের প্রখ্যাত তাফসীরকারক আল্লামা কুরতুবী রহ. স্বীয় তাফসীরগ্রন্থে লিখেছেন―‘এ আয়াত থেকে প্রমাণিত হয়, আল্লাহ তাআলা ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ভালোবাসা ওয়াজিব―অবশ্য কর্তব্য, এতে কোনো মতানৈক্য নেই এবং এ ভালোবাসার অবস্থান অন্য সকল ভালোবাসার চেয়ে উর্ধ্বে।’
একটি হাদীসের ভাষ্য―রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, তোমাদের কেউ ততক্ষণ পূর্ণ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার নিকট তার বাবা তার সন্তান এবং অন্য সকল মানুষের চেয়ে অধিক প্রিয় না হই। [সহীহ বুখারী, হাদীস : ১৫]
কথা সহজ―পূর্ণ মুমিন হতে চাইলে, ঈমানের দাবিতে উত্তীর্ণ হতে চাইলে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ভালোবাসতে হবে সবার চেয়ে বেশি। একদিকে তিনি সৃষ্টিকুলের সেরা, এর সঙ্গে আমাদের জীবনে ছড়িয়ে আছে তাঁর সীমাহীন অনুগ্রহ। এসব বিবেচনায় এ সম্মান এ ভালোবাসা তাঁর অধিকার।
কিন্তু কথা হলো, এ সম্মান ও ভালোবাসার প্রকাশ আমরা কী করে করব? এর উত্তরও সহজ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে আমার সুন্নত জীবিত করল, সে আমাকে ভালোবাসল। আর যে আমাকে ভালোবাসল, সে আমার সঙ্গেই বেহেশতে থাকবে।’ [জামে তিরমিযী, হাদীস : ২৬৭৮]
এই হলো তাঁকে ভালোবাসার সহজ পথ। জীবনের পদে পদে প্রিয় নবীর প্রিয় সুন্নত মেনে চলাই তাঁকে ভালোবাসার প্রকাশ। এটাও স্বাভাবিক কথা―বড় কাউকে যখন কেউ ভালোবাসে, তখন সে তাঁর সবকিছুই অনুসরণ করতে চেষ্টা করে। চলাফেরা, পোশাক-আশাক, চুলের স্টাইল এমনকি কথা বলার ঢংও সে রপ্ত করতে চেষ্টা করে। এর নামই ভালোবাসা। তাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকেও ভালোবাসতে হলে তাঁর সুন্নতকে আঁকড়ে ধরতে হবে। তিনি আরও বলেছেন―‘আমি তোমাদের মাঝে দুটি বিষয় রেখে যাচ্ছি। এগুলোকে যতকাল আঁকড়ে থাকবে, ততদিন তোমরা কিছুতেই বিভ্রান্তির শিকার হবে না―এক. আল্লাহর কিতাব, দুই. তাঁর নবীর সুন্নত।’ [মুয়াত্তা মালেক, হাদীস : ১৫৯৪]
অর্থাৎ নবীজির ভালোবাসায় ও তাঁর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে গিয়ে এমন কিছু বলা যাবে না, এমন কোনো কাজ করা যাবে না, যা এ দুটি অর্থাৎ কুরআন ও হাদীসের পরিপন্থী। আরেকটি মানদ-―প্রিয় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র হাতে গড়া সাহাবায়ে কেরামের মহান জামাত, তাদের অনুসারী তাবেয়ীদের জামাত―তাঁরা যেভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ভালোবেসেছেন, যেভাবে তাঁর প্রতি সম্মান দেখিয়েছেন, নবীকে ভালোবেসে মুক্তি পেতে হলে আমাদেরকেও সেভাবেই ভালোবাসতে হবে। তাঁকে ভালোবেসে এমন কোনো কথা বলা যাবে না, যা সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেয়ীদের শিক্ষার পরিপন্থী। এমন কোনো পদ্ধতি অনুসরণ করা যাবে না, যা তাদের শিক্ষার পরিপন্থী। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তো বলেছেন : ‘সেরা মানুষ আমার কালের মানুষ, এরপর তাদের পরবর্তীরা, এরপর তাদের পরবর্তীরা।’ [সহীহ বুখারী, হাদীস : ৩৬৫১]
আমাদের প্রিয় ধর্ম ইসলামের এ এক অনন্য বৈশিষ্ট্য, ইসলামের নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র জীবনের ছোট-বড় নানা দিক যতটা যত্নের সঙ্গে সংরক্ষিত হয়েছে, সেভাবে আর কোনো ধর্মের কোনো প্রচারক কিংবা প্রবর্তকের জীবনীই সংরক্ষিত হয় নি। তাঁর জীবনী নিয়ে রচিত হয়েছে অসংখ্য বইপত্র। পবিত্র এ জীবনের একেকটি স্বতন্ত্র দিক নিয়েও কত বই লেখা হয়েছে! কত আলোচনা হয়েছে! তেমনি একটি বিষয়―নুর-বাশার প্রসঙ্গ।
মূল আলোচনায় যাওয়ার পূর্বে আরেকটি কথা বলে নিই। এই যে ওপরে বলে এলাম, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কালের মানুষ যারা, তারাই ছিলেন সেরা মানুষ। এরপর তাদের পরবর্তীরা, এরপর তাদের পরবর্তীরা। এভাবে তিন কালের মানুষ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শ্রেষ্ঠত্বের ঘোষণা দিয়ে গেছেন। সেরা মানুষদের এ তিন কালে মানুষের মাঝে নীতি-নৈতিকতা সততা-সত্যবাদিতা ছিল প্রবল। অন্যায়-অপরাধ মিথ্যা ও অনৈতিকতা একেবারে ছিল না এমন নয়, তবে এসব ছিল খুবই বিরল। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে ধীরে ধীরে মানুষের মাঝে মিথ্যা ধোঁকা প্রতারণা ও অনৈতিকতা ছড়িয়ে পড়তে থাকে। এর প্রভাব পড়ে দীনি নানা বিষয়ে―প্রিয় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস ও সুন্নত বর্ণনার ক্ষেত্রে, তাঁর পবিত্র জীবনী বর্ণনার ক্ষেত্রে, এমনকি তাঁর প্রিয় সাহাবীগণের জীবনের নানা দিক বর্ণনা প্রসঙ্গেও। চৌদ্দশ বছরের এ সুদীর্ঘ সময়ে কত কিছুই তো ঘটেছে। একটু শুনে আরেকটু বাড়িয়ে তিলকে তাল করার মতো ঘটনা যেমন ঘটেছে, তেমনি অসতর্কতাবশত চিলে কান নিয়ে যাওয়ায় কানে হাত না দিয়ে চিলের পেছনে ছোটার মতো হাস্যকর ঘটনাও ঘটেছে। কেউ ভুলে, কেউ ইচ্ছা করে, কেউ ভালো মনে করে, কেউবা মনে শত্রুতা লুকিয়ে রেখে, কেউ মানুষকে আল্লাহ তাআলার ইবাদতে অধিক মনোযোগী করে তোলার উদ্দেশ্যে, কেউ ইসলামের ক্ষতি করার মানসে, কেউবা আবেগতাড়িত হয়ে অসত্য ও অশুদ্ধ হাদীস বর্ণনা করেছে, কিংবা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নামে মিথ্যা কাহিনী জুড়ে দিয়েছে। যুগসচেতন আলেম সমাজ বিষয়টিকে ইসলামের ওপর একটি আঘাত হিসেবেই বিবেচনা করেছেন এবং এ আঘাত মোকাবেলা করার জন্যে তারা নিজেদের সর্বোচ্চ চেষ্টা বিলিয়ে দিয়েছেন। চোখে আঙ্গুল দিয়ে তারা দেখিয়ে দিয়েছেন―প্রিয় নবীজির কোন হাদীসটি গ্রহণযোগ্য আর কোনটি অগ্রহণযোগ্য; তাঁর জীবনসংক্রান্ত কোন তথ্যটি নির্ভরযোগ্য আর কোনটি অনির্ভরযোগ্য। তাই ইসলাম নিয়ে কোনো কথা বলতে হলে, ইসলামের নবীকে নিয়ে কোনো কথা বলতে হলে সে কথা অবশ্যই এসব মানদ-ে উত্তীর্ণ হতে হবে।
এবারে মূল প্রসঙ্গ। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নুর, না বাশার? বাশার আরবি শব্দ। এর অর্থ মানুষ। নুরের নবী কথাটি সম্ভবত এখান থেকেই বলা হয়। তিনি যদি নুর হয়ে থাকেন, নুর দিয়ে সৃষ্ট হয়ে থাকেন, তাহলে তাঁকে মাটির তৈরি মানুষ বললে তাঁর সম্মানহানি হবে। আর যদি তিনি মাটির তৈরি মানুষ হয়ে থাকেন আর তাকে আমরা নুর থেকে সৃষ্ট নবী বলি তাহলেও এটা তাঁর সম্মানহানি হবে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, দেশের একজন মন্ত্রী, বড় পদের অধিকারী একজন সম্মানিত মানুষ। শুধু পদের খাতিরে হলেও মানুষ তাকে সম্মান করে থাকে। বলে―মাননীয় মন্ত্রী। কিন্তু কেউ যদি মাননীয় মন্ত্রীকে চেয়ারম্যান বলে সম্বোধন করে তাহলে যেমন তাকে অসম্মান করা হয়, তেমনি অধিক সম্মান দেখাতে গিয়ে কোনো জনসমাবেশে যদি কেউ তাকে ঘোষণা করে ‘মহামান্য রাষ্ট্রপতি’ বলে, সেটা তাহলে সম্মানপ্রদর্শন হবে, না ঠাট্টা হবে―বিবেকবান কারও তা বুঝতেও অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।
আমরা আগেই বলে এসেছি, ইসলাম আর ইসলামের নবী সম্পর্কিত যে কোনো কিছু প্রমাণ করতে হলে সেটা অবশ্যই কুরআন-হাদীস সামনে রেখেই প্রমাণ করতে হবে। কুরআন-হাদীসের স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন বাণীগুলো থেকে সহজেই প্রমাণিত হয়―রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও দশজন মানুষের মতোই একজন স্বাভাবিক মানুষ ছিলেন। তবে তিনি যে অন্য সবার চেয়ে স্বতন্ত্র ও ভিন্ন, তাও বর্ণিত হয়েছে পাক কুরআনে ও হাদীস শরীফে। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষ ছিলেন―এ সম্পর্কিত পবিত্র কুরআনের কয়েকটি আয়াত লক্ষ করুন―‘তুমি বলো, পবিত্র মহান আমার পালনকর্তা! আমি একজন মানব রাসূল ছাড়া আর কী?’ [বনী ইসরাঈল : ১৭ : ৯৩]
‘বলো, আমিও তোমাদের মতোই একজন মানুষ। আমার প্রতি প্রত্যাদেশ হয়―তোমাদের মাবুদ একক মাবুদ। তাই যে ব্যক্তি তার পালনকর্তার সাক্ষাৎ কামনা করে সে যেন সৎ কাজ করে এবং তার পালনকর্তার ইবাদতে কাউকে শরিক না করে।’ [কাহ্ফ : ১১০]
‘বলো, আমিও তোমাদের মতোই একজন মানুষ। আমার প্রতি ওহি আসে―তোমাদের মাবুদ একমাত্র মাবুদ। তাই তোমরা তাঁরই প্রতি একাগ্র হয়ে যাও এবং তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো।’ [হা-মীম সাজদা : ৬]
‘তোমার পূর্বে আমি কোনো মানুষকেই অনন্ত জীবন দান করি নি। আর তোমার যদি মৃত্যু হয় তাহলে তারা কি চিরঞ্জীব হবে?’ [আম্বিয়া : ৩৪]
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নবুওয়ত পাওয়ার পরও একজন সাধারণ মানুষের মতোই জীবন কাটাতেন। আর এ বিষয়টিই মককার কাফেরদেরকে সংশয়ে ফেলে দিয়েছিল। পবিত্র কুরআনের বর্ণনা লক্ষ করুন―‘তারা বলে, এ রাসূলের কী হলো? সে খাবার খায়, আবার বাজারেও ঘুরে বেড়ায়!’ [ফুরকান : ২৫ : ৬]
এ আয়াতগুলোতে আমরা দেখতে পাই―১. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের মতোই একজন মানুষ ছিলেন, ২. তবে তাঁর সঙ্গে আমাদের পার্থক্য হলো, তাঁর কাছে ওহি অবতীর্ণ হতো, যা আমাদের কাছে অবতীর্ণ হয় না, ৩. পৃথিবীর অন্য সকল মানুষ যেমন মরণশীল, তিনিও মরণশীল, তাঁকেও মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হয়েছে। ৪. তিনি বাজারে যেতেন, খাবারও খেতেন, অর্থাৎ একজন সাধারণ মানুষের মতোই ছিল তাঁর জীবন।
বিষয়টি কেমন কৌতুকের মতো মনে হচ্ছে―আরবের মুশরিকরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নবী হিসেবে, রাসূল হিসেবে মানতে চায় নি। কারণ তিনি তাদের মতোই মানুষ। তাও আবার কোনো দাপুটে কিংবা প্রভাবশালী মানুষ নন। তাদের কথা ছিল―নবী হিসেবে মানুষ কেন, ফেরেশতা নেমে আসুক। মানুষ আবার নবী হবে কী করে! তাদের এ ধারণা ও দাবির প্রেক্ষিতে আল্লাহ তাআলা অবতীর্ণ করেছেন পাক কুরআনের আয়াত―‘আমি তো তোমার পূর্বে কতিপয় পুরুষকেই পাঠিয়েছিলাম, যাদের কাছে আমি ওহি পাঠিয়েছি…’ [নাহল : ১৬ : ৪৩]
‘যখন মানুষের নিকট হেদায়েত আসে তখন তাদের ঈমান আনা থেকে এছাড়া আর কোন বিষয় বিরত রাখে―তারা বলে, ‘আল্লাহ কি মানুষকে রাসূল করে পাঠালেন?’ বলো, ‘ফেরেশতাগণ যদি নিশ্চিন্ত হয়ে পৃথিবীতে বিচরণ করত তাহলে আমি আকাশ থেকে তাদের নিকট অবশ্যই ফেরেশতা রাসূল করে পাঠাতাম।’ [বনী ইসরাঈল : ১৭ : ৯৪-৯৫]
‘যদি তাকে ফেরেশতা করতাম, তাহলে তো তাকে মানুষের আকৃতিতেই পাঠাতাম আর তাদেরকে সেরূপ বিভ্রমে ফেলতাম, যেরূপ বিভ্রমে তারা এখন রয়েছে।’ [আনআম : ৬ : ৯]
শুধু তাই নয়, মককার কাফেরদের মতো পূর্ববর্তী অনেক নবীর উম্মতও তাদেরকে কেবল এজন্যেই বিশ্বাস করতে পারে নি―তারা মানুষ। পবিত্র কুরআনের বর্ণনা―‘তারা বলত, তোমরা তো আমাদের মতোই মানুষ। তোমরা আমাদেরকে ওই মাবুদ থেকে সরিয়ে রাখতে চাও, আমাদের বাপ-দাদারা যার ইবাদত-উপাসনা করত। তাহলে তোমরা সুস্পষ্ট কোনো প্রমাণ নিয়ে আসো।
তাদের রাসূলগণ তাদের বললেন : আমরা তোমাদের মতোই মানুষ। কিন্তু আল্লাহ স্বীয় বান্দাদের মধ্য থেকে যার ওপর ইচ্ছা অনুগ্রহ করেন (অর্থাৎ নবুওয়ত ও রিসালাত দান করেন)। আর আল্লাহর নির্দেশ ব্যতীত তোমাদের কাছে কোনো প্রমাণ নিয়ে আসা আমাদের কাজ নয়।’ [ইবরাহীম : ১৪ : ১০-১১]
এই হলো পবিত্র কুরআনের বর্ণনা। প্রিয় নবীজি হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামসহ পূর্ববর্তী সকল নবী-রাসূলই মানুষ ছিলেন―এ বিষয়ে এর পরও কি আর কিছু বলতে হয়? হয় না, তবুও বলি। হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একাধিক হাদীসেও বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন। লক্ষ করুন―রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : ‘নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা ইসমাঈলের বংশধর থেকে কিনানাকে মনোনীত করেছেন। এরপর কিনানার বংশধর থেকে কুরাইশকে মনোনীত করেছেন। কুরাইশের বংশধর থেকে বনি হাশেমকে মনোনীত করেছেন। আর বনি হাশেম থেকে আমাকে মনোনীত করেছেন।’ [সহীহ মুসলিম, হাদীস : ২২৭৬; জামে তিরমিযী, হাদীস : ৩৬০৫]
ভূমিকায় আমরা বলে এসেছি, কালের পরিবর্তনে প্রিয় নবীজির নামে ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় কেউ কেউ জুড়ে দিয়েছেন মিথ্যা হাদীস। কিন্তু সহীহ মুসলিম শরীফ যে সবরকম মিথ্যা অগ্রহণযোগ্য প্রত্যাখ্যাত হাদীস থেকে মুক্ত সহীহ হাদীসের এক অনবদ্য সংকলন―বিষয়টি তো পুরো উম্মতের কাছে এক বাক্যে স্বীকৃত। সহীহ মুসলিম―এ নামটিই কোনো হাদীস সহীহ হওয়ার জন্যে যথেষ্ট। কোনো হাদীসের সূত্র হিসেবে এ মুসলিম শরীফের নাম থাকলে সেখানে আর যাচাই-বাছাই করে প্রমাণ করতে হয় না―হাদীসটি সহীহ ও গ্রহণযোগ্য কি না। উপরের হাদীসটি সেই মুসলিম শরীফেই বর্ণিত। হাদীসটিতে আমরা স্পষ্টই দেখতে পাচ্ছি, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এখানে সংক্ষেপে তাঁর বংশধারা আমাদের জানিয়ে দিচ্ছেন, যা তাঁর মানুষ হওয়ারই প্রমাণ বহন করে।
আরেকটি হাদীস। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : ‘আমার জন্ম বিয়ের মাধ্যমেই হয়েছে। কোনো অবৈধ পন্থায় আমি জন্মগ্রহণ করি নি। জাহেলি যুগের কোনো অবৈধ পদ্ধতি আমাকে স্পর্শ করে নি (অর্থাৎ হযরত আদম আলাইহিস সালাম থেকে আমার বাবা-মা পর্যন্ত কোনো স্তরেই কোনো অবৈধতা ছিল না, বরং আমার বংশ পরম্পরা বিয়ের মাধ্যমেই চলে এসেছে)। পবিত্র পদ্ধতিতেই আমার জন্ম হয়েছে।’ [তাবাকাতে ইবনে সাদ, ১/২৬]
হাদীসের পাতায় এ বিষয়ে আরও কত হাদীস ছড়িয়ে আছে! কিন্তু এখানকার সংক্ষিপ্ত পরিসরে সেসব হাদীস উল্লেখ করার সুযোগ কোথায়! যাই হোক, কুরআনে কারীমের উপরোক্ত আয়াতগুলো আর উল্লিখিত হাদীসগুলো থেকে স্স্পুষ্টই প্রতীয়মান হয়―রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষ ছিলেন। শুধু তাই নয়, তিনি হযরত ইসমাঈল আলাইহিস সালামের বংশধর ছিলেন―এটাও উপরের হাদীসে সুস্পষ্ট।
মানুষকে আল্লাহ তাআলা প্রথম কীভাবে সৃষ্টি করেছেন, এরপর এ পৃথিবীতে তার বংশলতিকা কীভাবে ছড়িয়ে পড়ছে―এসব বিষয়ে তো পবিত্র কুরআনের বহু জায়গায় স্স্পুষ্ট বর্ণনা রয়েছে। একটি আয়াত লক্ষ করুন―‘আমি মানুষকে মাটির সারাংশ থেকে সৃষ্টি করেছি। এরপর আমি তাকে শুক্রবিন্দুরূপে এক সংরক্ষিত আধারে স্থাপন করেছি। এরপর আমি শুক্রবিন্দুকে জমাট রক্তরূপে সৃষ্টি করেছি; এরপর জমাট রক্তকে মাংসপি-ে পরিণত করেছি; এরপর সেই মাংসপি- থেকে অস্থি সৃষ্টি করেছি। এরপর অস্থিকে মাংস দিয়ে আবৃত করেছি। অবশেষে তাকে এক নতুন রূপে দাঁড় করিয়েছি। নিপুনতম সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ কত কল্যাণময়!’ [মুমিনুন : ১২-১৬]
পৃথিবীতে যত মহামানবই এসেছেন, সবাই একই পদ্ধতিতে পৃথিবীতে আগমন করেছেন। ব্যতিক্রম ছিলেন হযরত আদম আলাইহিস সালাম, তিনি প্রথম মানব। তাই তাঁর জন্মের ক্ষেত্রে মা-বাবার মধ্যস্থতার কোনো বিষয় ছিল না। ব্যতিক্রম হযরত হাওয়া রা., আল্লাহ তাআলা তাকে হযরত আদম আলাইহিস সালামের পাঁজড়ের হাড় থেকে সৃষ্টি করেছেন। ব্যতিক্রম হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম, কোনো পুরুষের স্পর্শ ছাড়াই আল্লাহ তাআলা তাঁকে তাঁর মায়ের গর্ভ থেকে সৃষ্টি করেছেন। এছাড়া সকল মানুষ এ স্বাভাবিক পদ্ধতিতেই জন্মগ্রহণ করেছেন। যে দুটি হাদীস আমরা উপরে উল্লেখ করেছি, তাতে একথাও প্রমাণিত হয়―রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও এ স্বাভাবিক পদ্ধতিতেই পৃথিবীতে আগমন করেছেন।
 
চলবে ইনশাআল্লাহ
[পরবর্তী আলোচ্য বিষয় : নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষ হয়েও নুর]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight