ধারাবাহিক উপন্যাস : কিশোরীর হাতের রক্তের চিঠি

পূর্ব প্রকাশিতর  পর…
আবুল হাসানদের জাহাজটিও ঢুকলো সিন্ধু রাজ্যের সমুদ্রসীমায়। আর এটা জানতে বাকি রইলনা সিন্ধুরাজা দাহিরের। যখন শুনতে পারলো যে এরা মুসলমান, হজ্জে যাচ্ছে, শুনে তার মাথা আরো খারাপ হয়ে গেল। তার পোষা কুকুরগুলোকে পাঠালো সমুদ্রপৃষ্ট থেকে এদের ধরে নিয়ে আসতে। ডাকাত সৈন্যরা জাহাজটিকে নজরদারিতে রাখলো। যেই জাহাজটি ঘাটে ভিরল, ডাকাত দল জাহাজটিকে আটক করল। আবদ্ধ করল মুসলমানদেরকে। তাদের ধরে নিয়ে এলো রাজার কাছে এবং তাদের সমুদয় মালামাল ধনসম্পদ লুণ্ঠন করলো রাজা দাহির। আর মুসলমানদের বন্ধি করলো তার কারাগারে। মুসলমানরা যেহেতু  হজ্জে যাচ্ছে, বলাই বাহুল্য তারা নিরস্ত্র। কিছুই করার ছিল না আবুল হাসানদের। বন্ধ হয়ে গেল লঙ্কাদীপের মুসলমানদের হজ্জ যাত্রা। শুরু হলো আবুল হাসানদের অনিশ্চিত বন্ধি জীবন। কারণ এ তো হলো বাদশা র্কতৃক কারাবদ্ধ, এখানে তো মামলা মোকাদ্দমা চলবেনা। সত্যি কি অবাক এক সময় ছিল তখন! অন্যায় ভাবে বন্ধি হয়ে গেল লঙ্কা দ্বীপের হজ্জ যাত্রীরা। কিন্তু বলার কিছু নেই। তার রাজ্যে তার কথাই শিরোধার্য। কারো কিছু বলার অধিকার নেই। এখানে শুধু তার কথাই চলবে। অন্য কারো কথা না, তবে হ্যাঁ, যদি কেউ তার রাজ্যে আক্রমণ করে তার কাছ থেকে রাজ্য ক্ষমতা ছিনিয়ে নিতে পারে তবেই পারবে সেখানে অন্য কেউ নাক গলাতে, নতুবা না। তখনকার সময়ে অবশ্য এক রাজা অন্যের রাজ্যে জোরদখল মূলক হামলা করে বসত। হারলে জান শেষ জিতলে বিজিত রাজ্যের রাজা।
যাহোক পুরাপুরি অন্যায় ভাবেই বন্ধি হয়ে গেল আবুল হাসানদের কাফেলা। তবে তাদের বন্ধিত্বের খবরটা ঠিকই ছড়াতে লাগলো চারপাশে। এভাবে একসময় তাদের কারারুদ্ধের খবর ছড়িয়ে পড়ল ভিবিন্ন মুসলিম দেশগুলোতে। মুসলিম শাসকরা এখবর পেয়ে খুব ব্যথিত হলো এবং এর ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত হলো। প্রথমে খোঁজ খবর নিতে লাগলো বন্ধি মুসলমানদের আত্মীয় স্বজনরা কে কোথায় আছে। সত্যি মুসলমানদের এমনি হওয়া উচিৎ। কারণ আল্লাহর নবী বলে গেছেন, এক মুসলমান আরেক মুসলমানের ভাই, মুসলমানরা সবাই এক  শরীরের মত, শরীরের মধ্যে যেমন একটা হাত ব্যাথিত হলে পুরো শরীরে তার ব্যাথা টের পাওয়া যায় তেমনি, এক মুসলমান ব্যাথা পেলে বিশ্বের যে কোনো প্রান্তে অন্য একজন মুসলমান  সে ব্যাথা আঁচ করতে পারবে এই হলো মুসলমান। আল্লাহর নবী মুহাম্মদ সা. এর প্রকৃত উম্মাত। তাদের বৈশিষ্ট তারা সবাই হাতে হাত রেখে চলে। অথচ এখন এক মুসলমান ব্যাথিত হলে অপর মুসলিমরা হীন স্বার্থের ক্ষাতিরে অট্ট হাসি হাসে। না জানি এমন হলে মুসলমানরা একদিন কোনো হায়েনার লোকমা হবে। যাহোক এভাবে তখনকার মুসলিম বাদশাহ  হাজ্জাজ বিন ইউসুফ খবর নিয়ে জানতে পারল যে, বন্ধি মুসলমানদের ছেলে সন্তান ও আত্মীয় স্বজনরা লংকা দ্বীপে বসবাস করে। সাথে সাথে তিনি লংকা দ্বীপে একজন মুসলিম সেনা পাঠালেন। নাম যোবায়ের। অবশ্য সে আসার আগেই লংকা বাসী জানতে পেরেছিলো যে, তাদের আত্মীয় স্বজনদের হজ্জ কাফেলাটি কোনো এক বিপদে পড়েছে তবে কোন ধরনের বিপদ তা তারা জানতো না। হাজ্জাজ বিন ইউসুফ তাকে বলে দিলেন, তুমি লংকা দ্বীপে গিয়ে তাদের সবাইকে বলে দিবে, হে মুসলমানরা! প্রথমে আমীরুল মুমিনীন হাজ্জাজ বিন ইউসুফের পক্ষ থেকে  আপনাদের কাছে ক্ষমা চাচ্ছি।  আপনাদের দূর্দিনে সাহায্যে দেরি হওয়ার জন্য, তবে একথা সত্য যে, খবর পাওয়ার পর বিন্দুমাত্র দেরি করা হয়নি। আপনাদের আর কোনো চিন্তা নেই। আপনাদের মধ্যে যারা বন্ধি তাদের জন্য পরিপূর্ণ ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। আর আমীরুল মুমিনীন এর পক্ষ থেকে বলে পাঠানো হয়েছে যেন, আপনাদেরকে তার কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। আপনাদের সবাইকে রাষ্ট্রিয় খরচে লালন পালন পড়াশুনা সহ সকল প্রকার সুযোগ সুবিধা দেয়া হবে। আপনারা তাড়াতাড়ি প্রস্তত হয়ে নিন, ও দিকে জাহাজ প্রস্তুত রয়েছে। যোবায়েরের  কথা শুনে ও তার আগমনে লংকা দ্বীপের মুসলমানদের মনে যেন একটু সাহস হলো। ভয়ের অন্ধকারে যেন জোনাকির মত আশার আলো জ্বলতে শুরু করল। তখন যোবায়েরর কথা মত আল্লাহর উপর ভরসা করে সবাই প্রস্তুত হতে লাগলো। প্রস্তুত হলো খালেদ এবং নাহিদাও। খালেদ আর নাহিদার মনও খুব ভারাক্রান্ত। যে মেয়েটির মুখখানি সর্বদা হাসি খুশি থাকতো তার চেহারায় যেন আজ বজ্রপাত হয়েছে। খালেদের অবস্থা আরো খারাপ। মুখ শুকিয়ে গেছে তার। কোনো কথা বলতে পারছেনা সে। সবার ভিতরই কেমন জানি অজানা এক শঙ্কা কাজ করছে। যাহোক তারা সবাই প্রস্তুত হলো। একে একে জাহাজে উঠল সবাই। অল্প বয়সের বাচ্চাদের এবং মহিলাদের বসানো হলো একটি সংরক্ষিত জায়গায়। তাদের সাথে আছে নাহিদা। প্রতিটি প্রাপ্ত বয়ষ্ক মেয়ে বা মহিলাই তাদেরকে আপাদমস্তক ঢেকে রেখেছে বড় চাদর বা বোরকা দ্বারা। যেন আল্লাহর বিধান পর্দার লঙ্ঘন না হয়। তাদের চারপাশে বসা আছে খালেদ সহ অন্যান্য যুবকেরা। লঙ্কা দ্বীপের অধিবাসীরা কেউ জানেনা তাদের গন্তব্য। কোথায় যাচ্ছে বা সেই জায়গা কোথায়। হাজ্জাজ বিন ইউসুফ কর্তৃক পাঠানো সেই যোবায়েরকে পথনির্দেশক মেনে যাত্রা শুরু করল লঙ্কা দ্বীপের লোকেরা। এবার সবাই উঠে পড়েছে জাহাজে। কেউই সামনের রাস্তা চিনেনা। শুধু চিনে যোবায়ের। সেই চালক কে দিক নির্দেশনা দিয়ে সামনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। শুরু হলো লঙ্কা দ্বীপের অসহায় মানুষগুলোর অচিনা গন্তব্যের যাত্রা। সবাই যেন নির্বাক। কারো মুখে তেমন কোনো কথা নেই। সবারই ঠোট নড়ছে। যিকির করছে মনে মনে, আর আল্লাহর কাছে দোআ করছে। আল্লাহ যেন রাজা দাহিরের কাছে আটকা পড়া সবাইকে সহীহ সালামতে ফিরিয়ে দেয়। এভাবে লঙ্কা দ্বীপের দ্বিতীয় কাফেলাটি চলতে লাগল। গন্তব্য হাজ্জাজ বিন ইউসুফের কাছে। সমুদ্রের বুক চিরে চলছে জাহাজ। অথৈ সমুদ্র কোথাও কোনো কুল কিনারা নাই। শুধু জলরাসির অস্তিত্ব। বড় বড় ঢেউগুলো জাহাজে আঘাত করলে মনে হয় যেন জাহাজ কাত করে দিবে। এভাবেই বিশাল সমুদ্রের মাঝে জাহাজ চলতে থাকে আপন গতিতে তার গন্তব্য পথে।    চলবে…..

একটি মন্তব্য রয়েছেঃ ধারাবাহিক উপন্যাস : কিশোরীর হাতের রক্তের চিঠি

  1. সোহানুজ্জামান মেহরান says:

    সুন্দর উপন্যাস উপহার দেওয়া লেখক কে অনেক ধন্যবাদ।আন্তরিক ভালবাসা ও শুভকামনা রইলো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight