জুমআতুল বিদা ও আখেরী দশক : আল্লামা তাকী উসমানী

আল্লাহ তাআলার মহাঅনুগ্রহ, তিনি রমযানুল মোবারকের পবিত্র সময় দান করেছেন। আজকের জুমআ রমযানের শেষ জুমআ হতে পারে। আগামী জুমআতে ঈদুল ফিতর হওয়ারও সম্ভাবনা রয়েছে। অবশ্য ঊনত্রিশ তারিখে চাঁদ না উঠলে আগমী জুমআও রমযানের অন্তর্ভুক্ত হবে। মানুষ এটাকে সাধারণত জুমআতুল বিদা বলে থাকে, আখেরী জুমআও বলে। এর কিছু বিশেষ বিধি-বিধানও লোকদের মাঝে প্রসিদ্ধ হয়ে গেছে। তবে বাস্তবতা হলো, এ দৃষ্টিকোণ থেকে শরীয়তে জুমআতুল বিদার কোনো বিশেষত্ব নেই।
রমযানের সব দিনই পবিত্র ও মহামূল্যবান। এর সাথে জুমআর দিন যুক্ত হলে তার বিশেষত্ব আরো বহু গুণে বেড়ে যায়। অবশ্য আখেরী জুমআর পর যেহেতু আর কোনো জুমআ রমযানে আসার মতো নেই, তাই এর গুরুত্ব অপরিসীম, কিন্তু এটাকে কোনো উৎসব মনে করা, এর জন্য বিশেষ বিধানাবলী সাব্যস্ত করা, এতে অমুক অমুক সূরা দিয়ে এত রাকাত নামায পড়তে হবে, এমন বিষয় কুরআন-হাদীসের দৃষ্টিতে সাব্যস্ত নয়। অবশ্য এ বাস্তবতা ঠিক, আখেরী জুমআ রমযান বিদায় নেয়ার পূর্বাভাস। তাই এতে বিশেষ কিছু আমল করা চাই।
প্রথম কাজ হলো, আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা। কেননা তিনি নিজ অনুগ্রহে আমাদের এ বরকতময় সময় দান করেছেন। এছাড়া এ জন্যও শুকরিয়া আদায় করব, তিনি আমাদের তাঁর দরবারে হাজিরা দেয়ার তাওফীক দান করেছেন। নামায পড়ার তাওফীক দিয়েছেন। রোযা রাখিয়েছেন। তারাবীহ পড়ার সুযোগ দিয়েছেন। এটা আল্লাহর বিশেষ মেহেরবানী, কোনো না কোনো পর্যায়ে তিনি আমাদের এ সকল ইবাদত করার তাওফীক দান করেছেন।
নতুবা অনেক পরিবার এমন আছে, যাদের খোঁজ-খবরই থাকে না কবে রমযান এসেছে, কবে গত হয়েছে। আল্লাহ আমাদের সকলকে এর থেকে রক্ষা করুন। তাদের না আছে নামাযের প্রতি মনোযোগ, না রোযার প্রতি মনোযোগ। অন্যান্য মাসের মতো এ মাসও কেটে যায়। আল্লাহ তাআলার মহাঅনুগ্রহ, তিনি আমাদের তাদের অন্তর্ভুক্ত করেননি। রোযা, নামায ও তারাবীহ পড়ার তাওফীক দান করেছেন। এসবই আল্লাহর অনুগ্রহ।
আল্লাহ তাওফীক দিয়েছেন তো ঠিক, কিন্তু আমাদের ইবাদত কতটুকু হয়েছে এবং কিভাবে হয়েছে তাতে কত ত্রুটি ও অসম্পূর্ণতা রয়েছে, এজন্য আল্লাহর কাছে তাওবা-ইস্তেগফার করা উচিত। কুরআনুল কারীমে পূর্ববর্তী উম্মতের ব্যাপারে এসেছে, আল্লাহর নেক বান্দারা রাতে খুব কম ঘুমাত। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ইবাদত করত। রুকু, সেজদা এবং কিয়ামে লিপ্ত থাকত, কিন্তু সকাল হলে তারা আল্লাহর কাছে ইস্তেগফার করত।
হযরত আয়েশা রা. থেকে এ আয়াত প্রসঙ্গে বর্ণিত আছে, তার মোটামুটি ভাষ্য এরূপ, তিনি বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! ইস্তেগফার তো হয় গোনাহ থেকে, কিন্তু এখানে তো সারা রাত আল্লাহর ইবাদতে কাটিয়েছে, ঘুমায়নি। অথচ তাদের ব্যাপারে বলা হচ্ছে, সকাল বেলা তারা ইস্তেগফার করত। তারা তো কোনো গোনাহ করেনি। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ইস্তেগফার এ জন্য, যেভাবে আল্লাহর ইবাদত করা দরকার ছিল তার হক আমাদের থেকে আদায় হয়নি।
মোটকথা, আল্লাহ তাআলার তাওফীকদানের উপর শোকর আদায় করবে। আর আমাদের দ্বারা যেহেতু হক আদায় হয়নি এ জন্য ইস্তেগফার করবে।
হযরত আবু বকর সিদ্দীক রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখনই কোনো ইবাদতের তাওফীক হবে তখন আল্লাহ তাআলার উদ্দেশে দু’টি কাজ করবে। বলবে, আল্লাহর প্রশংসা এবং তাঁর কাছে ইস্তেগফার করছি।
শুকরিয়া এ জন্য, তিনি তাওফীক দান করেছেন। আর ইস্তেগফার এ জন্য, যেভাবে ইবাদত করা দরকার ছিল তা হয়নি। হাদীসে একটি ভয়াবহ বিষয় আলোচিত হয়েছে। সকল মুসলমানের সে ব্যাপারে সতর্ক থাকা উচিত। নিম্নে হাদীসটির অনুবাদ পেশ করা হলো, হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদা মিম্বরে আরোহণকালে প্রথম সিঁড়িতে পা রেখে আমীন বললেন। দ্বিতীয় সিঁড়িতে পা রেখে আমীন বললেন। তৃতীয় সিঁড়িতে পা রেখেও আমীন বললেন।
খুতবা শেষে মিম্বর থেকে অবতরণ করলে সাহাবায়ে কেরাম আরয করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আজ আপনি এ ধরনের কাজ কেন করলেন? তিনি বললেন, আমি যখন প্রথম সিঁড়িতে পা রাখি তখন আমার কাছে জিবরাঈল আ. এসে বললেন, হে মুহাম্মদ! যে ব্যক্তি তার মাতা-পিতা উভয়কে কিংবা একজনকে পেয়েও মা লাভ না করে মারা যায়, সে জাহান্নামে প্রবেশ করুক এবং আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হোক। আপনি আমীন বলুন। আমি বললাম আমীন।
আর যার নিকট আপনার আলোচনা হওয়া সত্ত্বেও সে আপনার প্রতি দরূদ শরীফ প্রেরণ করল না, আল্লাহ তাকে রহমত থেকে বঞ্চিত করুন। আপনি বলুন আমীন। আমি আমীন বললাম। আর যে ব্যক্তি রমযান মাস পেয়েও মাপ্রাপ্ত হলো না আল্লাহ তাকে রহমত থেকে দূরে সরিয়ে দিন। আপনি বলুন আমীন। আমি বললাম, আমীন। [সহীহ ইবনে হিব্বান : মুজামুল কাবীর লিততাবারানী]
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মিম্বর ছিল তিন সিঁড়িবিশিষ্ট। তিনি দাঁড়াতেন উপরের সিঁড়িতে। যখন আবু বকর সিদ্দীক রা. প্রথম খলীফা হলেন, তিনি ভাবলেন, আল্লাহর রাসূলের সিঁড়িতে দাঁড়ানো আমার জন্য বেয়াদবি হবে, তাই তিনি দ্বিতীয় সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে খুতবা দিতেন। আবু বকর রা. এর ইন্তেকালের পর উমর রা. খলীফা হলেন। তিনি ভাবলেন, আমার জন্য তো দ্বিতীয় সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে খুতবা দেয়াও বেয়াদবি হবে, তাই তিনি খুতবা দেয়ার সময় তৃতীয় তথা শেষ সিঁড়িতে দাঁড়াতেন। তারপর থেকে এই পর্যন্ত এভাবেই চলে আসছে।
দেখুন, এখানে যিনি দোয়া করেছেন, তিনি আল্লাহর ফেরেশতা জিবরাঈল আ.। যিনি আমীন বলেছেন, তিনি নবী-রাসূলগণের সরদার মুহাম্মদ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। দিনটি ছিল জুমআর দিন, খুতবার সময়। স্থান মসজিদে নববী। সুতরাং দোয়াগুলো যে কবুল হয়েছে, তাতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। ভয়ের বিষয় হলো, এগুলো তো দোয়া ছিল না, ছিল বদ-দোয়া। বদ-দোয়া করেছেন জিবরাঈল আ.। আমীন বলেছেন নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। সুতরাং তা কবুলের ব্যাপারে কোনো সন্দেহ থাকতে পারে না। নিম্নে বদ-দোয়াগুলোর বিবরণ তুলে ধরা হলো।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথম সিঁড়িতে পা রাখলে জিবরাঈল আ. বদ-দোয়া করলেন, ওই ব্যক্তি ধ্বংস হোক, যে তার মাতা-পিতাকে বৃদ্ধ অবস্থায় পেয়েও নিজের গোনাহ মা করিয়ে নিতে পারল না। অর্থাৎ, যার মা-বাবা বুড়ো হয়ে গেছে, তার জন্য জান্নাত লাভ করা সহজ। কারণ, মা-বাবার খেদমতে যখন তার প্রথম পদপে শুরু হয়, তখন থেকেই আল্লাহর রহমত নাযিল হতে থাকে। মা-বাবা খুশি তো আল্লাহ খুশি।
হাদীস শরীফে এসেছে, মা-বাবার প্রতি একবার রহমতের দৃষ্টিতে তাকালে একটি হজ্ব ও একটি ওমরার সাওয়াব পাওয়া যায়। একবারের দৃষ্টিলতে এত সওয়াব পাওয়া গেলে এভাবে প্রতিবারে কত সওয়াব পাওয়া যাবে, কল্পনা করা যায় কি? মা-বাবা হলেন সন্তানের দুনিয়া-আখেরাতের সফলতার চাবিকাঠি। মা-বাবাকে খুশি করুন, দেখবেন তাঁরা দোয়ার পসরা সাজিয়ে দিবেন। তাই তাঁদের সেবা করে জান্নাত লাভ করা সহজ, কিন্তু যে লোকটি মা-বাবাকে বুড়ো অবস্থায় পেল, অথচ নিজের মা নিশ্চিত করিয়ে নিতে পারল না, সত্যিই সে হতভাগা।
দ্বিতীয় সিঁড়িতে পা রেখে জিবরাঈল আ. বললেন, সে ব্যক্তি ধ্বংস হোক যার সামনে আপনার নাম নেয়া সত্ত্বেও সে দরূদ শরীফ পড়েনি। বলাবাহুল্য, মানবতার সবচে বড় দরদী আমাদের প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। গোটা মানবতার ইতিহাসে এত বড় উপকারী দ্বিতীয় জন নেই। তিনি উম্মতের জন্য কী-না করেছেন। কত কষ্ট সহ্য করেছেন। জুলুম-নিপীড়ন, ুধা-পিপাসাসহ অসহনীয় পরিস্থিতির মোকাবেলা করে তিনি উম্মতকে ঈমানের দৌলত উপহার দিয়েছেন। সে নবীর নাম শোনার পরও দরূদ না পড়া বড়ই দুর্ভাগ্যের পরিচয়। এ কারণে জিবরাঈল আ. বদ-দোয়া করেছেন এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেই আমীন বলেছেন।
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সংপ্তি দরূদ। এছাড়াও বহু দরূদ রয়েছে। যেকোনো দরূদ পড়লে উক্ত কর্তব্য আদায় হয়। সুতরাং আল্লাহর নবীর নাম উচ্চারিত হলে অন্তত ‘সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ বলা চাই। আমাদের দেশে সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বোঝানোর জন্য যে صلعم অথবা ص ইত্যাদি (যেমন বাংলায় সা.) লেখা হয়, এর দ্বারা দরূদের হক আদায় হয় না। এটা কৃপণতা। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে কৃপণতা কেন? এমনও তো হতে পারে, এর কারণে আমরা বদ-দোয়ার ভাগী হয়ে যাব। আল্লাহ আমাদের রা করুন।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তৃতীয় সিঁড়িতে পা রাখার পর জিবরাঈল আ. বদ-দোয়া করলেন, ঐ ব্যক্তি ধ্বংস হোক, যে রমযানের এক মাস পেল অথচ নিজের গোনাহ মাফ করিয়ে নিতে পারল না।
সুতরাং আজকের দিন ভয়েরও। একটা রমযান তো চলে গেলো, কিন্তু আমাদের গোনাহের কি হলো? আমরা কি মা করিয়ে নিতে পেরেছি? রমযান তো ছিল মাগফিরাতের মাস। যাবতীয় অপবিত্র চিন্তা, কাজ ও কথা থেকে নিজেকে শুদ্ধ করে মাগফিরাতের সাগরে ডুব দেয়ার মাস। এ মাসের এক একটি মুহূর্ত ছিল হীরার মতো দামী। আল্লাহ বিরামহীনভাবে আমাদের তাঁর রহমতের কোলে ডেকে বলেছিলেন, আছ কি মা প্রার্থনাকারী, যাকে আমি মা করব। আছ কি রিযিক প্রার্থনাকারী, যাকে আমি রিযিক দিব? আছ কি বিপদ-আপদ থেকে মুক্তি প্রার্থনাকারী, যাকে আমি মুক্তি দিব?
আল্লাহ তাআলা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তোমরা রোযা রাখ, তারাবীহর প্রতি যত্মবান হও, অতীত গোনাহগুলো আমি মা করে দিব। রোযাদারকে ইফতার করাও, তোমাকে মা করে দিব। তোমার রোযার প্রতিটি ধাপ ইবাদত। রমযানের প্রতিটি পদেেপ আল্লাহ তাআলা মার দরজা খুলে রেখেছেন। হাদীসে যে বলা হয়েছে, ‘রমযানে জান্নাতের সকল দরজা উন্মুক্ত করে দেয়া হয় এবং জাহান্নামের সকল দরজা বন্ধ করে দেয়া হয়’ এর অর্থ এটাই।
সারকথা, আল্লাহ তোমাকে মা করার জন্য এত বাহানা রেখে দিয়েছেন। সুতরাং মা অর্জনের জন্য এর চেয়ে উপযুক্ত সুযোগ আর নেই। যে লোকটি এত বড় সুযোগ নষ্ট করে দিল, তার জন্য দুর্ভোগ। তার জন্য রয়েছে জিবরাঈল আ. এর বদ-দোয়া। সুতরাং আজকের দিনটি ভয়েরও দিন।
আল্লাহ তাআলার দয়া অসীম। তাঁর কাছে আশা রাখ, তিনি আমাদের উক্ত বদ-দোয়ার অন্তর্ভুক্ত করেননি। রোযা রাখার তাওফীক তিনিই তো দিয়েছেন। আমাদের ঈমান আছে, সওয়াবের আশাও আছে। আলহামদু লিল্লাহ!
সুতরাং এ আশাও রাখব, তিনি আমাদের মা করে দিবেন। নিজেদের ভুল আছে, এজন্য ভয়ও আছে। এরই নাম ঈমান। ইরশাদ হয়েছে, “ভয় ও আশার নামই ঈমান।”

অনুবাদ : মুফতী উবায়দুল হক খান, মুঈনে মুফতী, জামিআ সাবিলুর রাশাদ গাজীপুর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight