ধারাবাহিক উন্যাস : কায়রাওয়ানী দুলহান

পূর্বপ্রকাশিতের পর….
বিনতে ইখশীদের প্রাসাদ নীলনদের পূর্বতীরে অবস্থিত এক বিশাল বড় প্রাসাদ। এর মেঝে ও দেয়ালে বিভিন্ন ধরনের দামী দামী গালিচা বিছানো এবং মনমুগ্ধকর কারুকার্য করা। আব্বাসীয়দের বিলাসিতা ও অপব্যয় সব কিছুতেই সুষ্পষ্ট। এদিকে বিনতে ইখশীদ ছিলেন উপমাতুল্য একজন বিলাসিতাপ্রিয় নারী। বিনোদন, বিলাসিতা, আরাম-আয়েশের এমন কোন উপকরণ নেই- যা তিনি সংগ্রহ করেন নি। সকলের ওপরই তাঁর ভিন্নরকম প্রভাব-প্রতিপত্তি রয়েছে। বিশেষকরে কাফূরের পর মিসরের শাসনক্ষমতা যখন তাঁর ভাই ও কাফুরের নাতী আহমদ বিন আলীর হাতে অর্পিত হয়। আর আহমদ বিন আলী বয়সে ছোট হওয়ায় কার্যত সকল প্রভাব ও কর্তৃত্বের চাবিকাঠি বিনতে ইখশীদের হাতেই ছিল। এজন্যেই জা‘ফর ইবনুল ফুরাত যখন বালক আহমদের ক্ষমতা নেওয়ার অপচেষ্টা চালান, তখন যায়নাব তাকে ব্যর্থ করে দেন। এতে জা‘ফর মনক্ষুণœ হয়ে জাওহারের কাছে সন্ধিপ্রস্তাব পাঠিয়ে দেন।
ষোল
সেদিন আসরের সময়। বিনতে ইখশীদের পরিচারিকা ও দাসীরা তাঁর খেদমত করছিল। এমন সময় এক দাসী এসে সংবাদ দিল যে, এক খদ্দের আপনার সাক্ষাতপ্রার্থী। তার সাথে অনিন্দ্য সুন্দরী একটি বাদী রয়েছে। তিনি তৎক্ষণাৎ তাদেরকে ভিতরে নিয়ে আসার নির্দেশ দিলেন। কামরায় প্রবেশ করেই ব্যবসায়ী শাহযাদী যায়নাবের হাতে ঝুঁকে কুর্ণিশ করল। লিময়া তার অনুকরণ করল। এরপর সে মাথা অবনত করে দাঁড়িয়ে রইল। শাহজাদী তাকে বসতে ইঙ্গিত করে ব্যবসায়ীকে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি এই সুন্দরী রূপসী যুবতী কোথায় পেলে?
ব্যবসায়ী বলল, এ বাদী আপনার অনুগত ইয়াকুব হাদিয়া স্বরূপ আপনার নিকট পাঠিয়েছে।
শাহজাদীর চেহারায় সন্তুষ্টি প্রকাশ করে বললেন, সত্যিই এটি অত্যন্ত মূল্যবান হাদিয়া। ইয়াকুবকে গিয়ে বলো, আমি তার হাদিয়া কবুল করেছি এবং আমার পক্ষ থেকে তাকে শুকরিয়া জানাও।
এরপর শাহজাদী আঙুল থেকে একটি আঙটি খুলে খদ্দেরকে দিলেন। সে আঙটিতে চুমু খেয়ে পকেটে পুরলো এবং আবারও কুর্নিশ করে বিদায় নিল।
লিময়া তখনও নীরব হয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিল। এমন সময় দাড়োয়ান এসে বলল, কয়েকজন ইখশীদি সেনা অফিসার মনিবের সাথে কথা বলতে চায়।
শাহজাদী বিরক্তিভরে বললেন, ওদেরকে অপেক্ষা করতে বল। এরপর তিনি ওঠে লিময়াকেও তাঁর পিছুপিছু আসতে বললেন। চলার পথে শাহজাদী তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার নাম কী? আকস্মিক প্রশ্নে লিময়া হতচকিত হয়ে গেল। ফলে মুখ ফসকে আসল নাম বলতে যাবে, কিন্তু সতর্ক হয়ে গেল এবং বলল, সালামাহ, আমার মনিব!
শাহজাদী বললেন, সুন্দর নাম তো! অপরূপ সুন্দরী বাদীর অপরূপ নাম। এরপর তিনি হাতে তালি দিয়ে রাজপ্রাসাদের প্রধান পরিচারিকাকে ডাকলেন।
পরিচারিকা এলে শাহজাদী তাকে নির্দেশ দিলেন, সালামাকে একটি আরামদায়ক বিশেষ কামরার ব্যবস্থা কর এবং তার সকল প্রয়োজন পুরা কর। পরিচারিকা লিময়াকে নিয়ে প্রস্থান করল।
লিময়া নিজ কামরায় এসে কাপড় পাল্টে উন্নত রেশমী কাপড় পড়ল। মাথার চুল স্বাভাবিকভাবে আঁচড়াল। এতেই তাকে অপরূপ ও যাদুময়ী যুবতী মনে হচ্ছিল। এর একটু পরই প্রধান পরিচারিকা এসে বলল, শাহজাদী তোমাকে ডাকছে।
শাহজাদীর কামরায় পৌঁছে দেখল, তিনি ‘আবলুস’ কাঠের তৈরি স্বর্ণখচিত একটি আসনে বসে আছেন। কামরা থেকে নীলনদের মনোরম দৃশ্য সহজেই উপভোগ করা যায়। কামরাটি বেশ বড়সড়। কামরার মেঝেতে দামী দামী কার্পেট ও গালিচা বিছানো। অন্দরের নওকর বাদীরাও সুন্দর সুন্দর কাপড় পরে কামরার ভেতরে-বাইরে ঘোরাফেরা করছে।
শাহজাদী লিময়াকে এই অপরূপ সাজ ও বাহারী পোষাকে তার আসল চেহারা  উদ্ভাসিত হল ও তার সৌন্দর্যে বিমুগ্ধ হয়ে আবেগাপ্লুত শাহজাদী নিজের আসনের পাশেই বসার জন্য জায়গা করে দিলেন।
লিময়া তাঁর পাশে বসলে শাহজাদী তাকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেয়ে বললেন, সালামাহ! প্রথম দিনই তুমি আমার হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছ। তোমাকে দেখে আমার মনে হয়, তুমি কোন উঁচু বংশের মেয়ে। আচ্ছা, তুমি কোন দেশের?
লিময়া বলল, আমি মরক্কোর অধিবাসি আমার মনিবা।
শাহজাদী তার দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, তা কোন্ এলাকার এবং কোন্ বংশের?
লিময়া বলল, দাসীরা তো তাদের মনিবার দিকেই সম্বন্ধিত। আর আমি এখন আমার মনিবা শাহজাদী বিনতে ইখশীদের ঘরে অবস্থান করছি। আমার সম্পর্ক ও সম্বন্ধও তাঁর সাথেই, আর এতেই আমি গর্বিত।
শাহজাদী তার এই বুদ্ধিদীপ্ত উত্তরে অত্যন্ত প্রীত হলেন। বললেন, অনেক অনেক সুন্দর উত্তর দিলে হে সালামাহ। সর্বদা তুমি আমার আস্থাভাজন হয়ে থাকবে। তাই তুমি আমাকে কিছু বলতে কোন সংকোচ করবে না এবং এখানে তোমার কোন ভয় নেই।
এসময় দাড়োয়ান প্রবেশ করে আবার বলল, ইখশীদি সেনা অফিসাররা এখনো অপেক্ষা করছে।
শাহজাদী তখন অসন্তোষ প্রকাশ করত মাথা নেড়ে বললেন, ওরা আমার কাছে কী চায়। আমি ওদের জন্য কীবা করতে পারব? তিনি লিময়ার দিকে তাকালেন।
লিময়া দেখল যে, এ সুযোগ তার হাতছাড়া করা ঠিক হবে না।  সে মুচকি হেসে বলল, আসলে আমার মনিবার ওপর যদি ওদের আস্থা না থাকত, তাহলে ওরা এসময়ে তাঁর সাথে সাক্ষাত প্রার্থনা করত না।
শাহজাদী তখন দাড়োয়ানকে বললেন, ঠিক আছে ওদেরকে নিয়ে বৈঠকঘরে বসাও।
এদিকে তিনি খাদেমাদেরকে পর্দা টেনে দেওয়ার নির্দেশ দিলেন। পর্দা টানানোর পর হলঘরটি দু’ভাগ হয়ে গেল। পর্দাটি নকশা করা রেশমী কাপড়ের তৈরি। পর্দায় অনেকগুলো ছিদ্র। শাহজাদী এগুলো দিয়ে যাকে ইচ্ছা তাকেই দেখতে পারেন। কিন্তু তাঁকে কেউ দেখতে পায় না।
এরপর লিময়া নিজ কামরায় চলে যাওয়ার ভান করল। কিন্তু শাহজাদী তাকে রেখে দিলেন এবং পাশ্ববর্তী আসনেই বসতে বললেন।
একটু পরই সেনাউর্দি পড়া তিনজন লোক প্রবেশ করে রাজকীয় অভিবাদন জানান। শাহজাদী তাদেরকে বসতে আদেশ করে লিময়ার কানে ফিসফিসিয়ে বললেন, এরা তিনজন আমাদের একনিষ্ঠ সেনা অফিসারদের অন্যতম। আমার পিতার দিকে সম্বন্ধ করে এদেরকে ‘ইখশীদি’ বলা হয়ে থাকে।
এরপর শাহজাদী উঁচু আওয়াজে বললেন, স্বাগতম হে জানবাজ, বীর বাহাদুরগণ! আশা করি তোমাদের আগমণ কোন ভালো উদ্দেশ্যেই।
শাহজাদীর আওয়াজ পেয়ে তাদের বয়স্ক এক সেনা অফিসার দাঁড়িয়ে বলল, আল্লাহ চাহেন তো ভালো। কিন্তু এ মুহূর্তে জনাবাকে বিরক্ত করতে হচ্ছে বলে আমরা আন্তরিকভাবে দুঃখিত। এছাড়া আর কোন উপায়ও ছিল না। কারণ ওদিকে শত্র“রা আমাদের দোরগোড়ায়; এদিকে ‘কাফুর’ সমর্থকরা ক্ষমতা নেয়ার তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত। সৈনিকদেরকে আমাদের বিরুদ্ধে উস্কে দিচ্ছে। আর ওই উজীর জা‘ফর বিন ফুরাতের দৌরাত্ব ও বিদ্বেষ অনেকগুণ বেড়েছে। অর্থ-সম্পদও এখন তার কব্জায়। ইতোমধ্যে খবর পেয়েছি যে, সে শত্র“র কাছে শান্তিপ্রস্তাব ও সন্ধিচুক্তির বিষয়ে আলোচনার জন্য দূত পাঠিয়েছে। এ ব্যাপারে আমাদের মহামান্য শাহজাদীর মতামত জানতে এসেছি।
শাহজাদী শেষোক্ত এ সংবাদ ক্রোধে ফেটে পড়লেন। তিনি বললেন, কী ইবনুল ফুরাতের এত স্পর্ধা! সে কীভাবে এ কাজটি করতে পারল। এ মুহূর্তেই তাকে বরখাস্ত করা আবশ্যক।
তখন এক অফিসার বলল, সে এটি করতে সাহস পেয়েছে কাফুরীদের ইন্ধন ও সহযোগিতার কারণে। এই কাফুরীরা ক্ষমতার মসনদ শত্র“দের হাতে চলে গেলেও ইখশীদি পরিবারের হাতে দেখতে চায় না। তার কথা শেষ হওয়ার পূর্বেই বাইরে হৈ চৈ ও শোরগোল আরম্ভ হয়ে গেল।
কাফুরীরা যখন তাদের দোষারোপ শুনল, তখন তারা জোরপূর্বক ভেতরে প্রবেশ করল। তাদের একজন বলতে লাগল, তোমরা বলছ যে, আমরা ক্ষমতার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছি এবং শত্র“দেরকে তোমাদের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলছি.। অথচ তোমরা ভুলে গেছ, আমরা যদি আমীর কাফুরকে সহায়তা ও সমর্থন না করতাম, তাহলে তোমাদের রাজত্ব আজ বিলিন হয়ে যেত! আজ যদি কাফুর বেঁচে থাকতেন, তাহলে শত্র“রা মিসরে প্রবেশের দুঃসাহস দেখাতে পারতো না। কিন্তু এখন তো তোমরা ক্ষমতায় আছো, তাহলে এবার শত্র“দেরকে দেশ থেকে তাড়াও।
এক ইখশীদি অফিসার তার উত্তরে বলল, আমরা শত্র“দেরকে দেশত্যাগে বাধ্য করতে পারি, যদি তোমরা তাদের সাথে সবধরনের সহায়তা ও সন্ধিচুক্তির মানসিকতা ত্যাগ কর।
তখন আরেক কাফুরী অফিসার চিৎকার করে বলতে লাগল, তুমি এ কথা শ্রদ্ধেয়া শাহজাদীর সামনে বলছ। ধিক তোমাকে! তোমরা আজ এ কথাগুলো এ মহান সভাকক্ষে না বলে অন্য জায়গায় বললে আমরা তোমাদের গর্দান উড়িয়ে দিতাম। তোমাদেরকেও তোমাদের কৃষ্ণগোলাম আমীরের সাথে কবরের পথে যাত্রা করিয়ে দিতাম। আসলে তোমরা যে আমীরকে নিয়ে গর্ব কর, তার ব্যাপারে প্রসিদ্ধ আরবী কবি মুতানাব্বী বিদ্রুপ করে যা বলেছে, তার সবটুকুই তো বাস্তব!
তখন আরেক কাফূরী সৈনিক তরবারি কোষমুক্ত করে বলল, এই! কতো স্পর্ধা তোর! মৃতদেরকে গালমন্দ করছিস। নিঃসন্দেহে এটি তোর উদ্ধত্য। আমাদের শ্রদ্ধেয়া শাহজাদী তোর ব্যাপারে কোন ব্যবস্থা না নিলে, আজই তোর দফা রফা করে দেব।
এভাবে উভয় পক্ষের পাল্টাপাল্টি জবাব সভাকক্ষ আবার উত্ত্বপ্ত হল। সকলেই পরস্পরকে অশ্রাব্য ভাষায় গালাগালি করতে লাগল। প্রচণ্ড হৈ চৈ আর শোরগোলের কারণে শাহজাদীর আওয়াজ ও কথা কারও কানে গেল না।
এমনকি তারা সংঘর্ষের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেল। শাহজাদী তখন আরও উঁচু আওয়াজে বললেন, ধিক তোমাদের। এসব কী হচ্ছে? আমার সামনে তোমরা পরস্পরে গালাগালি করছ। এরচে’ গুরুতর হলো, আমাদের সামনেই আমাদের পূর্বসূরীদের দোষারোপ করছো। এটা আমরা কখনো মেনে নিতে পারি না। রে নির্বোধেরা! এখন তোমরা এসব নিয়ে ঝগড়া-বিবাদ করছো! অথচ শত্র“ এখন আমাদের দুয়ারে দাঁড়িয়ে।
আর তোমরা যারা কাফুর সমর্থক, তাদেরকে বলছি, কাফুর ছিলেন দেশের একজন একনিষ্ঠ খাদেম। আল্লাহ তাঁর প্রতি রহম করুন। তোমরা তাঁকে নিয়ে আমাদের সাথে গর্ব করার কী আছে! তিনি তো মূলত ক্ষমতা জবরদখল করেছিলেন কিংবা তাঁর কোন স্বার্থান্বেষী বন্ধু ক্ষমতা ছিনিয়ে নিয়ে তাঁকে মসনদে বসিয়ে ছিলো। তিনি দাবী করতেন যে, এই ক্ষমতা দখল বাগদাদের খলীফার নির্দেশেই হয়েছে। তবে এ মুহূর্তে এ নিয়ে কেন ঝগড়া-বিবাদ হচ্ছে। এখন তো এগুলো করার সময় নয়!
শাহজাদীর মুখে এ বক্তব্য শুনে কাফুর সমর্থকরা দাঁড়িয়ে গেল। তাদের মধ্যে নেতাগোছের একজন বলল, নাহ! এখন যেহেতু স্বয়ং শাহজাদীর মুখ থেকেই ওই অবমাননাকর কথা শুনতে পেলাম, তাহলে আমাদের এখানে এক মুহূর্ত থাকাও ঠিক হবে না। তাই আমরা আমাদের বিষয়টি যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে রেখেই চলে যাচ্ছি। এ বলে সে ও তার সাথীরা ক্রোধে অগ্নিশর্মা হয়ে হন্হন্ করে বেড়িয়ে গেল।
ক্রমশ….

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight