তাওবা এবং তার পরবর্তী করণীয় সমূহ : মো. কামরুল ইসলাম

যে তাওবা করে ও ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে, তারাই তবে বেহেশতে প্রবেশ করবে, তাদের প্রতি কোন অন্যায় করা হবে না। [সূরা মারিয়ম : ৬০]

কোনো গুনাহ বা অন্যায় হয়ে গেলে সাথে সাথে অথবা পরবর্তীতে তার জন্য অনুতপ্ত হয়ে, আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করাকেই তাওবা বা ইস্তিগফার বলে। গুনাহ আল্লাহর রাগ গোস্বার উপকরণ। আল্লাহ রাগ হলে মসিবত চাপিয়ে দেন, সংকটে ফেলেন, রোজিরোজগারে বরকত কমিয়ে দেন। কিন্তু মানুষ যখন সেই গুনাহ থেকে মুক্তি পেতে তাওবা করে তখন আল্লাহর রাগ প্রশমিত হয়। কজেই তখন তিনি চাপিয়ে দেওয়া মসিবত তুলে নেন। তাওবা করার দ্বারা আখেরাতের শাস্তি মোচন হয়ে যায়। দুনিয়ার মধ্যে যদি কোনো প্রকার শাস্তি প্রধান করা হয়, যেমন- কেউ ব্যভিচার করল এবং তাকে পাথর মেরে শাস্তি দেওয়া হলো এবং সে মৃত্যু বরণ করল, মৃত্যুর আগে যদি সে তাওবা না করে তাহলে আখেরাতে তার শাস্তি দেওয়া বাকি রয়ে যাবে। তবে যদি তাওবা করে থাকে তাহলে আশা করা যায় তার শাস্তি আখেরাতে মওকুফ করা হবে।
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন,  যে ব্যক্তি তাওবা করে এবং ভালো কাজ করতে থাকে এবং মন্দ কাজ পরিত্যাগ করে, আল্লাহ তাআলা তার পাপসমূহ মোচন করে দেন এবং মন্দ কর্মগুলিকে ভাল কর্মে পরিণত করে দেন। আল্লাহ তাআলা ক্ষমাকারী পরম দয়ালু। [সুরা ফুরকান : ৭০] হাদীস শরীফে বলা হয়েছে, এক ব্যক্তি হাশরের ময়দানে উপস্থিত হবে, আল্লাহ তাআলা তাকে ডাকবেন এবং বলবেন, নিকটে আসো। সে নিকটে আসবে, আল্লাহ বলবেন, আরো নিকটে আসো। সে ভয়ে কাঁপতে থাকবে এবং নিকটবর্তী হবে, তখন আল্লাহ তার কানে কানে কথা বলবেন। আল্লাহ তার ছোট ছোট গুনাহসমূহ মনে করে দিয়ে বলবেন, এগুলো কেন করেছিলে? তার কোনো উত্তর থাকবেনা। সে তার কৃতকর্ম গোপন করতে চাইবে। ভয়ে কাঁপতে থাকবে  আর বলবে, হায় আমার কোন মুক্তির উপায়  নেই! আল্লাহ তখন ফেরেশতাদের বলবেন, যাও তাকে জাহান্নামে নিয়ে যাও। আপত্তি করার কেনো উপায় থাকবেনা। তবে মৃত্যুর সময় যদি সে তাওবা করে গিয়ে থাকে, তাহলে আল্লাহ তার কৃত ওয়াদা অনুযায়ী বলবেন, তার গুনাহ গুলোকে সওয়াবে রুপান্তরিত করে দাও। তখন সে  বলবে, হে আল্লাহ আমি তো আরো অনেক গুনাহ করেছি  যেগুলো তুমি জিজ্ঞেস করার সময় গোপন করেছিলাম। তখন আল্লাহর পক্ষ হতে বান্দার উপর রহমত বর্ষিত হবে। তখন ধ্বংসের সম্ভাবনা থাকবেনা। আর এগুলো মূলত তাদের প্রাপ্য-যারা তাওবা করে, নেক আমল করে, কারণ সে তো তাওবা করেছে। তবে আল্লাহ না করুন, যদি কোন কারণে আল্লাহ বান্দার উপর রাগান্বিত হয়ে যান তাহলে বাঁচার কোনো পথ থাকবেনা। এবার যার খুশি সে তাওবা করে আসবে আর যার খুশি সে তাওবা ছাড়া আসবে। তাওবার দরজা কারো জন্য বন্ধ হয়ে যায়নি। একজন মুমিনের জন্য আবশ্যক হলো সে যেন আল্লাহর রহমত হতে নৈরাশ না হয়। তাওবার দরজা তখন বন্ধ হয়ে যাবে যখন সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উদিত হওয়া শুরু হবে। সুতরাং কেউ যদি সত্তর বছর বয়সে গুনাহ থেকে ফিরে আসে এবং তাওবা করে, আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দিবেন। আল্লাহ তাআলা বলেন- এবং নিঃসন্দেহে আমি তো পরম গোনাহ মাফকারী, তার জন্য যে তাওবা করে এবং বিশ্বাস স্থাপন করে ও সৎকর্ম করে, তারপর সঠিক পথে চলে। [সূরা ত্বাহা : ৮২]
হাদীস শরীফে এসেছে কেউ যিনা করল এবং সে লজ্জা করল ও অনুতপ্ত হলো তারপর হাত উঠিয়ে আল্লাহর কাছে বলল, হে আমার রব! বাকি শব্দগুলো বলার আগে আল্লাহ বলেন, তুমি তাহলে জেনে গেছো যে, তোমার একজন রব আছে, তার কাছে তোমার জিজ্ঞাসিত হতে হবে। যখন জেনে গেছো তখন তোমাকে ক্ষমা করে দেয়া হলো। হাদীসে আছে কোনো ব্যক্তি যদি দিনে সত্তর বার গুনাহ করে এবং সত্তর বার তাওবা করে তবে আল্লাহ তাআলা তাকে সত্তর বার মাফ করে দেন। তবে নিয়ত অবশ্যই খালেস হতে হবে।
রাসূল সা. বলেন, হে লোক সকল! তোমরা গুনাহ করতে করতে অতৃপ্ত হয়ে যাও; কিন্তু আল্লাহ তাআলা ক্ষমা করতে করতে অতৃপ্ত হন না। তোমাদের গুনাহ করার একটা সীমারেখা আছে কিন্তু আল্লাহর ক্ষমা করার কোনো সীমারেখা নেই। সুতরাং যদি শয়তানের ওয়াসওয়াসায় পড়ে আমাদের থেকে কোন গুনাহ হয়েও যায় তাহলে আমাদের উচিত তৎক্ষণাত তাওবা করে নেয়া। আর তাওবা পরবর্তী সময়ে যেন আমরা এ ব্যপারে বদ্ধপরিকর হই যে, এ কাজ আর কখনও করবনা এবং কৃতকর্মের উপর লজ্জিত হই। আর সামনে সে কাজ না করার দৃঢ় সংকল্প করি। অনেক সময় শয়তান ধোঁকায় ফেলে যে, আরে এখনও অনেক সময় আছে তাওবা করার, পরে তাওবা করে নেব। এখন তো সবে মাত্র যুবক! বৃদ্ধ হই, পরে আমল করা যাবে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। কারো মৃত্যু বরণ করার জন্য বৃদ্ধ হতে হয় না। যুবক বা সুস্থ অসুস্থও মৃত্যুর জন্য শর্ত না। যে কোন মূহুর্তেই মৃত্যু হতে পারে। আসলে বাস্তব দৃষ্টিতে তাকালে বুঝা যায় যে, যুবকরাই বেশি মৃত্যু বরণ করে। কারণ একটা বড় কোন মজলিসে বা বাজারে, সভা সমিতি বা গ্রাম মহল্লায়, আমরা কাদের বেশি দেখতে পাই? নিশ্চই যুবকদের! এটাই প্রমাণ যে যুবকরা বেশি মৃত্যুবরণ করে। যদি সবাই বৃদ্ধ হয়ে মারা যেত তাহলে বৃদ্ধ মানুষ বেশি চোখে পড়ত, অথচ বাস্তবতা এর উল্টো। বৃদ্ধ হওয়ার তো প্রশ্নই আসেনা, এমনও তো হতে পারতো যে, আমি আমার মায়ের গর্ভেই মারা যেতে পারতাম। এমন ঘটনা তো অহরহ আছে। সুতরাং বুঝা গেল এমন চিন্তা শুধুই ধোঁকা। দুনিয়া বা জীবন কোনটারই কোনো ভরসা নেই। সুতরাং এখনি সময়। এখনি, এক মূহুর্তও দেরি করা ঠিক হবে না। তাওবা করে নিজেকে শুধরে নেয়া উচিৎ। আমল করার সময় তো হলো যৌবন কাল। বৃদ্ধ বয়সে তো কমিশনের উপর চলে। যেমন একজন মানুষ সরকারি চাকুরী করে, এখন সে যদি বলে সবে মাত্র আমার বয়স আঠারো, যখন পঞ্চাশ ষাট হবে তখন কাজ করে দিবো। এখন একটু জীবন কে উপভোগ করে নিই। এমন হলে প্রতিটি মানুষই তাকে পাগল বলবে। কারণ পঞ্চাশ ষাটের সময় তো মানুষ পেনশন নিয়ে আরামে দিন কাটাবে ভাবে। আর কাজের কাজ করে যৌবন কালে। ইবাদত আমলের ব্যাপারটাও ঠিক এমনি। যৌবন কালে আমল করবে আর বৃদ্ধ বয়সে পেনশন দিয়ে চলবে। অর্থাৎ সে যদি যৌবন কালে রাত্রে দাঁড়িয়ে নামায পড়ত তাহলে বৃদ্ধ বয়সে বার্ধক্যজনিত কারণে দূর্বল হয়ে যাওয়ার ফলে না পড়তে পারলেও তাকে সেই দাঁড়িয়ে নামায পড়ার পুরো সাওয়াব দেয়া হবে। ফেরেশতা বৃদ্ধ বয়সে যৌবন কালের উপর ভিত্তি করে আমল লিখে, তথা সওয়াবের ক্ষেত্রটা। সুতরাং যদি কোন ভালো কাজ করতে ইচ্ছে হয় তাহলে সাথে সাথে সেটা করা উচিৎ। কারণ পরে হয়তো সময় পাওয়া যাবেনা বা মন উল্টে যেতে পারে। ভালো কাজে তো কোন পরামর্শ করার প্রয়োজন পরে না। ইস্তেখারারও দরকার পরেনা। ইস্তেখারা তো ঐ কাজে করা হয় যে কাজে হক বাতিল স্পষ্ট নয়। সুতরাং দিলে কোনো ভালো কাজের শখ জাগলে সাথে সাথে তা করা উচিৎ।
হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার তাওফিক দান করুন। কোনো ভাবে কোনো গুনাহ হয়ে গেলে তাওবা করার সুযোগ দিন এবং আমাদের তাওবা কে কবুল করে নিন। তাওবার পর যেন সেই কাজ পূণরায় না হয় সেই তাওফিক দিন।  আমাদের ঈমান আমল ঠিক করে দিন। সুন্নতের উপর যেন চলতে পারি তাওফিক দিন। আপনার মর্জি মুতাবেক আমাদেরকে পরিচালিত করুন। আমীন।
লেখক: প্রাবন্ধিক, জামিয়া মাদানিয়া সাভার ঢাকা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight