ধারাবাহিক উপন্যাস : রাজকুমারী

সকালের মেঘমুক্ত নির্মল নীল আকাশ। ঝির ঝির কোমল বাতাস গায়ে আদুরে পরশ বুলিয়ে দিচ্ছে এবং বাগানের প্রস্ফুটিত ফুলগুলোতে কম্পন সৃষ্টি করে অজানা উদ্দেশ্যে চলে যাচ্ছে। হঠাত বাগানের এক প্রান্তে নারীকণ্ঠের মিষ্টি মধুর কলহাস্যের শব্দ শোনা গেল।
সন্যাসিনী  স্বগতকণ্ঠে অস্ফুটস্বরে বলল,  আমি  রাজকুমারীকে কিছু কথা বলব।
যুবতীদের মাঝে সোমনাথ-রাজার কন্যা চন্দ্রুমুখীও ছিল।
চন্দ্রমুখী অনিন্দ্যসুন্দরী ও উদ্ভিন্নযৌবনা এক যুবতী। নিটোল গোলাকার চেহারা। প্রশস্ত ললাট পটলচেরা ডাগর নয়ন। উন্নত সরু নাসিকা। পাপড়ির মতো সুন্দর, মসৃণ ওষ্ঠাধর। উজ্জ্বল গৌর বর্ণের শরীরে যেন রূপের জোয়ার। অত্যন্ত লজ্জাবতী ও সরল-সুন্দর হৃদয়ের অধিকারীনী। দেখলে, তার সৌন্দর্যে মোহিত হয়ে স্বর্গের অপ্সরীরা পর্যন্ত তার প্রেমে বিমুগ্ধ হবে।
রাজকুমারী বলল, বলুন মাতাজি।
দীর্ঘদিন যাবত আমি একটি কথা গোপন করে আসছি। তুমি যখন হামাগুড়ি দিয়ে চলতে, তখন থেকেই আমি আমার অন্তরে বিষয়টি লালন করছি।
রাজকুমারী চন্দ্রমুখীর চোখ থেকে বিস্ময় জড়ে পড়ল। বলল, তবে কি তা আমার সঙ্গে সম্পৃক্ত?
সন্ন্যাসিনী রাজকুমারীর সুষমাময় চেহারার প্রতি তাকিয়ে বলল, তোমারই সম্পর্কিত কিছু অজানা কথা আমি তোমাকে বলতে চাই….। কিন্তু আমাকে তো বারণ করে দেয়া হয়েছে। আমার থেকে কঠিন প্রতিশ্রুতি নেয়া হয়েছে!
যার সঙ্গে তোমার রহস্যের সম্পর্ক বিদ্যমান। আমার রহস্য! চন্দ্রমুখীর কণ্ঠচিরে একরাশ বিস্ময় ঝড়ে পড়ল।
হ্যাঁ, তোমার রহস্য হে রাজকুমারী!
আপনি তো আমার অন্তরে কৌতূহলের আগুন জ্বালিয়ে দিলেন! আর আমার অন্তরে সে আগুন পনের বছর যাবৎ জ্বলছে। আমি তা এখনও গোপন করে আছি। আমি আমার অন্তরে এমন আগুন জ্বালিয়ে রেখেছি, যার তাপ-তীব্রতা উত্তরোত্তর কেবল বৃদ্ধিই পাচ্ছে। কিন্তু, আমি মথুরায় যাচ্ছি। বলতে পারি না ফিরে আসব কি-না। হয়ত সেখানেই আমার ইহ-লীলা সাঙ্গ হয়ে যাবে। তাই তোমার জীবনরহস্যটি আমি তোমার নিকট ব্যক্ত করে যেতে চাই।
অত্যন্ত মেহেরবানী হবে। অনুগ্রহপূর্বক আপনি তা বলে যান। কিন্তু ভাবছি, তা হলে কি আমার প্রতিশ্রতি ভঙ্গ হবে না! সে-চিন্তা এখন আর আপনি করবেন না। কারণ, আমার আগ্রহের মাত্রা তীব্র আকার ধারণ করছে।শোনো রাজকুমারী, এখন আমি তোমার জীবন-রহস্যকে আর লুকিয়ে রাখতে পারছি না।
তা হলে বলে ফেলুন।
এখানে নয়- নির্জনে একাকি বলতে হবে।
তা হলে এক্ষুণি আমি আমার সখীদের দূরে সরিয়ে দিচ্ছি। রাজকুমারী তার সখীদের দিকে ফিরে তাকাল এবং ইঙ্গিতে তাদের দূরে সরে যেতে বলল।
তারা সবাই দূরে গেলে রাজকুমারী বলল, এবার বলুন।
সন্ন্যাসিনী চারদিকে দৃষ্টি মেলে দেখে নিল। না, কেউ নেই। কেউ তাদের কথা শুনতে পাবে না। এবার সে চুপি-চুপি বলল, তোমার এই জীবন-রহস্য গোপন রাখতে আমি বাধ্য ছিলাম। কারণ, এতে আমার প্রাণহানীর আশঙ্কা তো আছেই , তোমার ভীষণ ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু, এখন আমি চাচ্ছি, আমি তা তোমার নিকট প্রকাশ করে দেব। তবে, তোমাকে অঙ্গীকার করতে হবে, তুমি বিষয়টি কারও নিকট প্রকাশ করবে না।
চন্দ্রমুখী বলল, হ্যাঁ আমি অঙ্গীকার করলাম, বিষয়টি কারও নিকট প্রকাশ করব না।শোনো রাজকুমারী, তুমি যদি তা প্রকাশ করো, তা হলে আমার তো মরতে হবেই, তোমার জীবনেরও ভীষণ ক্ষতি হবে।
আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। আমি তা প্রকাশ করব না।
আশা করি, অন্তত আমি মথুরা না পৌঁছা পর্যন্ত কিছুতেই তা প্রকাশ করবে না।
আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি; আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন।
সন্ন্যাসিনী কণ্ঠে গাম্ভীর্য এনে বলল; শোনো চন্দ্রমুখী, তুমি রাজকুমারী নও।’  সন্ন্যাসিনীর কথা শুনে চন্দ্রমুখী বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল। বলল, আমি রাজকুমারী নই? তাহলে আমি কে? কী আমার পরিচয়?
শান্ত হও চন্দ্রমুখী! আমি এক-এক করে তোমাকে  সব কিছুই খুলে বলব। তাতে তুমি যেমন বিস্মিত হবে, তেমনি ব্যথিতও হবে।
হ্যাঁ মাতাজি, আমি এতে অত্যন্ত বিস্মিত হয়েছি। দারুন ব্যথিতও হয়েছি।
তুমি দুঃখিত ও ব্যথিত হয়ো না। তুমি রাজকুমারীই থাকবে। আমি তোমাকে সব কিছু বিস্তারিত শোনাচ্ছি।
সন্ন্যাসিনীর কথা শেষ হতে -না হতেই রব ওঠে, মহারানী আসছেন, মহারানী আসছেন।
উভয়ে তাকিয়ে দেখল, দূর থেকে একদল নারী এগিয়ে আসছে।
সন্ন্যাসিনী হন্তদন্ত হয়ে বলল, এখন আর বলতে পারছি না। অন্য সময় বলব। তুমি হাসিমুখে মায়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করো। তাকে কোনোরূপ সন্দেহে ফেলো না। অন্যথায় আমার জীবনাশঙ্কা রয়েছে। আমি এখন যাচ্ছি।
সন্ন্যাসিনী ধীরপায়ে চলে গেল। চন্দ্রমুখী সন্ন্যাসিনীর প্রস্থানপথের দিকে বিস্মিতনেত্রে তাকিয়ে রইল।
রাজকুমারী চন্দ্রমুখী যখন শুনল, সে রাজকুমারী নয়, তখন থেকে তার অন্তরে এক অস্থিরতার ঝড় শুরু হয়ে গেল। বারংবার একটি চিন্তাই তার মস্তিস্কে উঁকি দিতে লাগল, আমি যদি রাজকুমারী না হই, তাহলে আমি কে? আমি কার কন্যা? তাদের উদ্দেশ্য? না-কি তারা জানেন না, আমি তাদের সন্তান নই? আর যদি জেনে থাকেন, তাহলে কেন তারা আমার আসল পরিচয় গোপন রাখছেন? এতে কী রহস্য আছে? এÑধরনের হাজারও প্রশ্ন তাকে সারাক্ষণ অস্থির করে রাখছে।
তবে, সে খুব ভালোভাবে অনুভব করে, তার লালন-পালন রাজকুমারীর মতোই হচ্ছে। রানী তাকে কন্যার মতোই আদর-সোহাগ করেন। রাজাও তাকে মেয়ের মতোই দেখেন, তার খোঁজ-খবর নেন।  প্রজারা তাকে রাজকুমরীর মতোই সম্মান করে। দাস-দাসী আর সখীরাও তাকে রাজকুমারীর মতোই সম্মান করে। কিন্তু তার পরও সন্ন্যাসিনীর সেই একটি কথাই তাকে অস্থির করে তুলছে। এদিকে রাজা ও রানীকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করার দুঃসাহসও তার নেই। তাই সে নীরবে অস্থির-বেচাইন অবস্থায় সময় কাটাতে লাগল।
রাজকুমারী চন্দ্রমুখী দীর্ঘদিন থেকে সন্ন্যাসিনীকে চেনে। অত্যন্ত সতী-সাধ্বী এবং ঈশ্বরের অনুগ্রধন্য সন্ন্যাসিনী। দিনের অধিকাংশ সময়ই তিনি পূজা-অর্চনায় অতিবাহিত করেন। কখনও মিথ্যা বলেন না। তাই রাজকুমারীর বিশ্বাস, একদিন সন্ন্যাসিনী এসে নিজেই তার এই রহস্যঘেরা জীবনকাহিনী বলে যাবেন। কিন্তু কয়েকদিন অতিবাহিত হয়ে গেল, সন্ন্যাসিনী এলেন না। অথচ,  প্রতিটি দিন সে তার আগমনের প্রতীক্ষায় প্রহর গুনছে। দিন-দিন তার অন্তর অস্বাভাবিক উতলা হয়ে ওঠছে।
সন্ন্যাসিনী সোমনাথ মন্দিরে থাকেন। তিনি ছাড়া আরও অনেক সন্ন্যাসিনী সেখানে থাকেন। তাদের সংখ্যা দেড়শ থেকে দুইশত। তাদের সবার মাঝে এই সন্ন্যাসিনী এক বিশেষ বৈশিষ্ট্যের অধিকারিনী। তার নাম হয়ত অন্য কিছু ছিল; কিন্তু সবাই তাকে শোবাদেবী নামে ডাকে ও চেনে। সোমনাথ মন্দিরের সকল সন্ন্যাসী ও সন্ন্যাসিনী তাকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করে। তার ধ্যান ও পূজা-অর্চনার কথা সবাই নির্দ্ধিধায় স্বীকার করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight