তাঁর কোন দান অস্বীকার করবে তুমি? (সূরা আররাহমানের কাব্যানুবাদ) / হাফেজ মাওলানা আবূ সালেহ

সূরা আররাহমানের মাহাত্ম্য, বৈশিষ্ট্য, আলোচ্য বিষয় ও সাহিত্যমান
হযরত হাকেম জাবের রা. থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, একদা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের সামনে গোটা সূরা আর-রাহমান তেলাওয়াত করলেন। (আর এই সূরায় ৩১ বার ফাবি আইয়ি আলায়ি…আয়াতটি পুনরাবৃত্ত হয়েছে।) এসময় আমরা কেউ কিছুই বলিনি, বরং একদম চুপ থেকেছি। সূরাটির তেলাওয়াত শেষ করার পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিস্ময়ের স্বরে আমাদেরকে বললেন, “কী ব্যাপার! তোমরা চুপ রইলে কেন? ইতিপূর্বে জ্বিনদের কাছে এক রাতে এই সূরাটি আমি তেলাওয়াত করেছিলাম। তখন তারা প্রতিবার ‘ফাবি আইয়ি আলায়ি রাব্বিকুমা তুকায্যিবান’ (অর্থাৎ, ‘হে জ্বিন ও ইনছান! তোমরা তোমাদের প্রভুর কোন দানকে অস্বীকার করবে?)-এর জবাবে বলেছে, ‘না, হে প্রভু! আমরা আপনার কোন দানকেই অস্বীকার করি না, বরং প্রত্যেক দানকেই স্বীকার করি, আপনার জন্যই সকল প্রশংসা!’ তোমাদের তুলনায় তারাই (জ্বিনেরাই তো) উত্তম ছিলো!” [মুছনাদে হাকেম, তিরমিজী]
এ ঘটনা থেকে সূরা আর রাহমানের মাহাত্ম্য ও মর্যাদা অনুভব করা যায়। আলোচ্য বিষয় এবং আরবি সাহিত্যমানের দিক থেকেও সূরা আর রাহমান অনুপম ও অতুলনীয়। ‘আর-রহমান’ নামী এই সূরার সবটাতে মহান রাব্বুল আলামীনের জান্নাত-জাহান্নাম, ইহলৌকিক পারলৌকিক, বৈষয়িক, আত্মিক, সকল দান ও অবদানের ধারাবাহিক বর্ণনা রয়েছে। যার কোনটাকেই ছোট করে দেখার কিংবা অবহেলা করার সুযোগ নেই! অস্বীকার তো দূরের কথা! এই সূরাকে বলা হয় কুরআনের সুগন্ধি। যেমন সূরা ইয়াসীনকে বলা হয় কুরআনের হৃৎপি-।
সত্যিই, সূরা আর-রাহমানের উচ্চ সাহিত্যমান, আরবি ভাষার লালিত্য, ঐতিহ্য, আভিজাত্য পাঠক এবং শ্রোতাদের দেহ-মনে এক অনন্য সুরভি ছড়িয়ে দেয়। যে সুরভি আবেদন সৃষ্টি করে মানবপ্রাণে তার প্রভুর কাছে নিজেকে সঁপে দিতে। তাঁর অসংখ্য অবদানের স্বীকৃতি দিয়ে কৃতজ্ঞতা জানাতে। সুতরাং তাঁর অবদানের অস্বীকৃতি কিংবা অস্বীকারের বিষয়টি নাকচ করে দিতেই এই সূরায় ‘ফাবি আইয়ি আলায়ি রাব্বিকুমা তুকায্যিবান’ আয়াতটির ৩১ বার পুনরাবৃত্ত হয়েছে। যা আরবি অলংকারশাস্ত্রে শোভনীয় এবং বহুল ব্যবহৃত। বাংলা সাহিত্যেও এরূপ একটি-দুটি লাইন বার বার উল্লেখের রীতি স্বীকৃত। বরং একই রকম ছন্দবদ্ধতা বজায় রাখার জন্য তা কখনও কখনও আবশ্যক হয়ে দাঁড়ায়।
এই সূরার নাম ‘আর-রাহমান’। এই নামের মাঝে সুস্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে যে, মহান সত্তা আল্লাহ, যিনি সর্বোচ্চ দয়ালু (রহমান) তিনি মানুষ ও জ্বিনের প্রতি সর্বোচ্চ দয়া ও করুণাস্বরূপই তাঁর সব দান ঢেলে দিয়েছেন। এই অসংখ্য দান এবং অবদানের মধ্যে সর্বোচ্চ দান হলো মানুষকে কুরআন শিক্ষা দেয়া। কুরআনের জ্ঞান দান করা। কেননা, এই কুরআন অনুসরণের মাঝেই রয়েছে মানুষ ও জ্বিনের সর্বাঙ্গীন মঙ্গল ও কল্যাণ। যে কল্যাণ ও মঙ্গল লাভ করে সাহাবায়ে কেরামের জীবন ধন্য হয়েছে। তারা সফলকাম হয়েছেন। মানব ও জ্বিনদের মধ্যে যারাই এই কুরআনে কারীমের পূর্ণাঙ্গ অনুসরণ করবে তারাই সফলকাম হবে। এই কুরআনের বাইরের কোনো মতবাদের অনুসরণে সফলতা নেই। মানুষের সৃষ্টির উদ্দেশ্য এই কুরআনী শিক্ষা দানের মাধ্যমে তাদেরকে জান্নাতের পথে পরিচালিত করা এবং জাহান্নাম থেকে রক্ষা করা। তাই মানব সৃষ্টির কথা উল্লেখ করার আগে তাদের সৃষ্টির উদ্দেশ্য কুরআন শিক্ষা প্রদানের বিষয়টি বর্ণনা করেছেন আল্লাহ তাআলা। তাঁর প্রত্যেকটি নেয়ামত ও অবদান এবং দানের কৃতজ্ঞতা আদায় করা জ্বিন-ইনসানের অবশ্য কর্তব্য। এই কৃতজ্ঞতা জান্নাতের পথ সুগম করে। আর তার অকৃতজ্ঞতা এবং নাফরমানি জাহান্নামে প্রবেশ করায়। এসব বিষয় অনন্য ভঙ্গিতে বর্ণিত হয়েছে সূরা আর রাহমানে।
কাব্যানুবাদের কৈফিয়ত : অশেষ মেহেরবান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর অশেষ অনুগ্রহে প্রায় ২০ বছর যাবৎ কুরআনে কারীমের তরজমা ও তাফসীরের চর্চার সাথে এই অধমকে জড়িয়ে রেখেছেন। তরজমা-তাফসীরের কাসে সূরা আর-রাহমানের তরজমা করার সময় মাঝে মাঝে বাংলায় কাব্যানুবাদ হয়ে যেতে থাকে। সেই সূত্রে ইচ্ছে জাগে এই মনে, পূর্ণ সূরা আর রাহমানের বাংলা কাব্যানুবাদ করলে কেমন হয়! ছাত্রদের এবং কোন কোন শুভানুধ্যায়ির পক্ষ থেকেও অনুপ্রেরণা পেতে থাকি। এই মানসিক উজ্জীবন এবং অনুপ্রেরণা থেকেই সূরা আর রাহমানের কাব্যানুবাদ শুরু করি। যা ছিল দীর্ঘ কাল যাবৎ মনের মাঝে পুষে রাখা নেক সাধ। এই অনুবাদ সংগত কারনেই কোথাও কোথাও ভাবানুবাদ করা হয়েছে। জানি না এই অনুবাদ কতটুকু কাব্যানুবাদে পরিণত হয়েছে আর কতটুকু অসার অনুবাদ হয়েছে। পাঠকবৃন্দের কাছেই তার নির্ণয়ের ভার ছেড়ে দিলাম। চলুন, এবার কাব্যানুবাদ তুলে ধরা যাক, তাঁর প্রতি তাওয়াক্কুল করে।
সূরা আর রাহমান
বিছমিল্লাহির রহমানির রাহীম
শুরু সেই আল্লাহর নামে যিনি মহান
যিনি সর্বোচ্চ দয়াময় অশেষ মেহেরবান।
আয়াত
১. আর রাহমান: মহিমাময় তিনি মহান
যিনি সর্বোচ্চ মেহেরবান মহিয়ান।
২. তিনিই শিক্ষা দিয়েছেন কুরআন
৩. সৃজন করেছেন  (শ্রেষ্ঠজাতি) ইনছান
৪. (অতঃপর) করেছেন তাদের ভাষা জ্ঞান দান!
৫. (তাঁর সৃষ্টি) চন্দ্র-সূর্য নিজ নিজ পথে ধাবমান
৬. তরুলতা বৃক্ষ করে তাঁকেই ছেজদা দান।
৭. আকাশকে তিনিই করেছেন উচ্চতা দান।
৮. তিনিই করেছেন পৃথিবীতে ন্যায়ের পাল্লা স্থাপন
৯. যাতে মাপে-ওজনে তোমরা না করো সীমালংঘন।
১০. আদেশ তাঁর, ওজন করো ইনসাফের সাথে
১১. এই মনোরম বসুন্ধরা সৃষ্ট সকল মাখলূক তরে
১২. আছে আবরণময় ফল-ফসলাদী সুরভিত ফুলোদ্যান
১৩. সুতরাং হে জ্বিন ও ইনছান! তোমরা অস্বীকার করবে তোমাদের রবের কোন অবদান?
১৪. শক্ত মাটির নির্যাস থেকে তিনি করেছেন মানব জাতিকে সৃজন
১৫. অগ্নিশিখা থেকে সৃষ্ট জ্বিনের জীবন।
১৬. সুতরাং হে জ্বিন ও ইনছান অস্বীকার করবে তোমার প্রতিপালকের কোন মহাদান?
১৭. তিনিই কেবল প্রভূ পূর্ব-পশ্চিমের (তাঁরই নির্দেশে সূর্য উদীয়মান-অস্তমান) সুতরাং হে জ্বিন ও ইনছান অস্বীকার করবে তোমরা তাঁর কোন অবদান?
১৮. দুটি নদী পাশাপাশি সতত বহমান
১৯. তবু তাদের মাঝে দুর্ভেদ্য অন্তরাল বিদ্যমান।
২০. সুতরাং হে জ্বিন ও ইনছান! অস্বীকার করবে তোমরা তাঁর কোন দয়ার দান?
২১. বিপরীত মুখী এ দুই স্রোতস্বিনীর রঙ স্বাদ কলতান তবু ওদের মাঝে গড়ে ওঠে মোতি পদ্মরাগ-মারজান সুতরাং হে জ্বিন ও ইনছান
২২. তোমরা অস্বীকার করবে প্রতিপালকের কোন অবদান?
২৩. তাঁরই অবদান গুণে দ্রুত বেগবান সমুদ্রবুকে পর্বতসম নৌযান
২৪. অতএব হে জ্বিন ও ইনছান! অস্বীকার করবে তোমরা তাঁর কোন অবদান?
২৫. এই পৃথিবীর সবকিছুর হবে একদিন অবসান থাকবেন
২৬. অমর অব্যয়-অক্ষয় তোমার রব মহানুভব সর্বোচ্চ তাঁর অবস্থান।
২৭. সুতরাং হে জ্বিন ও ইনছান! অস্বীকার করবে তোমরা তার কোন কৃতিত্বের শান?
২৮. তাঁরই কাছে মাঁগে মাটির মাখলূক হাত তুলে দিনমান সর্বদা তিনি তাঁর শানে সমুজ্জ্বল মহান
২৯. সুতরাং হে জ্বিন ও ইনছান! অস্বীকার করতে পারো তোমরা তাঁর কোন অবদান?
৩০. খুব শীঘ্রই আমি তোমাদের দিকে দৃষ্টি দেব হে জ্বিন ও ইনছান, তোমরা হিসাব থেকে পাবে না পরিত্রাণ।
৩১. অতএব হে মানব ও দানব! তোমরা অস্বীকার করবে বিধাতার কোন অবদান?
৩২. হে জ্বিন ও মানব সম্প্রদায় কার সাধ্য ভূমিও আকাশ সীমা অতিক্রম করে যায়! না, পারবে না কেউ, করতে হবে তাঁর কর্তৃত্বেই অবস্থান
৩৩. সুতরাং হে জ্বিন ও ইনছান! তোমরা এড়াতে পারবে না, তাঁর কোন বিধান।
৩৪. সেদিন (আখেরাতে) পাপীদের প্রতি নিক্ষিপ্ত হবে তপ্ত-ধু¤্র তাপ আর অগ্নিশিখা লেলিহান তা ফেরাতে কেউ হবে না ক্ষমতাবান
৩৫. সুতরাং হে জ্বিন ও ইনছান! অস্বীকার করবে তোমরা তাঁর কোন বিধান?
৩৬. সেদিন আকাশ হবে ভেঙে খান খান
৩৭. সুতরাং হে জ্বিন ও ইনছান! তোমরা অস্বীকার করবে বিধাতার কোন অবদান?
৩৮. পাপীরা সেদিন থাকবে কঠিন ঘাটিতে কেউ যাবে না তাদের ন্যায়-অন্যায় জিজ্ঞাসিতে। তাদের পাপপঙ্কিলতা থাকবে প্রকাশমান,
৩৯. সুতরাং হে জ্বিন ও ইনছান! তোমরা মিথ্যা বলবে তোমাদের প্রতিপালকের কোন অবদান?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight