দ্বীনের পরশে : মুহাম্মদ আবু সালেহ

Dua

জামাল মিয়া। পেশায় একজন রিকসা চালক। থাকেন ঢাকার মগবাজার  এলাকায়। দুই সন্তান আর স্ত্রী নিয়ে তার সংসার। সংখ্যায় বেশ সুখী পরিবার। তবে বাস্তব চিত্র পুরোপুরি উল্টো। সারাদিন রিকসা চালিয়ে সংসার চালাতে বেশ হিমশিম খেতে হয় জামালের। জামালের জীবন অনেক কষ্টের। এক তো অভাবের জ্বালা। তার উপর বউয়ের বাড়তি যন্ত্রণা। বউটা যেনো কুড়ে কুড়ে শেষ করে দিচ্ছে জামালকে।
জামালের প্রথম জীবন বেশ সুখের ছিল। জামালের পিতা সেরকম ধনী না হলেও বেশ সৌখিন মানুষ। সৌখিন পিতা আসলামের একমাত্র সন্তান এই জামাল মিয়া। আসলামের ঘরে অভাব ছিলনা। ছেলেকে তাই বড় করেছেন রাজপুত্রের মত করে। কিন্তু আসলাম জানতোনা, এই মাত্রাতিরিক্ত আদরই একদিন জামালের কাল হয়ে দাঁড়াবে। জামাল তখন কৈশর পেরিয়ে যৌবনে পা রেখেছে। এর পর থেকেই জামালের চালচলনে বেশ পরিবর্তন এসেছে। ঠিকমত খায়না। ঘরে ফিরে না। সময়মত ঘুমোয় না। সারাদিন শুধু বন্ধু বান্ধবের সাথে ঘুরে বেড়ায়। আসলাম তখনো কিছুই জানেনা। বয়সে বার্ধক্য এসেছে। তাই আগের মত ছেলের খোঁজ খবর রাখা যায়না। আসলাম যখন বিষয়টা জানতে পারে তখন অনেক দেরী হয়ে গেছে। অসৎ বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে জামাল জড়িয়ে পড়ে মেয়েলি সমস্যায়।  আসলাম একদিন বারান্দায় চেয়ার নিয়ে বসে আছে। একটু পর বাড়িতে প্রবেশ করল পূর্বপাড়ার রহিম। আসলাম বলল, কী ব্যপার রহিম! এই অসময়ে তুমি? রহিম বলে,  ভাই! আমার একটা মেয়ে আছে কলেজে পড়ে। আপনি হয়তো সেটা জানেন।  কিন্তু আজ ক’দিন যাবৎ মেয়েটা ঠিকমত কলেজে যেতে পারছেনা।  আপনার ছেলে জামাল তার কিছু বন্ধু নিয়ে প্রতিদিনই রাস্তায় তাকে বিরক্ত করে। আমার মেয়েটা বড় অসস্তিতে পড়ে গেছে। বিষয়টা তাই আপনাকে জানাতে আসলাম। আসলাম তার ছেলে সম্পর্কে এমন অভিযোগ শুনে হতবাক হয়ে গেল। যেই ছেলেকে রাজপুতের আদর দিয়ে এতো বড় করেছি সেই ছেলের নামে আজ এতো বড় অভিযোগ? তাহলে কী আমার এতোদিনের আদর সব ভেস্তে গেল? না….. আসলাম আর ভাবতে পারেনা। সিদ্ধান্ত নিল, এর জন্য জামালকে অবশ্যই কঠিন ধমকি দিবে। আসলামের মনে আজ শান্তি নেই। রহিম চলে যাওয়ার পর থেকে জামালের অপেক্ষায় আছে। মাগরিব গড়িয়ে এশা হয়ে গেল। জামাল এখনো ফিরেনি। আসলামের অসস্তি বাড়তেই লাগল। আজ খাবার খেতেও ইচ্ছে করছেনা। আসলামের প্রিয় মাছ সরপুঁটির তরকারির প্রতি আজ কোন আগ্রহ বোধ হচ্ছেনা। ধ্যানে মনে শুধু জামালই ঘুরছে।
জামাল ঘরে ফিরল অনেকটা রাত করে। বাবাকে জাগ্রত দেখে খানিকটা হতচকিয়ে ওঠে জামাল। কারণ, তার বাবা সাধারণত এতোক্ষণ জেগে থাকেনা। আসলাম ডাক দিল, জামাল! এদিকে আয়। জামাল ধীর পায়ে এগিয়ে গেল। আসলাম বলল, আজ পূর্বপাড়ার রহিম তোর নামে নালিশ নিয়ে এসেছে। তুই আর তোর বন্ধুরা মিলে তার মেয়েকে পথে ঘাটে উত্যক্ত করিস। এটা কি সত্য?  জামাল কিছুই বলেনা। চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। আসলাম বুঝে গেল, অভিযোগ সত্য। আসলাম তার ছেলের কর্মে দুঃখ পেল। এতো আদরের ছেলে আজ এতোবেশি বিগড়ে গেছে মনে হতেই, রাগে ক্ষোভে আসলামের চেহারা লাল হয়ে গেল। বলল, কিরে জামাল! কষ্ট কী জিনিস আমরা কি কখনো তোকে সেটা বুঝতে দিয়েছি? কখনো কি তুই কোন জিনিসের অভাব অনুভব করেছিস? আশপাশের মা বাপের চেয়ে আমরা কি তোকে কোনদিক দিয়ে কম আদর করেছি? তোকে আমরা যতœ করে বড় করেছি তোর এই অবনতি দেখার জন্য? জামাল তুই ভাল করে শুনে রাখ! আমরা তোকে আদর দিয়ে বড় করেছি এই আশায় যে, আমাদের ছেলে বড় হয়ে মানুষ হবে। সেই আশাই যদি পূরণ না হয়, তাহলে এমন ছেলে থাকার চেয়ে না থাকায় ভাল। তুই যদি ভাল হয়ে চলতে পারিস তাহলে ভাল। অন্যথায় আমার বাড়ি থেকে চলে যাবি। কথাগুলো বেশ আবেগের সাথে বলে ফেলেন আসলাম। এতোক্ষণে আসলামের চোখের কোণা হালকা ভিজে ওঠেছে। কুপিবাতির আলোয় চোখের জল চিকচিক করছে। পিতার চোখে অশ্রু দেখে ছেলে বদলে যাবে, এটাই ভেবেছিল আসলাম। কিন্তু ঘটল এর বিপরীত।  আসলাম ঘুম হতে জেগে শুনে জামাল বাড়িতে নেই। চলে গেছে ঢাকা। ছেলের কঠোর মানষিকতা দেখে অন্তরে ব্যথা পেল আসলাম।
জামাল বাড়ি থেকে বের হয়ে সোজা ঢাকা চলে আসে। ঢাকা এসে একটি গার্মেন্টসে কাজ শুরু করে। গার্মেন্টসে কাজ করার সময় পরিচয় হয় তার বউ বিউটির সাথে। একদিনের পরিচয় একসময় রুপ নেয় গভীর প্রেমে। অবশেষে সুখীজীবনের আশায় বিয়ে। বিয়ে পরবর্তী দু তিন মাস অনেক সুখে কাটান জামাল মিয়া। এরপর বদলে যায় বিউটি। পাল্টে যায় জামালের জীবন। জামাল লক্ষ্য করে, বিউটি এখন কেমন যেন অনেকটা বদলে গেছে। আগের মত মিষ্টি করে কথা বলে না। কর্কশভাষায় কথা বলে। পান থেকে চুন খসলেই ঝগড়া বাধিয়ে দেয়। দেখতে দেখতে জামাল দুই সন্তানের জনক হল। আর বিউটি দিনে দিনে আরো অশৃংখল হয়ে ওঠল। যেমন খারাপ ব্যবহার করে জামালের সাথে, তেমনি করে সন্তানের সাথে। আর ধর্মকর্মের ধার তো ধারেই না। সব মিলে জামালের অভাব যতটা কষ্টের কারণ, তারচে বড় কারণ তার বউ। সময়ের বিবর্তনে কত কিছুরই পরিবর্তন হয়েছে। কত নদী শুকিয়ে চড় হয়েছে!  কাঁচারাস্তা পিঁচঢালা রাস্তায় উন্নত হয়েছে! কত গ্রাম শহরের বেশ ধরেছে! পরিবর্তন আসেনি শুধু এই বিউটির মেজাজে। জামাল মনে মনে ভাবে, আমার বউ কি আবারও প্রেমময়ী হবে?  ওর মেজাজে পরিবর্তন আসা কি সম্ভব?  আচ্ছা! সব স্বামীরাই কি আমার মত কষ্টে আছে?  সব মেয়েরাই কি বিউটির মত?  দুনিয়াতে এমন স্ত্রী কি নেই? যে তার স্বামীকে সত্যিকারার্থে ভালবাসে? হয়তোবা আছে। তার ধারণা বাস্তবায়িত হয় এক হুজুর দম্পতিকে দেখে। জামাল একদিন রিকসা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। একজন হুজুর এসে সালাম দিয়ে বলল, ভাই! যাবেন কমলাপুর? জামাল দেখল, হুজুরের সাথে একজন মহিলা আছে। আপাদমস্তক যার বোরকায় ঢাকা। সম্ভবত হুজুরের স্ত্রী। জামাল রাজি হল। পথিমধ্যে জামাল লক্ষ্য করল, রিকসায় দুজন থাকা সত্তেও জামাল শুধু হুজুরের কথা আর হাসিই শুনছে। হুজুরের স্ত্রীর না শুনা যাচ্ছে কথা, না হাসি। তবে কি হুজুর নিজে নিজেই কথা বলছে আর হাসছে? না, এটা সম্ভব না। জামাল বুঝে গেল, হুজুরের সাথে হুজুরের স্ত্রীই কথা বলছে। আর সেটা এতোই নিচু স্বরে যে, সামনে বসা রিকসাওয়ালাও শুনতে পাচ্ছেনা। জামাল ভাবতে লাগল, আমার রিকসায় কত দম্পতি আর প্রেমিকযুগল চড়েছে; তারা উচ্চস্বরে কথা বলেছে। হেসে লুটিপুটি খেয়েছে। শুধু আমি নই, পাশঘেঁষে চলে যাওয়া অপর রিকসার লোকেরাও শুনতে পেরেছে। আজই প্রথম এমন একজন মহিলা পেলাম, যার কথা আমি শুনতে পারিনি। আহ! আমার বিউটি যদি এমন হতো। কিন্তু এটা কি সম্ভব?
একদিন সময় করে জামাল তাদের মহল্লার ইমাম সাহেবের কাছে গেল। ইমাম সাহেবকে তার স্ত্রীর ব্যপারে বিস্তারিত বলল। সাথে ঐ হুজুরের স্ত্রীর কথা। শেষে বলল, হুজুর! আমার বিউটি কি এমন হতে পারবে?
জবাবে ইমাম সাহেব বলল, দেখেন জামাল ভাই! আমাদের সমাজের যে পরিবেশ; তাতে দ্বীন শিখা ছাড়া কোনো মেয়েই আখলাকী, স্বামীভক্ত; খোদাভীরু হবেনা। এর জন্য প্রয়োজন দ্বীন শিক্ষা করা। আপনি যেই হুজুরের স্ত্রীর কথা বলেছেন সে অবশ্যই মাদরাসায় পড়েছে। যার ফলে তার জীবন এতোটা সুন্দর আর উন্নত হয়েছে। কিন্তু আপনার স্ত্রীর পক্ষে তো এটা সম্ভব নয়। তবে জামাল ভাই! আপনার জন্য একটি রাস্তা খোলা আছে। আপনি চেষ্টা করে দেখতে পারেন। আপনার স্ত্রীকে নিয়ে মাসতুরাতের জামাতে চলে যান। দেখেন, এর অসিলায় আপনার স্ত্রীর জীবনে কোনো পরিবর্তন আসে কি না?
জামাল হুজুরের পরামর্শ অনুযায়ী তার স্ত্রীকে প্রথমে তিন দিন করে তারপর দশ দিন এবং শেষে চল্লিশ দিনের জন্য মাসতুরাতের জামাতে চলে যায়। চিল্লা শেষে জামাল যখন বাড়িতে ফিরে আসে তখন, তার স্ত্রীর মাঝে বেশ পরিবর্তন লক্ষ্য করে। কথা বলে নরম স্বরে। বাচ্চাদেরকে নিয়মিত দ্বীন শেখায়। সবসময় নিজের পর্দার দিকে সতর্ক থাকে। জামালকে আগের তুলনায় অনেক বেশি ভালবাসে। বিউটির এই অসাধারণ পরিবর্তন দেখে জামাল আবেগাল্পুত হয়ে মহিয়ান গরিয়ান প্রভুর দরবারে সেজদায় লুটিয়ে পড়ে।

2 মন্তব্য রয়েছেঃ দ্বীনের পরশে : মুহাম্মদ আবু সালেহ

  1. shahanara begum says:

    শিক্ষনীয় ঘটনা। অবশ্যিই আমাদের সমাজে সত্যিকার ইসলামের চর্চা থাকলে সমাজে এত অশান্তি, হানাহানি আর উচ্ছৃংখলতা থাকতো না।

  2. মিরাজ says:

    ধন্যবাদ, সুন্দর হয়েছে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight