ধারাবাহিক উপন্যাস : কায়রাওয়ানী দুলহান[3] ষরযন্ত্রের ঘনঘটা

Upnnas

লিময়া উম্মুল উমারা থেকে বিদায় নিয়ে প্রধান ফটকে গিয়ে  যখন পৌঁছলো ততক্ষণে ঠিকই ফটক বন্ধ হয়ে গেছে। পাহারাদাররা ফটকের কাছেই অস্ত্র নিয়ে পাহারা দিচ্ছে। লিময়া অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে তাদের কাছে গেল। তাদেরকে দ্রুত দরজা খুলে দিতে নির্দেশ করলো। ‘সিজিলমাসার’ অধিপতির কাছে অতিগুরুত্বপূর্ণ এক কাজে শীঘ্রই তার দেখা করার  জন্য যেতে হবে। পাহারাদাররা তার কথা ও তাড়াহুড়া দেখে আশ্বস্ত হয়ে বিলম্ব না করে তখনই ফটক খুলে দিল। কেউ তাকে নওকর হওয়ার ব্যাপারে এতটুকুও সন্দেহ করেনি।
লিময়া ফটক পার হয়েই বাবার খীমার দিকে দ্রুত হাঁটা দিল। রাত ছিল গভীর অন্ধকারে ঢাকা। পথও ছিল জনমানবহীন ভুঁতুড়ে। কিছুদূর এগুতেই সে একটি ছায়া তার দিকে আসতে দেখল। একটু পরই ছায়াটি তার পথ আগলে দাঁড়ালো। ছায়াটি আওয়াজ দিল, কে তুমি?
লিময়া যথাসম্ভব দৃঢ়তা ও স্থীরতার সাথে পুরুষের কণ্ঠে কথা বলার চেষ্টা করলো। সে (মেয়েলি) ভরাট গলায় বললো, আমীরুল মুমিনীনের পক্ষ থেকে ‘সিজিলমাসার’ অধিপতির নিকট দূত হিসেবে যাচ্ছি। ছায়ামূর্তিটি বলল, কিন্তু রাজপ্রাসাদ থেকে তো রাতে কোনো দূত বের হয় না। লিময়া এবার কণ্ঠে (কৃত্রিম) ঝাঁঝ মিশিয়ে বলল, এই ব্যাপারে তুমি নাক গলাবার কে? ছায়ামূর্তিটি, এটি আমার গুরুদায়িত্ব। তুমি কে? এবার লিময়ার স্বরে কিছুটা নমনিয়তা ও জড়তা প্রকাশ পেল। কাপাঁ কাঁপা স্বরে সে জিজ্ঞাসা করল, আপনি কে? ছায়ামূর্তিটি বলল, ভাল কথা। আমি ‘হুসাইন বিন জাওহার’। এবার বলো, তুমি কে?
হুসাইনের পরিচয় পেয়ে লিময়া বড় লজ্জায় পড়ে গেল। কারণ অমন অবস্থায় এবং এ মুহূর্তে প্রথমেই হুসাইনের সাথে একেবারে তার সাক্ষাত হবে-লিময়া তা কল্পনাও করেনি। তার হৃদয়ের স্পন্দন ও ধুকধুকানি বেড়েই চলছিল। হুসাইনকে সে কি বলবে সে খুঁজে পাচ্ছিল না। ফলে সে কোনো কথা না বলে নীরব রইলো। উভয়েই এভাবে কিছুক্ষণ অতিবাহিত হইল। একসময় হুসাইন নিজেই তার কাছে গিয়ে আদেশের সুরে বলল, এই! কী হলো, তুমি হয়তো নিজের পরিচয় দেবে, অন্যথায় আমি কিন্তু তোমার এই মুখোশ খুলে ফেলব!! লিময়া এ কথা শুনে ভীষণ ভয় পেল। সে তখনই তার আসল স্বরে (মেয়েলি) বলল, জনাব! আমি আপনাকে বলতে চাচ্ছিলাম..। এ বলে সে হুসাইন থেকে দূরে সরে গেল।..
হুসাইন তার কথা শুনে জোরে জোরে অনেকক্ষণ হাসলেন, এবং নিশ্চিত হলেন যে, তিনি যার সাথে কথা বলছেন, সে একজন যুবতী।
হুসাইন বলল, এই মেয়ে! তুমি নিজের পরিচয় দিতে অস্বীকার করছো, দাঁড়াও আমিই তোমাকে বলে দিচ্ছি তুমি কে!’মূলত হুসাইন একথা বলে তাকে বাজিয়ে নিতে চাইলো। কারণ, তার সন্দেহ হচ্ছিল যে, মেয়েটি লিময়া’ই।
লিময়া এবার আড়ষ্টকণ্ঠে বলল-সে নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল যে, হুসাইন তাকে চিনে ফেলেছে। আচ্ছা! আপনি আমাকে চিনলেন কিভাবে? ইতোপূর্বে তো আমাকে আপনি দেখেননি!
হুসাইন বলল, কীভাবে চিনলাম, তা মুখ্য বিষয় নয়; আসল কথা হল, তুমি এ সময়ে রাজপ্রাসাদ থেকে একাকী বের হওয়ার ঝুঁকি নিতে গেলে কেন?
লিময়া বলল, এক জরূরী বিষয়ে আব্বার সাথে এখনই সাক্ষাত করা প্রয়োজন ছিল-তাই!
হুসাইন এবার নিশ্চিত হলেন যে, মেয়েটি লিময়া-ই। সে এবার নরম সুরে বলল, আপনি প্রাসাদ থেকে বের হওয়ার আগে যদি অপেক্ষা থাকার নির্দেশ দিতেন, তাহলেই দেখতেন বান্দা আপনাকে খেদমতে হাযির।..
লিময়া : অনেক শুকরিয়া আপনার!
হুসাইন : এখন আপনি অনুমতি দিলে আপনার পিতার তাবু পর্যন্ত এগিয়ে দিতে পারি। আবার আপনার ফেরা পর্যন্ত আমি অপেক্ষা করব এবং রাজপ্রাসাদে আপনাকে নিরাপদে পৌঁছে দেব।..
লিময়া: এজন্যও আপনার অনেক শুকরিয়া! আমি আপনার বীর-বাহাদুরির প্রতি আস্থাশীল। এ বলে লিময়া হাঁটতে লাগল। হুসাইনও তার পিছুপিছু চলল। পথে তারা আর কোনো কথা বলল না। একসময় লিময়া তার পিতার সেনাশিবির এলাকায় পৌঁছে গেল। তখন হুসাইন লুকিয়ে পড়ল। আর লিময়া তার পিতার তাবুতে প্রবেশ করল। তাবুতে ঢুকেই পিতাকে ‘আবু হামেদের’ সাথে আলাপরত দেখতে পেল। পিতা হামদুন তাকে দেখেই চিনে ফেললেন। লিময়াও দৌঁড়ে গিয়ে তাঁর কোলে লুটিয়ে পড়ল এবং পিতাকে চুম্বন করলো। এরপর আবু হামেদকে অভিবাদন জানিয়ে দু’জনের মাঝে বসে গেল।
কিছু সময় যাওয়ার পর লিময়ার পিতা বললেন, বেটি! তোমাকে স্বাগত জানাই। কিন্তু এ অসময়ে তুমি কি মনে করে?.. আবু হামেদ লিময়াকে জবাব দেওয়ার সুযোগ না দিয়ে বলল, আরে কী যে বল, বেটি লিময়া তো বড় মোক্ষম সময়েই এসেছে। মনে হচ্ছে, সে আমাদের পারষ্পরিক ডাক শুনেই এসেছে।’
লিময়া তিরস্কারের সুরে বলল, হুসাইনের সাথে বিয়ের প্রস্তাবে আমার সম্মতি নেওয়ার পূর্বে বাবার রাজি হওয়ায় আমি তাঁর সাথে আলোচনা করতে এসেছি।
আবু হামেদ তখন মৃদু হাসল এবং একটু পরই তার চেহারায় ক্রুর হাসির রেখা ফুটে উঠল। সে বলল, স্বাগতম তোমাকে হে লিময়া!
লিময়া তার কোন উত্তর না দিয়ে পিতার দিকে ফিরে বলল, আচ্ছা বাবা! আপনি তো আমাকে কথা দিয়েছিলেন যে, আমার সম্মতি ছাড়া বিয়ের প্রস্তাবে রাজি হবেন না।..
বাবা হামদুন বললেন, বেটি! আবু হামেদই তোমাকে সব খুলে বলবেন।
এবার লিময়া (অনিচ্ছা সত্ত্বেও) আবু হামেদের দিকে ফিরল। আবু হামেদও সাথে সাথেই বলতে লাগলো, ধন্যবাদ তোমাকে লিময়া। বিয়ের এ প্রস্তাব গ্রহণ তো বরং আমাদের জন্য আনন্দের বিষয়। সমগ্র সিজিলমাসাবাসীর জন্য গৌরবের বিষয়। এমনকি তা সিজিলমাসার সিংহাসনকে রক্ষারও সর্বোত্তম উপায়।’
লিময়া তার কথা শুনে বিস্মিত হলো। তার কথার উদ্দেশ্য সে কিছুই ঠাউর করতে পারল না। সে তার পিতা ও আবু হামেদের দিকে বারবার জিজ্ঞাসুনেত্রে তাকাতে লাগল। পরক্ষণেই সে বলল, তাহলে সালিমের (ফিরে এলে) কী হবে?..
আবু হামেদ বলল, ও! সে তো আমাদের এ সিদ্ধান্তে যারপরনাই খুশী হবে।.. বিশ্বাস করো আজ যদি সালিম আমাদের এ বৈঠকে উপস্থিত থাকতো, তাহলে সেও নির্দ্বিধায় তোমাকে এ প্রস্তাব গ্রহণের আব্দার করতো..। কারণ সে তো এর দ্বারা তোমার এবং আমাদের সকলের কল্যাণ চায়..।
লিময়া এবার বুঝতে পারল যে, তার পিতা ও আবু হামেদ কিছু একটা লুকাচ্ছেন।.. তাই সে পিতার দিকে ফিরে বলল, কিন্তু বাবা!
আবু হামেদ তার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলল, এখনতো তোমার বাবা ও আমীরুল মুমিনীনের মাঝে প্রস্তাবের বিষয়টি চূড়ান্ত হয়ে গেছে। ঐ সিদ্ধান্ত কি এখন আর নাকচ করা সম্ভব?
লিময়া মাথা নিচু করে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে ভাবতে লাগল, তাহলে পরিশেষে তার অনিচ্ছায়ই এই প্রস্তাব নিতে হল। এ কথা ভাবতেই তার গণ্ড বেয়ে দু’ফোঁটা তপ্ত অশ্র“ গড়িয়ে পড়ল..। এরপর সে আবু হামেদের দিকে তাকিয়ে বলল, এতক্ষণ যা শুনালেন, চাচা! আপনার থেকে এমনটি কখনো আশা করিনি..। আমার মন এই প্রস্তাবে একটুও সায় দিচ্ছে না। কারণ (আপনারা পারলেও) আমি আমার প্রতিশ্র“ত ‘বাগদত্ত্বর’ সাথে খেয়ানত (বিশ্বাসঘাতকতা) করতে পারব না।..
আবু হামেদ লিময়ার কাঁধে আলতো চাপড় দিয়ে বলল, তোমাকে তো আমি অত্যন্ত বুদ্ধিমতি ও চৌকস মেয়ে হিসেবে জানি। কিন্তু অবাক হলাম যে, তুমি আমাদের পরিকল্পনা এখনও ধরতে পারনি..। লিময়া! তুমি কীভাবে ভাবলে যে, এ  প্রস্তাব গ্রহণ করলে তুমি সালিম ছাড়া অন্যের জন্য হয়ে যাবে?! এমন তো কখনো-ই হবে না।’
লিময়া তার এই ধাঁধাঁপূর্ণ কথায় হতভম্ব হয়ে গেল। চোখ ছানাবড়া করে আবু হামেদের দিকে তাকিয়ে রইল।’
আবু হামেদ বলল, হ্যাঁ লিময়া, অবশ্যই আমি তোমাকে সবকথা খুলে বলব। তার আগে আমি তোমাকে জিজ্ঞাসা করব: তোমার পিতা একসময় সিজিলমাসার অধিপতি ছিল-তা কি তুমি ভুলে গেছ? তাঁর রাজত্ব ও ক্ষমতার কথা কি তুমি ভুলে গেছ? তুমি কি ভাবছ যে, আমরা তোমাকে ঐ হুসাইন বিন জাওহারের কাছে বিক্রি করে দেব! যার পিতা তোমাদের দেশে অতর্কিত আক্রমণ করে তোমার পিতার মসনদকে টুকরো টুকরো করে দিয়েছে। না লিময়া! তা আমরা কখনো হতে দিবো না। বরং আমরা চাই যে, মুঈযের রাজপ্রাসাদে তুমি আমাদের কাজে সহযোগিতামূলক গুপ্তচরবৃত্তি করবে, যতক্ষণ না তোমার বাবার মসনদ পুনরুদ্ধারের মোক্ষম সুযোগ আসে। আর এরপর তুমিই হবে সিজিলমাসার রানী।’..
লিময়ার তখন একেবারে পরিষ্কার হয়ে গেল যে, তার পিতা ও আবু হামেদ খলীফা মুঈযের বিরুদ্ধে গভীর ষরযন্ত্রের জাল বুনছে। তবে সে শঙ্কিত হলো এ কথা ভেবে যে, স্বয়ং তাকেই আমীরুল মুমিনীনের রাজপ্রাসাদে গোয়েন্দাগিরির জন্য পাঠানো হচ্ছে! সাথে সাথে তার প্রচণ্ড গোস্বা পেল। কিন্তু সে অনেক কষ্টে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করলো। তাদের ষরযন্ত্রের খুঁটিনাটি সব জানতে সে আবু হামেদকে লক্ষ্য করে বলল, এখন বুঝতে পারছি আপনার কথার উদ্দেশ্য কি। আচ্ছা, তাহলে এই মিশন কীভাবে পূর্ণতা লাভ করবে?
আবু হামেদের চেহারায় এবার আনন্দের দ্যুতি খেলে গেল। হামদুনের দিকে -দু’হাত মুচড়াতে মুচড়াতে- বলল, আমি বলিনি যে, আল্লাহ তাআলা তোমাকে অসাধারণ বুদ্ধিমতি ও গুণবতি এক মেয়ে দান করেছেন। সে-ই আমাদের মিশনে সর্বাধিক সাহায্য করতে পারবে।’
এরপর আবু হামেদ লিময়ার দিকে ফিরে বলল, হ্যা, বিষয়টি একেবারে সহজ। কায়রাওয়ানের শাসক ও তার সেনাপতির হাত থেকে রেহায় পেতে এমন এক পরিকল্পনা নিয়েছি, যার ফলে সমগ্র আফ্রিকায় কেউ আর আমাদের গতিরোধ করতে পারবে না।’ এখন তুমি শুধু এই প্রস্তাবটুকু গ্রহণ করে নাও..। তবে নিশ্চিত থাক, বিয়ের আক্দ (বিয়ের অনুষ্ঠান) পূর্ণ হওয়ার আগেই মুঈয, সেনাপতি জাওহার ও তার ছেলে হুসাইন- তিনজনেরই প্রাণবায়ু উড়ে যাবে।
লিময়া এতটুকু শ্রবণ করে আতঙ্কে চোখ দুটো বন্ধ করে ফেলল। কারণ সে কল্পনাও করেনি যে, তাদের ষরযন্ত্র এ পর্যন্ত গড়াবে। তারপরও সে নিজেকে সম্বরণ করে বলল, কিন্তু এটি কি খলীফার সাথে আমার গাদ্দারী হবে না। তিনি তো আমাকে তাঁর রাজপ্রাসাদে অত্যন্ত আদর ও মমতা এবং যতেœর সাথে দেখাশুনা করছেন। উপরন্তু তাঁর স্ত্রী আমাকে নিজের মেয়ে হিসেবে গ্রহণ করেছেন। তাঁর সাথেও তো বিশ্বাসঘাতকতা হবে!!’
আবু হামেদ তখন কুটিল হাসি হেসে বলল, বেটি! তুমি কোনটাকে বিশ্বাসঘাতকতা বলছ- অথচ তুমি জান, ‘আবু আব্দুল্লাহ আশশীয়ীর কথা- তার বদৌলতেই ফাতিমীরা এই সালতানাত পেয়েছিলো। কিন্তু ‘আবু আব্দুল্লাহ’র ভাগ্যে কী জুটে ছিলো। তারা তাকে হত্যা করলো। এতটুকুতেই তারা থেমে যায়নি; বরং এই ফাতিমীরা শীয়া অধ্যুষিত কবীলাগুলো এবং বার্বারী প্রদেশগুলোতে অতর্কিত সেনা অভিযান চালিয়ে তাদের বংশের সম্ভ্রান্ত লোকদের নির্বিচারে হত্যা করলো। তাদের ধন-সম্পদ লুণ্ঠন করল এবং তাদেরকে জোরপূর্বক খলীফার আনুগত্বের স্বীকৃত নিল।..
তাদের এ আলোচনার ফাঁকেই লিময়া দেখল যে, তাবুতে মুখোশপরা এক লোক প্রবেশ করছে। লোকটি প্রবেশ করেই লিময়ার পিতার হাতে ঝুঁকে চুম্বন করে আবু হামেদের কাছে গিয়ে তাঁর সাথে মুআনাকা (কুলাকুলি) করল। লোকটির চেহারা ঢাকা থাকায় লিময়া তাকে চিনতে পারছিল না। একটু পরই লোকটি লিময়ার কাছে গিয়ে তার মুখোশ সরিয়ে ফেলল। একি..! সে যে তার সালিম..!!

ক্রমশ
ভাষান্তর: প্রবন্ধিক, শিক্ষাসচীব, আল-মানহাল মডেল কওমী মাদরাসা, উত্তরা, ঢাকা।

2 মন্তব্য রয়েছেঃ ধারাবাহিক উপন্যাস : কায়রাওয়ানী দুলহান[3] ষরযন্ত্রের ঘনঘটা

  1. আল জান্নাত says:

    Onek sundar upannas, Donnabad Lekhok ke.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight