দাম্পত্ত জীবনের শান্তি কোন পথে! মুফতী আব্দুল্লাহ আল নোমান

মহান আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করার সাথে সাথে তার জীবন ধারণের জন্য কিছু চাহিদা দিয়েছেন এবং চাহিদা মিটানোর পদ্ধতিও বলে দিয়েছেন। মানব জীবনে খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার ন্যায় জৈবিক চাহিদাও গুরুত্বপূর্ণ। এই চাহিদা পূরণের জন্য ইসলাম বিবাহের বিধান দিয়েছে। আল্লাহ তা‘য়ালা পৃথিবীর প্রথম মানুষ আদম আ.-কে নিজ হাতে সৃষ্টি করেছেন। পরবর্তী বংশ বৃদ্ধির জন্য হাওয়া আ.-কে সৃষ্টি করে আদম আ. -এর সাথে বিবাহের ব্যবস্থা করেন। মানব জীবন প্রণালী পরিবর্তনের সাথে সাথে বিবাহের নিয়মেও পরিবর্তন ঘটেছে। অবশেষে শেষ নবী মুহাম্মাদ সা. জাহেলী যুগের সকল কুসংস্কার দূর করে নারীদেরকে বিবাহের মাধ্যমে মর্যাদা দান করেছেন। কিন্তু কালের বিবর্তনে বাংলাদেশের মুসলমানগণ বিবাহের ইসলামী পদ্ধতি ভুলে অনেকটা বিধর্মীদের রসম-রেওয়াজের সাথে মিশে গেছে। আলোচ্য প্রবন্ধে বিবাহের গুরুত্ব, সঠিক সময় ও বিবাহের সুন্নত তরিকাসহ কিছু নিয়ম-পদ্ধতি সম্পর্কে আলোচনা পেশ করা হল।

বিবাহের গুরুত্ব
মহান আল্লাহ পৃথিবীর সবকিছু জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি করেছেন। [যারিয়াত ৫১/৪৯]। এমনকি লতা-পাতা, গাছ-পালাও। [ইয়াসীন ৩৬/৩৬]  তেমনি মহান আল্লাহ মানুষকে নারী-পুরুষে  বিভক্ত করেছেন।  [হুজুরাত ৪৯/১৩, নিসা ৪/১] এবং একে অপরের প্রতি আকর্ষণীয় করে দিয়েছেন।
ইসলামে নারী-পুরুষের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন, বসবাস ও জৈবিক চাহিদা পূরণের একমাত্র পন্থা হিসাবে বিবাহের প্রচলন করা হয়েছে। এজন্য প্রত্যেক অভিভাবককে তাদের অধীনস্থদের বিবাহের ব্যবস্থা করার নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে যারা স্বামীহীন তাদের বিবাহ সম্পাদন কর এবং তোমাদের দাস-দাসীদের মধ্যে যারা সৎ তাদেরও।’ [সূরা নূর ২৪/৩২]
বিবাহের মাধ্যমে মানুষ তার দৃষ্টিকে সংযত করে যৌনাঙ্গের পবিত্রতা রক্ষার মাধ্যমে জান্নাতের পথ সুগম করতে সক্ষম হয়। রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, ‘হে যুবসমাজ! তোমাদের মধ্যে যারা বিবাহের সামর্থ্য রাখে, তাদের বিবাহ করা কর্তব্য। কেননা বিবাহ হয় দৃষ্টি নিয়ন্ত্রণকারী, যৌনাঙ্গের পবিত্রতা রক্ষাকারী। আর যার সামর্থ্য নেই সে যেন ছিয়াম পালন  করে। কেননা  ছিয়াম  হচ্ছে যৌবনকে  দমন করার মাধ্যম’। [বুখারী ৫০৬৫, মুসলিম ১৪০০, মিশকাত ৩০৮০]

বিবাহের সঠিক সময়
বিবাহ মানুষের জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। একজন মানুষ যেমন মাধ্যমিক শেষ না করে উচ্চ মাধ্যমিক এ উত্তীর্ণ হতে পারে না ঠিক তেমনি একটি সঠিক সময়ের আগেও বিবাহিত জীবন শুরু করা উচিৎ না। ছেলে হোক বা মেয়ে হোক সবারই একটা সঠিক সময়ে বিয়ে করা উচিৎ। কেননা বিয়ের জন্য দুই ধরনের প্রস্তুতির প্রয়োজন। প্রথমত মানসিক এবং দ্বিতীয়ত শারীরিক। দুইটাই সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিয়ে মানেই হল একটা দায়িত্ব পূর্ণ জীবন। সে যদি ছেলে হয় তবে তাকে একজন মেয়ের সম্পূর্ণ দায়িত্ব গ্রহন করতে হবে আর সেই দায়িত্ব পালনের জন্য তার থাকতে হবে সেই সামর্থ্য অর্থাৎ তাকে প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। কেননা যতই ভালোবাসা থাকুক না কেন অভাব যখন দরজায় আসে ভালোবাসা তখন জানালা দিয়ে পালায়। আর যদি সে মেয়ে হয় তাহলে তাকে স্বামী সংসার সহ পুরো একটা পরিবারের দায়িত্ব নিতে হবে। তাই তাকেও মানসিক ভাবে সবল হতে হবে। সেই সাথে  ছেলে হোক মেয়ে হোক দুজনকেই শারীরিক ভাবে পরিপক্ব হতে হবে।
এই জন্য বয়সেরও একটা ব্যাপার আছে কারন বয়সের সাথে সাথেই মানুষের শারীরিক ও মানসিক পরিপক্কতা আসে। আবার অনেক সময় দেখা যায় জীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে হতে বিয়ের বয়সের সীমারেখা পেরিয়ে যায়। সেই দিকটাতেও খেয়াল রাখা উচিৎ। কারন বর্তমানে মানুষের গড় আয়ু এমনিতেই কম।
আর ডাক্তার দের মতে  তাড়াতাড়ি বিয়ে করলে নাকি আয়ু বাড়ে। তাই সবকিছু ঠিক করে একটা নির্দিষ্ট সময়ে বিয়ে করা উচিৎ। সাধারণত একটা মেয়ের বিয়ের সঠিক সময় হল ১৬-২২ আর ছেলের জন্য সঠিক সময় হল ২৪-৩০। এর মধ্যেই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত  করে বিয়ে করা উচিৎ।

বিবাহের কতিপয় সুন্নত
যে সকল ভাইয়েরা/বোনেরা বিবাহ উপযুক্ত বা যাহারা বিবাহ নিয়ে ভাবছেন তাদের অথবা যারা অভিবাবক আছেন তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। কারণ তারা নিজেরা যদি সুন্নতের উপর আমল করেন তাহলে সমাজ সুন্দর, সুস্থ এবং স্বাভাবিক হবে। কেননা বিবাহ একটি সহজ কাজ। সুন্নতের অনুসরণ না করে বিধর্মীদের অনুকরণ করার কারনে এটা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে ব্যভিচার সহজ হয়ে সমাজ ব্যবস্থা দিন দিন খারাবের দিকে ধাবিত হচ্ছে। এখন আমরা যদি সম্মিলিত ভাবে সুন্নত মুতাবেক বিবাহের কাজ আঞ্জাম দেই তাহলে পরিবারে নেমে আসবে অনাবিল সুখ শান্তি এবং পারিবারিক বন্ধনও হবে সুদৃঢ়। নি¤েœ বিবাহের সুন্নতগুলো কমবেশি আলোকপাত করা হল-
(১) মাসনূন বিবাহ সাদা সিধে ও অনাড়ম্বর হবে, যা অপচয়, অপব্যয়, বেপর্দা ও বিজাতীয় সংস্কৃতি মুক্ত হবে এবং তাতে যৌতুকের শর্ত বা সামর্থের অধিক মহরানার শর্ত থাকবেনা। [তাবারানী আউসাত, হাদিস নং- ৩৬১২]
(২) সৎ ও খোদাভীরু পাত্র-পাত্রীর সন্ধান করে বিবাহের পূর্বে পয়গাম পাঠানো। কোন বাহানা বা সুযোগে পাত্রী দেখা সম্ভব হলে, দেখে নেয়া মুস্তাহাব। কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে ঘটা করে পাত্রী দেখানোর যে প্রথা আমাদের সমাজে প্রচলিত তা সুন্নতের পরিপন্থী ও পরিত্যাজ্য। [বুখারী হাদিস নং-৫০৯০, ইমদাদুল ফাতাওয়া-৪: ২০০]
(৩) শাউয়াল মাসে এবং জুমুয়ার দিনে মসজিদে বিবাহ সম্পাদন করা। উল্লেখ্য, সকল মাসের যে কোন দিন বিবাহ করা জায়িয আছে। [মুসলিম ১৪২৩/ বায়হাকী ১৪৬৯৯]
(৪) বিবাহের খবর ব্যাপকভাবে প্রচার করে বিবাহ করা এবং বিবাহের পরে আকদ অনুষ্ঠানে উপস্থিত লোকদের মাঝে খেজুর বন্টন করা। [বুখারী/৫১৪৭]
(৫) সামর্থানুযায়ী মোহর ধার্য করা। [আবু দাউদ/২১০৬]
(৬) বাসর রাতে স্ত্রীর কপালের উপরের চুল হাতে নিয়ে এই দোয়া পড়াঃ “আল্লাহুম্মা ইন্নি আস আলুকা খয়রাহা ওয়া খয়রা মা জাবালতুহা আলাইহি ওয়াওযুবিকা মিন শার্রিহা মিন শার্রিমা জাবালতাহা আলাইহি” [আবু দাউদ/২১৬০]
(৭) স্ত্রীর সঙ্গে প্রথমে অন্তরঙ্গতা সৃষ্টি করবে, তার পর যখনই সহবাস এর ইচ্ছা হয়, তখন প্রথমে নিম্নোক্ত দু’আ পড়ে নিবে: “বিসমিল্লাহি আল্লাহুম্মা জান্নিবনা শাইতনা ওয়া জান্নিবিশশাইতনা মা রকাজকতনা” [মুসলিম/১৪৩৪]
(উপরোক্ত দোয়া না পড়লে শয়তানের তাছীরে বাচ্চার উপর কু-প্রভাব পড়ে। অতঃপর সন্তান বড় হলে, তার মধ্যে ধীরে ধীরে তা প্রকাশ পেতে থাকে এবং বাচ্চা নাফরমান ও অবাধ্য হয়। সুতরাং পিতা মাতাকে খুবই শতর্ক থাকা জরুরী)
(৮) বাসর রাতের পর স্বীয় আত্মীয় স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, শুভাকাংখী এবং গরীব মিসকীনদের তাউফীক অনুযায়ী ওলীমা খাওয়ানোর আয়োজন করা। [মুসলিম/১৪২৭]
(৯) কোন পক্ষ যেওরের শর্ত করা নিষেধ এবং ছেলের পক্ষ থেকে যৌতুক চাওয়া হারাম। [আহসানুল ফাতাওয়া ৫/১৩]
(১০) কনের ইজিন বা অনুমতির জন্য স্বাক্ষীর কোন প্রয়োজন নাই। সুতরাং ছেলের পক্ষের লোক ইজিন শুনতে যাওয়া অনর্থক এবং বেপর্দা। সুতরাং তা নিষেধ। মেয়ের কোন মাহরুম বিবাহের এবং উকীল হওয়ার অনুমতি নিবে। [মুসলিম/১৪২১]
(১১) শর্ত আরোপ করে বর যাত্রীর নামে বরের সাথে অধিক সংখ্যক লোকজন নিয়ে যাওয়া এবং কনের বাড়িতে মেহমান হয়ে কনের পিতার উপর বোঝা সৃষ্টি করা আজকের সমাজের একটি জঘন্য কু-প্রথা, যা সম্পূর্ণ রুপে পরিত্যাগ করা আবশ্যক। [মুসনাদে আহমাদ/২০৭২২, বুখারী/২৬৯৭]
(১২) ওলীমায় অতিরিক্ত ব্যয় করা কিংবা খুব উচু মানের খানার ব্যবস্থা করা জরুরী নয়। বরং সামর্থানুযায়ী খরচ করাই সুন্নত আদায়ের জন্য যথেষ্ট। যে ওলীমায় শুধু ধনী ও দুনিয়াদার লোকদের দাওয়াত দেওয়া হয়, দ্বীনদার ও গরীব-মিসকিনদের দাওয়াত দেওয়া হয়না, সে ওলীমাকে হাদিসে নিকৃষ্টতম ওলীমা বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। সুতরাং এ ধরনের ওলীমা আয়োজন থেকে বিরত থাকা উচিত। [আবু দাউদ /৩৭৫৪]
আল্লাহ আমাদের সবাইকে সুন্নাহ মোতাবেক বিবাহ করার তৌফিক দান করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight