ধৈর্য সৌভাগ্যের সোপান : মুহাম্মদ শরীফুল আলম

Dua

ধৈর্য হচ্ছে মানব চিত্তের অবিচলিত ভাব। এ ভাবকে যারা নিজেদের মাঝে ধারণ করতে পারেন তারাই ধৈর্যশীল। তারা বড় ভাগ্যবান। বড় সুখী জন।  ধৈর্যশীল ব্যক্তিরা হন সবার প্রিয়। সকলের শ্রদ্ধার পাত্র। আল্লাহ তায়ালাও তাদেরকে ভালবাসেন। তাই তো পবিত্র কুরআনে তিনি বলেছেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন। [সূরা বাকারা:১৫৩]

মানব জীবনে সুখ-দুঃখ হচ্ছে একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। সুখের সময় মানুষ আনন্দিত হবে, উল্লসিত হবে, আর দুঃখের সময় পেরেশান হবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু একজন ধৈর্যশীল মুমিন ব্যক্তির কাছে বিষয়টি সম্পূর্ণ বিপরিত। সুখ-স্বচ্ছলতার সময় তিনি উদ্ভাসিত হবেন এবং  সুখের দীপ্তি চোখে মুখে ছড়িয়ে পড়বে ঠিকই। কিন্তু তিনি উল্লাসে ফেটে পড়েন না। আর যখন বিপদ আসে দুঃখ-দুর্দশার ঝড় বইতে থাকে তখনও তিনি থাকেন শান্ত-শিষ্ট, সুশৃঙ্খল ও সুস্থির। তার আচরণ হয় পরিমার্জিত ও পরিশীলিত। কারণ তিনি ধৈর্যের মাধ্যমে  মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রতিনিয়ত পুরস্কার পাওয়ার আশা রাখেন। আর এ কারণেই তিনি মনের মাঝে সে সময়েও পুলক অনুভব করেন। তার হৃদয়-রাজ্যে বইতে থাকে অনাবিল আনন্দের ফল্গুধারা।
হযরত সুহাইব রা. থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, মুমিনের বিষয়টি আশ্চর্যজনক। আল্লাহ তায়ালা তার ব্যপারে যে ফায়সালাই করেন তাই তার জন্য হয় কল্যাণকর। সে যদি নেয়ামত প্রাপ্ত হয়, তাহলে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে। ফলে সেটা তার জন্য কল্যাণকর হয়। আর যদি বিপদে পড়ে তাহলে সে ধৈর্যধারণ করে, তখন সেটাও তার জন্য কল্যাণকর হয়। [ইবনে কাসীর: ১খ, পৃ. ৪২০]   পক্ষান্তরে যাদের অন্তরে ধৈর্য নেই, তারা জীবনে সফল হতে পারে না। তারা হয় অশান্ত-উগ্র-উশৃঙ্খল। তাদের আচরণ হয় অমার্জিত-অশালীন।
তবে ধৈর্য যে শুধু বিপদের ওপরই সীমাবদ্ধ তা কিন্তু নয়। তাফসীরে ইবনে  কাসীরে ধৈর্যকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে। যথা-
ক) অন্যায়ের পথ থেকে নিজেকে বিরত রেখে ধৈর্যধারণ করা।
খ) আল্লাহ তায়ালার আনুগত্যের ওপর ধৈর্যধারণ করা।
গ) বিপদের সময় ধৈর্যধারণ করা। মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে ঘোষিত বিরাট প্রতিদান লাভ করতে হলে সকল প্রকার ধৈর্যই ধারণ করতে হবে।
আখেরাতে ধৈর্যের প্রতিদান সম্পর্কে হযরত আলী ইবনে হাসান রা. একটি সুন্দর হাদীস বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, আল্লাহ তায়ালা যখন পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকল মানুষকে একত্রিত করবেন, তখন এক ঘোষক ঘোষণা করবে, ধৈর্যধারণকারীরা কোথায়? তারা যেন হিসাবের পূর্বেই জান্নাতে প্রবেশ করে। তিনি বলেন, তখন কিছু লোক দাঁড়িয়ে যাবে। সে সময় ফেরেশতারা তাদের সাথে সাক্ষাৎ করে বলবে, হে আদম সন্তান, তোমরা কোথায় যাও? তারা বলবে, জান্নাতে। ফেরেশতারা বলবেন, হিসাবের পূর্বেই? তারা বলবে, হাঁ, ফেরেশতারা বলবেন, তোমরা কারা? তারা বলবে, আমরা ধৈর্যশীল। ফেরেশতারা বলবেন, তোমরা কীভাবে ধৈর্যধারণ করতে? তারা বলবে, আমরা আল্লাহর আনুগত্যের ওপর ধৈর্যধারণ করতাম এবং আল্লাহর নাফরমানী থেকেও ধৈর্যধারণ করতাম। এক পর্যায়ে আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে মৃত্যুদান করেন। ফেরেশতারা বলবেন, তাহলে তোমাদের কথা ঠিকই আছে। তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করো। আমলকারীদের প্রতিদান কতইনা উত্তম। [ইবনে কাসীর: ১খ, পৃ. ৪২১]
আল্লাহ তায়ালা অনেক সময় মৃত্যুর আগে দুনিয়াতেই ধৈর্যের প্রতিদান দিয়ে থাকেন। প্রখ্যাত মহিলা সাহাবী হযরত উম্মে সালামা রা.-এর ঘটনায় তার দৃষ্টান্ত ফুটে উঠেছে। তিনি বলেন, আমার স্বামী আবু সালামা রা. একদিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবার থেকে আমার কাছে এলেন এবং বললেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এমন একটি কথা শুনেছি যা আমাকে খুব আনন্দ দিয়েছে। তিনি বলেছেন, যে মুসলমান কোনো বিপদে পড়ে-   ’আমরা আল্লাহর জন্য আর তার কাছেই আমরা ফিরে যাব।’ পাঠ করবে তারপর বলবে,  ‘আল্লাহুম্মা আজিরনী ফী মুসীবাতী ওয়া আখলিফ লী খাইরাম মিনহা।’ ‘হে আল্লাহ, আপনি আমাকে বিপদের প্রতিদান দিন এবং হারানো বস্তুর চেয়েও উত্তম বস্তু দান করুন।’ তবে অবশ্যই তাকে তা দেওয়া হবে।
উম্মে সালামা রা. বলেন, আমি দুয়াটি মুখস্থ করে নিলাম। পরে  যখন আবু সালামা রা.-এর মৃত্যু হলো, তখন আমি  ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্ন্া ইলাইহি রাজিউন’ পাঠ করলাম। আর বললাম,  ‘আল্লাহুম্মা আজিরনী ফী মুসীবাতী ওয়া আখলিফ লী খাইরাম মিনহা।’
হে আল্লাহ, আপনি আমাকে বিপদের প্রতিদান দিন এবং হারানো বস্তুর চেয়েও উত্তম বস্তু দান করুন।’ তবে অবশ্যই তাকে তা দেওয়া হবে।
কিন্তু আমি ভাবলাম যে, আবু সালামার চেয়ে উত্তম স্¦ামী কীভাবে পেতে পারি? এরপর আমার ইদ্দত অতিবাহিত হলে, আমি একদিন চামড়া শোধনের কাজ করছিলাম। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আগমন করলেন এবং ঘরে  প্রবেশের অনুমতি চাইলেন। তখন আমি চামড়া রেখে দিলাম এবং হাত ধুয়ে এসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ভেতরে আসতে অনুরোধ জানালাম। তারপর খেজুরের ছাল ভর্তি একটি চামড়ার আসন দিলাম। তিনি তাতে বসলেন। তারপর আমাকে বিবাহের প্রস্তাব দিলেন। তিনি যখন কথা শেষ করলেন, তখন আমি বললাম, ‘হে আল্লাহর রাসূল! আপনার ব্যাপারে আমার আগ্রহী না হওয়ার তো কোনো কারণ নেই। কিন্তু ব্যাপার হলো যে, আমি খুব জেদি নারী। খোদা না করুন, শেষে আপনার ইচ্ছা ও রুচির বিরুদ্ধে আমার কোনো আচরণ প্রকাশ পায়। আর পরিণতিতে আমার ওপর আল্লাহর আযাব নেমে আসে। আর আমি তো যথেষ্ট বয়স্কা এবং আমার ছেলেমেয়েও রয়েছে।’ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জবাবে বললেন- শোনো, অর্থহীন জেদ আল্লাহ তা’য়ালা দূর করে দিবেন। আর বয়সে আমিও তোমার সমবয়সী। তোমার ছেলেমেয়েরা আমারও ছেলেমেয়ে। উম্মে সালামা রা. বলেন, ‘তারপর আমি নিজেকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্য সঁপে দিলাম।’ এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বিয়ে করেন। উম্মে সালামা রা. বলেন, ‘আল্লাহ আমাকে হারানো স্বামী আবু সালামার চেয়ে উত্তম স্বামী দান করেছেন। আর তিনি হলেন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।’ [ইবনে কাসীর: ১খ, পৃ. ৪২৩]
লেখক: প্রাবন্ধিক, শিক্ষক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight