দেওবন্দের এদারা / মোস্তফা কামাল গাজী

মসজিদে রশিদে ফজর পড়ে বাইরে এলাম। বসন্তের ঝকঝকে একটা সকাল। মৃদু বাতাসে একটু একটু শীত লাগছে। মসজিদের বেলে পাথরের বিশাল চত্বর। তার একপাশে ফুলের বাগান। নানা রঙের ফুল ফুটে আছে সেখানে। নাম না জানা চমৎকার কিছু হলুদ রঙের ফুল গাছের ডালে ঝুলছে। শিশিরজলে ভেজা ফুলগুলো বেশ লাগছে। তবে এতো ফুলের মাঝেও প্রজাপতি উড়ছে না কোথাও। নেই পাখির কূজন। বসন্তের সিংহভাগ সৌন্দর্যই অনুপস্থিত এখানে। তাই নিজের দেশ ও গ্রামের কথা বড্ডো মনে পড়ে। পায়চারি করতে করতে সূরা ইয়াসিন পড়ে নিলাম। ১৪২৩ হিজরিতে বিশাল এলাকা জুড়ে নির্মিত হয় এই মসজিদ। দেওবন্দের দৃষ্টিনন্দন ভবনগুলোর মাধ্যে এটি একটি। দিল্লির জামে মসজিদ, আগ্রার তাজমহল থেকে কোনো দিক দিয়ে কম নয়। তাই পর্যটকমহলের কাছে এটি সুন্দরের মধ্যমণি। এর বেসমেন্টে কওমিশিার প্রাথমিক ধাপের সর্বোচ্চ কাস দাওরায়ে হাদিসের অধ্যাপনা হয়। প্রায় আঠার’শ ছাত্রের অপূর্ব মিলনলেলা নজর কাড়ে সবসময়।
মসজিদের দেিণ মাদ্রাসার মূল ভবন। সেখানে ঢুকতে পুরোনো আমলের বিশাল একটা গেট। নাম, ‘মাদানি গেট’। হযরত হুসাইন আহমদ মাদানি রহ. এ পথ দিয়ে আসা যাওয়া করতেন। তাই এ নামে নামকরণ। ইংরেজি বর্ণ ‘এল’ আকারে পূর্ব-পশ্চিম দিকে তিনতলা বিশিষ্ট বিশাল ভবন। নাম ‘দারে জাদিদ’। মাঝখানে বিশালাকরের ‘বাবুজ জাহির’ গেট। আফগান বাদশাহ জাহির শাহের তোহফা এটি। তার নামেই নামকরণ। এর ভেরত ছোট ছোট অনেকগুলো কামরা। এর একটি কামরায় অধমের থাকার জায়গা। এর ওপরে বিখ্যাত আইনশাস্ত্র ফতোয়ায়ে শামির অধ্যয়নাগার। গেটের সামনে একটুখানি খালি জায়গা। সুন্দর বসার জায়গা। অবসর সময়ে এখানটায় বসে আড্ডা দেয়া যায় বেশ। গেটের ঠিক সামনে সাদা গম্বুজবিশিষ্ট দরসগাহ। একসময় এখানে দাওরায়ে হাদিসের কাস হতো বলে নাম ‘পুরাতন দারুল হাদিস’। নিচের দিকের সব ক’টি কাস এখনো হয় এখানে। একটু সামনে এগোলে এহাতায়ে মুলছরি। দুটি বিশাল বকুল গাছ। গাছদুটি ঘিরে রয়েছে অসংখ্য দেয়াল পত্রিকা। হিন্দি, উর্দু, ফারসি, আরবি, বাংলা, ইংলিশ, তামিল ও তেলেগু ভাষার দেয়ালিকাগুলো নজর কাড়ে। কাসের ফাঁকে সাহিত্যপ্রেমীদের ভিড় লেগেই থাকে। একপাশে নওদারা। স্বপ্নযোগে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর চিহ্নিত রেখা অনুসরণে নির্মিত এটি। বরকতের উদ্দেশ্যে এখনো দেওবন্দের সকল জানাযা এখানেই পড়া হয়। এর সামনের দিকে জলপানের সুন্দর ব্যবস্থা। গরমকালে ঠা-া পানি পাওয়া যায়। এখানেই ঐতিহাসিক সে কূপটা ছিলো, যেখান থেকে স্বপ্নযোগে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছাত্রদের দুধপান করিয়েছেন। যারাই সে দুধ পান করেছে, দেওবন্দের ছাত্র হবার সুযোগ মিলবে একসময়। একপাশে ইফতা, তাফসির, কেরাতসহ কারিগরি শিাবিভাগ। পশ্চিমে দারুল উলুমের লাইব্রেরি, তাবলিগ বিভাগ, দারে জাদিদ কদিম এবং বর্ডিং। একটু সামনে শায়খুল হিন্দ একাডেমি আর ফার্সিখানা। নওদারার পূর্বপাশে মসজিদে কদিম এবং সদর গেট। হযরত কাসেম নানুতুবি রহ. এ পথে চলতেন বলে এর নাম দেয়া হয়েছে ‘কাসেমি গেট’। গেটের একপাশে দারুল উলুমের মেহমানখানা। এর পশ্চিমপাশে মসজিদে সাত্তা। হযরত কাসেম নানুতুবি রহ. এখানেই ইবাদত করতেন। তাঁর ইবাদতখানা আজো বিদ্যমান। মসজিদের একপাশে ছিলো ঐতিহাসিক ডালিম গাছ। যার নিচে বসে কওমি মাদ্রাসার সর্বপ্রথম দরস দেয়া হয়। যার শিক ছাত্র উভয়ের নাম ছিলো মাহমুদ। তখন ছিলো ১৮৬৬ সাল। ইংরেজদের অত্যাচারে নিষ্পেষিত মুসলমানদের জীবন। নিজেদের শিা সংস্কৃতি হারাতে বসেছে কেবল। আলেমগণ ভারতবর্ষ থেকে ইসলাম নিশ্চিহ্ন হওয়ার আশংকায় উৎকণ্ঠিত। কোনো সুরহা খুঁজে পাচ্ছেন না তাঁরা। ঠিক তখনি স্বপ্নযোগে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নির্দেশে এবং তাঁর চিহ্নিত রেখায় নির্মিত হয় বর্তমানের ঐতিহ্যবাহী কওমি ধারার অন্যতম বিদ্যাপীঠ আল জামিয়াতুল ইসলামিয়া দারুল উলুম দেওবন্দ। যার শাখা এখন বিশ্বময়। দেওবন্দ মাদ্রাসা শুধু শিানিবাস নয়; একটি আন্দোলনও। এ আন্দোলনের প্রভাবে একসম ইংরেজরা দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়।
মসজিদে রশিদের বাইরে একটা রাস্তার ওপাশেই রয়েছে আরো বড় বড় চারটে মঞ্জিল। আজমি মঞ্জিল, আফ্রিকি মঞ্জিল, শায়খুল হিন্দ মঞ্জিল এবং দারুল কুরআন। আফ্রিকি মঞ্জিল দুইতলা আর বাকি সবগুলো তিনতলা করে। এ সবগুলোই ছাত্রাবাস। কাসরুম আর ছাত্রাবাস আলাদা।
জল, বিদ্যুৎ আর দু-বেলা আহার সম্পূর্ণ ফ্রি। শুধু ভর্তি পরীায় নাম এলেই হলো। এর আশপাশে রয়েছে আরো শ-খানেক মসজিদ মাদ্রাসা।
কাস শেষে সবাই একসঙ্গে বের হলে মনে হয় ফেরেশতার শুভ্র সফেদ এক কাফেলা।
দেওবন্দ, ইউপি, ভারত।

আমার অবহেলা ও কলমের অভিমান (রোজনামচা )
মুহাম্মদ রাসেল রাবী
আজ শুক্রবার। সপ্তাহশেষে একটু নীরবতায় নিশ্বাস নেবার দিন আজ। আমার সঙ্গে আমার কলমটাও যাতে একটু প্রশান্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারে তাই বসলাম খাতা নিয়ে। দ্বিতীয় সাময়িক পরীার প্রস্তুতির জন্য প্রায় একমাস পর আজই কলমটা হাতে নিলাম। কিন্তু একি! দীর্ঘদিন পর সাাতে কারাগারের কয়েদির মত দেখাচ্ছে ওকে। যেন সবেমাত্র ছাড়া পাওয়া শক্তিহীন কঙ্কালসার দেহ সে। কী বলে ব্যক্ত করবে নিজের এই মুহূর্তটা? সেই শক্তিটুকুও যেন নেই ওর মুখে। দীর্ঘণ পর পর দু-একধাপ অগ্রসর হয়ে আবারো থেমে যাচ্ছে। শব্দের তালে মিলে হাঁটতেই পারছে না। কেনই বা পারবে, নিশ্বাস ফেলার মত ব্যস্ততা আবার সেই ফাঁকে ধূর্ত অলসতার কারাগারে বন্দী থেকে শব্দের সুরই যে ভুলে গেছে ও। কী হবে এখন ওর? ওকে দেখতেই তো বিরক্ত লাগছে। এতই নাকাল অবস্থা হবে ওর কে জানতো আগে। অন্যথায় আবশ্যক কাজগুলোর মধ্যেও অল্প সময় হলেও ওর পিছনে ব্যয় করতাম। তাছাড়া এই কিশোর বয়সে কি আর শিশুর মত হাত ধরে হাঁটানো যায়? বেশির থেকে বেশি ডানে যাও, ওদিকে যেয়ো না, ভেবে চিন্তে পা ফেলো ইত্যাদি বলা যায়। কিন্তু পাখি দেখিয়ে ফিডার-ভরাদুধ খাওয়ানো এখন তো মোটেই অসম্ভব। এখন বুঝতে পারছি আদীব হুজুরের (আবু তাহের মেসবাহ) কথার দাম। বুঝতে পারছি রোজনামচা লেখার গুরুত্বও।
আরে, ঐ তো! ঐ তো এখন হাঁটছে দেখি। ধীরে ধীরে আমার দিকেই তো আসছে। কিছু বলবেও মনে হচ্ছে।  কি হে প্রিয়! ওভাবে তাকিয়ে আছো কেন, কিছু বলবে? হ্যাঁ, বলবো। তা বলো শুনি। দেখেছো আমায়, কেমন হয়েছি আমি? কী রূপ নিয়েছে আমার বর্তমান? শুধু তোমার জন্য। শুধু তোমায় ভালবেসে। কেন, কেন আমায় হাতছানি দিয়ে ডেকেছিলে তখন বারবার? আমি তো চাইনি তোমায়। চাইনি তো আমি তোমার হতে। তবুও কেন ভালবেসেছিলে আমায়। কেন আমার পিছু পিছু উন্মাদের মত ঘুরেছিলে সারাণ। সময় অসময় সবসময় কেন আমায় বিরক্ত করেছিলে। ভুলে গেছো সবই?
মনে নেই, আমাকে নিয়ে ব্যস্ত থাকায় কতজন কত কথা বলেছিলো তোমায়? পড়াশোনা নষ্ট, ব্রেনের য়, সময় অপচয় আরো কত কি। এতকিছুর পরেও কেন স্বপ্ন দেখতে আমায় নিয়ে? কেন ইস্পাতের মত শক্ত হাতে ধরে রেখেছিলে আমায়?
তোমার আশা-বিশ্বাস, কষ্ট-যন্ত্রণা, ত্যাগ-তিতিক্ষা, অসহায়ত্ব ও একাকিত্ব যখন বাধ্য করলো আমাকে তোমায় মেনে নিতে, আমাকে নিয়ে তোমার সফলতার যখন শুরুমাত্র, আমার দেয়া প্রতিশ্রুতি যখন সবার দ্বারে দ্বারে বলে বেড়াচ্ছিলে, ঠিক তখনই আমি হলাম তোমার চরম অবহেলার পাত্র। কেন? কেন এই অবহেলা। কী দোষ আমার। সযতেœ আমায় বুকে নিয়ে কেন তবে ফেলে দিচ্ছো আবার।
প্লিজ প্রিয়! আর কেঁদো না। আর কোনদিন এমন হবে না। শত সমস্যার সম্মুখেও তোমার অবহেলা করবো না কখনো। মাফ করে দাও এবার। মা করো আমায়।
তাহলে আমাকে ছুঁয়ে বলো, যতদিন না আমি তোমার জীবনের বিশেষ বিশেষণ হবো, যতœ করবে আমায়। মনে রাখবে এবং অনুশীলন করবে প্রতিনিয়ত।
অবশ্যই হে প্রিয়! এই যে তোমায় ছুঁয়ে বলছি দেখো, আমি যদি বেঁচে থাকি আর প্রভু যদি সহায় হোন, তোমায় কথা দিচ্ছি, অবশ্যই তোমাকে আমার জীবনের বিশেষ সঙ্গি বানাবো ইনশাআল্লাহ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight