ঝাড়-ফুকেঁর শরীয়ত সম্মত বিধান পর্ব-২ : সৈয়দা সুফিয়া খাতুন

গত সংখ্যায় আলোচনা করা হয়েছে বদ নযর, যাদু ও তদসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে। এ সংখ্যায় আরো কিছু বিষয় আলোচনার পর এগুলোর প্রতিক্রিয়া অবসানে কি কি করনীয় এবং তার চিকিৎসা কিভাবে করা হবে তার আলোচনার দাবী রাখে।

যাদুকর ও ভেল্কীবাজদেরকে চেনার উপায়

যাদুকর বা বেল্কীবাজ রোগী এবং তার বাবা-মা’র নাম জিজ্ঞেস করবে। অথচ নাম জানা ও না জানার সাথে চিকিৎসার কোন সম্পর্ক নেই। রোগীর ব্যবহৃত কোন বস্তু যেমন টুপি বা কাপড় বা চুল ইত্যাদি তলব করবে। জিনের উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট বৈশিষ্টের কোন প্রাণীর রক্ত নিয়ে রুগীর গায়ে মাখাবে। ঝাড়-ফুকঁ করার সময় দুর্বোধ্য শব্দে গুনগুন করে মন্ত্র পাঠ করবে বা লিখে দিবে। তাবীজ কবচ যেমন: নম্বরের মাধ্যমে বা বিচ্ছিন্ন অক্ষরের মাধ্যমে ছক আঁকিয়ে রোগীকে প্রদান করবে। রোগীকে কিছু দিন অন্ধকার ঘরের মধ্যে নির্জনে থাকার জন্য নির্দেশ দিবে। নির্দিষ্ট কিছু দিনের জন্য রোগীকে পানি স্পর্শ করতে নিষেধ করবে। রুগীকে এমন কিছু প্রদান করবে যা মাটিতে বা কবরস্থানে বা নিজ গৃহে পুতেঁ রাখতে বলবে বা কাগজে কিছু লেখে দিবে পুড়িয়ে ধোঁয়া নেয়ার জন্য। রোগীকে তার ব্যক্তিগত ব্যাপারে কিছু খবর প্রদান করবে যা সে ব্যতীত আর কেহ জানেনা। অথবা রোগীর কথা বলার পূবেই তার নাম ঠিকানা ও কি অসুখ হয়েছে ইত্যাদি বলে দিবে। রোগী তার কাছে যাওয়া মাত্র ব্যবস্থা পত্র দিয়ে দিবে বা টেলিফোন বা ডাকের মাধ্যমে ব্যবস্থাপত্র লিখে দিবে।

 

যাদুর প্রতিক্রিয়া আছে

আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাতের আকিদা হচ্ছে জিন মানুষের উপর আছর করতে পারে। দলীল হচ্ছে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যারা সুদ খায় তারা কিয়ামতের দিবসে ঐ ব্যক্তির ন্যায় দাঁড়াবে যাকে শয়তান স্পর্শ করে মোহাবিষ্ট করে থাকে।” [সূরা বাকারা:২৭৫]

তাফসীরবিদগণ ঐক্যমত হয়েছেন যে, আয়াতে (আলিফ লাম মিম ছিন) বলতে উদ্দেশ্য হচ্ছে শয়তানের পাগলামী যা জিনের স্পর্শ ও আছরের কারনে মানুষের মধ্যে তার প্রভাব দেখা যায় ফলে মানুষ দিশেহারা হয়ে যায়।

 

কয়েকটি সর্তকতা

(১) বদনযরকারীর সাথে সংশ্লিষ্ট কুসংস্কারকে বিশ্বাস করা জায়েয নয়। যেমন তার পেশাব পান করা। তার স্পর্শকৃত বস্তু পাওয়া গেলে তা দ্বারা কোন ঊপকার পাওয়া যাবে না এমন বিশ্বাস করাও যাবে না।

(২) বদনযর লাগবে এই আশংকায় তাবীজ লটকানো বা চামড়া বা রিং বা তাবীজের মালা পরিধান করা জায়েয নেই। নবী সা. বলেন, “যে ব্যক্তি কোন কিছু লটকাবে, তাকে সেই বস্তুর

প্রতি সোপর্দ করা হবে।” [তিরমিযী] তাবীজ যদি কুরআনের আয়াত দ্বারা লিখা হয় তবে তাতে মতবিরোধ আছে, তবে উত্তম হচ্ছে তা পরিত্যাগ করা।

(৩)    গাড়ীর মধ্যে ’মাশা আল্লাহ’ তাবারাকাল্লাহ’ লিখে, তলোয়ার, চাকু, চোঁখ আকিঁয়ে লটকিয়ে দেয়া, কুরআন রাখা অথবা বাড়ীতে কুরআনের বিভিন্ন আয়াত লিখে লটকিয়ে রাখা জায়েয নয়। কেননা এগুলো দ্বারা বদনযর থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে না। বরং এগুলো নিষিদ্ধ তাবীজের অর্ন্তভূক্ত হয়ে যেতে পারে।

(৪)    রুগী দৃঢ় বিশ্বাস রাখবে যে তার দু’আ কবুল হবে। আরোগ্য হতে দেরি হচ্ছে কেন এগুলো বলবে না। যদি বলা হয় আরোগ্যের জন্য সারা জীবন ঔষধ খেতে হবে তবে ভীত হয় না। কিন্তু যদি দীর্ঘ সময় ঝাড়-ফুঁক করে তবে অস্থির হয়ে যায়। অথচ ঝাড়-ফুঁকের জন্য যে আয়াত পাঠ করা হয় তার প্রত্যেকটা অক্ষরের জন্য নেকী লাভ হবে। আর একটি নেকীকে দশগুন পর্যন্ত বৃদ্বি করা হয়। কেননা এগুলোর মাধ্যমে আরোগ্যের আশা করা যায়।

(৫)    দলবদ্ধ হয়ে ঝাড়-ফুঁকের দু’আ পাঠ করা সুন্নতের খেলাফ, এর প্রভাবও দুর্বল। অনুররুপ ভাবে টেপরেকর্ডের মাধ্যমে শোনাও ঠিক না। কেননা এতে নিয়ত উপস্থিত থাকে না। অথচ ঝাড়-ফুকঁকারীর নিয়ত থাকা অন্যতম শর্ত। যদিও টেপরেকর্ডারের কেরাত শোনাতে কল্যাণ আছে। আরোগ্য লাভ করা পর্যন্ত ঝাড়-ফুঁেকর দু’আ বারবার পাঠ করা সুন্নত। কিন্তু ক্লান্ত হয়ে গেলে ঝাড়-ফুঁক কমিয়ে দিবে যাতে করে বিতৃষ্ণাভাব সৃষ্টি না হয়। বিনা দলীলে আয়াত ও দু’আ পাঠ করার ক্ষেত্রে সংখ্যা নির্দিষ্ট করা ঠিক না।

কিছু কিছু আলামত আছে যা দ্বারা প্রমাণ পাওয়া যাবে যে, ঝাড়-ফুকঁকারী যাদু বা শিরকি ঝাড়-ফুকঁ ব্যবহার করেছে, কুরআন দ্বারা ঝাড়-ফুকঁ করছে না। বাহ্যিক ভাবে কিছু ধর্মীয় পরিচয় থাকলেও ধোঁকায় পড়া যাবে না। শুরুতে কুরআন থেকে হয়তো কিছু পাঠ করবে কিন্তু অল্পক্ষণ পরেই অন্য কিছু পড়া শুরু করবে। আবার অনেকে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য ঘনঘন মসজিদে যাবে। আপনার সামনে ঠোঁট নাড়িয়ে যিকির পাঠ করবে। সাবধান এদের আক্বীদা ও মূল পরিচয় না জেনে যেন ধোঁকায় না পড়েন।

 

শরীয়ত সম্মত উপায়ে ঝাড় -ফুক করার শর্তাবলী

১- ঝাড়-ফুঁক হতে হবে আল্লাহর কুরআন অথবা তাঁর নামসমূহ অথবা তাঁর গুনাবলীসমূহ দ্বারা।

২- ঝাড়-ফুঁক হতে হবে আরবী বা অন্য যে কোনো ভাষায়, যার অর্থ জানা যায়।

৩- এ কথায় দৃঢ় বিশ্বাস রাখতে হবে যে, (রোগ চিকিৎসায়) ঝাড়-ফুঁকের কোনোই ক্ষমতা নাই, বরং রোগ শিফা’র সকল ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহ তা‘আলারই।

৪- ঝাড়-ফুঁক যেন হারাম অবস্থায় না হয় অর্থাৎ নাপাক অবস্থায় অথবা, কবর বা পায়খানায় বসে ঝাড়-ফুঁক করা যাবে না। পবিত্র আল-কুরআনে ঝাড়-ফুঁক সংক্রান্ত অনেক আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে, পাঠকদের সুবাধার্থে যার কিছু নি¤েœ দেওয়া হলো

ঝাড়-ফুঁকের জন্য কুরআনের আয়াত সূরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসী, সূরা বাকারার শেষের দু’আয়াত, সূরা কাফিরুন, সূরা ইখলাস, সূরা নাস। সূরা বাকারার ১৩৭, সূরা আহকাফের ৩১, সূরা বানী ইসরাঈলের ৮২, সূরা নেসার ৫৪, সূরা শুআরার ৮০, সূরা তাওবার ১৪, ২৬, সূরা ফুসসিলাতের ৪৪, সূরা হাশরের ২১, সূরা মুলুকের ৩, সূরা কলমের ৫১, সূরা আরাফের১১৭-১১৯, সূরা ত্বাহার ৬৫-৬৯, সূরা ফাতাহ এর ৪, ২৬, ১৮নং আয়াত পাঠ করবে। এছাড়া হাদীসেও ঝাড়-ফুঁক সম্পর্কীয় কিছু বর্ণনা পাওয়া যায় যা নি¤েœ দেওয়া হল।

ঝাড়-ফুঁকের জন্য হাদীসে বর্ণিত কিছু শব্দ

أسأل الله العظيم رب العرش العظيم أن يشفيك.

اعيذك بلكمات الله التامة من كل شيطان وهامة ومن كل عين لامة.

اذهب البأس رب الناس ان الشافي لا شافي لا شفاءك شفاء لا يغادر سقما.

اللهم اذهب عنه حرها وبردها ووصبها.

حسبي الله لا اله الا هو توكلت وهو رب العرش العظيم.

بسم الله ارقيك من كل شيئ يؤذيك ومن شر كل نفس أو عين حاسد الله يشفيك بسم الله ارقيك اعوذ بعزة الله وقدرته من شر ما اجد وأحاذر.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight