ধারাবাহিক উপন্যাস : কিশোরীর হাতের রক্তের চিঠি -আকিদুল ইসলাম সাদি

Rokter Chiti

লঙ্কা একটি দ্বীপের নাম। যেটি শ্রীলঙ্কায় অবস্থিত। যার আশপাশে রয়েছে গভীর সমূদ্র। আল্লাহ তাআলার কত বড় একটি নেয়ামত যে, গভীর সমুদ্রের মধ্যে জেগে উঠেছে এ দ্বীপটি। দ্বীপটি যদিও একটি সমুদ্রের দ্বীপ, কিন্তু এটিকে আর মনে হয় না যে, এর অবস্থান সমুদ্রে। মনে হয় যেন অনেক বড় একটি রাজ্য। কারণ শ্রীলঙ্কায় অবস্থিত লঙ্কা দ্বীপটি দ্বীপ হলেও তার মধ্যে গড়ে উঠেছে অনেক সবুজ শ্যামল অরণ্য। যার মধ্যে রয়েছে ছোট বড় বিভিন্ন প্রকারের গাছ। যেখানে বাস করে বিভিন্ন ধরনের প্রাণী। উড়াউড়ি করে হরেক রকমের পাখি। তারা পাখা মেলে উড়ে এ ডাল থেকে ও ডালে যায়। মনে হয় যেন এরা গাছ-পালা লতা-পাতার সাথে মিতালী গড়েছে। সবুজ শ্যামল অরণ্য ও পশু পাখির কোলাহল লঙ্কা দীপকে ফুটিয়ে তুলেছে খুব। এখন লঙ্কা দীপকে দেখতে লাগে অপূর্ব। অপূর্ব এ দ্বীপটি সবদিক থেকেই বসবাসের উপযোগী। কোন কিছুর কমতি নেই দ্বীপটিতে। তাই সেখানে গড়ে উঠেছে অনেক জনবসতি। যেখানে বসবাস করে অনেক পরিবার অনেক জনগোষ্ঠি। আর তারাই ব্যবসা করার জন্য গড়ে তুলেছে অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। এবং শিক্ষার জন্য গড়ে তুলেছে অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। লঙ্কা দ্বীপের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সাথে ব্যবসায় জড়িত ছিলো পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মানুষ। তারা দূর দূরান্ত থেকে লঙ্কা দ্বীপে ব্যবসা করতে আসত। এবং অনেক লাভবান হত। এমনকি অরবের লোকজনও ব্যবসা করার জন্য লঙ্কা দ্বীপে আসত। এবং তারা সুন্দর ভাবে ব্যবসা করত। এরই ধারাবাহিকতায় আবুল হাসান নামক এক ব্যক্তি সূদুর আরব থেকে লঙ্কা দ্বীপে আসে। তারও উদ্দেশ্য হলো লঙ্কা দ্বীপে ব্যবসা করা। আবুল হাসানের জন্ম স্থান আরব দেশের মদীনা শহরে। সে মদীনাতেই বসবাস করত। কিন্তু ব্যবসা করার জন্য লঙ্কা দ্বীপে এসেছে। আবুল হাসান খুবই খোদাভীরু লোক। তার খোদাভীরুতা খুবই প্রসংশনীয়। শুধু আবুল হাসানের খোদাভীরুতাকে প্রশংসনীয় বললে মনে হয় ভুল হবে। কেননা আরবের সকল মুসলমানের খোদাভীরুতাই হলো প্রশংসনীয়। আর যে মুসলমান লোকটির মদীনা শরীফে জন্ম, বড় হওয়া, শিক্ষা দীক্ষা তার খোদাভীরুতা বেশি থাকাটা অবাক করার কিছ নেয়। কেননা মদীনা শরীফের লোকেরা আল্লাহ ও তার রাসূল সা. কে সবার চেয়ে বেশি ভালবাসে। আর যারা আল্লাহ ও তার রাসূল সা. কে যত বেশি ভালবাসে তাদের মধ্যে খোদাভীরুতা তত বেশি। আর খোদাভীরুতা যাদের মধ্যে যত বেশি, প্রশংসনীয় তারাই তত বেশি হয়। মদীনার লোকজন যে, নবীজিকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে তার দৃষ্টান্ত ইতিহাস দেখলেই চোখে পড়ে। বুঝা যায় তাদের দেশে গেলে। নবী কারীম সা. যখন পৃথিবীর বুকে আগমন করেন। তখন পৃথিবী ছিলো অন্ধকারাচ্ছন্ন। চতুরদিক ছিলো জুলুম নির্যাতনে ভরপুর। খুন রাহাজানি ছিলো মানুষের পেশা। কন্যা সন্তানকে মনে করা হতো গজব। এজন্য কন্যা সন্তানকে তারা জীবিত পুতে রাখত। এছাড়াও মানুষ আরো অনেক গোমরাহীতে ডুবেছিলো তখন। যার কারণে সে যুগকে ইসলামের ভাষায় আইয়ামে জাহিলিয়াত বলা হত। অর্থাৎ সে যুগটি এমন একটি যুগে পরিণত হয় যে, এমন যুগ ইতিপূর্বে গত হয়নি। কেয়ামত পর্যন্ত হবেও না। নবী কারীম সা. সেই যুগে জন্ম গ্রহণ করেন, আর আস্তে আস্তে বড় হতে লাগলেন। নবীজি সা. যত বড় হচ্ছে এবং যত বুদ্ধি বাড়ছে তত তার মধ্যে একটি ব্যথা বাড়ছে, তাহলো তিনি  কীভাবে এ অন্ধকারাচ্ছন্ন যুগকে আলোয় পরিণত করবেন। এবং সমস্ত জুলুম নির্যাতন ও গোমরাহী থেকে মানুষকে কীভাবে বাঁচাবেন। কীভাবে তিনি সমাজ থেকে খুন রাহাজানি দূর করে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা করবেন। দিন যত যাচ্ছে নবী কারীম সা. এর মধ্যে এ ব্যথাগুলি তত বাড়ছে। আস্তে আস্তে দিন রাত মাস বছর অতিক্রম হতে লাগল। এক সময় নবীজির বয়স চল্লিশ বছরে উপনীত হলো এবং হেরা গুহায় তিনি ধ্যান মগ্ন অবস্থায় নবুওয়াত প্রাপ্ত হলেন। অতঃপর তিনি অন্ধকারাচ্ছন্ন পৃথিবীকে আলোয় পরিণত করতে জুলুম নির্যাতন থেকে মানুষ কে বাঁচানোর জন্য গোমরাহী থেকে সঠিক পথে আনার জন্য দ্বীনের দাওয়াত দিতে শুরু করলেন। তিনি এ দাওয়াতি কার্যক্রম প্রথমে শুরু করেছিলেন, তার জন্মভূমি মক্কা নগরীতে; কিন্তু সেখান থেকে তিনি দ্বীনি দাওয়াতের ব্যাপারে তেমন কোন সাড়া পাননি বরং সেখান থেকে পেয়েছেন শুধু নির্যাতন। পেয়েছেন ধিক্কার। যে মক্কার মানুষ নবীজিকে খুব বিশ্বাস করতো এমনকি তাকে আল আমীন উপাধিতে ভূষিত করেছিলো সেই মক্কার মানুষগুলোই তাকে নির্যাতন করতে লাগল। এবং পাগল বলে ধিক্কার দিতে লগলো। নবীজির দোষ ছিলো তিনি দ্বীনি দাওয়াত দিচ্ছিলেন। তিনি মানুষকে তাওহীদের দিকে ডাকছিলেন। সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য মেহনত করছিলেন। যখন নবীজি সা. এর উপর মক্কাবাসী অধিক অত্যাচার শুরু করলো এবং তাকে হত্যা করার পরিকল্পনা করলো, তখন আল্লাহ তাআলা তাকে হিজরত করার নির্দেশ দিলেন। নবী কারীম সা. আল্লাহ তাআলার সে নির্দেশ পালনার্থে হিজরত করে মদীনায় গেলেন। নবীজি সা. এর আগমনের কথা শোনে মদিনবাসী খুশিতে ব্যাকুল হয়ে গেলো। তারা নবীজিকে স্বাগতম জানানোর জন্য পথ চেয়ে অপেক্ষায় রইলো। নবী কারীম সা. অনেক বাধাঁ অতিক্রম করে কাফেরদের চোখ ফাঁকি দিয়ে মদীনায় উপস্থিত হলেন। নবীজি মদীনায় আগমন করেছেন বলে মদিনবাসী নিজেদেরকে ধন্য মনে করলেন। মদীনাবাসী সত্যিই ধন্য। কারণ তাদের মাঝেই তো তাশরীফ নিয়েছিলেন আল্লাহ তাআলার মাহবুব হযরত মুহাম্মাদ সা.। মদিনবাসী তাকে সসম্মানে গ্রহণ করে নিলেন। এবং দ্বীনি দাওয়াত সহ সকল ব্যাপারে সকল প্রকার সাহায্য সহযোগিতা করলেন। তারা নবীজিকে অভয় দিয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল আমরা আপনাকে সর্বক্ষণ সঙ্গ দিবো ইনশাআল্লাহ। আপনার ডানে বামে সামনে পিছনে থেকে দ্বীনের কাজ করে যাব। যদি তার জন্য বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিতে হয় আমরা মদীনাবাসী তাতে প্রস্তুত। আপনার কোন চিন্তা নেই। আপনি বিনা দিধায় দ্বীনের কাজ চালিয়ে যান। নবী কারীম সা. মদিনবাসীদের থেকে সকল প্রকার নুসরত ও হিম্মত পেয়ে বিনা দিধায় দিনের কাজ চালিয়ে গেলেন। আল্লাহর রাসূল মদীনাতে এমনভাবে দ্বীনের দাওয়াত দিয়েছিলেন যে, তার দাওয়াতে আস্তে আস্তে সকল মদীনাবাসী ইসলামের ছায়াতলে চলে এলো। নবীজি পরবর্তীতে মদীনাতেই সর্বপ্রথম ইসলামী রাষ্ট্রের সূচনা করেন এবং মদীনা থেকেই সমস্ত বিশ্বে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছান। এসমস্ত ইতিহাস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, মদীনার লোকেরা আল্লাহ ও তার রাসূল সা. কে অনেক বেশি ভালবাসতেন। সেই মদীনা থেকেই লঙ্কা দ্বীপে ব্যবসা করার জন্য এসেছে আবুল হাসান। আবুল হাসান লঙ্কা দীপে এসে দেখতে পেলো অনেক আরব পরিবার লঙ্কা দীপে স্থায়ী ভাবে বসবাস করছে। কিন্তু তাদের মধ্যে নেই কোন ইসলামী জ্ঞান। তারা ইসলাম সম্পর্কে একেবারেই অজ্ঞ। সর্বদা মূর্তিপূজায় মগ্ন। আল্লাহ কে? এবং তার রাসূলই বা কে? কিছুই জানেনা তারা। তাদের সম্পর্কেও তারা অজ্ঞ। ইতিপূর্বে আরবের যেরকম মূর্তিপূজা চলত তারাও ঠিক সে রকম মূর্তিপূজা করে। মূর্তিকেই তারা মনে করে উপাস্য। পৃথিবীতে ইসলাম ধর্ম ও তার বাহক প্রিয় নবী মোহাম্মদ সা. এর আগমনের পূর্বেই এসকল আরব্য লোকগুলি শ্রীলঙ্কায় এসেছিলো ব্যবসা করার জন্য। তারা শ্রীলঙ্কায় ব্যবসা করতে  এসে আর ফিরে যায়নি স্বদেশে। পরবর্তীতে তারা লঙ্কাদ্বীপের স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে যায়। সেখানেই গড়ে উঠে তাদের পরিবার। তাদের মধ্যে যারা অবিবাহিত ছিল তারা লঙ্কা দীপের রমণীদেরকে বিবাহ করে। এবং সুখে শান্তিতে নিজেদের দাম্পত্য জীবন অতিবাহিত করতে লাগল। তাদের থেকে জন্ম গ্রহণ করে সন্তান সন্ততি। আর তারা লঙ্কা দ্বীপের হাওয়া বাতাসেই বড় হয় এবং পরবর্তীতে তাদের দ্বারাই লঙ্কা দীপে বিস্তার লাভ করে আরব পরিবার। তারা যেহেতু আরবী লোক ছিলো তাই তারা আরবী রীতি অনূযায়ী মূর্তি পূজা করত। এবং এটাকেই তারা ইবাদত মনে করত। [চলবে]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight