ধারাবাহিক উপন্যাস : কিশোরীর হাতের রক্তের চিঠি

Rokter Chiti

আবুল হাসান সম্ভবত তাদের এ মূর্তিপূজা  দেখেই চিনতে পেরেছিলো যে, তারা সকলেই প্রায় আরব দেশের লোক। আবুল হাসান তাদের  এ করুণ অবস্থা দেখে খুবই ব্যথিত হল। সে তাদেরকে দ্বীনি দাওয়াত দিতে শুরু করল। মূলত এমনি হওয়া দরকার সকল মুসলমানদের গুণ। কেননা আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে এ উম্মতে মোহাম্মদীর সম্পর্কেই ইরশাদ করেছেন- তোমরাই শেষ্ঠ উম্মত, মানব জাতির কল্যাণেই তোমাদের সৃষ্টি করা হয়েছে। তোমরা সৎ কাজের নির্দেশ দিবে এবং অসৎ কাজ থেকে মানুষকে নিষেধ করবে এবং নিজে আল্লাহ তাআলার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর। [সূরা আল ইমরান- ১১০] আল্লাহ তাআলা বর্ণিত আয়াতে প্রকৃতপক্ষে সমস্ত উম্মতে মোহাম্মদীকেই শ্রেষ্ঠ উম্মত বলে সম্ভোধন করেছেন। কারণ তাদের ভিতরে সৎ কাজের আদেশ অসৎ কাজের নিষেধ ও দাওয়াতের গুণ আছে। যে আদেশটি আল্লাহর রাসূল সা. দিয়ে গিয়েছেন। তিনি বলেন, তোমরা আমার একটি বাণী শুনলেও তা অন্যের কাছে পৌঁছে দাও। সেমতে আবুল হাসান তার দায়িত্ব কর্তব্য পালনার্থে লঙ্কা দ্বীপে বসবাসকৃত মানুষদের বুঝাতে লাগলো। আবুল হাসান তাদেরকে বলল, হে লঙ্কা দ্বীপের বসবাসকৃত আরব লোকেরা! আরবে এখন আর সেই মূর্তি পূজা নেই। তারা এখন আর কোন মূর্তি বা মাখলুকের সামনে মাথা নত করে সিজদাহ করে না। আরবে একজন সোনার মানুষের আগমন ঘটেছিলো। যাকে আল্লাহ তাআলা নবী ও রাসূল করে পৃথিবীতে প্রেরণ করেছিলেন। তিনি এসে মানুষদেরকে একত্ববাদের দাওয়াত দিয়েছেন। তার দাওয়াতে মানুষ হেদায়াত প্রাপ্ত হয়েছে এবং আল্লাহ তাআলাকে চিনেছে। পবিত্র কাবা শরীফে যে মূর্তিগুলি রাখা ছিলো, সেই মূর্তিগুলি ভেঙ্গে চুরমার করে ফেলা হয়েছে। যারা রেখেছিলো মূর্ত্যগিুলো তারাই আবার এগুলো বের করেছে। আরবগণ এখন মূর্তিপূজা ছেড়ে একমাত্র আল্লাহ তাআলার ইবাদত করে। তারা জাহেলী পথ থেকে ফিরে এসে নূরের পথে প্রবেশ করেছে। খুন রাহাজানি যেখানে ছিলো ভরপুর, সেখানে এখন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ভ্রাতৃত্ব সমাজ। বিশৃঙ্খলা দূর হয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে শৃঙ্খলা। আবুল হাসান লঙ্কা দ্বীপে বসবাসকৃত লোকদেরকে এভাবে বুঝাতে লাগলো, এক সময় তার বুঝানো সফল হল। লঙ্কা দ্বীপের লোকেরা  একত্ববাদের কালিমা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মোহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’ পড়ে মুসলমান হয়ে গেছে। আবুল হাসানের দাওয়াতে একসময় লঙ্কা দ্বীপের মানুষ আল্লাহ ও তার রসূল কে চিনতে পারলো। খুঁজে পেলো দুনিয়া ও  আখেরাত উভয় জাহানে শান্তির সঠিক পথ। আর একারণেই আবুল হাসান আল্লাহ তাআলার দরবারে শুকরিয়া জ্ঞাপন করলো। তারপর আবুল হাসান লঙ্কা দ্বীপের নওমুসলিমদেরকে ইসলামী সকল বিধিবিধান শিক্ষা দিতে লাগলো। আবুল হাসান লঙ্কা দ্বীপের মানুষেদের শিক্ষা দিল, কিভাবে নামায পড়তে হয়, রোযা ও হজ্জ করতে হয়, কোন নিয়মে যাকাত দিতে হয়, ব্যবসা বাণিজ্য ইসলামী নীতিতে কিভাবে করতে হয়। এভাবে ইসলামী সকল বিধিবিধান তাদেরকে আস্তে আস্তে শিক্ষা দিলো। লঙ্কা দ্বীপের লোকজন আবুল হাসানের কাছ থেকে ইসলামের সকল বিষয়গুলি শিখতে পেরে নিজেদেরকে ধন্য মনে করলো এবং তারা সে অনুযায়ী নিজেদের জীবন গঠন করতে লাগলো। আবুল হাসান এক পর্যায়ে লঙ্কা দ্বীপের স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে গেলো। সে লঙ্কা দ্বীপে বাড়ি করে থাকতে লাগলো। আবুল হাসান লঙ্কা দ্বীপে বিবাহও করল। সুখে শান্তিতে দাম্পত্য জীবন অতিবাহিত করতে লাগলো। তাদের সংসারটা হয়ে উঠলো জান্নাতের একটি টুকরা। জান্নাতে যেমন কোন অশান্তি থাকবে না ঠিক আবুুল হাসানের সংসারেও অশান্তির কোন লেশ মাত্রও নেই। একপর্যায়ে আবুল হাসানদের ঘরকে আলোকিত করে জন্ম নিল একটি  পুত্র সন্তান। ছেলে দেখতে খুবই সুুন্দর মনে হয় যেন আবুল হাসানের ঘরে আসমানের চাঁদ নেমে এসেছে। আবুল হাসান ছেলেটির নাম রাখলো খালেদ। খালেদ আস্তে আস্তে লঙ্কা দ্বীপের হাওয়া বাতাসে বড় হতে লাগলো। বছর খানেক পর আবার আবুল হাসানের ঘরে আরেকটি কন্যা সন্তান জন্ম গ্রহণ করল। কন্যা সন্তানটির চেহারাও খুব সুন্দর হয়েছে। মনে হচ্ছে আবুল হাসানের ঘরের বাগানে আরেকটি ফুল ফুটেছে। আবুল হাসান কন্যা সন্তানটির নাম রাখলো নাহীদা। খালেদ ও নাহীদা পিটাপিটি ভাই বোন। তারা দুজন মা বাবার আদর যতœ ও লঙ্কা দ্বীপের হাওয়া বাতাসে বড় হতে লাগলো। আবুল হাসান স্ত্রী সন্তানদেরকে নিয়ে সুখে শান্তিতে বসবাস করতে লাগলো। তার দাম্পত্য সাংসারিক ও পারিবারিক জীবন হলো খুবই সুখময়। শুধু আবুল হাসানের জীবনই শান্তিময় হয়নি। পুরো লঙ্কা দ্বীপের মানুষই সুখে ভাসছে এখন ইসলামের ছায়াতলে এসে। তাদের থেকে দূর হয়ে গেছে সকল অশান্তি। ইসলাম ধর্ম যে শান্তির ধর্ম পৃথিবীতে ইসলাম সত্যিই সুখ শান্তির বার্তা নিয়ে এসেছে তা লঙ্কা দ্বীপের লোকদের দিকে পলক দিলেই বুঝা যায়। অথচ এই তো কিছু দিন আগেও এ দ্বীপে ছিলো প্রচুর অরাজগতা। ব্যবসা বাণিজ্য, খেত ক্ষামার, বাড়ি ঘর নিয়ে ঝগড়া যেন লেগেই থাকতো এই দ্বীপাঞ্চলে। ইসলামের আগমনে ভ্রাতৃত্বের হিমেল হাওয়ায় লঙ্কা দ্বীপ এখন পুরো শীতল চাদরে মোড়ানো। অঘোষিত ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল সমাজে সাম্যের বিধান। ভ্রাতৃত্বের বন্ধন। তাদের মাঝে ধরা দিলো সুখের সোনালি হরিণ। একসময় লঙ্কা দ্বীপের মুসলমানগণ নিয়ত করলো তারা কোন এক বছর হজ্জে যাবে। আবুল হাসানও নিয়ত করলো, সে ও যাবে। হজ্জে যাওয়ার নিয়ত করার পর লঙ্কা দ্বীপের মানুষের মনে অনেক ভাবনা উদয় হলো। কেননা আরব দেশ সম্পর্কে তারা একেবারেই অজ্ঞ। আর যে জিনিস সম্পর্কে জানা থাকে না সে জিনিস সম্পর্কে জানার আগ পর্যন্ত মনে অনেক ভাবনা জাগে। মনের তুলিতে আকতে শুরু করে অনেক ভাবনা। লঙ্কা দ্বীপের লোকদের মধ্যেও এমনি কিছু ভাবনা ঘুরপাক খাচ্ছিল। না জানি আরব দেশ কত সুন্দর। যে দেশে এসেছেন মোহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সা.। নাযিল হয়েছে পবিত্র কুরআন। কি এক উত্তেজনা অনুভূতি। আমরা মক্কা নগরীতে যাবো, হারামাইন দেখব। দেখব নবীর জন্ম স্থান। শিশু নবীর খেলাধূলা করে বেড়ে উঠার জায়গাগুলো। তাওয়াফ করব আল্লাহর পবিত্র ঘর। আর পায়খানা করব নবী করীম সা. এর প্রধান দুশমন আবু জাহেলের বাড়িতে। আবু জাহেল ছিল সবচেয়ে পাপিষ্ট ও নিকৃষ্ট লোক। তাই তার বাড়িটিকেই হাজ্জীদের জন্য পায়খানা বানানো হয়েছে। সব হাজ্জী সাহেবদের একটা বাসনা থাকে ওর বাড়িতে পায়খানা করবে। একটু চেপেচুপে হলেও নবীর দুশমনের আঙ্গীনায় ছাড়তে চায় তাদের ক্ষোব।
ক্রমশ…..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight