জীবন হোক আল্লাহতে সমর্পিত : ড. মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী

এক দরবেশ আশ্রয় নিয়েছিলেন গহীন বনে। লোকালয় ছেড়ে নির্জন সাধনায় তার একমাত্র সাথী ছিল নিদ্রা। তার সব প্রয়োজন-চাহিদা মিটে যেত আল্লাহর পক্ষ হতে। তাই মানুষের সংশ্রবে তিনি অস্বস্তিবোধ করতেন। লোকালয়ের স্বাভাবিক জীবন ছেড়ে নির্জন সাধনা কীভাবে কারো ভাল লাগে, এ প্রশ্ন কারো মনে জাগতে পারে। মওলানা রূমী র. জবাবে বলেন, যাকে যে কাজের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে সে কাজ তার কাছে ভাল লাগে। কেউ বাড়ীতে আরামে জীবন কাটাতে ভালবাসে। কেউ আনন্দ পায় সফরে, দেশভ্রমনের কষ্ট স্বীকারে, এমনকি দুর্গম পর্বতারোহনে। নেতৃত্বের বাতিকে কেউ জীবনের আরাম আয়েশ ভুলে আনন্দ পায়। আবার কেউ চাষাবাদে সবুজের সমারোহে প্রাণ জুড়ায়। বস্তুত প্রত্যেক মানুষকে একেক কাজের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে, আর সেই কাজের আকর্ষণ তার অন্তরে গেঁথে দেয়া হয়েছে। সেকাজেই সে মনের শান্তি পায়। কুরআন মজীদের ভাষায় :
“বলুন, প্রত্যেকেই নিজ প্রকৃতি অনুযায়ী কাজ করে থাকে এবং তোমার প্রতিপালক চলার পথে কে সর্বাপেক্ষা নির্ভুল তা সম্যক অবগত আছেন।” [সূরা বনি ইসরাঈল : আয়াত ৮৪]
মওলানা রূমী বলেন,
গর বেবিনী মেইলে খোদ সূয়ে সামা
পররে দওলত বরগুশা হামচোন হুমা
যদি দেখ তোমার মনের আকর্ষণ উর্ধ্ব আসমান পানে
বিহঙ্গের মতো উড়াল দাও সৌভাগ্যের ডানা মেলে।
তুমি যদি তোমার অন্তরে আধ্যাত্মিক আকর্ষণ, ঐ জগতের হাতছানি অনুভব কর, তাহলে আনন্দিত হও, সৌভাগ্যে তোমার সন্ধানে। রূপকথার বিহঙ্গমা পক্ষীর মতো ডানা মেলে সেদিকে উড়াল দাও। কারণ এই আকর্ষণের অন্য অর্থ, উর্ধ্বজগত হতে তোমার প্রতি আহ্বান এসেছে। তাই সে আকর্ষণে তুমি আকৃষ্ট হচ্ছ। এমন যে কোনো কাজ থেকে বিরত থাক, যার কারণে সেই আকর্ষণ ব্যাহত হয়। পক্ষান্তরে,
ওয়ার বেবিনী মেইলে খোদ সূয়ে যমীন
নওহে মী কুন হীচ মন্শীন আয হানীন
আর যদি দেখ তোমার ঝোঁক মাটির দিকে
কাঁদো অবিরাম কান্না যেন একটুও না থামে।
যদি দেখ যে, তোমার মনের টান দুনিয়ার দিকে, বস্তুগত হীনতা নিচতা, অপবিত্রতা, অশ্লীলতার দিকে, তাহলে বুঝে নাও যে, তোমার কপাল হয়ত মন্দ। তোমার যাত্রা ধ্বংসের পথে। এ মুহূর্তে তোমার করণীয়, তুমি কাঁদতে থাক, আল্লাহর কাছে মাফ চাও, সাহায্য চাও। মানবিক অধঃপতনের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায় তালাশ কর।
হ্যাঁ, প্রত্যেকে নিজের মনের সাথে পরামর্শ করে বুঝতে পারে, নিজে কি আসলে ভাল মানুষ? মানবীয় গুণাবলীর প্রতিভা কি তার মধ্যে গচ্ছিত? মনুষ্যত্বের সৌভাগ্য তার নসীব হবে? নাকি তার মন তাকে মন্দের দিকে, হীনতা নিচতা, পাপ ও অশ্লীলতার দিকে টানে। সে অবস্থায় অবশ্যই সতর্ক হতে হবে। হতে পারে তার ভাগ্য লিপিতে দুর্ভাগ্য লেখা আছে। এমন পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য মওলানা রূমীর পরামর্শ, তুমি কাঁদো, কান্না জুড়ে দাও, অবিরাম কাঁদো। এই কান্নাই তোমাকে উদ্ধার করে নিয়ে যাবে আল্লাহর সান্নিধ্যে। তিনি বলেছেন, যারা জ্ঞানী ও বিচক্ষণ এ ধরনের আলামত দেখে তারা সতর্ক হয়ে যান। আল্লাহর কাছে কাঁদেন, সাহায্য চান। কিন্তু যারা মূর্খ নাদান তারা আল্লাহর শরণ না নিয়ে মাথা কুটে, বেসামাল হয়ে হাহুতাশ করে, অস্থিরতায় কাতরায়। মওলানার আরো পরামর্শ, কোনো কাজ করার আগে তার শেষটা দেখে নাও। যাতে তোমাকে পস্তাতে না হয়। শাস্ত্রে বলা আছে, ‘ভাবিয়া করিও কাজ করিয়া ভাবিও না।’
পরিণতি ভেবে কাজ করার গুরুত্ব প্রমাণের জন্য মওলানা রূমী আরেকটি গল্পের অবতারণা করে বুঝিয়ে বলেন, মান্যগণ্য বুড়ো এক লোক মুটভরা স্বর্ণকণা নিয়ে স্বর্ণের দোকানে গিয়ে বলল, আমাকে একটি নিক্তি দিন, আমার স্বর্ণগুলো মাপতে হবে। স্বর্ণকার বলল, আমার কাছে চালুনি নেই। বৃদ্ধ বলে, আমি তো চালুনি চাই নি, স্বর্ণ মাপার নিক্তি চাচ্ছি। দোকানদার বলল, আমার কাছে ঝাড়– নেই, বলছি। বুড়ো বলল, আপনি কি না শোনার ভান করছেন? না কি আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করছেন? আমি চেয়েছি স্বর্ণ ওজন দেয়ার নিক্তি, আপনি একবার বলেন, চালুনি নেই। আবার বলেন, ঝাড়– নেই। কি পেয়েছেন আমাকে? স্বর্ণকার বলল, আমি বধির নই। আপনার কথা শুনিনি এমনও নই। কিন্তু দেখছি, আপনার হাত কাঁপছে। আপনার পারকিনশন রোগ। কাজেই নিক্তি যদি আপনার হাতে দিই, স্বর্ণের টুকরোগুলো মাটিতে পড়ে যাবে। তখন বলবেন, একজন ঝাঁড়–দারকে ডাকুন। স্বর্ণকণাগুলো কুড়িয়ে দিক। আর চালুনির ব্যবস্থা কর। মাটি ছেকে স্বর্ণকণাগুলো আলাদা করে দাও। কাজেই আমি আগে থেকেই আপনার অবস্থা দেখে বুঝেছি, আপনাকে আমার নিক্তি দিলে সমস্যা আছে। এই গল্পে বুড়ো লোকটি সাধারণ মানুষের রূপক আর স্বর্ণকার দিব্যদৃষ্টির বুযর্গের উপমা। মওলানা বুঝাতে চান, বুযর্গ লোকেরা কথা বলেন ইশারায়। তারা সৃষ্টিলোকে বিরাজিত গুপ্ত রহস্য ফাঁশ করেন না। কারণ, তা আল্লাহর আমানত। তাই ইশারায় কথা বলেন। অথচ গল্পের বুড়োর মতো দুনিয়াদাররা তাদের ঈশারার মর্ম বুঝে না। মওলানা বলেন নির্জনে ইবাদতে নিমগ্ন দরবেশের প্রসঙ্গে ফিরে এসে বলেন,
সেই বনে ছিল ঘন ছায়াদার ফলজ গাছ। পেয়ারা সদৃশ গোলাবির সারি সারি বাগান। সেখানেই ধ্যানমগ্ন দরবেশের অবস্থান। দরবেশের খায়েশ জাগল, রিজিকের ব্যাপারে আল্লাহর সাথে বুঝাপড়া করবেন। বললেন, প্রভু হে! সাধনার পথে তোমার সাথে একটি অঙ্গীকার করতে চাই। আমি প্রতিজ্ঞা করছি, নিবিড় ফলজ গাছের কোনো ফল হাতে ছিঁড়ব না। ক্ষুধায় আক্রান্ত হলেও নিজ হাতে পেড়ে ফল খাব না। যে ফল গাছ থেকে ঝড়ে পড়বে তা নিয়েই ক্ষুন্নিবৃত্তি করব। কিছুদিন এই অঙ্গীকারের উপর চলল দরবেশ। কিন্তু তকদিরের অগ্নিপরীক্ষার সময় উপস্থিত হল। কারণ ছিল, দরবেশ তার অঙ্গীকারে ইনশাআল্লাহ (আল্লাহ চাহেন তো) বলেন নি। এ জন্যে আল্লাহর নির্দেশ হল, তোমার ভাবিষ্যত পরিকল্পনায় অবশ্যই ইনশাল্লাহ বল। তোমার সামর্থকে তার ইচ্ছার উপর সোপর্দ কর। তোমার কাজের সাথে তার শক্তিকে যুক্ত কর। কারণ, আল্লাহর ইচ্ছা ও ক্ষমতা তোমার আয়ত্বে নয়। তিনি প্রতিক্ষণে ভিন্ন ভিন্ন শানে থাকেন। তোমার দিলে তিনি প্রতি মুহূর্তে নতুন নতুন ভাবের উন্মেষ ঘটান। ‘কুল্লা ইয়াউমিন হুয়া ফি শান’ (প্রতিদিন তিনি একেক অবস্থায় থাকেন) [সূরা আর রহমান : আয়াত ২৯]
মওলানা আরবি কবিতায় বলেন,
কুল্লু ইসবাহিন লানা’ শানুন জদীদ
কুল্লু শাইয়িন আন মুরাদী লা ইয়াহীদ
প্রতিদিন ভোরে আমার জাগে নতুন নতুন অবস্থা,
যাকিছু ঘটে অতিক্রম করতে পারে না আমার ইচ্ছা।
বিষয়টির নাজুকতা বুঝানোর জন্যে মওলানা আরো বলেন, হাদীসে বর্ণিত, মানুষের দিল পাখির পালকের মতো, ঝরে পড়া পালক মরুবিয়াবানে ঝড়ের কবলে ওলট পালট হতে থাকে। হালকা পালকটিকে বাতাস যেদিকে ইচ্ছা ডানে, বামে, সামনে পেছনে নিয়ে যায়। তোমার দিলের অবস্থাও অনুরূপ।
অপর হাদীসের ভাষ্য অনুযায়ী মানুষের অন্তর নিত্যপরিবর্তনশীল। ডেকচির মধ্যে ফুটন্ত পানির মতো, যা টগবগ করে। প্রতি মুহূর্তে মনে একেক কল্পনার আনাগোনা চলে। মওলানা বলেন, এই ওলট-পালট, কল্পনা ও চিন্তার বিবর্তন নিজ থেকে নয়। বরং অন্য কোথাওর টানে এমনটি হয়। কাজেই মনের চিন্তা ও কল্পনার উপর তুমি কীভাবে অত বেশি আস্থাশীল হলে। কীভাবে মনে করলে যে, তোমার মনের অবস্থা, ভাব, চিন্তা অপরিবর্তিত থাকবে; অথচ পরে তোমাকে লজ্জিত অনুতপ্ত হতে হবে। তাই ইনশাআল্লাহ বলাই যে কোনো অযাচিত পরিস্থিতির রক্ষাকবচ। জেনে রেখ, মনের ভাবের এই পরিবর্তন তকদীরেরই ফায়সালা। বিচক্ষণ পাখি দেখে যে, ফাঁদ পেতে খাবার ছড়িয়ে শিকারী তার অপেক্ষায় আছে এরপরও লোভের বশে তার সতর্কতা মার খেয়ে যায়। চোখ কান খোলা থাকা সত্ত্বেও শিকারির পাতানো জালে আটকে যায়। তকদিরের ফায়সালা তাকে করুণ পরিণতির দিকে নিয়ে যায়।
কোনো এক শাহজাদা এমন রূপসী নারীর ফাঁদে আটকে গেল, যে কিনা বংশ মর্যাদায় বা যে কোনো বিবেচনায় রাজবংশের জন্য কলঙ্ক। ঘরবাড়ি রাজত্বের মায়া ছেড়ে এমন চোকরির পেছনে দৌঁড়াতে গিয়ে শাহজাদা সর্বশান্ত হয়ে যায়। পরে সম্বিত ফিরে পেলে বুযর্গ লোকের কাছে গিয়ে ধর্ণা দেয়, হুজুর আমাকে দোয়া করুন। আমার জন্য তদবির বাৎলে দিন। মনের আসক্তির বন্দিত্ব থেকে আমায় রক্ষা করুন। মওলানা বলেন, শাহজাদার এই বন্দিদশা তার তকদিরের ফায়সালা। এর থেকে উদ্ধার পাওয়ার পথ তারাই জানে, যারা আল্লাহওয়ালা। তাদের কাছেই দিব্যজ্ঞানের মশাল আছে।
মানুষের হাত পায়ে জিঞ্জিরবেড়ির বাঁধন বা কারাগারের লৌহকপাট যতই শক্ত হোক কোনো না কোনোভাবে খোলা যাবেই। কারণ তা প্রকাশ্যে দেখা যায়। কিন্তু মানুষের ভাগ্যের উপর যে জিঞ্জরবেড়ি তা খোলার সাধ্য নাই। এই বাঁধন কখনো মানুষকে সৌভাগ্যের আকাশে নিয়ে যায়। কখনো ধ্বংস অধঃপতনের গহ্বরে তলিয়ে নেয়। এই বাঁধন অদৃশ্য, কেবল তারাই দেখতে পায়, যারা স্বচ্ছ হৃদয়ের অধিকারী।
বন্দে তকদীর ও কাযায়ে মুখতাফী
কে নবীনদ অ’ন বজুয জা’নে সফী
তকদীরের ফায়সালা নিয়তির অদৃশ্য বাঁধন
দেখে শুধু সে যার হৃদয় স্বচ্ছ আয়নার মতন।
কাজেই ভবিষ্যতের কোনো কাজের দায়িত্ব আল্লাহর ইচ্ছার উপর সোপর্দ করাই বিচক্ষণ লোকের কাজ। কিন্তু গহীন বন নির্জনে আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন দরবেশ সে নিয়ম মানেন নি। নিজ হাতে গাছ থেকে আমরুদ পেড়ে খাবেন না বলে আল্লাহর সাথে অঙ্গীকার করার সময় ইনশাআল্লাহ বলেননি। যার ফলে কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হল।
পাঞ্জ রোয অ’ন বাদ আমরুদী নরীখত
যা’তশে জুআশ সবূরী মী গুরীখত
এরপর থেকে পাঁচদিন বাতাসে পড়ল না আমরুদ ঝরে
ক্ষুধার আগুনে দরবেশের ধৈর্য পালাল দেশ ছেড়ে।
পাঁচদিন ধরে কিছু খায়নি দরবেশ। ক্ষুধার আগুনে তার পৃথিবী গদ্যময়। থোকা থোকা আমরুদ ঝুলছে। অথচ একটিও ঝরে পরে না বাতাসের দোলায়। এরপরও তিনি ধৈর্যের পরাকাষ্ঠা দেখালেন। একবার প্রবল বাতাস বয়ে গেল। দরবেশ ভাবলেন, এই বুঝি টুপ করে একটি আমরুদ ঝরে পড়বে, তিনি ক্ষুন্নিবৃত্তি করবেন। কিন্তু না, পড়ল না। ক্ষুধা, দুর্বলতার সাথে তকদীরের ফায়সালা তাকে কাবু করে ফেলল। তিনি হাতটা বাড়িয়ে ক’টি আমরুদ পাড়লেন। সাথে সাথে তার অন্তরে খবর হয়ে গেল। তুমি প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করেছ। আল্লাহর সাথে কৃত ওয়াদা ভঙ্গের শাস্তি ভোগ করতে হবে। হ্যাঁ, আল্লাহর তরফে এমন শাস্তি এল, যা তার দিব্যচক্ষু খুলে দিল।
দরবেশ বিস্মিত, কিংকর্তব্যবিমূঢ়। আচমকা জনবিশেক ডাকাত এসে জটলা পাকাল সেই বাগানে। ডাকাতির মালমাত্তা ভাগ করে সেখানে বসে। ঘটনার উপর নজরদারী ছিল সরকারী গোয়েন্দার। থানায় খবর দিল, অমুক বনে ডাকাতের দল চোরাই মালামাল ভাগবাটোয়ারায় ব্যস্ত। এখনই অভিযান চালালে হাতে নাতে পাকড়াও হবে। তড়িত গতিতে রেপিড এ্যকশন টহল দল ঘটনাস্থলে হাজির। ডাকাতরা হাতে নাতে পাকড়াও। দ্রুত কার্যকর আইনে বিচার হল। শরীয়া আইনে প্রত্যেকের বাম পা, ডান হাত কাটা হল। চরম হট্টগোলের মধ্যে বেচারা দরবেশের বিচার এবার। ডাকাত দলের সাথে থাকায় বেচারা চোর সাব্যস্ত হল। প্রথমে তার ডান হাত কাটা হল, তারপর বাম পা কর্তিত। দরবেশ এগিয়ে দিল পা। দূর থেকে অশ^ারোহী দারোগা ডাক দিল, ওহে কী কর। ইনি তো চোর নন, ডাকাত নন। আল্লাহর অলি, অমুক আব্দাল। বাছবিচার না করে কেন মহান বুযর্গের হাত কাটলে তোমরা?
আল্লাহর অলির পরিচয় শুনে পুলিশ বেচারার পিলে চমকে উঠল। একি করলাম, হায় খোদা! আল্লাহর কসম না জেনে এতবড় জঘন্য পাপ করেছি। দরবেশের পায়ে ক্ষমা চায় পুলিশ। দরবেশ বললেন, অস্থির হইও না। এই শাস্তি আমার পাওনা ছিল।
মন শেকাস্তাম হুরমতে আয়মা’নে উ
পস ইয়ামীনাম বুর্দ দা’দেস্তা’নে উ
আমি তার সাথে অঙ্গীকারের করেছি সম্মান হানি,
তার বিচারই কেটে নিয়েছে আমার ডান হাতখানি। ৩খ. ব-১৬৮৮
আল্লাহর সাথে আমিই অঙ্গীকার করেছিলাম, আমরুদ গাছের ফল যেটি ঝড়ে পড়বে কেবল সেটিই কুড়িয়ে খাব। নিজে গাছ থেকে পেড়ে খাব না। (আল্লাহ রিযিকদাতাÑএই ঈমানে সিদ্ধি লাভ করব।) কিন্তু সেই অঙ্গীকার আমি নিজেই ভঙ্গ করেছি। অথচ জানতাম যে, অঙ্গীকার ভঙ্গ করলে তার প্রায়শ্চিত্ত ভোগ করতেই হবে। দারোগার উদ্দেশ্যে শেখ বললেন,
দস্তে মা’ ও পা’য়ে মা’ ও মাগজ ও পুস্ত
বা’দ আই ওয়ালী ফেদা’য়ে হুকমে দূস্ত
আমার হাত, আমার পা অস্থি মজ্জা চামড়া যত
বন্ধুর হুকুমের তরে হে দারোগা নিয়ত উৎসর্গিত।
এই শাস্তি আমার ভাগ্যে ছিল, আমি তোমাকে মাফ করে দিলাম। যেহেতু না জেনে করেছ এর অশুভ প্রতিক্রিয়া হতে তুমি নিরাপদ। আমার প্রকৃত অবস্থা তো তিনিই জানেন, যার ইচ্ছার সাথে লড়বার সাধ্য কারো নাই। দেখ না, অনেক বিচক্ষণ পাখি খাবারের খোঁজে গিয়ে নিজের গর্দানটা এগিয়ে দেয় শিকারির পাতানো জালে। বিচক্ষণ মাছও খাবারের লোভে বড়শির কাঁটা গিলে প্রাণ দেয়। বহু পূত চরিত্রের ভদ্রজন, ফুলের মত চরিত্র, অথচ কখন যৌনতার ডোবায় পড়ে দুনিয়া আখেরাত বরবাদ করে দেয়, টেরও পায় না। আদালতের বিচারপতি, দেশজুড়ে যার সুনাম সুখ্যাতি। দেখা যায়, হঠাৎ ঘুষের অন্ধকূপে নিমজ্জিত হয়ে ধ্বংসের গহ্বরে তলিয়ে গেল। কুরআনে বর্ণিত হারুত মারুত ফেরেশতার ঘটনাও এর ব্যতিক্রম নয়।
এ জন্যেই তো বায়েজিদ বোস্তামী যখন দেখলেন, নামাযে তার অলসতা আসে। বুঝতে পারলেন, পানি পান করার কারণে তার এই জড়তা, আড়ষ্টতা। তাই তিনি প্রতিজ্ঞা করলেন, এক বছর পানি পান করবেন না। এক বছর পানি পান থেকে বিরত থাকা ছিল বায়েজিদ বোস্তামীর কৃচ্ছসাধনার নূন্যমত নমুনা। নচেৎ তার কৃচ্ছসাধনা ছিল অসাধারণ। তাই তিনি আরিফদের কুতুব, সুলতানুল আউলিয়া হিসেবে দুুনিয়াতে নন্দিত। দেখা গেল, পেটের তাড়নায় যখন দরবেশের হাত কর্তিত হল, তখন তিনি আল্লাহর ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পিত। এরই সুবাদে লোক সমাজে তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ল শেখে আকতা‘ (হাত কাটা শায়খ) হিসেবে।
একদিন হঠাৎ এক দর্শনার্থী দরবেশের আস্তানায় প্রবেশ করে দেখে, ডান হাত কর্তিত শেখ দিব্যি দুই হাতে একটি ঝুড়ি বুনছেন। বিচলিত দরবেশ তাকে ভর্ৎসনা করে বললেন, বিনা অনুমতিতে কেন আমার আস্তানায় প্রবেশ করলে? ভয়ে কাচুমাচু আগন্তুক বলল, হুযুর আপনার প্রভি ভক্তি ও ভালবাসার আকর্ষণে আমি এমনটি করেছি। অন্য কোনো উদ্দেশ্য আমার ছিল না। দরবেশ বললেন, যাক। এখন কথা হল আমার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তুমি আজকের এই ঘটনা কারো কাছে প্রকাশ করতে পারবে না। কিন্তু ঘটনাচক্রে আরেকদিন কয়েকজন লোক জানালার ফাঁকে লক্ষ করল, শেখ দুই হাতে ঝুড়ি বুনছেন। দরবেশ টের পেয়ে সরাসরি আল্লাহর কাছে অনুযোগ করলেন, প্রভুহে এই রহস্য তো তোমার জানা। আমি লুকিয়ে রেখেছিলাম, এখন তুমিই তা ফাঁশ করে দিয়েছ। কারণ তো আমার বুঝে আসে না।
আল্লাহর তরফ হতে ইলহাম আসল, সেই বেদনাদায়ক পরিস্থিতিতে তোমার হাত কাটা যাওয়ায় কিছুলোক তোমার বুযর্গীকে অস্বীকার করেছিল। তুমি আমার প্রিয়জন তোমার প্রতি কারো বিদ্বেষ আমি বরদাশত করতে পারি না। তারা বলছিল, এই লোক আসলে ভন্ড। আল্লাহ তাই তাকে মানুষের সামনে এভাবে অপমানিত করেছেন। কিন্তু তুমি আমার ইচ্ছার প্রতি সম্মান দেখিয়ে প্রমাণ করেছ, তুমি সত্য, তোমার বুযর্গী সত্য। আল্লাহর ওলীর প্রতি বিদ্বেষ পোষণের কারণে এই দলটি কাফের হয়ে যাক, তা আমি চাই নি। এজন্যেই তোমার কারামত তাদের সামনে ফাঁশ করে দিয়েছি। হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ বলেন,
“যে ব্যক্তি আমার কোনো অলীর প্রতি শত্রুতা পোষণ করে আমি তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করি। [বুখারী শরীফ : হাদীস নং ৬৫০২]
আল্লাহ পাক বলেন, অবশ্যই এই কারামাতের আগেই আমি তোমাকে আমার সান্নিধ্য দিয়ে আত্মিক প্রশান্তিতে ডুবিয়ে রেখেছি। তার প্রমাণ, তুমি দেহের মৃত্যু, অঙ্গহানির ধাপ অতিক্রম করে মৃত্যুভয়কে জয় করেছ। দুনিয়ার ভোগ বিলাসিতা নয়, আমার সাক্ষাত লাভই তোমার কাছে সবচে প্রিয়। ফেরাউনের রোষাণলে পড়ে জাদুকররাও এভাবেই পরকালীন জীবনকে বেছে নিয়েছিল আল্লাহ প্রেমের আকর্ষণে।
দরবেশ তকদীরের ফায়সালা সানন্দে মাথা পেতে নিয়ে পরীক্ষায় চমৎকারভাবে উত্তীর্ণ হন। ইতোপূর্বে আলোচিত এই কাহিনীর উপসংহারে মওলানা রূমী বলেন, দরবেশের কাছে ইলহাম আসে, হে দরবেশ! তুমি সত্য। আধ্যাত্মিকতায় তুমি কামালিয়াত হাসিল করেছ। তার প্রমাণ, তুমি মৃত্যুভয়কে জয় করেছ। মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার আগ্রহ ব্যক্তির কামালিয়তের প্রমাণ। এখানেই শাহাদতের মাহাত্ম্য নিহিত। মওলানা রূমী প্রমাণ হিসেবে মূসা আ. এর সাথে ফেরাউনের জাদুর প্রতিযোগিতা আর জাদুকররা হেরে গিয়ে মূসা আ. এর প্রতি ঈমান আনার প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন।
সা’হেরা’ন রা’ নেই কে ফেরআউনে লয়ীন
কর্দ তাহদীদে সেয়া’সত বর যমীন
জাদুকরদের অভিশপ্ত ফেরাউন কি
দেয়নি কঠোর শাস্তি দেয়ার হুমকি?
কিন্তু ফেরাউনের শাস্তির হুমকির তারা পরোয়া করে নি; বরং হাত পা কাটা যাওয়া আর শূলীতে ঝুলার শাস্তি তারা বরণ করে নিয়েছিল। প্রশ্ন হল, সত্যের উপর থাকা সত্ত্বেও তাদেরকে কেন প্রাণ দিতে হল। হাত-পা কর্তিত হয়ে শূলীতে চড়ে কেন প্রাণ বিসর্জন দিল। তাহলে সত্যের পক্ষে থাকার সার্থকতা কোথায়? এই জটিল জিজ্ঞাসার বিশ্লেষণ মওলানা রূমী কিভাবে করেছেন তা জানার জন্যে, ঐতিহাসিক ঘটনাটি সামনে আনা প্রয়োজন। যারা ইসলামী জ্ঞানে পারদর্শী তাদের জন্য মসনবীর সামান্য ইশারাই যথেষ্ট। কিন্তু আমাদের মতো সাধারণ লোকদের জন্য কুরআন মজীদে বর্ণিত কাহিনী বিশদভাবে জানলে এর সত্য তাৎপর্য বোধগম্য করা সহজ হবে।
মূসা আ. তার শ^শুর হযরত শোয়াইব আ. এর বাড়ি মাদায়েন থেকে মিশরে আসার পথে তুয়া উপত্যকায় নবুয়াত লাভ করেন। আল্লাহ তাআলা তাকে আদেশ দেন, তুমি ফেরাউনকে গিয়ে দীনের দাওয়াত দাও এবং বনি ইসরাইল বংশের লোকদের মুক্ত কর। আদেশ পেয়ে তিনি স¤্রাট ফেরাউনের কাছে গিয়ে বলেন,
“হে ফেরাউন! আমি বিশ^পালক আল্লাহর পক্ষ হতে তোমার প্রতি প্রেরিত হয়েছি।” (১০৪)
”এটা স্থির নিশ্চিত যে, আমি আল্লাহর সম্বন্ধে সত্য ব্যতীত কোনো কথা বলব না।” [সূরা আ‘রাফ : আয়াত ১০৫]
তা হল, তিনি এক তাঁর কোনো শরীক নেই। আমি তোমাদের কাছে তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে সাক্ষ্য প্রমাণ নিয়ে এসেছি। আমার পরিষ্কার দাবি, তুমি বনি ইসরাঈলকে আমার সাথে যেতে দাও। তাদেরকে তুমি দাস বানিয়ে রেখো না। তাদের উপর জুলুম অত্যাচারের স্টীম রোলার চালাচ্ছ। তাদেরকে আমি পবিত্র ভূমি বায়তুল মুকাদ্দাস নিয়ে যেতে চাই।
ওয়াহাব ইবনে মুনাব্বাহ বলেন, নানা ঘটনা প্রবাহের ভেতর দিয়ে ইউসুফ আ. ও তাঁর মাতাপিতা কেনান তথা আজকের ফিলিস্তিন হতে মিশরে এসে বসতি স্থাপন করেছিলেন। ইউসুফ আ. এর ইন্তিকালের পর তার বংশধর বনি ইসরাঈলের জনসংখ্যা বেড়ে যায়। এক সময় ফেরাউন মিশরের ক্ষমতা গ্রহণ করে বনি ইসরাঈলকে দাসত্বে শৃংখলিত করে। তাদের উপর নানা ধরণের কর আরোপ, অপমান লাঞ্ছনার জীবন এবং হীন তুচ্ছ কাজে ফেরাউন ও তার বংশ কিবতিদের সেবাদাসগিরী করতে বাধ্য করে। ফেরাউনের ক্ষমতার দাপট চরম পর্যায়ে পৌঁছলে সে নিজেকে খোদা বলে দাবি করে। এমন প্রতাপশালী বাদশাহর সম্মুখে মূসা যে বক্তব্য পেশ করলেন তা ছিল রীতিমত ধৃষ্টতা। ফেরাউন ভেবে চিন্তে বলল, মূসা তোমার দাবির সত্যতার পক্ষে-
“তুমি যদি কোনো নিদর্শন এনে থাক, দেখাও দেখি। তুমি যদি সত্যবাদী হও।” [সূরা আ‘রাফ : আয়াত ১০৬]
মুসার হাতে তখন লাঠিখানা ছিল। বললেন, আমার হাতে এটি কী? ফেরাউন বলল, লাঠি।
“অতঃপর মূসা তার লাঠি নিক্ষেপ করল এবং তৎক্ষণাৎ তা সাক্ষাত অজগরে পরিণত হল।” [সূরা আ‘রাফ : আয়াত ১০৭]
মূূসা হাত থেকে লাঠি মাটিতে রাখলেন। তৎক্ষনাৎ তা নর সর্পে পরিণত হল। এক বিরাট অজগর। ভাবতেই পারেনি যে, লাঠি সাপ হয়ে যাবে। সাপ বিশাল হা করে ভয়াবহ ভঙ্গিতে এগিয়ে গেল ফেরাউনের দিকে। এখনই বুঝি ফেরাউনের তখতসহ রাজপ্রসাদ গিলে খাবে। আতঙ্কে ফেরাউন সিংহাসন থেকে ছিটকে পড়ল। পালিয়ে গেল তো মলমূত্র ত্যাগ করে জামা কাপড়ের অবস্থা বেহাল। সাপ এখন লোকদের দিকে ফিরল, যারা ছিল ফেরাউনের চাকর-বাকর। চারদিকে হৈহুল্লোড় চিৎকার। একদল তো আতঙ্কে সেখানেই মারা পড়ল। আরেকদল পলাতে লাগল। পলায়নপর ফেরাউন নতশিরে বলল, মূসা! সাপ থামাও। আমি তোমার প্রতি বিশ^াস স্থাপন করব এবং বনি ইসরাঈলকে তোমার সাথে পাঠিয়ে দেব। মূসা আ. সাপখানা ধরতেই তা লাঠি হয়ে গেল। পরিস্থিতি শান্ত হলে ফেরাউন জানতে চাইল, মূসা তোমার কাছে কি অন্য কোনো নিদর্শন আছে, যা তোমার সত্যতার পক্ষে সাক্ষী হতে পারে? মূসা বললেন, আমার আরেকটি নিদর্শন আছে। এই বলে তিনি তার হাতখানা বগলের নিচে রাখলেন। পরক্ষণে বের করলেন। আল্লাহ পাক সে কথাই সংক্ষেপে বলেছেন,
“এবং সে তার হাত বের করল আর তৎক্ষণাৎ তা দর্শকদের দৃষ্টিতে শুভ্র উজ্জ্বল প্রতিভাত হল।” [সূরা আ‘রাফ : আয়াত ১০৮]
অর্থাৎ ফেরাউন ও অন্যদের সামনে একেবারে শুভ্র সমুজ্জ্বল আলোকিত একখানা হাত। সে হাতের জ্যোতিতে সূর্যের আলোও নিষ্প্রভ হয়ে গেল। মূসা আ. হাতখানা তার জামার ভেতরে বা বগল তলে রাখলেন। সাথে সাথে তা আগের মতো স্বাভাবিক হাতে পরিণত হল।
ফেরাউন ভয়ের চোটে মূসার প্রতি ঈমান আনার কথা বললেও, এর অর্থ তো মূসার প্রতি আনুগত্য স্বীকার করা। বনি ইসরাঈলকে দাসত্ব হতে মুক্তি দিলে তো দেশ অচল হয়ে যাবে। দাস শ্রমিক শ্রেণী কাজ না করলে কিবতিদের জীবন যাত্রা অচল। কিবতিদের কর্তৃত্বের অবসান হবে। ফেরাউন সম্পূর্ণ কিংকর্তব্যবিমূঢ়। একবার চিন্তা করল, মূসাকে হত্যা করে আপদ দূর করবে। ফেরাউনকে তার সভাসদরা সান্ত¡না দিল,
“ফেরাউনকে সম্প্রদায়ের প্রধানরা বলল, এ তো একজন সুদক্ষ জাদুকর।” [সূরা আ‘রাফ : আয়াত ১০৯]
তাকে হত্যা করা উচিত হবে না। কারণ জনগণের মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হতে পারে। তারা সন্দেহ করবে যে, মূসা সত্য ছিল। তাই তাকে হত্যা করা হয়েছে। বরং লোকটি তো জাদুকর। তাকে জাদু দিয়েই জব্দ করতে হবে। তাতে তার মিথ্যাচার জারিজুরি ফাঁশ হয়ে যাবে এবং সে যে মস্তবড় জাদুকর তা প্রমাণিত হবে। মতামতটি ফেরাউনের মনঃপুত হল। ফেরাউন জ¦ালাময়ী ভাষণ দিল, হ্যাঁ, এক মস্ত জাদুকর এসেছে দেশে।
“এ তোমাদেরকে তোমাদের দেশ হতে বহিষ্কার করতে চায়।” [সূরা আ‘রাফ : আয়াত ১১০]
সে তার জাদুর বলে তোমাদেরকে তোমাদের দেশ থেকে তাড়াতে চায়। ফেরাউন ও কিবতিদেরকে মিশর থেকে তাড়ানোই তার উদ্দেশ্য। সে একটা বিপ্লব ঘটাতে চায়। কারণ তোমাদের জীবন জীবিকা তো বনি ইসরাঈলের সেবাকর্ম আর প্রদেয় কর এর উপর নির্ভরশীল। বনি ইসরাঈলকে এখান থেকে নিয়ে যাওয়ার অর্থ হচ্ছে, তোমাদের জীবন জীবিকা ও আয়ের পথ বন্ধ করে দেয়া। এখন তোমরা কি পরামর্শ দাও।
“তারা বলল, তাকে ও তার ভাইকে কিঞ্চিৎ অবকাশ দিন এবং বিভিন্ন শহরে জাদুকর সংগ্রাহকদের পাঠিয়ে দিন।” [সূরা আ‘রাফ : আয়াত ১১১]
“আদেশ দিন, যেন তারা আপনার নিকট প্রতিটি সুদক্ষ জাদুকর উপস্থিত করে।” [সূরা আ‘রাফ : আয়াত ১১২]
মিশরের বিভিন্ন শহরে জাদুবিদ্যায় পারদর্শী ওঝারা ছিল। জাদু দেখানোই ছিল তাদের পেশা। রাজকীয় ফরমান পেয়ে চারদিক থেকে তারা সমবেত হল।
“জাদুকররা ফেরাউনের নিকট এসে বলল, আমরা যদি বিজয়ী হই তবে আমাদের জন্য পুরষ্কার থাকবে তো?” [সূরা আ‘রাফ : আয়াত ১১৩]
“সে বলল, হ্যাঁ এবং তোমরা অবশ্যই আমার সান্নিধ্যপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।” [সূরা আ‘রাফ : আয়াত ১১৪]
বেতন ভাতা পুরস্কার তো আছেই। সবচে বড় কথা, তোমরা আমার সান্নিধ্যপ্রাপ্ত হবে। এর চেয়ে বড় পুরস্কার আর কি চাও। নির্ধারিত দিন ক্ষণে জাতীয় উৎসবের দিনে জাদুকররা মূসার উদ্দেশ্যে বলল,
“তারা বলল, হে মূসা! আপনি কি আগে নিক্ষেপ করবেন, নাকি আমরাই নিক্ষেপ করব?” [সূরা আ‘রাফ : আয়াত ১১৫]
“মূসা আ. বললেন, তোমরাই নিক্ষেপ কর। যখন তারা নিক্ষেপ করল, তখন তারা লোকের চোখে জাদু করল তাদেরকে আতংকিত করল এবং তারা এক বড় রকমের জাদু দেখাল।” [সূরা আ‘রাফ : আয়াত ১১৬]
মওলানা রূমী অন্যত্র বলেন, এই যে জাদুকররা মূসা আ. কে সমীহ করল। মূসা আ. এর কাছে জিজ্ঞাসা করল যে, আগে কি আপনি নিক্ষেপ করবেন, নাকি আমরা নিজেক্ষপ করব, তার মধ্যে আল্লাহর নবীর প্রতি আদব প্রকাশ পেয়েছিল তারই বরকতে আল্লাহ তাদের ঈমান নসীব করেছিলেন এবং তাদের পরকালীন জীবন হয়েছিল সুন্দর, সুখময় ও সত্যের আলোতে সমুজ্জ্বল।
মিশরের জাতীয় দিবসের মহাউৎসব। আল্লাহর নবী মূসা আ. এর মোকাবিলায় ফেরাউনের জাদুর মহারণ। সারাদেশ থেকে জড়ো করা জাদুকরদের হাতে লাঠি আর রশি। ওদিকে মূসার হাতে একখানা লাঠি। জাদুকরদের সংখ্যাও অগণন। কেউ বলেছেন বাহাত্তর জন। কারো মতে আরো বেশি। সাত হাজার বলেও একটি বর্ণনা আছে। জাদুকররা রশি ছেড়ে দিল মাঠে। সাথে তাদের হাতের লাঠিও। লাঠি আর রশি সাপ হয়ে লাফালাফি শুরু করল ময়দান জুড়ে। মূসার দিকে বারে বারে ধেয়ে আসে, ভেল্কি দেখায়। ফেরাউন আর তার লোকজনের মনে খুশির বাঁধভাঙ্গা জোয়ার। মূসার পরাজয় সুনিশ্চিত। আসমানী আদেশের অপেক্ষায় থাকেন আল্লাহর নবী। ওহী আসল,
“আমি মূসার প্রতি প্রত্যাদেশ করলাম, তুমিও তোমার লাঠি নিক্ষেপ কর। সহসা তা তাদের অলীক মিথ্যা সৃষ্টিগুলোকে গিলতে লাগল।” [সূরা আ‘রাফ : আয়াত ১১৭]
জাদুর চালে তারা সাপ নাচিয়ে বাজিমাত করতে চাইল। মূসার লাঠি মাটিতে রাখার সাথে সাথে তা অজগর হয়ে প্রকা- হা করে ওসব গিলতে লাগল। অগণিত মানুষ হতবাক, ভীত বিহ্বল, এদিক সেদিক দৌঁড়ঝাপ।
“ফলে সত্য প্রতিষ্ঠিত হল, তারা যা করছিল তা মিথ্যা প্রতিপন্ন হল।” [সূরা আ‘রাফ : আয়াত ১১৮]
প্রমাণিত হল, মূসা যা করেছেন, জাদু নয়। তাতে কোনোরূপ প্রতারণা ছলনা নাই। বরং তা মূসা আ. এর অলৌকিক ক্ষমতার কাজ, আল্লাহর প্রদত্ত্ব। জাদুর ক্ষেত্রে প্রতিপক্ষ বিজয়ী হলে বিজিতদের জাদুর সরঞ্জাম অকেজো পড়ে থাকে মাটিতে। এখন তো সাপরূপ মূসার লাঠি সবকিছু গিলে ফেলেছে। এমন কাজ কিছুতেই জাদু হতে পারে না। এই মহারণে ফেরাউনের দলবল ও কিবতিদের সামগ্রিক অবস্থা,
“সেখানে তারা পরাভূত হল ও লাঞ্ছিত হল।” [সূরা আ‘রাফ : আয়াত ১১৯]
বর্ণিত আছে, জাদুর মহারণে যখন সত্য উদ্ভাসিত হল, মিথ্যা পরাজিত হল, তখন মূসা ও হারুণ আ. উভয়ে শোকরানা সিজদায় মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। তখন জাদুকররাও মূসাকে অনুকরণ করল।
“এবং জাদুকরেরা সিজদাবনত হল।” [সূরা আ‘রাফ : আয়াত ১২০]
তারাও আল্লাহর কাছে সিজদায় লুঠিয়ে পড়ল। মুহূর্তে তাদের চিন্তা ও বিশ^াসে আমূল পরিবর্তন এসে গেল।
“তারা সমস্বরে বলে উঠল, আমরা ঈমান আনলাম জগতসমূহের প্রতিপালকের প্রতি,” [সূরা আ‘রাফ : আয়াত ১২১]
”যিনি মূসা ও হারূনেরও প্রতিপালক।” [সূরা আ‘রাফ : আয়াত ১২২]
তাফসীরবিদ মাকাতিল বলেন, জাদুর যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে মূসা আ. জাদুকর সর্দার শামাউনকে ডেকে বলেন, আমি যদি তোমার উপর জয়ী হই তাহলে কি তুমি আমার উপর ঈমান আনবে? শামাউন বলল, আমি এমন জাদুর কারিশমা দেখাব, কোনো জাদু যার ধারে কাছে আসতে পারবে না। কাজেই তুমি যদি বিজয়ী হতে পার তাহলে অবশ্যই ঈমান আনব। কেননা, তাতে বুঝতে পারব যে, তোমার কারিশমা জাদু নয়, জাদু হলে আমার উপর জয়ী হতে পারত না। ফেরাউন দূর থেকে তাদের পারস্পরিক কথাবার্তার দৃশ্য দেখেছিল। একে অজুহাত বানিয়ে নতুন এক রাজনৈতিক চালে মেতে উঠল। জনগণকে ক্ষেপিয়ে তোলার কৌশল নিল। বলল, আজকের জাদু সম্পূর্ণ পাতানো খেলা। এর পেছনে তোমাদের অন্য মতলব আছে।
“ফেরআউন বলল, কী! আমি তোমাদেরকে অনুমতি দেয়ার পূর্বে তোমরা তার উপর বিশ^াস স্থাপন করলে? তা তো এক চক্রান্ত; তোমরা সজ্ঞানে এই চক্রান্ত করেছ নগরবাসীদেরকে নগর থেকে বহিষ্কার করার জন্য। তোমরা শীঘ্রই এর পরিণাম জানতে পারবে।” [সূরা আ‘রাফ : আয়াত ১২৩]
জাতির উদ্দেশ্যে জ¦ালাময়ী এক ভাষণ। জনগণকে সত্যের বিরুদ্ধে দাঁড় করাতে সবচে বড় অস্ত্রটি ব্যবহার করল দেশদ্রোহিতার অভিযোগজাতির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের শ্লোগান দিল মূসার বিরুদ্ধে। বলল, তোমরা মিশরবাসীকে দেশ থেকে বহিষ্কারের ষড়যন্ত্র করেছ। তোমাদের উদ্দেশ্য মিশরের উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা। তোমরা কানে কানে সেই শলা-পরামর্শই করেছ। দু’জন কিবতি ছাড়া সব জাদুকর ছিল বনি ইসরাঈল বংশোদ্ভুত। তাদের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলার উস্কানীমূলক বক্তৃতার সাথে তাদের দমিয়ে রাখার জন্য এক ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করল। সদম্ভে ঘোষণা করল,
“আমি তোমাদের হাত পা বিপরীত দিক হতে কর্তন করবই; অতঃপর তোমাদের সকলকে শূলিবিদ্ধ করবই। ডান পা আর বাম হাত অথবা বাম পা আর ডান হাত। অবশ্যই তোমাদেরকে ফাঁসিকাষ্টে ঝুলিয়ে রাখব।” [সূরা আ‘রাফ : আয়াত ১২৪]
ফেরাউনের এমন হুমকিকে তেড়াই পাত্তা দিল জাদুকররা। ঈমানী শক্তির বিষ্ফোরণে তাদের রক্ত কণিকায় শিহরণ জাগল আল্লাহর মহব্বতের আর তার রাহে শাহাদত লাভের তামান্নার। যে জাদুকররা সকালে কাফের ছিল তারাই বিকেল বেলা খাঁটি মুসলমানে রূপান্তরিত হল। আল্লাহর নবীকে পরাস্ত করতে রশি নিয়ে এসেছিল, এখন নিজেরা বন্দি হয়ে গেল ঈমানের রশিতে। ক্ষমতাধর ফেরাউন যখন হাতপা কর্তন আর শূলীতে চড়ানোর হুমকি দিল তখনও তারা অবিচল। মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচার কোনো আকুতি তাদের নাই।
“তারা বলল, আমারা আমাদের প্রতিপালকের নিকট অবশ্যই প্রত্যাবর্তন করব।” [সূরা আ‘রাফ : আয়াত ১২৫]
তাদের ঈমানী চেতনার সামনে দুনিয়ার সব সুখ সম্ভোগ, ফেরাউনের সান্নিধ্য, পদোন্নতি, বেতন ভাতা বৃদ্ধির প্রলোভন তুচ্ছ হয়ে গেল। ফেরাউনকে তারা মুখের উপর বলে দিল:
“তুমি তো আমাদেরকে শাস্তি দিচ্ছ শুধু এ জন্য যে, আমরা আমাদের প্রতিপালকের নিদর্শনে ঈমান এনেছি, যখন তা আমাদের নিকট এসেছে। হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে ধৈর্য দান কর এবং মুসলমানরূপে আমাদের মৃত্যু দাও।” [সূরা আ‘রাফ : আয়াত ১২৬]
হ্যাঁ, অন্যায়ের সামনে মাথা নত করা, জালিমের সহযোগিতা করা, জুলুমের সমর্থক হয়ে পদ-পদবী লাভ করা, তার চেয়ে আমাদের কাছে মৃত্যু অনেক শ্রেয়। জন্মেছি তো মরতে হবেই। এই মরণ যদি আল্লাহর রাহে হয়, সত্যের পথে হয় সেটিই হবে জীবনের পরম সাফল্য। সূরা তোহায় ফেরাউনের উদ্দেশ্যে জাদুকরদের বক্তব্য আরো জোরদার। ফেরাউনকে,
“তারা বলল, আমাদের নিকট যে স্পষ্ট নিদর্শন এসেছে তার উপর এবং যিনি আমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন তার উপর তোমাকে আমরা কিছুতেই প্রাধান্য দিব না। সুতরাং তুমি কর যা তুমি করতে চাও। তুমি তো কেবল পার্থিব জীবনের উপর কর্তৃত্ব করতে পার। [সূরা তোয়াহা : আয়াত ৭২]
“আমরা নিশ্চয়ই আমাদের প্রতিপালকের প্রতি ঈমান এনেছি, যাতে তিনি আমাদের অপরাধ ক্ষমা করেন এবং তুমি আমাদেরকে জাদু করতে যে বাধ্য করেছ তা (ও যেন ক্ষমা করেন)। আর আল্লাহ শ্রেষ্ঠ ও স্থায়ী।” [সূরা তোয়াহা : আয়াত ৭৩]
আমাদের সামনে জীবন মৃত্যুর অপার রহস্য উন্মোচিত হয়ে গেছে যে,
“যে তার প্রতিপালকের নিকট অপরাধী হয়ে উপস্থিত হবে তার জন্য তো আছে জাহান্নাম, সেথায় সে মরবেও না, বাঁচবেও না।” [সূরা তোয়াহা : আয়াত ৭৪]
“এবং যারা তার নিকট উপস্থিত হবে মুমিন অবস্থায় সৎকর্ম করে তাদের জন্য আছে সমুচ্চ মর্যাদা।” [সূরা তোয়াহা : আয়াত ৭৫]
“স্থায়ী জান্নাত, যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত, সেথায় তারা স্থায়ী হবে এবং এই পুরস্কার তাদেরই, যারা পবিত্র।” [সূরা তোয়াহা : আয়াত ৭৬]
আল্লাহর প্রিয় বান্দারা বিপদে ঘাবড়ায় না। সর্র্বাবস্থায় সত্য ও ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে। সাহসের সাথে পরিস্থিতি মোকাবিলার চেষ্টা করে। বিপদ যদি একান্তই আপতিত হয়, বিচলিত হয় না। আল্লাহর পক্ষ হতে পরীক্ষা বলে মনে করে। বাস্তবতাকে সানন্দে বরণ করে। এই জীবন দর্শনের পক্ষে মওলানা রূমী একটি কাহিনীর অবতারণা করেন, বিজন বনে ইবাদতে নিমগ্ন এক দরবেশকে নিয়ে। দরবেশ নিজ থেকে আল্লাহর সাথে প্রতিজ্ঞা করেছিল, বাগান থেকে যে ফল ঝরে পড়বে, সেটি ছাড়া কোনো ফল নিজের হাতে পেড়ে খাবে না। ক্ষুধায় জান বের হয়ে গেলেও, না। আল্লাহর ইচ্ছা, ঝিরঝিরে বাতাসে কদিন থেকে একটি আমরূদও ঝড়ে পড়ে না। অগত্যা দরবেশ একটি আমরুদ হাতে ছিঁড়ে ক্ষুন্নিবৃত্তি করে। তাতে প্রতিজ্ঞা ভঙ্গের শাস্তি উপস্থিত হয়। হঠাৎ ডাকাতের দল এসে সেই বাগানে ডাকাতির মালামাল ভাগ করছিল, পুলিশ তাদের পাকড়াও করে ভ্রাম্যমান আদালতে বিচার করে। সেই বিচারে দরবেশেরও এক হাত কাটা যায়। পা কাটা যাওয়ার মুহূর্তে দারোগা উপস্থিত হয়ে চিনতে পারে দরবেশকে। পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ আমরা ইতোপূর্বে আলোচনা করেছি।
দরবেশ হাসিমুখে বরণ করে নেয় স্বকৃত ওয়াদা ভঙ্গের প্রায়শ্চিত্য। আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট থাকার বিনিময়ে তিনি বুযুর্গী ফিরে পান। প্রশ্ন ছিল, নিজের হাত কাটা যাওয়াকে কীভাবে দরবেশ মেনে নিতে পারলেন? এর ব্যাখ্যায় মওলানা রূমী কুরআন মজীদে বর্ণিত মূসা আ. ও জাদুকরদের প্রতিযোগিতার প্রসঙ্গ এনে বলেন, মিশরে জাতীয় উৎসবের দিন ফেরাউনের জড়ো করা জাদুকররা মূসা আ. এর মোকাবিলায় যখন মাঠে হাতের রশি ছেড়ে দিয়েছিল। তখন শত হাজার সাপ হয়ে দৌঁড়াচ্ছিল জাদুর রশি। মূসা আ. আল্লাহর হুকুমে হাতের লাঠি ছেড়ে দিলে লাঠি অজগর হয়ে জাদুকরদের সব সাপ গিলে খায়। জাদুকররা বুঝতে পারে মূসার লাঠি সত্যের মাপকাঠি, কোনো জাদুমন্ত্র নয়। তখনই তারা মাঠে সিজদায় লুটিয়ে পড়ে ঘোষণা দেয়, আমরা মূসা ও তার ভাই হারুন যে খোদায় বিশ^াস করেন, সেই খোদার উপর ঈমান আনলাম। ফেরাউন বেজায় ক্ষিপ্ত হয়ে তাদের হাত পা কর্তন আর শূলীতে চড়িয়ে শাস্তি দেয়ার ভয় দেখায়। ফেরাউন মনে করেছিল, জাদুকররা প্রাণের ভয়ে মূসাকে অস্বীকার করবে এবং ফেরাউনের মতাদর্শে ফিরে আসবে। কিন্তু জাদুকররা ঈমানের বলে বলিয়ান হয়ে ফেরাউনের শাস্তি বরণ করে নেন হাসিমুখে।
আল্লাহর প্রিয়বান্দারা কীভাবে সত্যের পথে প্রাণ বিসর্জন দিতে পারে, শাহাদতকে প্রাণ ভরে বরণ করে নিতে পারে তার রহস্য উন্মোচন করেছেন মওলানা রূমী। তিনি বলেন, ফেরাউন জানত না যে, জাদুকরদের সামনে জীবন মৃত্যুর রহস্য উন্মোচিত হয়ে গেছে। তাদের হৃদয় নগর কল্পনা ও অনুমানের অন্ধকার হতে মুক্ত, আধ্যাত্মিক আলোয় আলোকিত। তারা নিজের ছায়াকে কায়া থেকে পৃথকভাবে চিনতে পেরেছে। তারা বুঝতে পেরেছে, যে দেহ মানুষের রূহকে বেষ্টন করে আছে, তা ছায়ার মতো। একে অতিক্রম করে, বস্তুর যে জগত তার ওপারে, আরো গভীরে যে আত্মা বিরাজিত সেই আত্মার জগতের সন্ধান তারা পেয়েছে। সেখানে উড়াল দিতেই এখন তারা পাগলপারা। তাই দিক চক্রবালের শত বিপদ যদি তাদের দেহকে শত টুকরাও করে তাতে তারা মোটেও বিচলিত হয় না। তার জীবনের উৎপত্তিস্থল প্রাণের বাগান চিনেছে, কাজেই ভয়কে তারা সহজে অতিক্রম করেছে। মওলানা বলেন,
ইন জাহান খাবাস্ত আন্দর যান মা ইস্ত
গর রওয়াদ দর খাব দাস্তি বা’ক নীস্ত
এ জগত হল স্বপ্ন, কল্পনায় তুমি থেমে যেও না
স্বপ্নে যদি যায় হাত তাতে পরওয়া করো না।
এই জগত নিছক স্বপ্ন ছাড়া বেশি কিছু নয়। যদি স্বপ্নে দেখ যে, তোমার হাত কাটা গেছে, তাহলে চিন্তার কোনো কারণ নেই। ফেরাউনের জাদুকররা এই দর্শনেই হাসিমুখে হাত পা কাটা যাওয়া আর শূলীর শাস্তি মেনে নিয়েছিল। যদি স্বপ্নে দেখ যে, তোমার মাথাটা কাটা গেছে, তার ব্যাখ্যা হবে, তোমার মাথা অক্ষত এবং তুমি দীর্ঘজীবি হবে। যদি স্বপ্নে দেখ যে, তুমি কর্তিত হয়ে দুই টুকরা হয়ে গেছ, তাতে বুঝে নাও যে, তুমি সুস্বাস্থ্য নিয়ে বহুদিন বেঁচে থাকবে। মোটকথা স্বপ্নে যদি দেহের জন্য ক্ষতিকর কিছু দেখ তাহলে বুঝবে যে, আসলে দেহের কোনো ক্ষতি হবে না। মওলানা রূমী এখানে স্বপ্ন ব্যাখ্যার কয়েকটি মূলনীতির দিকে ইঙ্গিত করে বলছেন, স্বপ্নে অঙ্গহানি হতে দেখলে যেমন মানব জীবনের কোনো ক্ষতি হয় না, তেমনি আমরা যাকে বাস্তব জীবন বলি তাতে দেহ বা বস্তুগত ক্ষয়ক্ষতিতে আসল জীবন তথা আত্মিক জীবনের কোনো ক্ষতি হয় না। মওলানা ক্ষণস্থায়ীত্ব এবং তা রহস্যময় হওয়ার বিচারে স্বপ্নকে পার্থিব জীবনের সাথে তুলনা করেছেন। নচেত স্বপ্নও বাস্তব। কুরআন মজীদে বহু স্থানে স্বপ্নের কথা উল্লেখ আছে। স্বপ্নের বিধিবদ্ধ ব্যাখ্যা আছে। খুব কম সংখ্যক লোকই এই ব্যাখ্যা অবগত থাকেন।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে স্বপ্ন প্রধানত দুই প্রকারের। এক প্রকার হচ্ছে ‘‘আদগাছু আহলাম’ এলোমেলো স্বপ্ন। এর উৎপত্তি হয় শয়তানের প্ররোচণা ও নফসের আজেবাজে চিন্তা হতে। এগুলোর কোনো ব্যাখ্যা নেই। আরেক প্রকার হচ্ছে সত্য স্বপ্ন। সত্যস্বপ্ন আবার তিন প্রকার। এক প্রকার স্বপ্ন ঘুমের মধ্যে যেরূপ দেখে, জাগ্রত হলে হুবহু তাই বাস্তবে রূপায়িত হয়। এর কোনো ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয় না। এই স্বপ্ন আসে সরাসরি আল্লাহর মহান দরবার হতে। দ্বিতীয় প্রকার স্বপ্ন, যার একাংশের ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয় না। বরং জাগ্রত হয়ে তা হুবহু বাস্তবে রূপায়িত হয়। তৃতীয় প্রকারটি হচ্ছে, এমন স্বপ্ন, যা আগাগোড়াই ব্যাখ্যার প্রয়োজন। শেষোক্ত দুই প্রকারের স্বপ্ন উৎপত্তি হয় ফেরেশতাদের মাধ্যমে। (শরহে মসনবী, করীম যামানী, ৩/২৩৮)
মওলানা বলেন,
ইন জাহান রা’ কে বে সূরাত কায়েম আস্ত
গোফত পয়গাম্বর কে হুলমে নায়েম আস্ত
এই জগত বাহ্যিক অবয়বে জাহেরীতে প্রতিষ্ঠিত যা
নবীজির ভাষায় ঘুমন্ত স্বপ্নের চেয়ে ব্যতিক্রম নয় তা।
মওলানা মনস্তাত্মিক বিশ্লেষণে বলছেন যে, স্বপ্ন ও জীবন সম্পর্কে যে মূল্যায়নের কথা বললাম, তা তুমি অন্যের দেখাদেখি মেনে নিয়েছ, মুখে মুখে আওড়াও। কিন্তু নবীজির বাণীর হাকিকত বুঝতে তুমি সক্ষম নও। কিন্তু যারা দিব্যদৃষ্টির আল্লাহর, ওলী আল্লাহর নবীর বাণীর উপর তাদের আস্থা অবিচল। তোমার মনের আরেকটি প্রশ্ন হল, এই জীবন যদি স্বপ্ন হয়, তাহলে আমরা যে ঘুমিয়ে দেখি তা কোন ধরনের স্বপ্ন হবে? মওলানা বলেন, তুমি মনে কর, ঘুমের মধ্যে তুমি ভাবছ যে, আমি একটি স্বপ্ন দেখছি। তাতে তোমার দুটি স্বপ্ন একত্রি হল। বস্তুত যাদের অন্তর্দৃষ্টি খুলে গেছে, তারা মৃত্যুকে ভয় পায় না। তাদের সামনে আসল বিবেচ্য সত্যের উপর অবিচল থাকা। কেননা, তা নিয়েই পরকালে বিচার হবে। মওলানা বলছেন, অন্ধলোক পথ চলতে ভয়ে ভয়ে পা ফেলে। কিন্তু দৃষ্টিবানরা নির্ভয়ে পথ চলে। আল্লাহর নেক বান্দাও সত্যের জন্য দেহের উপর হাজারো বিপদ বরণ করতে ইতস্তত করে না, ভয় পায় না। জাদুকরদের সেই জবাবে লা-জবাব হয়ে যায় ক্ষমতাদর্পি ফেরাউন।
(সূত্র : মওলানা রূমীর মসনবী শরীফ, তৃতীয় খন্ড, বয়েত: ১৬১৪-১৭৪৫)
————০০০————
লেখক: সাবেক শিক্ষক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, কলামিস্ট, বহুগ্রন্থ প্রণেতা।