টিভি, সিনেমা, নাটক দেখার নেতিবাচক প্রভাব: একটি সমীক্ষা: মুফতী পিয়ার মাহমুদ

যুগের পরিবর্তনের সাথে সাথে সব কিছুতেই লেগেছে পরিবর্তনের হাওয়া। সেই পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে বিনোদনের রঙ্গিন দুনিয়াতেও। সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে আবিষ্কার হয়েছে টিভি, ডিস, ইন্টারনেট, ইউটিউবসহ বিনোদনের নানা উপকরণ। নতুন উপকরেণর দুর্দান্ত দাপটে মুখ থুবড়ে পড়েছে বিনোদনের পুরনো উপকরণ রেডিও, থিয়েটার, মঞ্চনাটক ইত্যাদি। এখন রিমোট চাপলেই গোটা পৃথিবী চোখের সামনে হাজির। এক পলকেই পর্দায় ভেসে উঠে বিনোদন জগতের চোখ ধাঁধানো সকল রঙ্গিন আয়োজন। পৃথিবীর তাবৎ বেহায়াপনা ও অশ্লীল দৃশ্য দেখা যায় ড্রয়িং রোমে বসেই। গ্রাম বাংলার অজ পাড়াগাঁও আজ প্রযুক্তির কল্যাণে আলো ঝলমলে। গ্রাম অঞ্চলের ছোট ছোট দোকান-পাট ও চায়ের স্টলগুলোতে ২৪ ঘন্টাই চলে টিভি, ভিসিডি ইত্যাদি। শহরের অবস্থাও তথৈবচ। বিজাতির আবিস্কৃত এই অভিশাপের অক্টোপাসে উম্মাহ আজ আবদ্ধ। মহামারির মতো প্রবেশ করছে মুসলিম উম্মাহর ঘরে ঘরে এই আপদ। উঠতি বয়সের তরুণ-তরুণী ও যুবক-যুবতীরা ইন্টারনেট, ইউটিউব ইত্যাদিতে নিয়মিত দেখছে নাটক, সিনেমা ও অশ্লীল ভিডিও। ফলে নৈতিক চরিত্র স্খলন, অবৈধ প্রেম-ভালবাসা, হানাহানি, খুন-খারাবী ইত্যাদি সমাজে ছড়িয়ে পড়ছে মহামারির মতো। এহেন অবস্থায় শক্তভাবে এর লাগাম টেনে ধরতে না পারলে চরম মাশুল দিতে হবে জাতিকে। এর ক্ষতি বয়ে বেড়াতে হবে যুগ-যুগান্তরে। তাই বক্ষ্যমান নিবন্ধে টিভি, সিডি, ডিভিডি, ডিস, ইন্টারনেট, ইউটিউব ইত্যাদিতে সিনেমা, নাটক, ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ও বিভিন্ন প্রোগ্রাম দেখার ভয়ঙ্কর ক্ষতির দিকগুলো কুরআন-হাদীস, মনোবিজ্ঞান ও বিভিন্ন গবেষণার আলোকে আলোকপাত করার প্রয়াস পাব ইনশাআল্লাহ। যেন এ সকল ক্ষতির দিক চিন্তা করে উম্মাহ নিবৃত হয় এই পাপের নর্দমায় অবগাহন করা থেকে।
জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ সময়ের অপচয়
এ সকল ভয়ানক অপরাধে লিপ্ত হয়ে অবলীলায় ধ্বংস করছে বেশুমার সময় আদম সন্তান। অথচ সময় মানব জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। সময়ের গুরুত্ব কারো অজানা নয়। কারো দি¦মতও নেই এ ব্যাপারে। কেবল মাত্র ইসলামই নয়, পৃথিবীর সকল ধর্ম, মতবাদ ও ইজমাই সময়ের গুরুত্ব দিয়েছে যারপর নাই এবং উপদেশ দিয়েছে সময়কে সর্বোচ্চ কাজে লাগানোর। এ কথা সবাই জানে ও বুঝে যে, যে মুহূর্তটি চলে গেল তা আর ফিরে আসবে না। এ কথাও সবাই বুঝে যে, সময়ের অপচয় মানে জীবনেরই অপচয়। আর কোন বিবেকবান মানুষ কি জীবনের অপচয় করতে পারে? অন্তত একজন মুমিন তা পারে না। কারণ সে মনে-প্রাণে বিশ^াস করে যে, জীবনের মহামূল্যবান সম্পদ সময়ের হিসাব তাকে দিতে হবে। এর জন্য জবাবদিহি করতে হবে আল্লাহর দরবারে। অথচ নির্মম ও নিদারুণ বাস্তবতা হলো, এগুলো দেখে অসংখ্য মানুষের অগণিত সময় নষ্ট হয়। এই সময়ের গুরুত্ব প্রসঙ্গে দয়ার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘দু’টি নিআমত এমন আছে, যেগুলোর ব্যাপারে অনেক মানুষ প্রতারণার শিকার। একটি হলো সুস্থতা অপরটি হলো অবসরতা।’ [বুখারী, হাদীস: ৬৪১২; তিরমিযী, হাদীস: ২৩০৪, শুআবুল ঈমান, বায়হাকী, হাদীস: ৯৭৬৮]
অপর একটি বর্ণনায় আছে, সাহাবী ইবনে আব্বাস রা. বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক ব্যক্তিকে নছীহত করছিলেন এই বলে, ‘পাঁচটি বিষয়কে পাঁচটি বিষয়ের পূর্বে গনিমত মনে কর। ১. বার্ধক্যের পূর্বে যৌবনকে। ২. অসুস্থতার পূর্বে সুস্থতাকে। ৩. দারিদ্রতার পূর্বে সচ্ছলতাকে। ৪. কর্ম ব্যস্থতার পূর্বে অবসর সময়কে। ৫. আর মৃত্যুর পূর্বে জীবনকে।’ [শুআবুল ঈমান, বায়হাকী, হাদীস: ৯৭৬৭; আল আদাব, হাদীস: ৮০৯] একজন মুমিনের হৃদয়ে যখন বারবার এ বাণীগুলোর শব্দ ও মর্ম বাজতে থাকবে, তখন ধীরে ধীরে সময়ের মর্যাদা ও গুরুত্ব তার মাঝে সৃষ্টি হবে। ফলে সে সময় অপচয় ও নষ্ট করা থেকে বেঁচে থাকার প্রয়াস পাবে।
অর্থেরও অপচয় হয় প্রচুর
এই পাপ সাগরে অবগাহন করার জন্য বিপুল পরিমাণে অর্থের অপচয় করে ইসলাম ও ইসলামের নবীর অনুসারীগণ। কার চেয়ে কে বড় স্কীনের টিভি কিনতে পারে তারও প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয় এবং এটাকে মনে করা হয় আভিজাত্য এবং সামাজিক সম্মান ও মর্যাদার বিষয়। অথচ অপচয়ের ব্যাপারে এসেছে কঠোর সতর্কবাণী। কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে, ‘আত্মীয়-স্বজন, অভাবগ্রস্থ ও মুসাফিরকে তাদের হক দিয়ে দিন এবং কখনই অপচয় করবেন না। নিশ্চয় অপচয়কারী শয়তানের ভাই (দোসর)। আর শয়তান তার প্রভুর প্রতি অতিশয় অকৃতজ্ঞ। [সূরা ইসরা: আয়াত২৬-২৭]।
অন্যত্র আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘তোমরা খাও, পান কর। তবে অপচয় করবে না। কেননা অপচয়কারীদের আল্লাহ পছন্দ করেন না।’ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,‘তোমরা খাবে, পান করবে, পরিধান করবে এবং সদকা করবে, তবে অপচয় ও অহংকার করবে না। ইবনে আব্বাস রা. বলেন, ইচ্ছে মতো খাবে, ইচ্ছে মতো পরবে। তবে দুটি কাজ থেকে অবশ্যই বেঁচে থাকবে, ১. অপচয় ও ২. অহংকার।’ [বুখারী: ২/৮৬০]
পর্দার বিধানও লঙ্গিত হয় চরমভাবে
সিনেমা, নাটক ইত্যাদি দেখার ক্ষতিকর একটি দিক হলো, এতে পর্দার বিধান লঙ্গিত হয় চড়মভাবে। বেহায়ার মতো পরিবারের সবাই মিলে এক সাথে বসে যুবক-যুতবীর অর্ধনগ্ন শরীর ও নাচ-গান ইত্যাদি দেখে থাকে। এতেকরে পর পুরুষ ও পর নারী দেখার পাশাপাশি নিজেদের মাঝেও সাধ জাগে তাদের মতো হতে। ফলে পর্দার বিধান পালনে আসে অনীহা। অথচ মানব সংসারে পর্দার গুরুত্ব ও উপকারিতা অনস্বীকার্য। লঙ্গনের শাস্তি ও ক্ষতি অসহনীয়। পালনের শান্তি ও উপকারিতা বরণীয়। কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে নবী আপনি আপনার স্ত্রী, কন্যা, ও মুমিনদের স্ত্রীগণকে বলুন, তারা যেন স্বীয় চাদরের কিয়দংশ নিজেদের উপর টেনে দেয়। এতে তাদের চেনা সহজ হবে। ফলে তাদেরকে উত্যক্ত ও বিরক্ত করা হবে না।’ [ সূরা আহযাব: আয়াত ৫৯]
অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘আপনি মুমিন পুরুষদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে আর হেফাযত করে স্বীয় লজ্জাস্থানকে। এ ব্যবস্থা তাদের জন্য অধিকতর পবিত্রতার উপায়। নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা তাদের কর্ম সর্ম্পকে অবগত। এভাবে আপনি মুমিন নারীদেরকে বলুন, তারাও যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে আর হেফাযত করে স্বীয় লজ্জাস্থানকে। (এ ব্যবস্থা তাদের জন্যও অধিকতর পবিত্রতার উপায়।) [সূরা নূর: আয়াত ৩০]
এখানে প্রণিধানযোগ্য বিষয় এই যে, উক্ত আয়াতে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পুণ্যাত্মা ও নিষ্কলুষ স্ত্রীগণকে পর্দার নির্দেশ দেয়া হয়েছে, যাদের অন্তরকে পাক-পবিত্র রাখার দায়িত্ব স্বয়ং আল্লাহ গ্রহণ করেছেন। অপর পে যে সকল পুরুষদের এই নির্দেশ দেয়া হয়েছে, তাঁরা হলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর মহান সাহাবী, যাদের মাঝে অনেকের মর্যাদা ফেরেশতাদের থেকেও উর্ধ্বে। এতদসত্ত্বেও তাদের আত্মিক পবিত্রতা ও মানসিক কুমন্ত্রণা থেকে বাচাঁর জন্য তাদের মধ্যে পর্দার ব্যবস্থা জরুরী মনে করা হয়েছে। আজ এমন ব্যক্তি কে আছে, যে তার মনকে মহান সাহাবাগণের মন অপো আর তার স্ত্রীর মনকে পুণ্যাত্মা নবীপত্মীগণের মন অপো অধিক পবিত্র ও নিষ্কলুষ দাবী করতে পারে? আর মনে করতে পারে যে, পর নারী ও পুরুষের সাথে একান্তে অবস্থান ও মেলামেশা কোন অনিষ্টের কারণ হবে না। [মাআরিফুল কুরআন: ৭/১৯৪-১৯৫]
সাহাবী আবু সাঈদ রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘কোন পুরুষ যেন অন্য পুরুষের লজ্জাস্থানের দিকে না তাকায়, এভাবে কোন নারীও যেন অন্য নারীর লজ্জাস্থানের দিকে না তাকায়।’ [মুসলিম, মিশকাত: ২/২৬৮]।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অন্যত্র বলেন, মহান আল্লাহ বলেন, হে আদম সন্তান! অনিচ্ছাকৃত প্রথমবারের দৃষ্টি মাফ করা হবে। তবে দি¦তীয়বার দেখা থেকে বেঁচে থাকো। নতুবা এটা তোমার ধ্বংসের কারণ হবে। [আরসালান বিন আখতার কৃত জোয়ানী যায়ে করনে কে নুকছানাত] অন্য বর্ণনায় এসেছে, ‘যে পুরুষ পর নারীর প্রতি কুদৃষ্টি দেয় এবং যে নারী কুদৃষ্টির জন্য নিজেকে অন্যের সামনে পেশ করে তাদের উভয়ের উপর আল্লাহ অভিশাপ করেছেন।’ [শুআবুল ঈমান, বায়হাকী, হাদীস: ৭৩৯৯]
সাহাবী আবু উমামা রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘যে মুসলমান কোন রূপসীর রূপ লাবণ্যে দৃষ্টি পড়ার সাথে সাথে স্বীয় চোখ অবনত করে ফেলে, আল্লাহ তাআলা তাকে এমন ইবাদত করার তওফীক দিবেন যার স্বাদ সে অনুভব করতে পারবে।’ [মসনাদে আহমাদ, হাদীস: ২২২৭৮]
এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘কিয়ামত দিবসে সকল চোখ কাঁদবে। তবে যে চোখ আল্লাহ কর্তৃক নিষিদ্ধ বস্তু থেকে বেঁচে থেকেছে, আল্লাহর পথে জেগে থেকেছে এবং আল্লাহর ভয়ে মাছির মাথা পরিমাণও অশ্রুপাত করেছে, সে চোখ কাঁদবে না।’ [আত তারগীব ওয়াত তারহীব, হাদীস: ৪৯৭]
এখন আমরা টিভি, সিডি, ডিভিডি, ডিস, ইন্টারনেট, ইউটিউব ইত্যাদিতে সিনেমা, নাটক, ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ও বিভিন্ন প্রোগ্রাম দেখার ভয়ঙ্কর ক্ষতিকর দিকগুলোর উপর কয়েকজন বিখ্যাত বিজ্ঞানী ও গবেষকের গবেষণা তোলে ধরব।
শিশুদের পড়াশোনায় অমনোযোগী ও দুর্বল করে তোলে
আমেরিকার কর্নেল ইউনিভার্সিটির লেকচারার ডক্টর জন কেনেডি তাঁর গবেষণামূলক এক প্রবন্ধে লিখেন, ‘কম বয়সের ছেলে-মেয়েরা টিভির উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। পর্দায় যা দেখে তার সব কিছুকেই বাস্তব বলে মনে করে এবং বিশ^াস করে নেয়। অধিকাংশ শিশু মনে করে টিভির ভিতরের ছবিগুলোও তাকে লক্ষ্য করছে।’ বিশিষ্ট মনোবিজ্ঞানী ড. জন এম হিলে তার কালজয়ী গ্রন্থে শিশুদের উপর টিভির নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে নিরীক্ষা চালানোর পর মন্তব্য করেন, ‘সাধারণত সপ্তাহে ২৮ ঘণ্টা টিভি দেখে অভ্যস্ত শিশুদের মস্তিষ্কের শক্তি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বিরাট পরিবর্তন দেখা দেয়। আর এ পরিবর্তন ভার ও সুন্দরের দিকে পরিচালিত করে না।’ শিশুদের পড়াশোনার উপর টিভির প্রভাব বিশ্লেষণ করতে গিয়ে কর্নেল ইউনিভার্সিটির মনোবিদ ড. জিরভী সেনগার লিখেছেন, ‘শিশুদের পড়াশোনায় অমনোযোগী ও দক্ষতা অর্জনে পিছিয়ে পড়ার পেছনে মূখ্য ভূমিকা পালন করছে আমেরিকান টেলিভিশন। টেলিভিশন দেখায় অভ্যস্ত শিশুরা পড়ালেখায় অনগ্রসর ও দুর্বল হয়ে থাকে।’ [টাইমস, অক্টোবর ১৯৯৯] নেলসন মিডিয়া রিসার্চের শিক্ষা অধিদপ্তরের পক্ষ থেকেও এরূপ বক্তব্য পাওয়া যায়। শিশুরা যত বেশি টিভি দেখায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ে, লেখাপড়ায় তত বেশি দুর্বল হতে থাকে। এক জরিপে দেখা যায়, সপ্তাহে ১০ ঘণ্টার বেশি সময় টিভি দেখে অভ্যস্ত ছাত্ররা ২ ঘণ্টা টিভি দেখে অভ্যস্ত ছাত্রদের তুলনায় ১০% নম্বর কম পায়। [টিভি গার্ড, মার্চ, ১৯৯৩]
অসময়ে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে
পড়ালেখার ক্ষতি ছাড়াও শিশুর সুস্থতার উপরও টিভি মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ড. গোল্ড তার এক গবেষনণামূলক প্রবন্ধে লিখেন, ‘যে সকল শিশুরা টিভি কম দেখে, তাদের তুলনায় যারা দৈনিক দুই/চার ঘণ্টা টিভি দেখে, তাদের রক্তে কোলেস্টরেলের পরিমাণ দিগুণ বেড়ে যায়। ফলে অধিকাংশ শিশু বড় হওয়ার পর অসময়ে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে।’
উগ্রতা, হঠকারিতা ও সন্ত্রাসী ভাব জন্ম দেয়
শারীরিক সমস্যা ছাড়াও আত্মীক ও নৈতিক অবক্ষয়ের বিরাট ভূমিকা রয়েছে টিভি দেখায়। এ্যান্ডারসন মিসাচুটস ভার্সিটির প্রফেসর ড. ডেনিয়েল তার ১৭ বছরের লব্ধ অভিজ্ঞতার ফলাফল বর্ণনা করেছেন এভাবে, ‘টিভিতে প্রচারিত ভয়ঙ্কর দৃশ্য সম্বলিত প্রোগ্রাম শিশুদের মনে সন্ত্রাসী মনোভাব জন্ম দেয়। যে সকল শিশুরা ভয়ানক দৃশ্য, লুটতরাজ ও মারামারি-কাটাকাটি দৃশ্য বেশি দেখে, তারা অত্যধিক আক্রমণাত্মক মনোভাবাপন্ন হয়। দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর দেখা গেছে, ভয়ঙ্কর চরিত্রের দৃশ্যসমূহ দেখার ফলে পরবর্তী জীবনে মেজাজের ভেতর উগ্রতা, হঠকারিতা, নিষ্ঠুরতা ও সন্ত্রাসী ভাব জন্ম নেয়।’ [টিভি গার্ড, মার্চ ১৯৯৩]
যৌন উত্তেজক অনুষ্ঠান দেখার ফলেও এরূপ প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে। আমেরিকার ফেডারেল কমিউনিকেশনের চেয়ারম্যান এবং কলম্বিয়া ব্রডকাস্টিং সিস্টেম এর সাবেক ডাইরেক্টর নিউটন মেনু আমেরিকান টিভি সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে টিভি স্টেশনকে সবচেয়ে নিকৃষ্টতম প্রতিষ্ঠান বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘১৯৬১ সালে আমার সন্তানদের জন্য আমেরিকান টিভি চ্যানেলগুলো ক্ষতিকর ছিল না। তখন তাদের উপর এর বিশেষ কোনো প্রভাবও লক্ষ্য করা যায়নি। কিন্তু আজ ১৯৬৬ সালে এসে আমার নাতিরা টিভি দেখার ফলে অবর্ণনীয় ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। আমেরিকায় ১৮ বছর বয়সের একটি কিশোর হত্যা, লুটপাট, মারামারি ও যৌন উত্তেজক অশ্লীল চরিত্রের কমপক্ষে আড়াই হাজার দৃশ্য দেখে থাকে। [ল-ন অবজার্ভার]
টিভিতে প্রদর্শিত উগ্র ও ভয়ঙ্কর দৃশ্যগুলো সমাজেরই প্রতিচ্ছবি
বহুল প্রচারিত পত্রিকা রিডার ডাইজেস্ট ১৯৬১ সালে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল, ‘টিভি অনুষ্ঠানে প্রদর্শিত অপরাধ বনাম ঘরে সংঘটিত অপরাধ’ শিরোনামে। সেই প্রতিবেদনে বলা হয়,‘টিভির মাধ্যমে অতি যতœসহকারে এ বিষয়টি প্রচার পেতে থাকে যে, হত্যা, লুটপাট, ধর্ষণ খুব সাধারণ একটি কাজ। ধীরে ধীরে সকল দর্শকের মন-মগজে এ বিষয়টি দৃঢ়ভাবে আসন গেড়ে বসে। ফলে তার দ্বারাও এ অপরাধগুলো সংঘটিত হওয়া স্বাভাবিক হয়ে যায়। ফ্রান্সের এক গবেষক মন্তব্য করেছেন, ‘টিভিতে প্রদর্শিত উগ্র ও ভয়ঙ্কর দৃশ্যগুলো সমাজেরই প্রতিচ্ছবি। এর দ্বারা উগ্রতাকে আরও উৎসাহিত করা হয়।’
শরীরে বিভিন্ন ধরনের রোগ-ব্যাধি বাসা বাঁধে
ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির মনোবিজ্ঞানী ড. কার্ল বাটস শিশুদের উপর বিভিন্ন অনুষ্ঠানের প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণ করে লিখেন, ফিল্ম, টিভি সিরিজ, কাল্পনিক ঘটনাবলী চলমান কার্টুন নির্ভর অনুষ্ঠান দেখার ফলে শিশুদের উপর মারাত্মক প্রভাব পড়ে। যে সকল প্রতিষ্ঠান ভিডিও গেমস ও কার্টুন প্রোগ্রাম নির্মাণ করে তাদের উচিৎ এ সকল প্রোগ্রামের নেতিবাচক প্রভাব ও সমূহ সমস্যা নিয়ে গভীর অনুসন্ধান করা এবং এগুলো থেকে উত্তরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা।’ তিনি তার গবেষণায় দেখিয়েছন যে, ভিডিও গেমস ও চলমান কার্টুননির্ভর প্রোগ্রাম দেখার ফলে শিশুরা নি¤œ বর্ণিত রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে, ১. হাত ঘর্মাক্ত হয়ে যাওয়া। ২. মাথা ব্যথা। ৩. মৃগী রোগ। ৪. বমি বমি ভাব। ৫. বদ হজম। ৬. শিরাতন্ত্রীর খিচুনি। ৭. কাল্পনিক অনুষ্ঠান দেখার ফলে মস্তিষ্কে প্রচ- রকমের চাপ পড়ে। ৮. মানসিক কষ্ট অনুভূত হয়। যখন অনুষ্ঠান শেষ হয়, তখন সে বাস্তব জগতে ফিরে আসে। [রিডার ডাইজেস্ট, ১৯৬১ইং]
টিভি শুধু বিনোদনের উপাদান ও অপরাধ বৃদ্ধির মাধ্যম
আমেরিকান মনোবিজ্ঞানী ড. লিউনার্ড আইরি ১৯৬০-১৯৯৬ সাল পর্যন্ত একটি শিশুর বেড়ে উঠা নিয়ে বিস্তর গবেষণা করেছেন। ড. লিউনার্ড আইরি কর্তৃক পরিচালিত মিশিগান ইউনিভার্সিটির তত্তাবধানে নিউইয়ার্কে ভূমিষ্ঠ সাড়ে ছয়শত শিশুর উপর তিনি জরিপ চালিয়েছেন। তারা অকপটে স্বীকার করেছেন যে, ‘উগ্রতা, হত্যা, অনৈতিক আচরণ, চুরি, ডাকাতি এবং সকল প্রকার অপকর্মের পেছনে আমাদের উপর টিভি, সিনেমার যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে। এ সকল শিশুরা পড়ালেখায় উন্নতি করতে পারেনি। ১৬/১৭ বছর বয়সে পৌঁছতেই এরা হত্যা ও লুটতরাজে জড়িয়ে পড়ে। সকল প্রকার অবৈধ পন্থা অবলম্বন করতে থাকে। মদ ও বিভিন্ন প্রকারের নেশায় আসক্ত হয়ে পড়ে। আমেরিকাবাসী বিল ম্যাকনের গবেষণায় এসেছে যে, টিভি শুধু বিনোদনের উপাদান ও অপরাধ বৃদ্ধির মাধ্যম। নেশা করা, চুরি-ডাকাতি, বাটপারি, হত্যা, লুটপাট ইত্যাদি এসব ফিল্ম দেখে শিক্ষা পায়। কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির মনোবিজ্ঞানী ড. স্টিফেন বলেছেন, ‘জেলখানাকে অপরাধের আখড়া বলা হতো। কিন্তু বর্তমানে টিভি হলো, অপরাধ জগতের প্রাথমিক স্কুল, যেখানে অতি যতœসহকারে ও সুশৃঙ্খলভাবে অপরাধীকে গড়ে তোলা হয়।’ এতগুলো ভয়ঙ্কর ক্ষতির দিক জানার পরও  শুধুই জাতে উঠার জন্য বা আভিজাত্যের বিবেচনায় কোন জ্ঞানী ব্যক্তি টিভি দেখায় অভ্যস্ত হতে পারে না। অন্তত একজন মুমিন তা পারে না।
লেখক: সিনিয়র মুহাদ্দিস, জামিয়া মিফতাহুল উলুম, নেত্রকোনা। গবেষক ও গ্রন্থ প্রণেতা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight