দ্বীনের প্রতি উৎসাহ প্রদান : এস এম আরিফুল কাদের

দ্বীন-ধর্মের উপর আমল করা অবশ্যই কর্তব্য। পাশাপাশি নিজের পরিবারস্থ সকলকে উৎসাহ প্রদান করাও অবশ্য কর্তব্য। নিজেকেসহ পরিবারের সকলকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাতে বলেছেন মহান আল্লাহ। কুরআনের ভাষায়, “হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেকে এবং পরিবারের সকলকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাও”। পিতা-মাতা, ভাই-বোন, পুত্র, স্বামী সবাইকে আল্লাহর দ্বীনের প্রতি উৎসাহ প্রদান করা অবশ্য কর্তব্য। সে ক্ষেত্রে মেয়েরা এ বিষয়ে খুব সচেতন থাকেন। যাতে করে পরিবারের সবাই নিজেদের দুনিয়া ও আখেরাত সুন্দর ও শান্তিময় করার সুযোগ পায়। হযরত উম্মে সুলাইম ছিলেন মদীনার অধিবাসী একজন বিখ্যাত মহিলা সাহাবী। হিজরতের ত্রিশ বছর পূর্বে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি তাঁর গোত্রের মালেক নামের এক যুবকের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের এক পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করে। নাম রাখেন আনাস। তাঁদের বিবাহের কয়েক বছর পরই মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নবুয়াতের কথা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। মদীনার কিছু লোক হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে সাাৎ করে মুসলমান হয়ে গেলেন। হযরত উম্মে সুলাইম তাঁদের মুখে রাসুলে আরাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কথা শুনলেন। ইসলামের সত্য কথা গেঁথে যায় তার অন্তঃকরণে। ঈমান আনলেন তিনি। সকল বাতিল মাবুদ পরিত্যাগ করে এক আল্লাহর ইবাদতে ধ্যানে মগ্ন হন।
তাঁর ছেলে হযরত আনাস ছিলেন ছোট। তাঁকে তিনি দ্বীনের ভাল খাদেম হিসাবে গড়ে তুলবেন বলে মনস্থ করলেন। তাঁর (আনাস রা.) শিশু কালেই ইসলামের কালেমা শিখালেন। এরপর কি করণীয় তা বললেন। তারপর ভাল ভাল কথা ও কাজ শিা দিতে লাগলেন। অভ্যাস করালেন দ্বীনের জন্য শীত গরমের কষ্ট সহ্য করার। তাঁর স্বামী মালেক তখনো ইসলাম গ্রহণ করেনি। তিনি (মালেক) তাঁর (উম্মে সুলাইমের) বিরোধিতা করতেন। উম্মে সুলাইম এতে নিরাশ হননি। বরং তাকে বুঝাতে লাগলনে। এক আল্লাহর ইবাদত করতে উৎসাহিত করতে লাগলেন। ইতিমধ্যে মালেক এক সফরে বের হয়ে নিহত হন তার শত্রুর হাতে। হযরত উম্মে সুলাইম বিধবা হয়ে গেলেন। তখন অনেকেই বিবাহ করতে চাইল তাঁকে। কিন্তু সবাইকে ‘না’ জবাব দিলেন। আর বললেন যতণ আমার এ শিশু সন্তান মজলিসে বসার এবং মানুষের সাথে কথা বার্তা বলার যোগ্য না হবে ততণ আমি বিয়ে করবো না।
আসলে তিনি এক অজানা আশংকায় ভুগছিলেন। ভেবেছিলেন, এ মুহূর্তে বিবাহ করার দরুন যদি সৎপিতা হযরত আনাসের লালন-পালনে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ান তবে তা হবে অতি দুঃখজনক। এ কথা ভেবেই তিনি বিবাহ থেকে দূরে রইলেন। হযরত আনাস রা. তাঁর মার এ ত্যাগ ও ইহসান চিরদিন মনে রেখেছিলেন। মায়ের কথা স্মরণ হওয়া মাত্রই তিনি বলতেন, “আমার মা আমার মুহাব্বাত ও তরবিয়াতের হক আদায় করেছেন”।
হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হিজরত করে যখন মদীনায় যান তখন আনাস রা. এর বয়স মাত্র দশ বছর। তাঁকে নিয়ে তাঁর মা রাসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দরবারে হাজির হলেন। আর বললেন, হে আল্লাহর রাসুল সা.! আমি এক বুক আশা নিয়ে এ সন্তানকে লালন-পালন করেছি। এ ছেলে আপনার খেদমত করবে বলে আমার আশা। হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর দরখাস্ত কবুল করে নেন। হযরত আনাস রা. কে সারাজীবন তাঁর সাথে রাখেন। তাঁর বুদ্ধিদীপ্ত কাজ-কর্মে তিনি সন্তুষ্ট হয়েছেন। তাঁকে ভালোবেসেছেন আন্তরিকতার সাথে।
হযরত আনাস রা. কে হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খেদমতে অর্পণ করার পর তিনি (উম্মে সুলাইম) তার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পেলেন। ইতিমধ্যে আবু তালহা নামক এক মর্যাদা সম্পন্ন ব্যক্তি তাঁকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। এতে তিনি আপত্তি জানালনে।
বললেন, “আমি রাসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপর ঈমান এনেছি। আর তুমি হচ্ছো একজন কাফের। তোমার সাথে আমার বিবাহ কেমনে সম্ভব? হে আবু তালহা আফসোস! তুমি মুর্তি পূজা কর। কাঠের মুর্তি যা মানুষের হাতের তৈরি। লাভ কিংবা লোকসান কোনটাই পৌঁছানোর মতা নাই যার। অথচ কি আর্শ্চয! তুমি হাই ও কাইয়্যুম, আযীয ও গালিব মহান আল্লাহ তা’য়ালার ইবাদত করো না। যিনি সমস্ত আসমান ও জমিনের মালিক”। কথাগুলো আবু তালহার মনে-প্রাণে এক অদ্ভুত প্রভাব বিস্তার করে। তিনি তৎণাৎ মুর্তিগুলো ভেঙ্গে উনুনে নিপে করে হজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খেদমতে হাজির হয়ে ইসলাম গ্রহণ করলেন। হযরত উম্মে সুলাইম খবর পেয়ে তাঁর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলেন। বিবাহের মহর হিসাবে ধার্য করা হলো আবু তালহা রা. এর ইসলাম।
হযরত উম্মে সুলাইমের অসাধারণ ত্যাগ ও পরিশ্রমের বদৌলতে যেমন তার পরিবারের সকলেই ঈমানের মহাদৌলত হাছিল হয়। ঠিক তেমনিভাবে লাভ করেন দ্বীন ও মিল্লাত তাঁর এক নিষ্ঠাবান মহান খাদেম।

লেখক : নির্বাহী পরিচালক, পানাহার স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদরাসা কিশোরগঞ্জ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight