জীবন

হাফেজ আমিনুল ইসলাম, হাসাড়া, মুন্সিগঞ্জ
প্রশ্ন : আমাদের মসজিদে বহুদিন ধরে জুমআর দিন একটি নিয়ম চালু আছে যে, ইমাম সাহেব যখন জুমআর খুতবা দেয়ার জন্য দাঁড়ান তখন সামনের কাতারগুলোতে দানবাক্স চালিয়ে দেয়া হয়। আর পেছনের কাতারগুলোতে খাদেম নিজেই রুমাল বা থলে হাতে হেঁটে হেঁটে টাকা ওঠান। খুতবা চলাকালীন এভাবে দানবাক্স চালানো এবং রুমাল দিয়ে টাকা ওঠানো কি ঠিক হচ্ছে?
জবাব : জুমআর নামাজের খুতবা চলাকালীন সকল কাজকর্ম থেকে বিরত থেকে খুতবা শ্রবণ করা ওয়াজিব। এ সময়ে দানবাক্স চালিয়ে হোক বা কাতারে কাতারে থলে হাতে বা রুমাল নিয়ে হেঁটে হেঁটে অথবা অন্য যে কোনো উপায়ে হোক টাকা ওঠানো ও টাকা দেয়া নাজায়েয।
হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি খুতবা চলাকালীন কংকর সরালো সেও অনর্থক কাজ করলো। অন্য হাদীসে আছে, যে ব্যক্তি অনর্থক কাজ করলো তার জুমআই শেষ হয়ে গেলো। তাই খুতবা চলাকালীন কোনো অবস্থাতেই দান-অনুদান তোলা যাবে না। [সহীহ বুখারী : ১/১২৭; বাদায়িউস সানায়ি : ২/২০৩; ফাতহুল কাদীর : ২/৬৬]
আনোয়ার হোসাইন, শ্রীপুর, গাজীপুর
প্রশ্ন : মদীনা থেকে মক্কায় গিয়ে যে সকল সৌভাগ্যবান ব্যক্তিবর্গ রাসুলুল্লাহ সা.-এর হাতে বাইআত গ্রহণ করেছিলেন এবং প্রথম বাইআতে শরীক হয়েছিলেন তারা কতজন এবং তাদের নাম কী?
জবাব : নবুওতের দশ বছর পর্যন্ত মক্কায় ইসলামের কোনো চর্চা ছিলো না। একাদশ বছরে মদীনা থেকে যারা হজ করতে মক্কায় আসেন তাদের মধ্যে রাসুলুল্লাহ সা. গোপনভাবে ইসলামের দাওয়াত দেন। ফলে ওই বছর মোট ছয়জন ইসলাম গ্রহণ করেন। এ বছর কোনো বাইআত হয়নি।
দ্বিতীয় বছর অর্থাৎ নবুওতের দ্বাদশ বছরে পূর্বের ছয়জনসহ আরো ছয়জন আসেন। আগে যারা ইসলাম গ্রহণ করেন নি তারাও ইসলাম গ্রহণ করেন এবং সবাই রাসুলুল্লাহ সা.-এর হাতে ইসলামের জন্য সর্বপ্রথম বাইআত গ্রহণ করেন। তাঁরা হলেন :
১। আসাদ বিন যুরারা রা.;
২। আউফ বিন হারেস রা.;
৩। রাফে বিন মালেক রা.;
৪। কুতবা বিন আমের রা.;
৫। উকবা বিন আমের রা.;
৬. মুআয বিন হারেস রা.;
৭। যাকওয়ান বিন আবদে কায়স রা.;
৮। আব্বাস বিন উবাদা রা.;
৯। আবুল হাইসাম মালেক রা.;
১০। ইয়াযিদ বিন সালাবা রা.;
১১। উবাদা বিন সামেত রা.;
১২। উআইম বিন সায়েদা রা.;
[সীরাতে মোস্তফা, ১খ, পৃষ্ঠা ৩৩২-৩৩৬]
মোহাম্মদ আনোয়ার, নেত্রকোনা
প্রশ্ন : আমরা জানি হযরত হামযা রা. রাসুল সা.-এর চাচা চিলেন। কেউ কেউ বলেন, তিনি নাকি রাসুল সা.-এর দুধভাইও ছিলেন। এ কথাটি কি সঠিক? কে কে রাসুল সা.-এর দুধভাই ছিলেন?
জবাব : হ্যাঁ, হযরত হামযা রা. রাসুলুল্লাহ সা.-এর চাচাও ছিলেন, আবার দুধভাইও ছিলেন। জন্মসূত্রে তিনি রাসুল সা.-এর চাচা ছিলেন এবং তিনি রাসুল সা.-এর দুধমাতা সুয়াইবাহর দুধ পান করেছিলেন। এ ছাড়াও রাসুল সা.-এর স্ত্রী উম্মে সালামা রা.-এর প্রাক্তন স্বামী আবু সালামা রা.ও সুয়াইবাহর দুধ পান করেছিলেন। এ হিসেবে তাঁরা উভয়ই রাসুল সা.-এর দুধভাই ছিলেন। এ ছাড়া হালিমা সাদিয়া রা.-এর ছেলে আবদুল্লাহও রাসুল সা.-এর দুধভাই। [আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া : ২/৭৩]

আবদুল আলিম, মিরপুর, ঢাকা।
প্রশ্ন : রাসুলুল্লাহ সা. সর্বপ্রথম কত বছর বয়সে সিরিয়া সফর করেন? ওই সফরের উদ্দেশ্য কী ছিল?
উত্তর : রাসুলুল্লাহ সা.-এর বয়স যখন আট বছর তখন তাঁর দাদা আবদুল মুত্তালিব দুনিয়া থেকে বিদায় গ্রহণ করেন। তিনি নবীজীকে সীমাহীন ভালোবাসতেন। মৃত্যুর আগে পুত্র আবু তালিবকে, যিনি নবীজীর আপন চাচা ছিলেন, ডেকে নিয়ে তাঁর জিম্মায় নবীজীকে দিয়ে গিয়েছিলেন। চাচা আবু তালিব নবীজীকে অত্যন্ত ¯েœহ করতেন। যেখানে যেতেন সঙ্গে করে নিয়ে যেতেন।
আরবের রেওয়াজ অনুসারে কুরাইশ গোত্রের একটি ব্যবসায়ী দল ব্যবসার উদ্দেশ্যে সিরিয়া সফরে যেত। একবার আবু তালিবও একই উদ্দেশ্যে ওই ব্যবসায়ী দলের সঙ্গে শরিক হন। বয়সে ছোট হওয়ার কারণে নবীজীকে সঙ্গে নেওয়ার ইচ্ছা ছিল না। কিন্তু রওয়ানা হওয়ার সময় নবীজীর মুখ মলিন দেখে সঙ্গে নিয়ে নেন। তখন নবীজীর বয়স ছিল মাত্র বার বছর। তবে বিশেষ কারণে পথিমধ্যে তিনি বসরা থেকে মক্কায় ফেরত চলে আসেন।
মাহবুবে এলাহী, চাটখিল, নোয়াখালী
প্রশ্ন : ওয়াইস কারনী রহ. সম্পর্কে একটি ঘটনা প্রসিদ্ধ আছে যে, ওহুদ যুদ্ধে রাসুল সা.-এর দান্দান মুবারক শহীদ হয়ে যাওয়ার পর তিনি তা জানতে পেরে পেরেশান হয়ে পড়েন। মর্মযাতনায় তাঁর অন্তর ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। এ ঘটনার পর তিনি নিজেকে আর স্থির রাখতে পারলেন না। ভাবতে লাগলেন নবীর দাঁত যখন শহীদ হয়েছে, তখন আমার এ দাঁত রেখে লাভ কী? এই কথা বলে তিনি নিজের একটি দাঁত ভেঙে ফেললেন। কিন্তু পরক্ষণেই চিন্তা করলেন, আমি যে দাঁত ভেঙেছি নবীজীর হয়তো সে দাঁত ভাঙে নি, অন্যটি ভেঙেছে। এই কথা ভেবে তিনি নিজের আরেকটি দাঁত ভেঙে ফেললেন। এভাবে নিজের সব দাঁত ভেঙে ফেললেন। এই ঘটনা সত্য কিনা?
জবাব : না এই ঘটনার কোনো প্রমাণ কোনো কিতাবে পাওয়া যায় না। মোল্লা আলী কারী রহ. বলেন, এ ঘটনার কোনো প্রমাণ নেই। তাছাড়া ঘটনাটি মাসআলার দিক থেকেও সঠিক নয়। নিজের কোনো অঙ্গ নিজহাতে ইচ্ছাপূর্বক নষ্ট করা জায়েয নেই। তা হারাম। ওয়ায়েস কারনী রহ. একজন তাবেয়ী ও বুযুর্গ ব্যক্তি ছিলেন। এ রকম নাজায়েয কাজ তিনি করতে পারেন না।
বলা বাহুল্য, রাসুলুল্লাহ সা.-এর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ বৈধভাবে হতে পারে। অবৈধ উপায়ে তাঁর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করা জায়েয নয়। [সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৫৪২; আল-বুরহানুল জালী ফী হাতকীকী ইনতিসাবিস সুফিয়্যাতি ইলা আলী, পৃষ্ঠা ১৬৪-১৬৫]

হারুনুর রশীদ, মিরপুর, ঢাকা।
প্রশ্ন : নামাযে সুরা ফাতেহার পর অন্য সুরা মেলাতে হয়। কিন্তু কেউ যদি সুরা ফাতেহার পর ভুলক্রমে তাশাহ্হুদ পড়ে ফেলে, পরে স্মরণ হওয়ামাত্র সুরা পড়ে নেয়, তাহলে তার নামায হবে কি?
জবাব : উল্লিখিত সুরতে এই ব্যক্তির ওপর সিজাদায়ে সাহু ওয়াজিব হবে। নামায শেষে সিজদায়ে সাহু করে নিলে নামায আদায় হয়ে যাবে। অন্যথায় নামায হবে না। [আনাহরুল ফায়েক, ১/৩৪২; হাশিয়াতুত তাহতাবি আলাল মারাকী, ৪৬১]
আলতাফ হুসাইন
মুহাম্মদপুর, ঢাকা
প্রশ্ন: (ক) আয়েশার কাছে ফাতেমার কিছু টাকা পাওনা ছিল। আয়েশা ফাতেমার টাকা পরিশোদধ করার আগেই ফাতেমা মারা যায়। ফাতেমার ওয়ারিশ, আত্মীয়- স্বজন বা বন্ধু বান্ধবের কারো সাথেই আয়েশার পরিচয় নেই। এখন আয়েশা ফাতেমার টাকা কিভাবে পরিশোধ করবে?
(খ) এক বক্তাকে বলতে শুনা গেল, ৪ টি জিনিস অসীম। আল্লাহ, জান্নাত, জাহান্নাম ও মানুষ। এই কথাটি ঠিক কিনা? মানুষ কিভাবে অসীম হতে পারে?
(গ) দুরূদে তুনাজ্জিনা/ নাজিয়া, দুরূদে নারিয়া ইত্যাদি বিভিন্ন দুরূদ শরীফ যেগুলো হাদীস দ¦ারা প্রমাণিত নয়; বরং বুযুর্গানে দ্বীনের অভিজ্ঞতা দ্বারা প্রমাণিত, সেগুলো পড়ার ব্যাপারে শরীয়তের হুকুম কী?
জবাব : (ক) প্রশ্নোক্ত সূরতে ফাতেমার টাকা পরিশোধ করার জন্য তার কোন ওয়ারিশকে খোঁজ করা আয়েশার জন্য আবশ্যক। যদি কোন ওয়ারিশের সন্ধান মেলে তবে তাকে আদায় করে দিবে। আর সাধ্যানুযায়ী খোঁজ করার পরেও যদি কোন ওয়ারিশের সন্ধান না মেলে তাহলে সন্ধান পাওয়ার আশায় অপেক্ষা করতে থাকবে। যদি নিরাশ হয়ে যায় তাহলে আয়েশা সেই টাকা ফাতেমার নামে মিসকিনদেরকে সদকা করে দিবে। কিন্তু পরবর্তিতে যদি কোন ওয়ারিশ পাওয়া যায় এবং সে আয়েশার সদকা করাকে মেনে নেয় তবে তো তার ঝণ আদায় হয়ে যাবে। অন্যথায় পুনরায় তাকে পূর্ণ টাকা আদায় করতে হবে। এক্ষেত্রে সদকার সওয়াব আয়েশা পাবে। (মাজমাউয যিমানাত; পৃষ্ঠা ৭৭৯, আহসানুল ফাতাওয়া ৬/৩৯০,ইমদাদুল আহকাম, ৩/৬২৬)
(খ) বক্তার এই কথা সঠিক নয়। কেননা অসীমের মূল অর্থ হল, সীমাহীন, যার কোন সীমা নেই। আর সীমাহীন একমাত্র আল্লাহ তায়ালাই। পক্ষান্তরে জান্নাত, জাহান্নাম ও মানুষ আল্লাহ তায়ালার মাখলুক যা কিছুতেই সীমাহীন হতে পারে না। আর অসীমের অর্থ যদি তিনি চিরস্থায়ী বা অশেষ বুঝিয়ে থাকেন তাহলে আরশ, কুরসী, ফেরেশতা, জীন, এগুলোও তো স্থায়ী হতে পারে। নির্দিষ্ট করে চারটি জিনিস বলা তো অযৌক্তিক। (সূরা নিসা- আকীদাতুত ত্বহাবী; প্রষ্টা ৬৫, মা’ আরিফুল কুরআন৩/৪০৮)
(গ) দুরূদে তুনাজ্জিনা, নারিয়া ইত্যাদি দুরূদ শরীফ যা হাদীস দ্বারা প্রমাণিত নয় যদি তা শুধু দুনিয়াবী উদ্দেশ্য হাসিলের লক্ষ্যে, কোন ধরনের বিপদাপদ থেকে মুক্তি লাভের উপায় স্বরূপ, কোন হকপন্থী আলেম, বুযুর্গ পড়তে দেন তাহলে তা কোন রকমের শরীয়ত কর্তৃক হুকুম প্রমাণিত হওয়ার আকীদা বিশ্বাস না রাখার শর্তে এবং দুরূদগুলোর সাথে শরীয়ত বিরোধী কোন শব্দ যোগ করা না হলে তা পড়া জায়েয আছে। অন্যথায় পড়া জায়েয নেই। ( ফাতাওয়ায়ে রহীমিয়া ২/৮২,৮৩)
মুহাম্মাদ খাইরুল ইসলাম, কয়রা, খুলনা
প্রশ্ন: নখ কাটার সুন্নাত তরীকা কি? কোন্ দিন ও কতো দিন পর পর নখ কাটা সুন্নাত? বিস্তারিত জানালে উপকৃত হবো।
উত্তর: হাতের নখ কাটার জন্য কিতাবে দু‘ধরনের মুস্তাহাব পদ্ধতি পাওয়া যায়। প্রথমটি হলো, ডান হাতের শাহাদাত অঙ্গুলী তথা তর্জনী থেকে শুরু করে মধ্যমা, অনামিকা, কনিষ্ঠা এরপর বৃদ্ধাঙ্গুলের নখ কাটবে। অতঃপর বাম হাতের কনিষ্ঠাঙ্গুলী থেকে শুরু করে বৃদ্ধাঙ্গুলে শেষ করবে। এই পদ্ধতিটি মুহাদ্দিসীনে কিরামের নিকট অধিক গ্রহণযোগ্য।
দ্বিতীয় পদ্ধতিটি হলো, উভয় হাতকে মুনাজাতের আকৃতিতে ধরে ডান হাতের তর্জনী থেকে শুরু করে বাম হাতের বৃদ্ধাঙ্গুল পর্যন্ত কেটে শেষ করে সর্বশেষ ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলের নখ কাটবে। এ পদ্ধতিটি অধিক প্রচলিত হলেও প্রথমটিই বেশী উত্তম।
পায়ের নখ কাটার মুস্তাহাব পদ্ধতি হলো, ডান পায়ের কনিষ্ঠাঙ্গুলী থেকে শুরু করে বাম পায়ের কনিষ্ঠাঙ্গুলে শেষ করবে।
নখ কাটার জন্য নির্দিষ্ট কোনো দিন নেই। যে কোনো দিন কাটা যাবে। তবে শুক্রবারে কাটা উত্তম। তাই সম্ভব হলে প্রতি সপ্তাহ শুক্রবার কাটা চাই। সম্ভব না হলে পনের দিন পর পর কাটবে। তাও সম্ভব না হলে চল্লিশ দিনের ভিতরে অবশ্যই কাটবে। কেননা, চল্লিশ দিনের বেশী হয়ে গেলে, তার জন্য অনেক হুঁশিয়ারী উচ্চারিত হয়েছে। দিনে সুযোগ না পেলে কিংবা মনে না পড়লে, রাতেও কাটা যাবে। রাতে নখ কাটতে কোনো অসুবিধে নেই। তবে যুদ্ধরত মুজাহিদ কিংবা অমুসলিম এলাকায় বসবাসরত মুসলমানদের জন্য চল্লিশ দিনের বেশী সময়ও নখ না কাটার অনুমতি আছে।- ফাতহুল বারী শরহে বুখারী: ১০/৩৪৫, ৩৪৬, আদ্-র্দুরুল মুখতার মা‘আ ফাতাওয়া শামী: ৯/৫৮২, ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ৫/৩৫৭, ৩৫৮, ফাতাওয়া খানিয়া বিহামিশি হিন্দিয়া: ৩/৪১১, মিরকাতুল মাসাবীহ শরহে মিশকাত: ৩/৪।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight