দৈনন্দিন মাসআলা-মাসায়েল : ওজুর মাসায়েল / মাওলানা শিব্বীর আহমদ

ওজুর ফজিলত
নামাজকে বলা হয় দীনের স্তম্ভ, আর নামাজের চাবি হলো ওজু। নামাজ পড়তে হলে প্রথমেই ওজু করে পবিত্রতা হাসিল করতে হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘কারও ওজু ভেঙ্গে গেলে পুনরায় ওজু করা পর্যন্ত তার কোনো নামাজই কবুল করা হয় না।’ [সহীহ বুখারী, হাদীস : ১৩৫]
ওজুর ফরজ
ওজুর ফরজ চারটিÑ ১. সমস্ত মুখম-ল ধোয়া, ২. দুই হাত কনুইসহ ধোয়া, ৩. মাথা মাসেহ করা, ৪. দুই পা টাখনুসহ ধোয়া। [সূরা মায়েদা, ৫ : ৬]
মাসআলা : মুখম-ল ধোয়ার সময় চুলের গোড়া থেকে থুতনির নীচ পর্যন্ত, এক কানের লতি থেকে আরেক কানের লতি পর্যন্ত সবটুকু ধুইতে হবে।
মাসআলা : দুই হাত কনুইসহ এবং দুই পা টাখনুসহ ধুইতে হবে। পুরো মাথার চার ভাগের এক ভাগ মাসেহ করতে হবে।
মাসআলা : উপরের কাজগুলো একবার করে করা ফরজ। এগুলোর কোনো একটি ছুটে গেলে কিংবা সামান্য একটু শুকনো থাকলেও ওজু হবে না।
মাসআলা : যদি পানি কম থাকার কারণে কিংবা অন্য কোনো সংকটের কারণে কেউ শুধু ওজুর ফরজগুলো আদায় করে তাহলেও ওজু হয়ে যাবে।
ওজুর সুন্নত
১. বিসমিল্লাহ বলা, ২. দুই হাত কব্জি পর্যন্ত ধোয়া, ৩. মেসওয়াক করা, ৪. কুলি করা, ৫. নাকে পানি দেয়া, ৬. হাতের আঙ্গুলগুলো খেলাল করা, ৭. সমস্ত মাথা একবার মাসেহ করা, ৮. কান মাসেহ করা, ৯. পায়ের আঙ্গুলগুলো খেলাল করা, ১০. প্রতিটি অঙ্গ তিনবার করে ধোয়া।
ওজু করার ধারাবাহিক পদ্ধতি
বিসমিল্লাহ বলে ওজু শুরু করবে। প্রথমে উভয় হাতের কব্জি পর্যন্ত তিনবার করে ধুইবে। এরপর তিনবার কুলি করবে এবং মেসওয়াক করবে। যদি মেসওয়াক না থাকে তাহলে মোটা কাপড় কিংবা আঙ্গুল দিয়ে হলেও দাঁত পরিষ্কার করবে। গরগরা করবে। তবে রোজা অবস্থায় গরগরা না করাই ভালো। এরপর তিনবার নাকে পানি দেবে। বাম হাত দিয়ে নাক পরিষ্কার করবে। এরপর তিনবার মুখ ধুইবে। ভ্রুর নীচে কিংবা কানের লতির সামনে শুকনো থেকে যেতে পারে। এ জায়গাগুলো ভালোভাবে ধুয়ে নিতে হবে। এরপর ডান হাত কনুইসহ তিনবার ধুইবে। এরপর বাম হাত। উভয় হাত ধোয়ার পর এক হাতের আঙ্গুল আরেক হাতের আঙ্গুলের মাঝে প্রবেশ করিয়ে খেলাল করবে। হাতের আংটি চুরি ইত্যাদি থাকলে এগুলো নাড়িয়ে ভালোভাবে ভেতরে পানি পৌঁছাতে হবে। এরপর সমস্ত মাথা একবার মাসেহ করবে। এরপর কান মাসেহ করবে। শাহাদাত (তর্জনি) আঙ্গুল দিয়ে কানের ভেতরের দিক আর বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে কানের বাইরের দিক মাসেহ করতে হয়। এরপর উভয় হাতের পিঠ দিয়ে ঘাড় মাসেহ করবে। সবশেষে তিনবার টাখনুসহ ডান পা এবং তিনবার টাখনুসহ বাম পা ধুইতে হবে।
মাসআলা : উল্লিখিত এ ধারাবাহিকতা রক্ষা করে ওজু করা সুন্নত। যদি কেউ এ ধারাবাহিকতা রক্ষা না করে ওজু করে, যেমন, আগে কনুই পর্যন্ত হাত ধোয়ার পর মুখ ধুইল অথবা পা ধোয়ার পর মাথা মাসেহ করল, তাহলে যদিও ওজু হয়ে যাবে, কিন্তু এমন করা সুন্নতের পরিপন্থী।
মাসআলা : এক অঙ্গ ধোয়ার পর তা শুকিয়ে যাওয়ার পূর্বেই আরেক অঙ্গ ধোয়া উচিত। এর ব্যতিক্রম হলে ওজু হয়ে যাবে ঠিক, তবে সুন্নতের খেলাপ হবে।
মাসআলা : ওজুতে যে অঙ্গগুলো ধোয়া ফরজ, সেখানে যদি এমন কোনো কিছু লেগে থাকে, যার কারণে চামড়ায় পানি পৌঁছে না, যেমন রং, তাহলে ওজু হবে না। ওজু করার পর যদি হাতে পায়ে বা মুখে লেগে থাকা কোনো রংয়ের ফোটা বা এমন কোনো  কিছু দেখা যায়, তাহলে তা উঠিয়ে ঐ জায়গাটুকু ধুয়ে নিলেই হবে। অবশ্য নখের ভেতর স্বাধারণত যে ময়লা থাকে, একারণে ওজুতে কোনো সমস্যা হবে না।
মাসআলা : হাতের আংটি চুরি ইত্যাদির কারণেও যদি চামড়া না ভেজে, তাহলেও ওজু হবে না।
মাসআলা : মুখম-ল, দুই হাত কনুই পর্যন্ত এবং দুই পা টাখনু পর্যন্ত একবার করে ধোয়া ফরজ আর তিনবার করে ধোয়া সুন্নত। এছাড়া ওজুর শুরুতে কব্জি পর্যন্ত দুই হাত ধোয়া, কুলি করা ইত্যাদিও তিনবার করে করা সুন্নত। তবে এক-দুইবার করে করলেও ওজু হয়ে যাবে।
মাসআলা : সর্বোচ্চ তিনবার করে ধোয়াই সুন্নত। এর বেশি ধোয়া উচিত নয়, মাকরুহ।
মাসআলা : ওজুতে প্রতিটি অঙ্গই যেন ভালোভাবে ধোয়া হয় সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। বিশেষত শীতকালে যখন হাত-পায়ের চামড়া শুষ্ক থাকে, তখন যতেœর সঙ্গে ওজু না করলে কোথাও কোথাও শুকনো থেকে যেতে পারে। বিশেষত পায়ের গোড়ালি। তাই শীতকাল হোক আর গ্রীষ্মকাল হোক, যতেœর সঙ্গে পূর্ণরূপে ওজু করতে হবে।
মাসআলা : বর্তমানে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ওজুতে পানির অপচয় হয়। পানির অপচয় যেন না হয় সেদিকে যথাসম্ভব লক্ষ রাখতে হবে।
মাসআলা : সরাসরি পানির টেপ ছেড়ে কিংবা টিউবওয়েল চেপে ওজু করলে পানির অপচয় হওয়াটাই স্বাভাবিক। সেক্ষেত্রে কোনো পাত্রে, যেমন বদনা মগ বালতি ইত্যাদিতে পানি নিয়ে সেখান থেকে ওজু করলে এ অপচয় থেকে বাঁচা যায়।
মাসআলা : মগ বা বালতি থেকে বারবার হাতে পানি নিয়ে ওজু করলে অবশিষ্ট পানি নাপাক হয় না। এমন এক পাত্র থেকে একসঙ্গে একাধিক মানুষ কিংবা একজন ওজু করার পর অবাশিষ্ট পানি দিয়ে আরেকজন ওজু করাতে কোনো সমস্যা নেই।
মাসআলা : ওজুর শেষে গামছা তোয়ালে ইত্যাদি দিয়ে শরীরের ভেজা অঙ্গগুলো মোছাও জায়েজ।
মাসআলা : ওজুর শেষে একবার কালেমায়ে শাহাদাত পড়া সুন্নত।
মাসআলা : একবার ওজু করে নামাজ পড়ার পর পরবর্তী নামাজের সময় যদি ওজু থাকে তাহলে আগের ওজু দিয়েও নামাজ পড়া যাবে। এতে সমস্যা নেই। তবে প্রত্যেক নামাজ নতুন নতুন ওজু দিয়ে পড়া ভালো।
মাসআলা : একবার ওজু করার পর সেই ওজু দিয়ে যদি এমন কোনো ইবাদত করা না হয় যা ওজু ছাড়া আদায় করা যায় না, যেমন নামাজ, তওয়াফ ইত্যাদি, তাহলে সেই ওজু থাকাবস্থায় দ্বিতীয়বার ওজু করা  মাকরুহ। আর যদি প্রথম ওজু দিয়ে দুই রাকাত নফল নামাজও পড়া হয় তাহলেও দ্বিতীয়বার ওজু করায় কোনো সমস্যা নেই। বরং ওজু করলেই বেশি সওয়াব পাওয়া যাবে।
মাসআলা : ওজু করার সময় মুখে উচ্চারণ করে নিয়ত করার কিছু নেই। তবে ওজু শুরু করার সময়ই মন আল্লাহ তায়ালার দিকে রুজু হওয়া উচিত। মনে মনে চিন্তা করা উচিত, আল্লাহ তায়ালার সামনে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ার জন্যে কিংবা আল্লাহ তায়ালার পাক কালাম তেলাওয়াত করার জন্যে আমি ওজু করছি। যে উদ্দেশ্যে ওজু করা হচ্ছে, এভাবে সে উদ্দেশ্যটির কথা তখন চিন্তা করা যেতে পারে। এতে সহজেই ওজুর সৌন্দর্য ও ওজুর প্রতি যতœ বেড়ে যেতে পারে।
ওজুতে মাকরুহ বিষয়
১. চেহারা ধোয়ার সময় জোরে পানি মারা, ২. বাম হাতে কুলি করা কিংবা নাকে পানি দেয়া, ৩. ডান হাতে নাক ঝাড়া ও পরিষ্কার করা, ৪. তিনবার মাথা মাসেহ করা।
মেসওয়াক
মেসওয়াক করা একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল। প্রতিবার ওজু করার সময়ই মেসওয়াক করা সুন্নত। হাদীস শরীফে আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : মেসওয়াক করলে মুখের পবিত্রতা ও আল্লাহর সন্তুষ্টি হাসিল হয়। আরেক হাদীসে আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : আমি যদি আমার উম্মতের জন্যে কষ্টকর মনে না করতাম, তাহলে তাদেরকে প্রত্যেক নামাজের সময় মেসওয়াক করার আদেশ করতাম।
গাছের ডাল দিয়েই মেসওয়াক করা সুন্নত। এর দুটি দিক―এক. দাঁত পরিষ্কার করা, দুই. গাছের ডাল হওয়া। ব্রাশ ব্যবহার করলে দাঁত পরিষ্কার করার সুন্নত আদায় হয়ে যাবে, কিন্তু গাছের ডাল ব্যবহার করার সুন্নত আদায় হবে না।
তাহিয়্যাতুল ওজু
ওজু করার পর দুই রাকাত ‘তাহিয়্যাতুল ওজু’ নামাজ পড়া ভালো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : যে কেউ সুন্দররূপে ওজু করে, এরপর পূর্ণ মনোযোগের সঙ্গে দুই রাকাত নামাজ পড়ে, তার জন্যে বেহেশত অবধারিত হয়ে যায়। [সুনানে আবু দাউদ, হাদীস : ৯০৬]
তবে তা অবশ্যই এমন সময়ে হতে হবে, যখন নফল নামাজ পড়া জায়েজ। নফল নামাজ পড়া জায়েজ নয় কিংবা মাকরুহ এমন কোনো সময় এ তাহিয়্যাতুল ওজু পড়া যাবে না।
চলবে ইনশাআল্লাহ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight