ধন সম্পদের বিনিময়ে জান্নাতের মহল ক্রয় : সৈয়দা সুফিয়া খাতুন

sign4

জাফর ইবন সুলায়মান রহ. বলেন যে, একদা আমি এবং মালেক ইবন দিনার একসঙ্গে বসরা শহরে গেলাম। ঘুরতে ঘুরতে আমরা একটি আলিশান মহলের কাছে গিয়ে এর ভিতরে প্রবেশ করে দেখলাম যে, মিস্ত্রী ও অন্যান্য শ্রমিকরা কাজ করতেছে। মহলটির একপাশে বসে আছে অত্যন্ত সুন্দর সুদর্শন  এক যুবক। এরকম সুন্দর পুরুষ আমরা আগে কখনও দেখিনি। যুবকটি মহল নির্মাণ সমাপ্তির অপেক্ষা করছিল। সে মিস্ত্রী ও শ্রমিকদের অমুক অমুক কাজ করার তাগীদ দিচ্ছিল। এ অবস্থা দেখে আমাকে মালেক ইবন দিনার বলেন, দেখেছ লোকটি কত সুন্দর এবং মহল তৈরির প্রতি তার কেমন আগ্রহ? তাকে দেখে আমার বড় করুণা হলো। আমার ইচ্ছে হচ্ছে তার জন্য আল্লাহর কাছে দোআ করতে যাতে আল্লাহ পাক তাকে নেককার বানিয়ে দেন। যেন সে জান্নাতের যুবকদের অর্ন্তভূক্ত হয়ে যায়। আলাপ আলোচনার পর আমরা যুবকের কাছে গিয়ে সালাম করলে সে সালামের জবাব দিল বটে, কিন্তু মালেক রহ. কে চিনতে পারেনি। কিছুক্ষণ পর সে তাকে চিনতে পেরে তাকে সম্মান করল এবং নিবেদন করল, জনাব কি উদ্দেশ্যে আগমন? হযরত মালেক রহ. বললেন, আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করতে চাই যে, তুমি এ মহলে কি পরিমাণ টাকা পয়সা ব্যয় করার ইচ্ছা করেছ? সে বলল, একলাখ দেরহাম। হযরত মালেক রহ. বললেন, যদি এ সমস্ত মালামাল তুমি আমাকে দাও তাহলে আমি এগুলো এমন স্থানে ব্যয় করব যার বিনিময়ে তুমি এর চেয়ে আরো উন্নত মহল পাবে। যে মহলের জিম্মাদার আমি নিজে হবো। শুধু মহলই নয় তার সকল আসবাপত্র, খাট পালঙ্গ এবং দাসদাসীও আমার জিম্মায়। ঐ মহলে লাল ইয়াকুতের গম্বুজ থাকবে তাবু থাকবে। মহলের মাটি হবে মেশক জাফরানের, সেই মহলটি তোমার এই মহল থেকে  হাজার গুণে প্রশস্ত হবে। আর সেই মহলটি হবে চিরস্থায়ী কখনও নষ্ট হবেনা। আর সেই মহলটিতে কোন শ্রমিকের হাত লাগবে না। শুধু আল্লাহর কুন শব্দটি ব্যবহৃত হয়েই মহলটি নির্মিত হবে। তখন যুবক তাকে বলল, জনাব আমাকে মাত্র অদ্যকার রাতটি সুযোগ দিন। আগামীকাল প্রত্যুষে আপনি আবার আসবেন। মালেক ইবন দিনার রহ. বললেন, ঠিক আছে।
জাফর রহ. বলেন, মালেক ইবন দিনার রহ. সারা রাত এই যুবকের কথা ভেবে ভেবে কাটিয়ে দিলেন, সকাল হওয়ার পূর্বমুহুর্তে তিনি গাত্রোত্থান করত তার জন্য দোআ করলেন এবং প্রত্যুষেই আমরা দুজন আবার যুবকের নিকট গেলাম। আমরা গিয়ে দেখলাম যে, যুবক মহলের দরজার সামনে বসে আছে। সে যখন মালেককে দেখল তখন সে খুশি হয়ে বলতে লাগল, গতকালের প্রতিশ্র“তি স্মরণ আছে কি? মালেক রহ. বললেন, হ্যাঁ আছে। তো তুমি কি আমার কথায় রাজি? সে বলল অবশ্যই রাজি। এ কথা বলেই লেকদেরকে সে ধন সম্পদগুলো একত্র করতে ডেকে পাঠিয়ে তাদের সামনে রাখল। তারপর কলম ও কাগজ আনিয়ে সে কাগজের উপর এ সংক্রান্ত বিষয়ের অঙ্গীকারনামা লিখে দিল। যা নিম্নরুপ:
বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম। এই চুক্তিনামা এই উদ্দেশে লিখা হচ্ছে যে, মালেক ইবন দিনার অমুকের পুত্র অমুকের জন্য আল্লাহ তাআলার কাছ থেকে এমন একটি মহল বিনিময় হচ্ছে যা তিনি আমাকে প্রদান করার জিম্মাদার। আর যদি এই মহল থেকে সেটির মধ্যে অতিরিক্ত কিছু হয় তা হবে আল্লাহ পাকের অনুগ্রহ। এই ধন সম্পদের বিনিময়ে তার জন্য আরেকটি জান্নাতের মহল তার এই মহল থেকে আরো প্রশস্ত ক্রয় করা হল। আর সে মহলটি হবে আল্লাহর নিকটে। চুক্তিনামা লিখে যুবকের হাতে প্রদান করা হল এবং যাবতীয় মালামাল নিয়ে আসা হল। তারপর আমি মালগুলো সারা দিন বিলি বন্টন করলাম। সন্ধ্যাবেলা মালেকের কাছে রাত অতিবাহিত ব্যতীত আর কিছুই ছিলনা। উক্ত ঘটনার চল্লিশ দিন অতিবাহিত হতে না হতেই একদিন মালেক ইবন দিনার ফজরের নামায আদায় করে চলে যাচ্ছিলেন। তিনি যখন মেহরাবের দিকে দৃষ্টি দিলেন তখন সেই চুক্তিনামাটি পড়ে থাকতে দেখতে পেলেন যা যুবকের সাথে করা হয়েছিল। তার অপর পৃষ্ঠায় লিখা রয়েছে- ইহা মহিমাময় আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে মালেক ইবন দিনারের জন্য ফরমান এবং পাপ থেকে মুক্তির সনদ। তুমি যে মহলের যামানত আমার উপর রেখেছিলে তা আমি সে যুবককে দিয়ে দিলাম। সত্তর ভাগেরও বেশি অংশ আমি তাকে দিয়েছি। এই লিখা দেখে মালেক ইবন দিনার রহ. বিস্মিত হয়ে গেলেন এবং চুক্তিনামাটি নিয়ে ঐ যুবকের ঘরে গিয়ে হাজির হলেন। তিনি বাড়িতে গিয়ে কান্নার আওয়াজ শুনতে পেলেন। আমি যুবকের অবস্থা বুঝতে পারলাম যে, সে গতকাল ইন্তেকাল করেছে। তারপর গোসলদাতাকে জিজ্ঞেস করলাম যে, তুমি কি তাকে গোসল দিয়েছো? সে হ্যাঁ সূচক জবাব দিল। তারপর মালেক ইবন দিনার জিজ্ঞেস করলেন তার মৃত্যু কিভাবে হয়েছে আমাকে বল। লোকটি বলল মৃত্যুর পূর্বে সে আমাকে বলল, আমার মৃত্যুর পর তুমি আমাকে গোসল দিবে। তারপর সে আমাকে একটি লেখা কাগজ দিয়ে বলল যে, ইহা আমার কফিনের ভিতর দিয়ে উহাসহ আমাকে দাফন করবে। যে পত্রটি মালেক ইবন দিনার মেহরাবের কাছ থেকে পেয়েছিল সেটি বের করে গোসলদাতাকে দেখাল তখন সে বলল, আল্লাহর কসম এই সেই পত্র যা আমি তার কাফনের মধ্যে রেখেছিলাম। তারপর যুবক দাঁড়িয়ে মালেক ইবন দিনার কে বলতে লাগল, আমি আপনাকে দুলাখ দিনার দিব। আপনি আমার জন্য এমন মহলের জিম্মাদার হয়ে যান। মালেক ইবন দিনার বললেন, যা হবার তা হয়ে গেছে। আল্লাহ পাক যা ইচ্ছা করেন তাই করেন। তারপর মালেক ইবন দিনার যখনই এই যুবকের কথা স্মরণ করতেন তখন ক্রন্দন করতেন এবং তার জন্য দোআ করতেন।
জীবিত থাকতেই জান্নাতের সুসংবাদ
কোন এক লোক বললেন, অমাকে এক বুযুর্গ লোক বলল, আমি স্বপ্নে দেখলাম যে, এক ব্যক্তি আমাকে বলছে, আমি তোমার জন্য একটি ঘর তৈরি করেছি। তুমি তা দেখলে তোমার নয়ন শীতল হয়ে যাবে। এক সপ্তাহ পরপর ঘরটি পরিষ্কার করার জন্য আমি তাকে বলে দিলাম। স্থানটির নাম দারুসসুরুর যার অর্থ শান্তির ঘর। সুতরাং তাই তুমি খুশি হয়ে যাও।
বর্ণনাকারী বলেন, সপ্তম দিন যখন এলো, দিনটি ছিল জুমআ বার। লোকটি খুড়িয়ে খুড়িয়ে ঝর্ণাতে গেল ওযু করার জন্য। সেখান থেকে সে পা ফসকে ঝর্ণাতে পড়ে মারা গেল। নামাজান্তে আমি তাকে ঝর্ণা থেকে বের করে দাফন কাফন করলাম। তিন দিন পর আমি তাকে স্বপ্ন দেখলাম যে, সে রেশমের সবুজ পোষাক পড়ে আছে। আমি তার অবস্থা জিজ্ঞেস করলাম। সে বলল, আল্লাহ পাক আমাকে দারুস্সুরুরে স্থান দিয়েছেন। যা আমার জন্য তৈরি করা হয়েছিল। আমি তাকে বললাম স্থানটি কেমন আমাকে কিছু বলতো? সে বলল, আফসোস এর কোন বর্ণনা আমি দিতে পারবোনা। সম্ভবত আমার পরিবার পরিজনদের জন্যও এর নিকটে আরেকটি মহল তৈরি করা হয়েছে। এখানে সব ধরনের আরাম আয়েশের উপকরণাদি রয়েছে। আমার ভাইদের জন্যও তাই হবে। তুমিও তাদের অর্ন্তভূক্ত।
এমন একটি স্থান যা বিরাণ হবে না এবং তার মালিকও মারা যাবেনা
প্রাচীনকালে এক বাদশাহ একটি শহর আবাদ করেন। তিনি শহরটি অত্যন্ত সৌন্দর্য মণ্ডিত করে প্রতিষ্ঠা করেন। শহরটির সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য তিনি প্রচুর অর্থ ব্যয় করেন। তারপর বাদশাহ খাদ্য রান্না করেন প্রজা সাধারণের জন্য এবং তিনি সেই ভোজ অনুষ্ঠানে কিছু সংখ্যক লোককে তার দরজায় বসিয়ে রাখেন। যারা খানা খেয়ে বের হবে তাদেরকে এ কথা জিজ্ঞেস করার জন্য যে, এ স্থানটির কোন ত্র“টি বিচ্যুতি আছে কিনা? প্রজারা সবাই বলল না কোন ত্র“টি বিচ্যুতি নেই। সর্বশেষে কিছু লোক কম্বল পরিহিতাবস্থায় এল। তাদের কাছেও জিজ্ঞেস করা হলো যে, তোমরা কি এর মধ্যে কোন দোষ ত্র“টি দেখেছ? তারা জবাব দিল এর মধ্যে দুটি দোষ আছে। পাহাড়াদাররা তাদেরকে আটক করে বাদশাহকে সংবাদ দিল। বাদশা বললেন আমি একটি দোষও সমর্থন করিনা; তাই তাদেরকে আমার দরবারে হাজির কর। তখন বাদশা তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, ত্র“টি দুটি কি কি? তারা বলল, স্থানটি বিরাণভূমিতে পরিণত হবে এবং এর মালিক মারা যাবে। বাদশাহ বললেন, এমন কোন জায়গা আছে যা বিরাণ হবে না এবং তার মালিক মারা যাবেনা? তারা বলল, হ্যাঁ আছে। কোথায় জিজ্ঞেস করলে তারা জান্নাতের আলোচনা করে এবং জাহান্নামের ভয়াবহ শাস্তির কথাও তুলে ধরে।  কথাগুলো বাদশার মনকে ভাবিয়ে তুলল এবং খুব চিন্তিত হয়ে গেলেন। তখন বাদশা তার রাজ্য বাদশাহি ছেড়ে জঙ্গলে চলে গেলেন এবং আল্লাহর কাছে তওবা করলেন।
এক হুর এবং তার অতি সুন্দরি দাসি
শায়খ আব্দুল ওয়াহেদ ইবন যায়েদ রহ. বলেন যে, একদা আমি জিহাদের উদ্দেশ্যে প্রস্তুতি নিলাম। তখন আমি আমার সাথীবর্গকে বললাম যে, জিহাদের ফাযায়েলের জন্য প্রতিজন দুটি করে আয়াত পড়ার জন্য তৈরি হও। তখন একজন পাঠ করল, আল্লাহ পাক জান্নাতের বিনিময়ে মুমিনদের জান মাল ক্রয় করে নিয়েছেন। [সূরা তাওবাহ-১১১] এই আয়াত শ্রবণ করে চৌদ্দ/পনের বছরের এক বালক যার পিতা অগাধ ধন সম্পদ রেখে মারা যায় সে দাঁড়িয়ে বলতে লাগল, হে আব্দুল ওয়াহেদ, আল্লাহ তাআলা মুসলমানের জান ও মালের বিনিময়ে জান্নাত ক্রয় করে নিয়েছেন। বালকটি তখন বলল, আপনাকে সাক্ষী রেখে বলছি, আমি আমার জান ও মাল জান্নাতের বিনিময়ে বিক্রি করে দিলাম। আমি তখন বললাম, দেখ বালক, খুব ভাল করে বুঝে শুনে কথা বল। তরবারীর ধার কিন্তু খুব ত্যাজ। তুমি ধৈর্য ধারণ করতে পারবেনা এবং দুর্বল হয়ে যাবে। বালক বলল, দেখুন শায়খ, আমি আল্লাহ পাকের সাথে সম্পর্ক করব আবার অক্ষম দুর্বল হয়ে যাবো এর আবার অর্থ কি? আমি আল্লাহ তাআলাকে সাক্ষী করে বলছি আমি আমার সমস্ত মালামাল বিক্রি করে দিলাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight