তাজা ঈমানের শক্তি / তানভীর রহমান

আরবের উত্তপ্ত মরুর সকল প্রতিকূলতাকে উপেক্ষা করে, স্বীয় জীবনকে আল্লাহর রাহে সোপর্দ করার দৃঢ় সংকল্প নিয়ে বদরের প্রান্তরের দিকে নির্ভীক পানে এগিয়ে চলছে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাতে গড়া সত্য ও ন্যায়ের ঝান্ডাবাহী একদল নকীব। যারা শির থাকতে দেননি আমামা। ছিলেন যারা আল্লাহর প্রেমে মূর্তমান এক উপমা। উদ্দেশ্য তাদের একটাই, ইসলামের চিরশত্রু কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে ইসলামের মর্যাদাকে সমুন্নত করত: অনাচারের কবর রচনা করা, সত্য ও সুবিচারের সৌধ নির্মান করা। কিন্তু তাদের কাছে নেই যুদ্ধের প্রয়োজনীয় সাজ-সরঞ্জাম। মুজাহিদদে সংখ্যা মাত্র ৩১৩। আবার তাদের অধিকাংশই সমর কৌশলে অনভিজ্ঞ। যুদ্ধাস্ত্র বলতে শুধু দুটি ঘোড়া, মুষ্টিমেয় তরবারি আর বল্লম। অপর দিকে আবু জাহেলের নেতৃত্বে লৌহবর্মে আচ্ছাদিত কুরাইশদের ১০০০ প্রশিক্ষিত কাফের যুদ্ধের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করে রওয়ানা হয়েছে। অস্ত্রে-শস্ত্রেও তারা ছিল টইটম্বুর। তাদের ছিল ১০০ ঘোড়, ৭০০ উট আর শত শত যুদ্ধাস্ত্র।
সাধারণ দৃষ্টিতে দেখলে মুসলমানদের এই উদ্যোগকে হাস্যকর বলে মনে হয়। তবুও মুসলমানগণ অকুতোভয়। কেননা, তারা নেতা হিসেবে পেয়েছে সেই মহামানবকে যিনি ন্যায়ের পথ বাতলে দেওয়া এবং কুফরী অন্ধকার দূরীভূত করার জন্যই আবির্ভূত হয়েছেন। আর তাদের দৃঢ় বিশ্বাস ও আস্থা সেই লা শরীক মহান প্রভুর উপর যিনি মজলুমের পক্ষে যেকোন মুহূর্তে গায়েবী নুসরাতের ব্যবস্থা করবেন।
প্রতীক্ষার পালা শেষ। দীর্ঘ ৮০ মাইলের দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে মুসলমানগণ বদরের প্রান্তরে এসেছে। প্রতিপক্ষ কাফেররাও উপস্থিত। কাফেরদের চোখে মুখে অন্ধকার ও জিঘাংসার ছাপ সুস্পষ্ট। নিরস্ত্র মুসলমানদের দেখে তারা মুচকি মুচকি  হাসছে আর দুনিয়া থেকে মুসলমানদের অস্তিত্ব বিলীন করার স্বপ্ন দেখছে। কিন্তু, আল্লাহর দরবারে কোন সিদ্ধান্ত গৃহীত ছিল সে সম্পর্কে কারোই ধারনা ছিল না। দু’পক্ষেরই পৌঁছাতে রাত হয়ে যাওয়ায় যুদ্ধ পরদিন থেকে শুরু হবে বলে সিদ্ধান্ত হল। সফরের কান্তি দূর করতে সকলেই তখন নিদ্রায় বিভোর হল। ২য় হিজরীর ১৭ ই রমজান। পূর্ব দিগন্তে দিনের সূর্য উকি দিতেই দু’দলই প্রস্তুত। একদিকে দাঁড়িয়ে আছে শাহাদাতের নেশায় পাগলপারা ঈমানী আদর্শে বলীয়মান কিছু মুসলমান। অপরদিকে দাঁড়িয়ে আছে প্রতিশোধের আগুনে প্রজ্বলিত অহংকারী কাফেররা। তৎকালীন যুদ্ধের নিয়ম অনুযায়ী দ্বন্দ্ব যুদ্ধের মাধ্যমে যুদ্ধ শুরু হল। মুসলমানদের পক্ষ থেকে ময়দানে নামলেন হযরত আলী রা. হযরত হামযাহ রা. এবং হযরত উবায়দা রা. কাফেরদের পক্ষ থেকে যুদ্ধে নামল ওয়ালিদ, উতবাহ এবং শাইবাহ। হযরত আলী রা. ওয়ালীদকে আক্রমন করলেন। হযরত হামযাহ রা. শাইবার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামলেন। হযরত উবাইদা রা. মুকাবেলা করলেন উতবার। তুমুল দ্বন্দযুদ্ধ শুরু হল। দম্ভের কারণে জ্বলন্ত অনকুন্ডিতে পরিণত হওয়া কাফেরদের তিন সৈনিকের উপর আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে ঈমানী বলে বলীয়ান মুসলানদের তিন মর্দে মুজাহিদ। দু পক্ষেরই মাঝে উৎকণ্ঠ বিরাজমান। সবারই মনে এক প্রশ্ন, কী হবে যুদ্ধের ফলাফল? কিছুক্ষণের মধ্যেই আলী রা. ওয়ালীদকে পরাজিত করে জাহান্নামে পাঠিয়ে দিলেন। হযরত হামজা রা. স্বীয় প্রতিপক্ষের উপর আঘাত হেনে তার ভবলীলা সাঙ্গ করে দিলেন। তবে হযরত উবায়দা রা. নবীন যোদ্ধা হওয়ায় উতবার আক্রমণে আহত হয়ে গেলেন। তখনই হযরত আলী রা. ও হযরত হামযাহ রা. উতবার উপর আক্রমণ করে তাকেও জাহান্নামের অতল গহ্বরে পাঠিয়ে দিলেন। তৎক্ষণাৎ আলী রা. স্বীয় আহত সাথীকে কাঠে উঠিয়ে নিয়ে উপস্থিত হলেন দরবারে রিসালাতে। আহত উবায়দা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করলেন, আমি কি শহীদের মর্যাদা পাব? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ, তুমি শহাদাত লাভে ধন্য হবে। এই কথা শুনার পর উবায়দা রা. খুবই আনন্দিত হন। মুসলমানরা যখন যুদ্ধ শেষে বিজয়ের কেতন উড়িয়ে ফিরে আসছিল তখন তিনি শহীদের ইতিহাসে নকীব হয়ে রইলেন। দ্বন্দ্ব যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর দু’পক্ষের সম্মিলিত আক্রমণ শুরু হল। দ্বন্দ্ব যুদ্ধে কাফেরদের তিন সর্দার নিহত হওয়ায় তারা মনোবল হারিয়ে ফেলল। তবুও আবু জাহেলের নেতৃত্বে তারা যুদ্ধ করতে থাকল। এদিকে মুসলমানদের সর্বাধীনায়ক হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর দরবারে হাত তুললেন। নিরস্ত্র মুসলমানদের জন্য আল্লাহর দরবারে গায়েবী সাহায্য প্রার্থনা করলেন। মুনাজাত শেষ করে দেখলেন যে, আল্লাহ তাআলা মুসলামনদের পক্ষে যুদ্ধের জন্য ফেরেশতাদের এক মুবারক জামাত পাঠিয়েছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই দৃশ্য দেখে খুবই আনন্দিত হলেন। তিনি তৎক্ষণাৎ সাহাবীদের মাঝে গিয়ে বলে দিলেন, তোমরা নিরাশ হয়ো না। আমি দেখতে পাচ্ছি, হযরত জিব্রাঈল আ. ফেরেশতাদের নিয়ে ময়দানে এসে গিয়েছেন। একথা শুনে সাহাবীগণ নতুনভাবে যুদ্ধে উদ্যমী হলেন। আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণে তুমুল যুদ্ধ শুরু হলো। কাফেররা অস্ত্রে সুসজ্জিত থাকলেও গায়েবী নুসরাত পাওয়া মুসলমানদের আক্রমণে হিমশিম খাচ্ছিল। হঠাৎ করেই আবদুর রহমান ইবনে আউফ রা. উপলব্ধি করতে পারলেন যে, কেউ তাকে ডাকছে। পিছনে তাকিয়ে দেখলেন যে, এ যুদ্ধের সবচেয়ে ছোট দুই যোদ্ধা মুআয এবং মুআব্বেজ, তারা আবদুর রহমান ইবনে আউফ রা. কে জিজ্ঞাসা করল, চাচা, আপনি কী আবু জাহেলকে চিনেন? সে নাকি আমাদের নবীকে গালি-গালাজ করে। আল্লাহর শপথ, আমরা তাকে না মেরে ছাড়ব না। হযরত ইবনে আউফ রা. আবু জাহেলকে দেখিয়ে দিলেন। তারা ঐ নরপশুকে দেখামাত্রই বাজপাখির মত তার উপর ঝাপিয়ে পড়ল। অকস্মাৎ এই আক্রমণের প্রতিরোধ করার মত সুযোগ আবু জাহেল তৈরি করতে পারল না। কিন্তু আবু জাহেলের পুত্র ইকরামা মুআব্বেজের উপর তরবারীর আঘাত হানলেন, তার হাত শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তবুও তারা আবু জাহেলের উপর আক্রমণ চালাতেই থাকে। অবশেষে সেও জনমের মত ঠান্ডা হয়ে গেল। কাফেরদের শীর্ষ চার নেতা নিহত হওয়ায় তারা একেবারে নিস্তেজ হয়ে পড়ল। একদিনেই এই যুদ্ধ শেষ হয়। নিরস্ত্র মুসলমানগণই এ যুদ্ধে বিজয় লাভ করেন। ৭০ জন কাফের যুদ্ধে মারা যায় এবং ৭০ জন কাফের বন্দী হয়। অপর দিকে ৩১৩ জনের নিরস্ত্র বাহীনীর মাত্র ১৪ জন মুজাহিদ শাহাদাতের অমীয় সুধা পান করেন। এই যুদ্ধ ইসলামী ইতিহাসের তাৎপর্যপূর্ণ একটি যুদ্ধ। এই যুদ্ধের মাধ্যমে ইসলামের শৌর্য-বীর্য প্রকাশ পায়। মুসলমানদের সার্বিক উন্নতি আর কাফিরদের লাঞ্ছনার সূচনা হয়। এই যুদ্ধে মুসলামনরা যুদ্ধের প্রয়োজনীয় সাজ-সরঞ্জামের দিক দিয়ে অনেক পিছিয়ে ছিল। তবুও তারা জয় লাভ করে। কেননা, তাদের ঈমান ছিল খাঁিট। তাদের হৃদয়ে ছিল নবী প্রেমের অনন্য দৃষ্টান্ত। তারা দুনিয়ার কোন জাতি বা যুদ্ধাস্ত্রকে ভয় করেনি। বরং ভয় করেছিল আল্লাহ তাআলাকে। স্বীয় ঈমানী শক্তির কারণেই তারা গায়েবী নুসরত পেয়েছিল। অপরদিকে কাফেররা তাদের অস্ত্রের উপর ভরসা করেছিল তারা নিরস্ত্র মুসলমানদের দেখে অহংকার করেছিল। এর ফলেই তাদের পতন হয়। কিন্তু আফসোসের বিষয়, যে ঈমানী শক্তির বলে মুসলমানগণ বদরের প্রান্তরে ঐতিহাসিক বিজয় লাভ করেছিল বর্তমান সমাজে সেই ঈমানী শক্তির খুবই অভাব। বিজাতিরা মুসলমানদের ঈমানের নূরকে ধ্বংস করতে নানা ধরনের ষড়যন্ত্র করছে। কারণ, তারা জানে যদি মুসলমানদের মধ্যে ঈমানী শক্তি থাকে তবে ঈসলামের সেই সোনালী যুগ আবারও ফিরে আসবে। বড় দুঃখের বিষয় কাফেরদের তৈরি সেই ফাঁদে পা দিয়ে মুসলমানরা তাদের ঐতিহ্যকে বিলীন করে দিয়েছে। আর প্রতিফল তো আমরা নিজেরাই অবলোকন করতে পারছি। যে মুসলমানরা চাটাই বসে বিশ্বশাসন করেছে তারা তাদের আলোকিত ইতিহাসকে ভুলে গিয়ে কাফেরদের গোলামী করছে। আজ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভেসে আসে নিরস্ত্র মুসলমানদের হাহাকার। কাফেরদের নির্মম অত্যাচারের ফলে প্রতিনিয়তই শত শত মায়ের বুক খালি হচ্ছে, অসংখ্য শিশু তাদের পিতা-মাতাকে হারিয়ে অনাথ হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে। এখন সবারই মনে একই প্রশ্ন, কেন এই অধঃপতন? বিস্ময়ের সাথে বলতে হয়, এই অধঃপতনের জন্য দায়ী আমরা নিজেরাই। পার্থিব সম্পদের কাছে নিজেদের ঈমানকে বিক্রি করে দিয়ে আমরা ধ্বংস ডেকে এনেছি। যদি আমরা সবাই নিজেদের ঈমানকে খাঁটি করতে পারি। তবে আর কোন মুসলমানের আর্তনাদ শুনতে হবে না। সেই সোনালী যুগ আবারও ফিরে আসবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে ঈমানী আদর্শে বলীয়ান হয়ে আল্লাহ সন্তুষ্টি হাসিল করার তাওফীক দান করুন। আমীন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight