জীবন হউক কর্মমুখর / মুহাম্মদ শরীফুল আলম

উদ্যম হচ্ছে সাফল্যের প্রতীক। যারা উদ্যমী হয়, সাফল্য তাদের পিছু ছাড়ে না। সে হয় সকলের প্রিয়। তাকে দেখলেই মন ভরে যায়। প্রাণ জুড়িয়ে যায়। আর কেনই বা নয়, সে তো মেতে ওঠে কর্মের সৃজনশীলতায়। ইসলাম কর্মমুখরতাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘সালাত সমাপ্ত হলে তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়বে এবং আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধান করবে ও আল্লাহকে অধিক স্মরণ করবে। যাতে তোমরা সফলকাম হও।’ [সূরা জুমুআ:১০]
অন্য আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তিনিই তো তোমাদের জন্য ভূমিকে সুগম করে দিয়েছেন; অতএব তোমরা তার দিগ-দিগন্তে বিচরণ করো এবং তার প্রদত্ত জীবনোপকরণ হতে আহার্য গ্রহণ করো। পুনরুত্থান তো তারই নিকট। [সূরা মুলক:১৫]
আল্লাহর নবী হযরত দাউদ আ. নিজ হাতে কাজ করে জীবিকা উপার্জন করতেন। তিনি লৌহ-বর্ম তৈরি করতে পারতেন। এ ব্যপারে পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে, ‘আর আমি তাকে তোমাদের জন্য বর্ম নির্মণ শিক্ষা দিয়েছিলাম যাতে তা তোমাদের যুদ্ধে তোমাদের রক্ষা করে; সুতরাং তোমরা কি কৃতজ্ঞ হবে না?’ [সূরা আম্বিয়া:৮০]
হযরত মিকদাদ ইবনে মা’দীকারব রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, কোন ব্যক্তি নিজ হাতে উপার্জিত খাবারের চেয়ে উত্তম খাবার কখনো খায় নি। [মিশকাত: পৃ. ২৪১]
অলস্য হচ্ছে ব্যর্থতার প্রতীক। যারা অলস অকর্মঠ তাদের জীবনে আলো নেই, সাফল্য নেই, আছে শুধু অন্ধকার। তাদের হৃদয়ে প্রতিজ্ঞা নেই,  স্বপ্ন নেই, নেই স্বপ্নের শ্যামল উদ্যান। ভবিষ্যতে এরাই হয় সমাজের বোঝা। কাজের সামর্থ থাকা সত্ত্বেও এদের কেউ কেউ ঝুঁকে পড়ে ভিক্ষাবৃত্তির দিকে। কেউবা নিষিদ্ধ নেশার দিকে। তাই আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানুষকে আলস্য ছেড়ে কাজ করে জীবিকা উপার্জনের শিক্ষা দিয়েছেন। হযরত আনাস ইবনে মালেক রা. থেকে বর্ণিত, এক আনসারি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে এসে হাত পাতলেন। তখন নবীজী বললেন, ‘তোমার বাড়িতে কি কিছুই নেই?’ তিনি বললেন, হাঁ, একটি চট আছে। আমরা তার কিছু অংশ পরিধান করি। আর কিছু বিছাই। আরেকটি পান পাত্র আছে। তাতে আমরা পানি পান করি। নবীজী বললেন, এ দুটি বস্তু নিয়ে এসো। লোকটি তা নিয়ে এলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা হাতে নিয়ে ঘোষণা করলেন, ‘এ দুটি জিনিস কে ক্রয় করবে?’ তখন এক ব্যক্তি বললো, আমি এক দিরহামের বিনিময়ে তা ক্রয় করবো। নবীজী তখন বললেন, এক দিরহামের বেশি কে দিবে? এ কথাটি দুই তিন বার বললেন। তখন এক ব্যক্তি বললো, ‘আমি দুই দিরহামে তা ক্রয় করবো।’ নবীজী তাকে দু’দিরহামের বিনিময়ে পানপাত্র ও চট দিলেন। তারপর দিরহাম দুটি আনসারিকে দিয়ে বললেন, এক দিরহাম দিয়ে খাবার ক্রয় করো এবং তা তোমার পরিবারের জন্য খরচ করো। আরেক দিরহাম দিয়ে কুড়াল ক্রয় করে আমার কাছে নিয়ে এসো। তিনি তাই করলেন। নবীজীর কাছে কুড়াল নিয়ে এলেন। আল্লাহর রাসূল তাতে নিজ হাতে আছাড় লাগিয়ে দিলেন। তারপর নবীজী বললেন, যাও, কাঠ কাটো। এবং বিক্রয় করো। আগামী পনেরো দিন যেনো আমি তোমাকে না দেখি। তারপর লোকটি গিয়ে কাঠ কেটে বিক্রয় করতে লাগলো। কিছু দিন পর এই লোকটি নবীজীর দরবারে এলেন। এ ক’দিনে তিনি পনেরো দিরহাম উপার্জন করে ফেলেছেন। কিছু দিরহাম দিয়ে কাপড় ক্রয় করেছেন। আর কিছু দিরহাম দিয়ে খাবার ক্রয় করেছেন। তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ভিক্ষাবৃত্তির কারণে কেয়ামতের দিন তোমার চেহারা বিকৃত হওয়ার চেয়ে এই কাজ উত্তম। [আবু দাউদ: হা.১৬৪১] কী চমৎকার করে ইসলাম আমাদেরকে কর্মের প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছে।
কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় যে, আলস্য আজ আমাদের সমাজে জেঁকে বসেছে। কেউ কেউ উচ্চ বেতন ও উচ্চ মর্যাদার সরকারী চাকুরী না পেয়ে ঘরের কোণে বসে আছে। বেসরকারী বা অল্প বেতনের সরকারী/বেসরকারী চাকুরীতে যোগদান করছে না। হয়তো আত্মগরিমার কারণে যে আমি এতো শিক্ষা অর্জন করলাম কি এরকম চাকুরী করার জন্যে? অথবা লোকলজ্জার ভয়ে যে, মানুষ আমাকে কী বলবে? কিন্তু এভাবে যে সে নিজের জীবন-যৌবন সব শেষ করছে তা আর ভাবছে না। অথচ হালাল উপার্জন অল্প হলেও প্রশংসাযোগ্য, মানুষের কাছেও আল্লাহ তায়ালার কাছেও।
আমাদের সমাজে কিছু যুবক ভাই আছেন যাদের জ্ঞানের গরমে পা মাটিতে পড়ে না। তাই পরিবারের ছোট ছোট কাজগুলো করতে পারে না। তারা ভাবে আমি তো বড় শিক্ষিত ছেলে। আমি যদি ঘর ঝাড়– দিই, কাপড় চোপড় ধুই, তাহলে তো আমার মান-সম্মান থাকবে না। এ ধারণা সঠিক নয়। কাজ করলে মান-ইজ্জত বাড়ে। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও পরিবারের টুকিটাকি কাজ করতেন। জুতার ফিতা লাগানো, কাপড় চোপড় ধোয়া, তা সেলাই করা, দুধ দোহন করা ইত্যাদি ছোট ছোট কাজ করতে তিনি কখনো লজ্জাবোধ করতেন না। [মিশকাত:৫২০]
আমাদের সমাজে বেকারত্ব আজ মহামারি আকার ধারণ করেছে। তা থেকে মুক্তি পেতে হলে আমাদের মানসিক অবস্থার পরিবর্তন করতে হবে। আমাদের জীবনকে কর্মমুখর করতে হবে। বাড়াতে হবে কাজের দক্ষতা ও প্রশিক্ষণ। সর্বোপরি আমাদের বাস্তব জীবনে অনুসরণ করতে হবে নববী আদর্শ। মহান আল্লাহ আমাদের সহায় হোন। আমীন!
পূর্ণ ঠিকানা
মুহাম্মদ শরীফুল আলম
শিক্ষক, হালডোবা মাদরাসা,
রাজেন্দ্রপুর, গাজীপুর।
০১৯২৮৩৪১২৯১
০১৭৭২১২৬৭৫৫

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight