জীবন ফিরে পেলাম (স্মৃতিচারণ) / রাহাত ইবনে মাহবুব

মাদরাসার বার্ষিক পরীক্ষা শেষ। ছুটি শরু হয়ে গেছে গতকালই। জনমানবশূণ্য মাদরাসায় আমরা মাত্র হাতে গনা সাত জন। তালিবে ইলম বিছানা পত্র আর ব্যাগ গুছানোয় ব্যস্ত। অনেক কাজ বাকি এখনও। চটজলদি সেরে ফেলা চাই। এরপর দুজন শিক্ষকের পিছু পিছু যেতে হবে কাকরাইল মসজিদে। তারপর সেখান থেকে দশ দিনের জন্য তাবলীগ জামাতে। দ্রুত সকালের নাস্তা সেরে গাট্টি মাথায় মাদরাসা থেকে বেরিয়ে পড়লাম। সবে উষার লাল আলো হলদে রঙে বদলাচ্ছে। রাস্তা-ঘাট এখনও বেশ ফাঁকা। তবে খুব বেশিক্ষণ এমন ফাঁকা থাকবে না। কর্মব্যস্ত মানুষগুলো ঘর ছেড়ে বেরুতেই জমে উঠবে পুরো নগরী। অনেক মালপত্র সমেত কাকরাইল পৌঁছুতে একটু বেগ পেতে হল আমাদের, কিন্তু আমরা তা গায়ে মাখলাম না। আল্লাহর রাস্তায় বেরিয়েছি। একটু আধটু কষ্ট তো সহ্য করতেই হবে। নয়নে সুখময় স্বর্গের খোঁজ পাবো কেমন করে? সবকিছু ঠিকঠাক শুধু সমস্যা বাধলো লোকসংখ্যায়। লোক সংখ্যায় সমস্যা হলেও এটা নিয়ে আমাদের অতো একটা মাথা ঘামাতে হলো না। উপরওয়ালা ঠিক সমস্যার সমাধান করে দিলেন। সাথী জুটে গেল। শ্যামলী মাদরাসাতুল কাউসার আল ইসলামীয়ার পাঁচ জন ছাত্র ও একজন শিক্ষক। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো পাঁচ জন ছাত্রের মধ্যে মুকাব্বির নামে একজন বড় ভাইকে পেলাম। আলাপ পরিচিতিতেই ভাল লেগে গেল মানুষটাকে। খুব সুন্দর করে জমিয়ে কথা বলে। তাও আবার একেবারে সুদ্ধ বাংলা ভাষায়। পরে আরো যা জানতে পারলাম মানুষটার ব্যাপারে উনার লেখার হাতও নাকি বেশ পাকা। সাথী জুটে গেছে। এখন আর কোন সমস্যা নেই। রোখ নিয়ে জামাত বেরিয়ে পড়লো নারায়গঞ্জ অভিমুখে। প্রথমে স্থলযান এরপর জলযানে চড়ে দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে জামাত পৌঁছুলো নারায়নগঞ্জ। এলাকাটা গ্রাম্য। গ্রামটা ঠিক ছবির মতই সুন্দর। যেমনটা আমরা ছোট্ট বেলায় ছন্দে ছন্দে পড়েছি। আমাদের গ্রামখানি ছবির মতন মাটির তলায় এর ছড়ানো রতন। পুরো গ্রাম ঘাড়ো সবুজে ছাওয়া। প্রকৃতির জাতও অসাধারণ। গ্রামের সীমানা ঘেসে বয়ে চলেছে নাম না জানা একটা নদী। আর নদীর পাড় ঘেসে গড়ে উঠেছে অসংখ্য ইটের ভাটা। যেগুলোর মাথা দিয়ে বের হওয়া গাড়ো কালো ধুয়ায় পরিবেশ দূষীত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। ছোট বড় নানান বয়সী শত শত কর্মঠ শ্রমিক এখানে রাত দিন নিরলস পরিশ্রম করে জীবিকা নির্বাহ করে। সারা গ্রাম মসজিদে ঠাসা। প্রতি চল্লিশ কদমের মধ্যে একটা করে মসজিদ। আহ! কি স্বর্গীয় দৃশ্য। এটা দেখেই ধর্ম-কর্মের প্রতি গ্রামবাসীর আগ্রহটা সামান্য হলেও আঁচ করা যায়। মহিলারাও রাস্তায় বের হল পরিপূর্ণ পর্দার সাথে। এমনকি পাঁচ ছয় বছর বয়সী ছোট্ট খুকিরা পর্যন্ত মাথায় হিজাব পরে ঘর থেকে বের হয়। আমরাও আমাদের কাজে মনযোগী হলাম। সকাল, দুপুর, বিকাল, সন্ধ্যায় গ্রামবাসীদের পেছনে মেহনত করি। মাঝে মাঝে  গ্রাম দেখতে বের হই। আর প্রতিদিন নদীতে গোসল করি। খুব ছোট বেলা থেই শহুরে পরিবেশে চার দেয়ালের মাঝখানে বন্দি থাকার কারণে সাঁতার শেখার সৌভাগ্য আমার নসীব হয়নি। তারপরও হাঁটু পানিতে লাফালাফি করেই আনন্দ নেয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু তাতেই একটা ভয়ানক কা- ঘটে গেল। একদিন দুপুর বেলা আমরা চার পাঁচজন সাথী মিলে নদীতে গোসল করছি। সাথীরা সবাই আমার থেকে দূরে পানিতে সাঁতার কাটছে। বলে রাখা ভাল, গ্রামবাসীরা তাদের সুবিধার্থে নদীর কিনারে ইট সিমেন্ট দিয়ে সিঁড়ির মত বানিয়ে রেখেছে। আমি সেই সিঁড়ির উপর অল্প পানিতে লাফাতে লাফাতে কখন যে বেশি পানিতে চলে গিয়েছি টেরই পাইনি। আমি অনুভব করলাম আমার পায়ের তলায় এখন আর সিঁড়ি নেই। ধীরে ধীরে আমি পানিতে ডুবে যেতে লাগলাম। এক সময় আমার পুরো শরীর পানির নিচে তলিয়ে গেল। শুধু ডান হাতটা পানির উপর নড়াচড়া করছি। ভাবলাম এই বুঝি সব শেষ। ঠিক এমন সময় আবুল হাসান নামে এক সাথী আমার কাছে এসে আমাকে টেনে পাড়ে তুলে নিয়ে গেল। পানি খেয়ে পেট ফুলে গেছে। খুব জোরে জোরে হাপাচ্ছি আমি। আমার বিশ্বাসই হচ্ছে না আমি যে আমার জীবনটা ফিরে পেয়েছি। আল হামদুলিল্লাহ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight