ধারাবাহিক উপন্যাস : কায়রাওয়ানী দুলহান (ভাষান্তর : নাজীবুল্লাহ ছিদ্দীকী)

Upnnas

বন্য উপত্যকায় :
(মূল : জুর্জি যীদান
ভাষান্তর : নাজীবুল্লাহ ছিদ্দীকী)
বিয়ের আর একদিন বাকী। আবু হামেদ তার অশ্বে আরোহণ করে দ্রুতগতিতে ঘোড়া ছুটাল। মরুভূমিতে হারিয়ে গেল। সূর্য তখন উত্ত্বপ্ত কিরণ ছড়াচ্ছিল। তবে আবু হামেদের গায়ে কোনো তাপ অনুভব হচ্ছিল না। কয়েকঘণ্টা ব্যাপী সে আপন গতিতে চলল। একসময় তার ঘোড়া একটি বড় পাহাড়ের কাছে এলো। এ পাহাড়ে অনেক গুহা। আবু হামেদ তার ঘোড়া নিয়ে বড় একটি গুহার দিকে চলল। গুহার মুখে এসে বিশেষ ধরনের কাশি দিল। তখন সে আওয়াজ শুনতে পেল, হে মাসউদ! ভেতরে এসো।’
আবু হামেদ ঘোড়া থেকে নেমে গুহায় ঢুকে পড়ল। চলতে চলতে সে হিংস্রপ্রাণীতে ভরা এক জায়গায় এসে থামল। এখানে সেখানে বড়-ছোট ভয়ঙ্কর সাপ ঘোরাফেরা করছে। টিকটিকিও দৌঁড়াদৌঁড়ি করছে। তন্মধ্যে একটি ছিল বিরাটকায় সাপ। একটি গাছের কাণ্ডে সাপটি পেঁচিয়ে ডানে বামে তাকাচ্ছে। আর মাঝে মাঝে পিলে চমকানো হিসহিস শব্দ করছে। আবু হামেদ যদি না জানতো যে, এগুলো সবই জাদুর তেলেসমাতি। এগুলো কোনো ক্ষতি করতে পারে না। তাহলে সে এক কদমও অগ্রসর হওয়ার সাহস করতো না।’
সে হাঁটতে লাগল। একসময় সে পাথরে খোঁদায় করা এক অন্ধকার কুঠরীতে এসে থামল। কুঠরীর মাঝখানে একটি তাকিয়া। তখন আবার আওয়াজ শুনলো, ‘মাসউদ’ সামনে বাড়। কুঠরীতে প্রবেশকরে দেখল যে, শুভ্রকেশী এক বৃদ্ধা ঐ তাকিয়ায় আসন পেতে বসে আছে..। তার গায়ে অদ্ভূত ধরনের বিভিন্ন রঙের পোষাক। তার চুলগুলো বরফের মত সাদা। চুলগুলো স্ফীত হয়ে জট বেঁধে গেছে। কুশ্রী চেহারায় দু’টি চোখ কোটরাগত। কানে দুলছে বিভিন্ন আকৃতির হাতির দাঁত ও পাতের তৈরি দুল।.. কব্জিতে তামার চুড়ি..। ভল্লুকের চামড়ায় বসে কোলে বড় এক আজদাহা সাপ নিয়ে খেলা করছে..।
আবু হামেদ যখন ঢুকল। বৃদ্ধাটি খসখস ও বিশ্রি আওয়াজে বলল, ‘এবার তো তুমি অনেক দেরী করে ফেললে।’ এরপর সে আবু হামেদকে তার পাশে রাখা একটি তাকিয়ায় বসতে ইশারা করল। আবু হামেদ বসতে বসতে বলল, আমি আমার সেই কাজে ছিলাম। আপনি তো তা ভাল করেই জানেন।’
বৃদ্ধাটি বিড়বিড় করে কী যেন আওড়াল। এরপর আবু হামেদকে লক্ষ্য করে বলল, ‘মাসউদ! তোমার বিজয় অত্যাসন্ন!’ বৃদ্ধা আবু হামেদকে সর্বদা এ নামেই ডাকত। আবু হামেদ এ সুসংবাদ শুনে আনন্দে উদ্বেলিত হল। এবং তৎক্ষণাৎ সে পকেট থেকে একটি দিরহাম ভর্তি একটি পুটলি বের করে বৃদ্ধার সামনে পেশ করে বলল, আল্লাহ তাআলা আপনার মঙ্গল করুন। মেহেরবানী করে এই নগণ্য নজরানা (হাদিয়া) আপনার এই ‘যাদুসন্তানদের’ খোরাকীস্বরূপ গ্রহণ করুন।’ বৃদ্ধার কোলে খেলতে থাকা সাপটির দিকে ইঙ্গিত করে আবু হামেদ এ কথাটি বলল। বৃদ্ধা হাত বাড়িয়ে পুটলিটি গ্রহণ করল।বলল, তোমার মিশন কতটুকু এগুলো ?..
আবু হামেদ হাত মুচড়াতে মুচড়াতে বলল, আমি ঐ লোকদেরকে এক স্থানে জমায়েত করার ব্যবস্থা করেছি। এখন আমি তাদেরকে কীভাবে ধ্বংস করব, আপনার পরামর্শ প্রয়োজন..।
যাদুকর বৃদ্ধাটি তখন এমন জোরে জোরে হাসতে লাগল যে, গুহার ভেতরের নীরবতাকে খানখান করে দিল। হাসি দেওয়ায় তার মুখের অভ্যন্তরটি মনে হল যেন, তা অন্ধকার এক প্রকাণ্ড গহবর। হঠাৎ বৃদ্ধাটি হাসি বন্ধ করে মাথা নিচু করে কিছুক্ষণ ধ্যানমগ্ন হলো। তার চেহারা তখন বিবর্ণ হয়ে গেল। চোখ দু’টো হঠাৎ তার জ্বলমল করে ওঠল..। এরপর সে হাত বাড়িয়ে পাশে রাখা ছোট একটি কৌটা থেকে কিছু পাওডার নিল। আবু হামেদকে লক্ষ্য করে বলল, এই যে পাউডারটি দেখছ, এর এক একটি কণা একটি উটকে নিমিষেই ধ্বংস করে দিতে পারে। নাও.. তুমি এই পাউডার নিয়ে তোমার মিশন সম্পন্ন করো। এবার যাও..।
********************
হামদুন তাঁর সেনাশিবিরকে বর্ণিল সাজে সাজিয়েছেন। প্রিয়কন্যা লিময়ার বিবাহ অনুষ্ঠান ও খলিফার শুভাগমণ উপলক্ষে চোখ ধাঁধাঁনো আলোকসজ্জা করেছেন। অনুষ্ঠান আয়োজনে তিনি প্রচুর টাকা ব্যয় করেছেন। দেশের সেরা সেরা বাবুর্চিদেরকে তিনি আমন্ত্রণ করেছেন। উন্নতজাতের ঘোড়া খরিদ করেছেন। প্রতিযোগীরা যেন এসব ঘোড়ায় চড়ে প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারে। এবং এ অনুষ্ঠান উপভোগ করার আমন্ত্রণ জানিয়ে বিপুল সংখ্যক লোককে তিনি দাওয়াতও করেছেন।
বিয়ের দিন লিময়া তার পিতার সেনাশিবিরে ফিরে এল। সেনাশিবিরে তখন  মানুষের উপচে পড়া ভীড়। লিময়া নিজ কামরায় প্রবেশ করেই তার পিতাকে সংবাদ দিতে বলল। পিতা হামদুন সংবাদ পেয়ে তৎক্ষণাত হাজির হলেন। লিময়া তখন দরজা বন্ধ করে দিয়ে বলতে লাগল, আবু হামেদের মতিগতি আমার কাছে ভাল ঠেকছে না। আমার আশঙ্কা হচ্ছে, সে খলিফাকে হত্যা করার ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র আঁটছে। তার কখনো ইচ্ছা নেয় যে, সিজিলমাসার সিংহাসনকে পুনরুদ্ধার করে আবার সেই গদিতে বসাবে। বরং সে চায় একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী হতে এবং সব অঞ্চলে তার আধিপত্ব বিস্তার করতে। এরপর সে তার পিতাকে ষড়যন্ত্রের অশুভ পরিণতি থেকে সতর্ক করল। সে বলল, রাজপ্রাসাদে সে কী পরিমাণ ভালবাসা ও সম্মান পেয়েছে। এবং উম্মুল উমারা যে তাকে আপন মেয়ে হিসেবে গ্রহণ করেছে, এমন মহান মানুষদের গাদ্দারী করা যায় বাবা..!?
লিময়া বিস্মিত হল যখন তার পিতা বললেন, আরে কি বলো! কে বলেছে, আমরা খলিফা ও তাঁর ঘনিষ্ঠ লোকদের সাথে গাদ্দারী করবো? এমন ব্যক্তিদের সাথে তো বিশ্বাসঘাতকতা করা যায় না! সর্বোপরি আমরা পরষ্পরে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছি। আর আমীরুল মুমিনীনের পক্ষ থেকে আমি যে বদান্যতা ও করুণা লাভ করেছি-এ কারণে আমি তাঁর কাছে সত্যিই অনেক কৃতজ্ঞ। যেদিন বিয়ের তারিখ ধার্য করা হল, সেদিন থেকেই খলিফাকে যেকোন ধরনের কষ্ট দেওয়ার পরিকল্পনা থেকে সরে এসেছি। এরপর আবু হামেদকে বিষয়টি জানালে সেও আমার সাথে একমত পোষণ করে।
লিময়া বাবার মুখ থেকে এ কথা শুনে আনন্দের আতিশয্যে তাঁর হাতের ওপর ঝুঁকে চুমু খেল। তার দু’চোখ বেয়ে তখন ফোঁটা ফোঁটা আনন্দাশ্র“ গড়িয়ে পড়ছিলো।
লিময়া বলল, আলহামদুলিল্লাহ বাবা! আপনি আমার দুশ্চিন্তা দূর করলেন। আমাকে সীমাহীন পেরেশানী থেকে স্বস্তি দিলেন। এজন্য আল্লাহ তাআলার শুকরিয়া আদায় করছি। সাথে সাথে আপনারও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। কিন্তু বাবা! আমি আপনাকে আবু হামেদ থেকে বরাবরের মত এখনো সতর্ক করছি।  আমার মনে হচ্ছে, সে এখনো তার সংকল্পে স্থির। এই আশংকাও ফেলে দেওয়া যায় না যে, সে খলিফার সাথে সাথে আপনার প্রাণও সংহার করার পাঁয়তারা করছে। অতএব আপনি এই ধূর্ত নেকড়ে থেকে সতর্ক থাকবেন!! হামদুন মেয়ের কাঁধ চাপড়ে বললেন, ‘বেটি লিময়া! সকলের ব্যাপারেই আমাদের সন্দেহ করা এবং খারাপ ধারণা পোষণ করা উচিত নয়। বিশেষ করে যারা আমাদের একনিষ্ঠ বন্ধু..।’ এরপর তিনি তাকে বিদায় জানিয়ে অনুষ্ঠান তদারকীর জন্য বের হয়ে গেলেন।..
ঐদিন আসরের সময়। হামদুনের সেনাশিবিরে সারি সারি বিশাল বড় শামিয়ানা টানানো হল। শামিয়ানার উপরে পতপত করে উড়ছিলো পতাকা। আমন্ত্রিত মেহমানদের ঢল নেমেছে। একটু পরই আমীর-উমারা, সেনাঅফিসারদের দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে খলিফা মুঈয আগমন করলেন। সেনাশিবিরের কাছাকাছি আসতেই হামদুনও তাঁর লোকেরা খলিফাকে উষ্ণ সংবর্ধনা দিয়ে বরণ করে নিলেন। এরপর হামদুন খলিফার পিছুপিছু চলতে লাগলেন। খলিফাকে নিয়ে তাঁর নির্ধারীত তাবুতে প্রবেশ করলেন। খলিফা আসন গ্রহণ করলেন। তাঁর ডানে প্রধান সিপাহসালার জাওহার এবং বামে তাঁর ছেলে বর হুসাইন বসলেন।
এর কিছুপর। হামদুন হাত দিয়ে ইশারা করলে একদল অশ্বারোহী শামিয়ানার সামনে খোলা চত্বরে এক সারিতে দাঁড়িয়ে গেল। খলিফাকে তারা সালাম জানিয়ে অশ্বে আরোহণ করল। অশ্বের পিঠে তারা তাদের অসাধারণ যোগ্যতার পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করল। খলিফা তা দেখে ভীষণ খুশী হলেন।
অশ্বারোহীরা তাদের খেলা শেষ করে পরষ্পরে ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হলো।
খলিফা তাদের মধ্যে যারা বিজয়ী, সকলকে বড় অংকের পুরষ্কার দেওয়ার নির্দেশ দিলেন।..
ওদিকে আবু হামেদ সবকিছু পর্যবেক্ষণ করছিলো। .. মনে মনে সে একটি ফন্দি আঁটছিলো..। এক মোক্ষম সুযোগের সন্ধানে ছিল। এক সময় তা পেয়েও গেল। সে খলিফার কাছে গিয়ে কুর্নিশ করে বলল, জাহাপনা! মূলত সিজিলমাসার অধিবাসি সকলেই অশ্বচালনা বিদ্যায় পারদর্শী। এমনকি এখানকার নারীরাও পুরুষদের থেকে কোনো অংশে পিছিয়ে নেয়।.. বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারা পুরুষদেরকেও হার মানায়।..
খলিফা চোখে মুখে বিস্ময় নিয়ে জাওহারের দিকে তাকালেন।
জাওহার বললেন, ঠিকই জনাব! আমি তা স্বচক্ষে দেখেছি। এটুকু বলে তিনি ছেলে হুসাইনের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন। এবার সবাই বুঝে ফেলল যে, জাওহার লিময়াকে বুঝাতে চাচ্ছেন।
আবু হামেদ বলল, আপনি মনে হয় লিময়াকে উদ্দেশ্য নিচ্ছেন..।
খলিফা বললেন, হ্যাঁ আমরা লিময়ার সবগুণের কথাই শুনেছি..। আচ্ছা, সে কি অশ্বারোহণ বিদ্যায়ও পারদর্শী?
আবু হামেদ বলল, সে শুধু পারদর্শীই নয়, বরং অসাধারণ পারদর্শী জাহাপনা। পুরুষদের মাঝেও তার সমকক্ষ পাওয়া মেলা ভার। আপনি চাইলে দেখবেন সে তার আরবিয় উন্নতজাতের ঘোড়ায় চড়ে বাতাসের গতিতে উড়ে বেড়াবে। তাছাড়া সিজিলমাসাবাসীর একটি রীতি হল, বধূকে যেদিন তার বরের কাছে পাঠানো হবে, সেদিন বধূ ঘোড়দৌঁড় প্রতিযোগিতা করে দেখায়। তার বরকে এ কথা বুঝানোর উদ্দেশ্য যে, বাহাদুরীর ক্ষেত্রে সে তার থেকে কম নয়।’
খলিফা মুঈয হুসাইনের দিকে তাকিয়ে হাস্যমুখে বললেন, আজতো শুধু বিয়ে হবে, উঠিয়ে নেয়া নাও হতে পারে। তারপরও হুসাইন যদি অনুমতি দেয়..।
হুসাইন তাঁর কথার মাঝখানে বিনয়ের সাথে দাঁড়িয়ে বলল, মাফ করবেন জাহাপনা! সে তো আপনার একজন বাদী মাত্র..।
এটুকু শুনেই আবু হামেদ ভোঁ দৌঁড় দিল। হামদুন গিয়ে খলিফার আগ্রহের কথা জানালো যে, তিনি লিময়াকে অশ্বারোহী হিসেবে দেখতে চাচ্ছেন। একটু পরই দেখা গেল, লিময়া আরবি উন্নতজাতের ঘোড়ার পিঠে সওয়ার। এক নওকর তার ঘোড়াকে টেনে আসছে। খলিফা শামিয়ানার দিকে এগিয়ে এল। সে অশ্ব চালনার এমন ঝুঁকিপূর্ণ কিছু কসরত প্রদর্শন করল যে, ঘোড়ার শরীর দিয়ে প্রচুর ঘাম বের হল। আর এ সময়ই ঐ নওকরটি ঘোড়ার নাকের কাছে স্পঞ্জ এনে ধরল। ঘোড়াটি স্পঞ্জ শুঁকতেই লিময়াকে নিয়ে ঝড়ের গতিতে ছুটল। একসময় ঘোড়া তাকে নিয়ে মরূভূমির গহিনে হারিয়ে গেল। ঘোড়ার অমন হল কেন, লিময়া তা বুঝে উঠতে পারল না। সে সর্বশক্তি প্রয়োগ করে তার লাগাম ধরে নামাতে চেষ্টা করল। কিন্তু তার চেষ্টা নিরর্থক। ঘোড়ার প্রচণ্ড গতি তাকে নাজেহাল করে তুলল।
ক্লান্তি ও অবসাদে সে একেবারে ভেঙ্গে পড়ল। ঘোড়ার জিনকে জড়িয়ে ধরে লাগাম ঢিল করে দিল। নিজেকে সে আল্লাহর মর্জির ওপর সোপর্দ করে দিলে। ঘোড়া তার আপন গতিতে চলছে।
ঘোড়ার পাগলা গতির কারণে খুড়ের আঘাতে ধূলিকণা এবং ছোট ছোট নুড়িপাথর উড়তে লাগল। আচমকা ঘোড়াটি বড় একটি পাথরের সাথে ধাক্কা খেয়ে উপুড় হয়ে পড়ে গেল। আর এদিকে লিময়া অনেক দূরে ছিটকে পড়ে বালির একটি গর্তে গিয়ে পতিত হল। প্রচণ্ড ব্যথা ও ক্লান্তিতে সে সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলল..।                     ক্রমশ….।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight