দৈনন্দিন মাসায়লে : নামাযরে ধারাবাহকি র্বণনা / মাওলানা শিব্বীর আহমদ

 
১. নিয়ত : নামাজের শুরুতে নিয়ত করা জরুরি। তবে মুখে উচ্চারণ করে নিয়ত করা জরুরি নয়। মনে মনে নিয়ত করাও যথেষ্ট। নিয়ত করুন—কোন নামাজ পড়ছেন, কত রাকাত পড়ছেন, তা ফরজ সুন্নত ওয়াজিব না নফল। ইমামের পেছনে হলে সেটিও নিয়ত করতে হবে।
২. তাকবিরে তাহরিমা : নিয়তের পর ‘আল্লাহু আকবার’ বলে নামাজ শুরু করতে হবে। একে তাকবিরে তাহরিমা বলে।
৩. তাকবির বলার সময় এমনভাবে হাত তুলুন, যেন আঙ্গুলগুলো কানের লতি বরাবর হয়।
একটি ভুল সংশোধন : হাত তোলার সময় হাতের ও পায়ের আঙ্গুলের মতো হাতের কব্জিও কেবলামুখী করে রাখা সুন্নত। কিন্তু কেউ কেউ দুই হাতের কব্জি কেবলামুখী করে রাখার পরিবর্তে কানের দিকে মুখ করে রাখে। কেউ আবার হাত দিয়ে কান ঢেকেই ফেলে। কেউ কান পর্যন্ত হাত উঠানোর পরিবর্তে একটু ইশারা করে। কেউ কানের লতি হাত দিয়ে ধরে। এগুলো সবই সুন্নত-পরিপন্থী। এসব থেকে বেঁচে থাকা উচিৎ।
৪. হাত বাঁধা : এরপর হাত বাঁধতে হবে। বাম হাতের কব্জিকে ডান হাত দিয়ে ধরে নাভির নীচে রাখতে হবে। ডান হাতের কনিষ্ঠাঙ্গুলি ও বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে বাম হাত চেপে ধরতে হবে আর অবশিষ্ট আঙ্গুলগুলো বাম হাতের বাহুর উপর বিছিয়ে রেখে দিতে হবে।
নাভির নীচে হাত রাখা প্রসঙ্গে হযরত আলী রা. বলেছেন, সুন্নত হলো নামাজে (হাতের) তালুর উপর তালু রেখে নাভির নীচে রাখা। [সুনানে আবু দাউদ, হাদীস : ৭৫৬]
উল্লেখ্য, কোনো কোনো হাদীসে নাভির উপরে হাত রাখার কথা এসেছে। ইমাম তিরমিযী রহ. বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন এভাবে—এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবী, তাবেয়ী এবং পরবর্তী আলেমগণের কর্মপদ্ধতি হলো—তারা নামাজে বাম হাতের উপর ডান হাত রাখাকেই নামাজের নিয়ম মনে করতেন। তবে তাদের কেউ কেউ দুই হাত নাভির উপরে রাখাকে উত্তম মনে করতেন আবার কেউ কেউ নাভির নীচে রাখাকে উত্তম মনে করতেন। এবং তাদের নিকট উভয় পদ্ধতিই বৈধ ছিল। [সুনানে তিরমিযী, হাদীস : ২৫২ এর আলোচনায়]
সাহাবী ও তাবেয়ীগণের আমল সম্পর্কিত উপরোক্ত বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো নাভির উপরে হাত বাঁধতেন, কখনো নাভির নীচে। কিন্তু বুকে হাত বাঁধার কথা কোনো সহীহ হাদীসে নেই এবং তা কোনো সাহাবী ও তাবেয়ীর আমল দ্বারাও প্রমাণিত নয়। তাই এ রীতিকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামমের সুন্নত বলা ঠিক নয়।
নামাজ শুরু করার পর দাঁড়ানো অবস্থায়
ছানা পড়া : তাকবিরে তাহরিমার পর প্রথমে সুবহানাকাল্লাহুম্মা (ছানা) পড়তে হবে।
সুরা ফাতেহা : ছানা শেষে প্রথমে আউযুবিল্লাহ ও বিসমিল্লাহ পড়তে হবে। এরপর সুরা ফাতেহা পড়তে হবে।
ফরজ নামাজের প্রথম দুই রাকাতে এবং নফল-সুন্নত নামাজের প্রতি রাকাতে সুরা ফাতেহা পড়া ওয়াজিব। ফরজ নামাজের তৃতীয় ও চতুর্থ রাকাতে সুরা ফাতেহা পড়া সুন্নত।
মুকতাদি সুরা ফাতেহা পড়বে না : সুরা ফাতেহা পড়ার উপরোক্ত বিধান কেবল সে ব্যক্তির জন্যে যে একাকী কিংবা ইমাম হিসেবে নামাজ পড়ছে। কিন্তু যারা মুকতাদি, ইমামের পেছনে নামাজ পড়ছে তারা শুধু ছানা পড়েই ক্ষান্ত থাকবে। ইমাম জোরে কিংবা আস্তে—যেভাবেই কেরাত পড়ুক, মুকতাদি কোনো অবস্থাতেই সুরা ফাতেহা কিংবা অন্য কোনো সুরা পড়বে না। বরং মনোযোগ দিয়ে শুনবে এবং চুপ থাকবে।
আমীন বলা : সুরা ফাতেহা শেষে আমীন বলা একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত। সুরা ফাতেহা শেষ হলে ইমাম-মুকতাদি ও একাকী নামাজ আদায়কারী সকলেই আস্তে আস্তে আমীন বলবে।
অন্য সুরা মিলানো : ফরজ নামাজের প্রথম দুই রাকাতে এবং নফল ও সুন্নত নামাজের প্রতি রাকাতেই সুরা ফাতেহার পর অন্য যে কোনো সুরা মিলাতে হবে। তবে ফরজ নামাজের তৃতীয় ও চতুর্থ রাকাতে সুরা ফাতেহার পর অন্য সুরা মিলাতে হবে না।
একটি সতর্কতা : নামাযে জিহবা ও ঠোঁট নাড়িয়ে কেরাত পড়া আবশ্যক। বরং কেরাত এমন হতে হবে যাতে নিজ কানে তা শোনা যায়। কেউ কেউ মুখ-ঠোঁট না নাড়িয়েই কেরাত পড়ে—এটাও সঠিক পন্থা নয়। আবার কেউ কেউ মুখে উচ্চারণ করে পড়ার পরিবর্তে মনে মনে পড়ার কল্পনা করে। এমন করলেও নামায হবে না।
রুকুতে
তাকবির বলা : সুরা মিলানো শেষে ‘আল্লাহু আকবার’ বলে রুকুতে যেতে হবে।
পিঠ সোজা রাখা : রুকুতে শরীরের উপরের অংশ এমনভাবে ঝুঁকিয়ে দিন, যাতে ঘাড় ও পিঠ একটি সোজা রেখার মত হয়ে যায়। এর চেয়ে বেশিও ঝুঁকাবেন না, এর চেয়ে কমও না। ঘাড় এত বেশি ঝুঁকাবেন না, যাতে চিবুক বুকের সাথে লেগে যায়। আবার এমন উপরেও রাখবেন না যাতে ঘাড় কোমর থেকে উঁচুতে থাকে। বরং ঘাড় ও কোমর বরাবর হতে হবে।
রুকুর পদ্ধতি : রুকুতে দুই হাতের আঙ্গুলগুলো ফাঁক ফাঁক করে দুই হাঁটুর উপর রাখুন। এভাবে ডান হাত দিয়ে ডান হাঁটু আর বাম হাত দিয়ে বাম হাঁটু ধরে রাখুন। হাত ও পা থাকবে সোজা।
তাসবিহ পাঠ : প্রতি রুকুতে তিনবার ‘সুবহানা রাব্বিয়াল আযীম’ পাঠ করুন।
ধীরস্থিরভাবে রুকু করা : রুকু-সেজদা অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে আদায় করতে হবে।
রুকু থেকে দাঁড়ানোর সময়
রুকু থেকে দাঁড়ানোর পদ্ধতি : রুকু থেকে শান্তভাবে উঠে দাঁড়ান এবং এতটুকু সোজা হয়ে দাঁড়ান, যাতে শরীরের কোনো অংশ বাঁকা হয়ে না থাকে।
রুকু থেকে উঠার দোয়া : রুকু থেকে উঠার সময় ‘ছামিয়াল্লাহু লিমান হামিদাহ’ বলুন এবং স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ুন ‘রাব্বানা লাকাল হামদ’।
একটি সতর্কতা : কেউ কেউ সোজা হয়ে দাঁড়ানোর পরিবর্তে দাঁড়ানোর দিকে একটু ইশারা করে। শরীর ঝুঁকে থাকা অবস্থায়ই সেজদায় চলে যায়। এমন করলে নামাজ দ্বিতীয়বার পড়া ওয়াজিব হবে। তাই এ থেকে যতেœর সাথে বিরত থাকতে হবে। যতক্ষণ পুরো শরীর স্থিরভাবে সোজা না হবে, ততক্ষণ সেজদা করা যাবে না।
সেজদায় যাওয়ার সময়
আগে হাঁটু রাখা : সেজদায় যাওয়ার সময় প্রথমে হাঁটু বাকিয়ে মাটিতে রাখুন, এরপর প্রথমে হাত ও পরে চেহারা রাখুন।
তাকবির বলা : সেজদায় যাওয়ার সময় ‘আল্লাহু আকবার’ বলুন।
সেজদায়
সেজদার পদ্ধতি : সেজদায় কপাল ও নাক ভালোভাবে মাটিতে রাখুন। চেহারা থাকবে উভয় হাতের মাঝে। চেহারা দুই হাতের মাঝে এমনভাবে রাখুন, যাতে দুই হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলির মাথা কানের লতির সামনে থাকে। উভয় বাহু পাঁজর থেকে দূরে এবং কনুই মাটি থেকে উঁচুতে রাখুন।
সাত অঙ্গের উপর সেজদা : সাত অঙ্গের উপর ভর দিয়ে সেজদা করতে হয়—কপাল ও নাক, দুই হাতের তালু, দুই হাঁটু, দুই পায়ের পাতার প্রান্ত।
পায়ের আঙ্গুল কিবলামুখী করে রাখা : সেজদার সময় পায়ের আঙ্গুলগুলো যথাসম্ভব কিবলামুখী করে রাখুন। দুই পা মিলিয়ে না রেখে ফাঁক করেই রাখুন।
তাসবিহ পড়া : প্রতি সেজদায় তিনবার ‘সুবহানা রাব্বিয়াল আ’লা’ পড়ুন।
স্থিরতা অবলম্বন করা : রুকুর মতো সেজদাও ধীরস্থিরভাবে আদায় করতে হবে।
একটি সতর্কতা : লক্ষ রাখুন, সেজদার সময় পা মাটি থেকে যেন উঠে না যায়। কারও কারও সেজদা তো এমন—সেজদার সময় পায়ের আঙ্গুলগুলো সে মোটেও মাটিতে রাখে না। এমন করলে সেজদা আদায় হবে না। ফলে নামাজও হবে না। এ থেকে যতেœর সাথে বিরত থাকতে হবে।
দুই সেজদার মাঝে
বসার পদ্ধতি : প্রথম সেজদা থেকে ‘আল্লাহু আকবার’ বলে সোজা হয়ে বসুন। বসার সময় বাম পা বিছিয়ে এর উপর বসুন। ডান পা এমনভাবে খাড়া করে রাখুন, যাতে এর আঙ্গুলগুলো কেবলামুখী থাকে। কেউ কেউ দুই পা খাড়া রেখে পায়ের গোড়ালির উপর বসে—এটা সঠিক পন্থা নয়।
সম্পূর্ণ সোজা হয়ে বসুন।
এভাবে না বসে কেবল সামান্য মাথা তুলে আবার সেজদায় চলে যাওয়া গোনাহ। এমনটি করলে নামাজ পুনরায় আদায় করা ওয়াজিব হবে।
দোয়া পড়া : দুই সেজদার মাঝে এই দোয়া পড়ুন—‘আল্লাহুম্মাগ ফিরলী ওয়ার হামনী ওয়াজবুরনী ওয়াহদিনী ওয়ারযুকনী’ অথবা রাব্বীগ ফিরলী রাব্বীগ ফিরলী।
দ্বিতীয় সেজদা এবং তা থেকে ওঠা
১. প্রথম সেজদার মতোই দ্বিতীয় সেজদা আদায় করুন। যে কোনো নামাজের প্রতি রাকাতে দুটি সেজদা করা ফরজ।
২. এসময় প্রথমে চেহারা, পরে হাত এবং সবশেষে হাঁটু ওঠান।
৩. প্রথম রাকাত শেষে দ্বিতীয় সেজদা থেকে সোজা উঠে দাঁড়ান। এসময় মাটিতে ভর না দিয়ে পায়ের ওপর ভর দিয়েই দাঁড়াতে হবে।
৪. প্রথম রাকাতের পর না বসেই দাঁড়িয়ে যান।
৫. পরবর্তী প্রতিটি রাকাতের কিয়াম-রুকু-সেজদা সবকিছু প্রথম রাকাতের মতোই হবে। তবে সুরা ফাতেহার পূর্বে ছানা ও আউযুবিল্লাহ পড়তে হবে না। শুধু বিসমিল্লাহ বলে পড়া শুরু করবে।
 
বৈঠকের সময়
১. বসার পদ্ধতি : দুই সেজদার মাঝে যেভাবে বসার কথা বলা হয়েছে, দ্বিতীয় ও শেষ রাকাতের পর তাশাহহুদের জন্যে সেভাবেই বসুন।
২. তাশাহহুদ : প্রত্যেক নামাজের প্রতিটি বৈঠকেই তাশাহহুদ অর্থাৎ আত্তাহিয়্যাতু দোয়াটি পড়ুন।
৩. আঙ্গুল দিয়ে ইশারা : আততাহিয়্যাতু পড়ার সময় যখন ‘আশহাদু আল্লা ইলাহা’ আসবে, তখন শাহাদাত আঙ্গুল দিয়ে ইশারা করুন। যখন ‘ইল্লাল্লাহ’ বলবেন, তখন আঙ্গুল নামিয়ে নিন।
ওয়ারযুকনী’ অথবা রাব্বীগ ফিরলী রাব্বীগ ফিরলী।
আঙ্গুল দিয়ে ইশারা করার পদ্ধতি এমন—প্রথমে মধ্যমা আঙ্গুলি ও বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে বৃত্ত বানিয়ে নিন। কনিষ্ঠাঙ্গুলি ও এর সাথের আঙ্গুলটি গুটিয়ে রাখুন। শাহাদাত আঙ্গুল এমনভাবে ওঠান, যেন তা কেবলার দিকে ঝুঁকে থাকে। আকাশের দিকে সম্পূর্ণ সোজা করে রাখবে না। ‘ইল্লাল্লাহ’ বলার সময় আঙ্গুল নামিয়ে নিন। তবে অন্যান্য আঙ্গুলগুলো বৈঠকের শেষ পর্যন্ত আগের মতোই রেখে দিন।
৪. দরুদ শরীফ পড়া : প্রথম বৈঠকে শুধু তাশাহহুদ পড়েই উঠে যান। আর শেষ বৈঠকে তাশাহহুদের পর দরুদ শরীফ পড়া সুন্নত।
৫. দোয়ায়ে মাছুরা পড়া : দরুদ শরীফের পর প্রচলিত দোয়ায়ে মাছুরা পড়া যেতে পারে। এছাড়া অন্য দোয়াও পড়া যেতে পারে।
৬. সালাম ফেরানো : এরপর প্রথমে ডান দিকে এবং পরে বাম দিকে সালাম ফেরান। সালামের মধ্য দিয়েই নামাজ শেষ হয়ে যায়।
৭. সালাম ফেরানোর পদ্ধতি : দুই দিকে সালাম ফিরানোর সময় ঘাড় এতটুকু ঘোরান, যেন পেছনের কাতারে যে আছে সে আপনার গাল দেখতে পায়।
[বিশেষ দ্রষ্টব্য : বাংলা ভাষায় আরবি শব্দের সঠিক উচ্চারণ লেখা বা পড়া সম্ভব নয়। তাই শুধু বাংলা উচ্চারণ দেখে আরবি দোয়া বা সুরা-কেরাত শিখলে তা শুদ্ধ না হওয়ার আশংকাই বেশি। এজন্যে এগুলো মূল আরবি দেখে কিংবা মূল আরবি উচ্চারণ কারও কাছ থেকে শুনে শেখা উচিত। বাংলায় যথার্থভাবে আরবি শব্দের প্রতিবর্ণায়ন সম্ভব নয় বলেই আমরা এখানে তাশাহহুদ, দরুদ শরীফ ইত্যাদির বাংলা উচ্চারণ উল্লেখ করি নি। ছোট যে দোয়াগুলোর বাংলা উচ্চারণ উল্লেখ করেছি, পাঠকবৃন্দের কাছে সেগুলোও মূল আরবি উচ্চারণের সঙ্গে মিলিয়ে পড়ার সবিনয় অনুরোধ রইল।]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight