ধারাবাহিক উপন্যাস : কায়রাওয়ানী দুলহান, ভাষান্তর : নাজীবুল্লাহ ছিদ্দীকী

Upnnas

লিময়ার যখন জ্ঞান ফিরলো, আকাশ ততক্ষণে অন্ধকার হয়ে এসেছে। আকাশে তারকারাজি মিটমিট করছে। সে উঠে বসার চেষ্টা করল। পায়ের গোড়ালিতে ব্যথা অনুভব করল। হাত দিয়ে পরীক্ষা করে আশ্বস্ত হলো যে, গোড়ালি ভাঙ্গেনি। মনোবল শক্ত করে সে উঠে বসল। অনুভব করল যে, তার ঘাড় দিয়ে কী যেন বেয়ে পড়ছে। হাত দিয়ে দেখল, রক্ত..। বুঝতে পারল যে, তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে..। মনে দৃঢ়তা ও অবিচলতা এনে লিময়া গর্ত থেকে বের হল। রক্তগুলো সে কাপড় দিয়ে মুছতে লাগল।..
ইত্যবসরে সে দ্রুতধাবমান কয়েকটি অশ্বের ক্ষুরধ্বনি শুনতে পেল। লিময়া পেছন ফিরে দেখল অনতিদূরেই কয়েকটি অশ্বারোহীর ছায়ামূর্তির দেখা যাচ্ছে। সংখ্যা তাদের দশের চেয়েও অধিক হবে। মনে মনে ভাবছিল যে, সে তাদের কাছে সাহায্য চাইবে। কিন্তু একটু পরেই তাদের একজনকে বলতে শুনল, ‘সে অবশ্যই মারা গেছে। কারণ, তার ঘোড়া মারা গেছে।’..
এতটুকু শুনেই লিময়া হামাগুড়ি দিয়ে  ধীরে ধীরে আবার গর্তে ফিরে এল। যেন ওরা তাকে দেখতে না পায়। অশ্বারোহীরা তার প্রায় কাছাকাছি চলে এসেছিল। এরপর সে আবু হামেদের কণ্ঠস্বরের মত একজনকে বলতে শুনল, ‘আমার কৌশল সফল হয়েছে। আমার গোপন রহস্য ফাঁস হয়ে যাওয়ার প্রধান শত্র“টি ‘আত্মপ্রবঞ্চিত লিময়া’কে হত্যা করলাম। আশা করি বাকীরাও শীঘ্রই তার কাতারে শামিল হবে। তারা হলো, খলীফা, সিপাহসালার (জাওহার) ও তার পুত্র হুসাইন। আর ‘ভীরু হামদুন’(?) তাকে তো প্রথমেই মেরে ফেলা হবে।’..
এবার লিময়া নিশ্চিত হল যে, এ লোকটি আবু হামেদই। সে-ই এই চক্রান্ত করেছে। তারপরই মনে হল ঐ নওকরের কথা, যে তার ঘোড়াকে স্পঞ্জ শুঁকিয়ে ছিল। এরপর আবু হামেদ থেকে এ মাত্র যা শুনলো তার ভয়াবহতা চিন্তা করতেই লিময়ার দু’চোখ বন্ধ হয়ে এল এবং হৃদস্পন্দন ভীষণ বেড়ে গেল ।..
এসময়েই সে দেখল একটি ঘোড়া বিদ্যুৎগতিতে ছুটছে। আবু হামেদের অশ্বারোহীরা তার গতিরোধ করল। তারা তার  গন্তব্য সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে সে বলল, ‘মিসর থেকে এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা নিয়ে সে কায়রাওয়ানের আমীরুল মুমিনীনের কাছে যাচ্ছে।’
আবু হামেদ তার কাছে গিয়ে চিঠিটি দিতে বলল। লোকটি এবলে তা প্রত্যাখ্যান করল যে, তাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে ‘চিঠিটি যেন খলীফা ছাড়া অন্য কারো হাতে হস্তান্তর না করা হয়। সর্বোপরি চিঠিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিধায় বলা হয়েছে, খলীফা  যদি ঘুমিয়েও থাকেন তাহলে আমি যেন তাঁকে জাগিয়ে চিঠিটি তাঁর হাতেই অর্পণ করি।’
আবু হামেদ তার অশ্বারোহীদেরকে ইশারা করলে তারা লোকটিকে ঘেরাও করে বেঁধে ফেলে। তারা তার কাপড়চোপড় তল্লাশি করল। কিন্তু তারা চিঠিটির খোঁজ পেল না। লোকটি চিঠিটিকে অত্যন্ত নিপুণভাবে তার কাপড়ের ভাঁজে লুকিয়ে রেখেছিল।..
তারা চিঠিটি না পেয়ে ক্রদ্ধ হয়ে তাদেরই একজন তরবারীর আঘাতে লোকটির মাথা দেহ থেকে আলাদা করে ফেলল..।
আবু হামেদ হত্যাকারীকে লক্ষ্য করে বলল, এই লোকটির সততা ও দৃঢ়তা দেখে চিঠিটির ব্যাপারে আমার কৌতূহল ও সন্দেহ হচ্ছে..। তাই তুমি তাকে ভাল করে তল্লাশিচালিয়ে আমাদের সাথে এসে মিলিত হবে।’ আদেশ দিয়ে আবু হামেদ বাকী সাথীদের নিয়ে ঘোড়া ছুটাল।..
এবার ঐ হত্যাকারী অশ্বারোহীটি তরবারী বালিতে গেঁথে নিহত ব্যক্তিটিকে উল্টেপাল্টে তার কাপড়ের ভিতরে-বাইরে চিঠিটি খুব ভাল করে খুঁজতে লাগল।..
লিময়া কালবিলম্ব না করে গর্ত থেকে বের হল। এবং অতিসন্তর্পণে এগিয়ে তরবারিটি হাতে নিয়েই ক্ষিপ্রগতিতে লোকটির মাথায় আঘাত করল। ফলে তখনই সে নিহত পত্রবাহকের পাশেই রক্তে গড়াগড়ি খেতে লাগল।..লিময়া নিহত পত্রবাহকের কাপড়ে চিঠিটি খুঁজতে লাগল এবং একসময় সে তা পেয়েও গেল।..
লিময়া চিঠিটি পেয়ে একমুহূর্তও দেরি করল না..। হত্যাকারী অশ্বারোহীর ঘোড়া নিয়ে সে তখনই সিজিলমাসার সেনাশিবিরের দিকে রওয়ানা দিল..।
*****
এদিকে হামদুনের সেনাশিবিরে গুজব রটে গিয়েছিল যে, লিময়া ঘোড়ায় চড়ে নিজেই লাগাম ঢিল করে দেয়। এবং ঘোড়া নিয়ে সে নিজেই মরুভূমির গহীনে হারিয়ে যায়।.. এখন আর তার নিরাপদে ফিরে আসার সম্ভাবনা নেয়।..
******
মাগরিবের ওয়াক্ত যখন ঘনিয়ে এল। হামদুন খলীফাকে বিশেষ দস্তরখানে রাতের খাবারের আমন্ত্রণ জানালেন। এরপর মোমবাতি জ্বালানো হল। সকল শামিয়ানার নিচে ধূপ দেওয়া হল।.. দস্তরখানে রকমারি সুস্বাদু খাবার সাজিয়ে রাখা হল..।
খলীফার দস্তরখানেই সিপাহসালার জাওহার ও ছেলে হুসাইন বসলেন।.. হামদুনও তাঁদের সাথে বসলেন..। খাবার পরিবেশন করা হল..। দক্ষ রাধুনির নিপুণ হাতের রান্নায় খাবার অত্যন্ত মজাদার ও সুস্বাদু হয়েছিল..। সকলেই রান্নার ভূয়সী প্রশংসা করল। এমনকি স্বয়ং খলীফাও খাবারের প্রশংসা না করে পারলেন না।
হামদুন তখন আনন্দে আত্মহারা হয়ে গদগদ কণ্ঠে পাশে দাঁড়ানো এক বাবুর্চির দিকে ইশারা করে বললেন যে, জাহাপনা! সব কৃতিত্ব ওর..। বন্ধু আবু হামেদ গতকালমাত্র তাকে কিনে এনেছে। এই দস্তরখানের খাবার রান্না করার জন্য ওকেই আমি দায়িত্ব দিয়েছিলাম..।’
*****
ওদিকে আবু হামেদ এ বাবুর্চিকেই নিপুণভাবে তৈরী এক ধরনের বিশেষ শরাবের মধ্যে বিষমিশ্রিত করার জন্য দায়িত্ব দিয়েছিল। এ শরাব খলীফা, জাওহার, হুসাইন এবং হামদুনকে পরিবেশন করারও নির্দেশ দিয়েছিল..। আর সে এর বিনিময়ে তাকে আকর্ষণীয় পুরস্কারের প্রলোভন দেখায়..।’     ক্রমশ….

একটি মন্তব্য রয়েছেঃ ধারাবাহিক উপন্যাস : কায়রাওয়ানী দুলহান, ভাষান্তর : নাজীবুল্লাহ ছিদ্দীকী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight