ধারাবাহিক উপন্যাস ; কায়রাওয়ানী দুলহান

পূর্ব প্রকাশিতের পর. ..

মিসর সেনাবাহিনীর মাঝে অন্তর্দ্বন্দ্ব ও ঝগড়া-বিবাদ লিময়ার মধ্যে মুঈয লিদীল্লাহর বাহিনীর সফলতা ও বিজয় সম্পর্কে আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে তুলল। নিজ চোখেই সে দেখল এবং নিজ কানেই শুনতে পেল, দেশের অভ্যন্তরীণ কোন্দল, রাজনৈতিক চরম দ্বন্দ্ব, সেনাবাহিনীর পারস্পরিক হিংসা-বিদ্বেষ এতই ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে যে, ভিনদেশী কোন শত্র“ আক্রমণ ছাড়াই ক্ষমতার মসনদ উল্টে যেতে পারে।
কাফুর সমর্থকরা যখন বের হয়ে গেল, শাহজাদী যায়নাব বিনতে ইখশীদ লিময়ার দিকে ফিরে বলতে লাগলেন, দেখলে তো ওদের মত নির্বোধ আর আছে! হায় আফসোস, এমন হলে আমরা শত্র“র সাথে লড়বো কী করে?! আমরা তো তাদের সাথে যুদ্ধ করতে পারব না।
লিময়া এবার সুযোগ পেয়ে বলল, আমার কষ্ট হচ্ছে আমার মনিব। আপনি কেন সত্য কথাটা বলতে গেলেন। হায় আপনার কথা যদি মিথ্যা হতো!
এবার শাহজাদীর স্বরে অনুতাপ ফুটে উঠল। তিনি বলতে লাগলেন, না না আমি ভুল বলেছি। আমি তা স্বপ্নেও কল্পনা করতে চাই না। না না আমি চাই না ভিনদেশী শত্র“ আমাদের দেশ আক্রমণ করুক আর আমরা তাদের গোলামী করি; তা কখনো হতে পারে না!
শাহজাদী নিজের ভুল বুঝতে পারল যে, কাফুরীদের সাথে সদয় আচরণ করা উচিত ছিল তার। একটু আগে তাদেরকে যা বলেছেন, তা ভুল ছিল। এমন পরিস্থিতিতে দুর্বল ও সংকীর্ণমনা লোকেরা যা করে, শাহজাদী তা-ই করলেন। নিজের দোষ অন্যের ঘাড়ে চাপাতে ব্যর্থ চেষ্টা করলেন। ফলে শাহজাদী ইখশীদের লক্ষ্য করে বললেন, এরা তখনও কাফুরীদের উত্থাপিত বিষয়ে আলোচনা করছিল, ‘শোনো! তাদের সাথে তোমাদের অমন কঠোর আচরণ করা উচিত হয় নি। কারণ এরা তো তোমাদেরই ভাই। যুদ্ধের ময়দানে তারাই আমাদের ভরসা। অথচ এখন তো এদেরকে তোমরা ক্ষেপিয়ে তুলেছো। তারা এখন আর তোমাদের কোন সাহায্য করতে এগিয়ে আসবে না।
এক ইখশীদী তখন বলল, জনাবা! আপনি এর দায়ভার আমাদের ওপর চাপাচ্ছেন? অথচ আপনিই তো শুনলেন, ওরা আমাদেরকে, আপনাকে এবং পুরো ইখশীদি পরিবারকে কীভাবে অপমান করেছে? এবার আপনি যেমনটি চেয়েছেন, তা-ই হবে। আমরা হয় তো আমীর আহমদের স্বল্প বয়স সত্ত্বেও তার হাতে বায়আত নিয়ে ভুল করেছি। তবে এটি তো করেছি কেবল আপনাকে সাহায্য করার জন্যই। এখন যদি আমাদেরকে আপনার কোন কাজের যোগ্য মনে না করেন, তাহলে তো আমাদের এখানে থেকে লাভ নেই; তাই আমরা চলে যাচ্ছি। এ বলে সে কক্ষ থেকে বেড়িয়ে গেল। তার সাথীরাও অনুসরণ করে কক্ষ ত্যাগ করল।
এ অবস্থায় শাহজাদী বিনতে ইখশীদ আরও সংকীর্ণতা ও একাকীত্বে পড়ে গেলেন। তার মনে হতাশা ছড়িয়ে পড়ল এবং চোখেমুখেও বিষণœতার ছাপ দেখা গেল।
লিময়া তাঁর এই পরিবর্তন ও নড়াচড়া সবই প্রত্যক্ষ করছিল। তাঁর মনের অবস্থা আরও পরখ করার জন্য বলল, জনাবা! কী হলো! আপনাকে অনেক বিষণœ ও চিন্তিত দেখছি? আপনি কী ওদের কথায় ভেঙে পড়েছেন!?
শাহজাদী তখন দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, আহ! সালামাহ! ওদের কথার কারণে নয়। আমাকে সবচে’ বেশি পীড়া দিচ্ছে, তারা যে নিজেদের পরিণতি ও জাতির ক্রান্তিলগ্ন নিয়ে এতটুকু ভাবে না- এই অবস্থা দেখে।
এরা পরস্পরে প্রতিদ্বন্দ্বি হয়ে এবং একে অপরের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে আমার কক্ষ থেকে বেড়িয়ে পড়েছে। অথচ তারা আমাদের হাত, আমাদের বাহু, আমাদের সৈনিক, আমাদের শক্তি, তারাই আমাদের প্রাণ। এখন আমরা কাদেরকে নিয়ে শত্র“র সাথে লড়বো? সন্ধিও করতে পারছি না, যুদ্ধ করারও সামর্থ নেই। হায় এখন কী হবে আমাদের!! এটুকু বলতেই তার চোখ অশ্র“তে টলমল করতে লাগল।
লিময়া তখন আবেগাপ্লুত হয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেল। শাহজাদীর প্রতি তার অনেক মায়া হল। বলল, জনাবা! আপনি ঘাবড়াবেন না। আপনার কিছুই হবে না।
শাহজাদী তার এই মায়া জড়ানো কথায় কিছু সান্ত্বনা খুঁজে পেয়ে বললেন, আমার আশংকার কিছু নেই কীভাবে? শত্র“রা যদি  বাস্তবেই শক্তিশালী হয়ে থাকে এবং তারা বিজয়ী হয়; তবে আমার সাথে তারা কীরূপ আচরণ করবে?
লিময়া বলল, না জনাবা! আপনার কিছুই হবে না!
শাহজাদী বললেন, বিষয়টি তুমি এত হালকাভাবে নিয়ো না।
– হ্যাঁ, বিষয়টি আমার কাছে হালকা-ই মনে হচ্ছে। সর্বোপরি বিজয়ের ব্যাপারে আপনার এমন হতাশ হওয়া উচিত নয়। তারপর আল্লাহ না করুন, শত্র“রা যদি আমাদের দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে বিজয়ী হয়ও। তদুপরি আপনি সম্পূর্ণ নিরাপদে থাকবেন। কারণ, ওই মরক্কোবাসীরা যদিও তারা আপনাদের শত্র“। কিন্তু আপনাদের প্রতি তারা আপনাদের ওইসব বিদ্রোহী ও উদ্ধত সৈনিকদের চেয়ে অধিক সহানুভূতিশীল।
এ পর্যায়ে এসে শাহজাদীর কণ্ঠস্বরে একটু রূঢ়তা ও ঝাঁঝ পরিলক্ষিত হল। তিনি বললেন, তুমি তা বুঝলে কী করে?
লিময়া বলল, অনেক যাচাই-বাছাই ও চিন্তাভাবনার পরই তা অনুধাবন করতে সক্ষম হয়েছি। কারণ আপনি তো জানেন যে, আমি মরক্কোর অধিবাসি। কায়রাওয়ানবাসীদের সাথে আমার প্রথম মনিবের গভীর সম্পর্ক ছিলো। মুঈয লিদীনিল্লাহ ও তাঁর প্রধান সেনাপতি জাওহারের সাথেও তার ভাল পরিচয় ছিলো। আমিও তাদের কথাবার্তা, আচার-আচরণ প্রত্যক্ষ করেছি। এতে আমার মনে হয়েছে যে, তারা আপনার ওই সৈনিকদের তুলনায় অনেক কল্যাণকামী।
শাহজাদী তার কথার মাঝেই বলে উঠলেন, তুমি কী মুঈয ও তার সেনাপতিকে চেন?
লিময়া বলল, হ্যাঁ জনাবা। আমি এই দু’জনকে ভালভাবেই চিনি এবং তারাও আমাকে জানেন।
শাহজাদী এই তথ্য পেয়ে অত্যন্ত প্রীত হলেন এবং লিময়ার প্রভাব ও বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কে তার ভাল ধারণা হল। ফলে শাহজাদী আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে কিছু বলতে উদ্যত হয়ে চেয়েছিলেন, কিন্তু লজ্জা ও আত্মসম্মান তাতে বাঁধ সাধল।
তবে লিময়া তা বুঝে নিয়ে তৎক্ষণাত বলল, আমার মনিবা! আমি স্বল্পসময়ে আপনার স্নেহ, মায়া-মমতা, আদর ও ভালোবাসা পেয়েছি; তার দাবীও আপনার কল্যাণার্থে আমি কিছু করি। আপনি অনুমতি দিলে একটি কথা বলতে পারি।
শাহজাদী বললেন, বলো!
লিময়া বলল, এখন তো আপনারা মরক্কোবাসীদের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত। আবার এখন শুনতে পেলাম। ইবনুল ফুরাত নাকি সন্ধির চেষ্টা চালাচ্ছে। সে যদি সফল হয়, আমি আপনাকে নিশ্চয়তা দিতে পারি যে, আপনি অত্যন্ত সম্মান ও মর্যাদার সাথে থাকবেন। কারণ, খলীফা মুঈযপতœী উম্মুল উমারাকে আমি ভাল করেই চিনি। তিনি অত্যন্ত গুণবতী ও দয়াবতি। তিনি আমাকে অনেক মহব্বত করেন।
আর যদি ইবনুল ফুরাত সন্ধিস্থাপনে সফলও না হয়, যুদ্ধের আগুন জ্বলে উঠে এবং মিসরীরা বিজয়ী হয়; তাহলেও আপনি সম্মান ও শ্রদ্ধার পাত্র হয়েই থাকবেন। তবে মিসরীরা পরাজিত হলে আমি জানবাজি রেখে আপনার ইজ্জত, আব্র“ ও ধন-সম্পদ হেফাযত করব। আপনি এ ব্যাপারে একটুও বিচলিত হবেন না।
শাহজাদী যায়নাব বিনতে ইখশীদ তার এই প্রতিশ্র“তি শুনে যারপর নাই খুশি হলেন। কিন্তু পূর্বে তিনি (অনুরোধমূলক) যা বলেছেন এর জন্য নিজেকে ছোট মনে হল এবং মনে মনে নিজেকে তিরস্কার করতে লাগলেন। লিময়া তাকে দুর্বল ও ভীরু ভাবতে পারে এ আশংকায় তিনি বললেন, ‘তবে বিজয় ইনশাআল্লাহ আমাদেরই হবে।
লিময়া বলল, বিজয় আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে। তিনি যাকে চান তাকেই বিজয় দান করেন। কিন্তু আমি শুধু আমার সাধ্যমত আপনার খেদমতের কথা বলেছি। ফয়সালা ও তাওফীক তো আল্লাহ তা‘আলাই দিবেন।
এ কথা শুনে শাহজাদী তাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন এবং বললেন, হে আমার  স্নেহধন্য! এ মুহূর্তে তোমার মতো একজনকেই আমার প্রয়োজন ছিল। আল্লাহ তা‘আলার অসংখ্য শুকরিয়া।
*  *  *  *  *  *
সূর্য্য তখন অস্তপ্রায়। শাহজাদী লিময়াকে নিয়ে জানালা দিয়ে নীলনদের অপরূপ দৃশ্য উপভোগ করছিলেন। হঠাৎ লিময়ার দু’চোখ একটি কিশতির ওপর আটকে গেল। কিশতিটি খুব দ্রুতগতিতে এদিকেই আসছে। যাত্রীরা কে হতে পারে ভাবতে ভাবতেই দেখল যে, কিশতির আরোহী কয়েকজন। তাদের মাঝে আবু হামেদ এবং সালিমও আছে। ওদের কথা মনে পড়তেই তার ভিতর প্রচণ্ড মোচড় দিল। কিন্তু বহুকষ্টে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করল।
এদিকে শাহজাদিও কিশতিটি দেখিয়ে বললেন, ওদের গতিবিধি দেখে মনে হচ্ছে, এরা আমাদের সাথে সাক্ষাত করার জন্যই আসছে। কিন্তু এখন আমি কারও সাথেই সাক্ষাত করতে প্রস্তুত নই। কারণ ওইসব কুলাঙ্গার অফিসাররা আমার মন-মেজায বিগড়ে দিয়ে গেছে।
লিময়া বলল, মনিবকে যদি পরামর্শ দেওয়ার কোন অধিকার থাকত আমার, তাহলে আমি এ পরামর্শ দিতাম যে, ওদের সাথে সাক্ষাত করতে কোন সমস্যা নেই। হয়তো বা তাদের কাছে নতুন কোন সংবাদ রয়েছে।
শাহজাদী আপ্লুত হয়ে বললেন, তুমি তো অত্যন্ত বুদ্ধিমতি ও চৌকস মেয়ে। হায় তোমাকে যদি আমি আরও আগে কাছে পেতাম।

একটু পরই দাড়োয়ান এসে মরক্কোর দু’জন নেতৃত্বস্থানীয় লোকের সাক্ষাতের জন্য অনুমতি চাইল। লিময়া বুঝতে পারল যে, এরা আবু হামেদ ও সালিম ছাড়া আর কেউ না।
শাহজাদী পর্দা ফেলে দিয়ে তাদেরকে আসার অনুমতি দিলেন।
লিময়া ওদের মুখ থেকে বন্দি হুসাইন সম্পর্কে নতুন কোন সংবাদ শুনার জন্য অধীর হয়ে অপেক্ষা করতে লাগল।
আবু হামেদ ও সালিম কামরায় প্রবেশ করে অভিবাদন জানাল। শাহজাদী তাদেরকে বসতে বলে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমাদেরকে আমাদের দেশে স্বাগতম। তোমরা কোত্থেকে এসেছ?
আবু হামেদ বলল, মোহতারামা, আমরা মরক্কোর অধীন সিজিলমাসা অঞ্চলের আমীর পর্যায়ের লোক। উবায়দিরা আমাদের দেশ জয় করলে তারা আমাদের ওপর সীমাহীন নির্যাতন চালায়। তাদের নির্যাতনে অতীষ্ঠ হয়ে আমরা আপনাদের দেশে এসেছি ইখশীদিদের ছায়াতলে এবং তাদের তত্ত্বাবধানে থাকার জন্য।
শুনতে পেলাম আমাদের ও আপনাদের শত্র“ জাওহার সিকিল্লী মিসর আক্রমণের জন্য বিশাল বাহিনী নিয়ে এগিয়ে আসছে। এদিকে শুনলাম যে, উজীর ও উর্ধ্বতন অফিসারদের মাঝে চরম মতবিরোধ ও দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে। যা তাদের ঐক্য এবং পারস্পরিক বন্ধুত্বে অনেক বড় ফাটল সৃষ্টি করেছে। আমাদের এখানে আসার পিছনে একটি মহৎ উদ্দেশ্য এটিও যে, আমরা তাদের মাঝে সমঝোতা সৃষ্টি এবং তাদেরকে পরস্পরের ভ্রাতৃত্ব বন্ধনে আবদ্ধ করতে চেষ্টা চালাব। যেন তারা বিজয় লাভ করে এবং জাওহার ও তার বাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে দেশত্যাগে বাধ্য করতে পারে।
আর আমাদের এ মিশনে আমরা সফল হবো বলে আমি আশাবাদী। কারণ, আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র রয়েছে, যা আমাদের এ মিশনে কার্যকরী ভূমিকা পালন করবে। আবু হামেদ যখন শেষোক্ত বাক্যটি উচ্চারণ করল, তখন লিময়া কানখাড়া করল।
শাহজাদী জিজ্ঞাসা করলেন, ‘গুরুত্বপূর্ণ নথি’ বলতে কী বুঝাতে চাচ্ছেন?
আবু হামেদ হাত মুচড়াতে মুচড়াতে বলল, জাওহারের একটি তরুণ ছেলে আছে। তার নাম হুসাইন। আমরা সিজিলমাসার নিকটবর্তী একটি জায়গায় প্রচুর পরিমাণ অর্থসম্পদ লুকিয়ে রেখেছিলাম। উদ্দেশ্য ছিল, এ অর্থ ব্যয় করে আমাদের দেশ পুনরুদ্ধার করতে পারবো। কিন্তু এই হুসাইন আমাদের অনুপস্থিতির সুযোগে তা হস্তগত করার মানসে অভিযান চালায়। তবে আমার লোকেরা তার অভিলাস পূর্ণ হওয়ার আগেই তাকে গ্রেফতার করে এবং হাতকড়া পরিয়ে আমাদের কাছে পাঠিয়ে দেয়। আপনি চাইলে আমরা ওকে এখানেই হাযির করতে পারি.্ তাকে আপনি পণবন্দি হিসেবে রেখে তার পিতা জাওহারকে হুমকি দিতে পারেন। হয়তো এর দ্বারা জাওহারের মিসর বিজয়ের মনোবাঞ্চায় ভাটা পড়বে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight