জীবন জিজ্ঞাসা

প্রশ্ন : নামাজ- রোজা করে না এমন লোকদের হাদিয়া ও ঘরে পাকানো খাবার খাওয়া এবং তাদেরকে সালাম দেয়া জায়েয আছে কি? আমার ছেলে- মেয়েরা নামাজ পড়ে না। টিভিতে নাটক-গান দেখে এবং শুনে। নামাজ পড়ার দাওয়াত দেয়া হচ্ছে, কিন্তু কোন কথা শুনে না ও মানে না। ছেলে- মেয়েদের থেকে আমরা আলাদা হয়ে বসবাস করব, নাকি তাদের দাওয়াত দিয়ে দীনের পথে চলতে বলতে থকব? উল্লেখ্য যে, টিভি নিষেধ করা সত্বেও ছেলের রোজগারের টাকা দিয়েই টিভি কিনেছে। খবর ও অন্যান্য ভাল শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান টিভিতে দেখা যাবে কি না?
মাসুম বিল্লাহ, লোহাগড়া, মুন্সিগঞ্জ
উত্তর : হ্যাঁ, আপনাদের জন্য ভিন্ন হয়ে বসবাস করা ভাল, যে এ বিচ্ছেদে তারা ব্যথিত ও অনুতপ্ত হয়ে নিজেদের ভুল থেকে ফিরে আসতে সক্ষম হয়। তবে এর সাথে সাথে তাদেরকে বুঝাতে থাকবেন। আল্লাহর নিকট তাদের তাওবার তাওফিকের জন্য দু’আ করতে থাকবেন। [ফাতাওয়া মাহমূদিয়া : ২/১৫]
প্রচলিত টিভির কোন অনুষ্ঠানই দেখা জায়েয নয়। এর সকল প্রকার অনুষ্ঠান দেখা গোনাহের কাজ এবং গোনাহের সহযোগিতা। সুতরাং দীনদারির উপর কায়েম থাকতে হলে, এর থেকে দূরে থাকা একান্ত জরুরী। [নিযামুল ফাতাওয়া : ২/৯৯]

প্রশ্ন : আমাদের দেশে প্রচলিত একটি কথা আছে, কোন অনুপস্থিত ব্যক্তির নাম বলার সাথে সাথে যদি সে উপস্থিত হয়, তাহলে আমরা তাকে বলে থাকি- ‘আপনি অনেকদিন বাঁচবেন। কারণ আমরা এই মাত্র আপনার নাম বলতেছিলাম।’ শরীয়তের দৃষ্টিতে এর কোন বাস্তবতা আছে কি না?
মুজিবর রহমান, নেত্রকোনা
উত্তর : আসলে এগুলো লোকসমাজের কল্পকথা। এমনিভাবে সমাজে অনেক আজব কথা প্রচলিত আছে। কুরআন-হাদিসের সাথে যার কোন সম্পর্ক নেই, শরীয়তে এর কোন বাস্তবতাও নেই। বিশেষতঃ অজ্ঞ মেয়েরা এসব কুধারণা বানাতে পটু।
প্রশ্ন : ফরজ গোসল করার নিয়ম-কানুন কি? কোন পদ্ধতিতে ফরজ গোসল করতে হয় এবং মেয়েলোক ও পুরুষের আলাদা কোন পদ্ধতি আছে কি না? গোসলের পর নামাজ পড়তে পুনঃ অজু করতে হবে কি না?
মুজাফফর হোসেন, কুমিল্লা।
উত্তর : গোসল করার সময় ইস্তিঞ্জা করে নিবে, তারপর পবিত্রতা অর্জনের নিয়তে উভয় হাত ধুয়ে নিয়ে শরীর ও কাপড় থেকে নাপাকী দূর করবে। তারপর হাত ভাল করে পরিষ্কার করে নিবে। তারপর নামাজের অজুর মতো অজু করে নিবে। অজুর সময় ভালভাবে গড়গড়া করবে এবং নাকের নরম জায়গা পর্যন্ত পানি পৌঁছাবে। অজুর শেষে মাথায় পানি ঢালবে। এভাবে তিনবার সম্পূর্ণ শরীর ভালভাবে ঘষে গোসল করবে।
মেয়েলোক এবং পুরুষ লোকের গোসলের নিয়ম একই। তবে মেয়েলোকের খোপা বাধা থাকলে চুলের গোড়ায় পানি পৌঁছালে তা খোলা জরুরী নয়। কিন্তু পুরুষের চুল সম্পূর্ণ খোলা রাখতে হবে। উপরন্তু মেয়েদের নাক ও কানের অলংকার পরার ছিদ্রে যাতে পানি পৌঁছে তা লক্ষ্য রাখতে হবে।
গোসলের পর নতুন করে অজু করার প্রয়োজন নেই। [ফাতাওয়া দারুল উলুম : ১/১৬৪, শামী : ১/১১৯]

প্রশ্ন : (ক) কাপড় পাক করার সহীহ তরিকা কি? (খ) নতুন কাপড় ধৌত করা ব্যতীত পরিধান করে নামাজ আদায় করা যাবে কি?
আঞ্জুমান আরা, পাবনা
উত্তর : (ক) কাপড় বিভিন্নভাবে নাপাক হতে পারে। সুতরাং তা পাক-পবিত্র করার তরিকাও ভিন্ন ভিন্ন। যদি কাপড়ে এমন নাপাকী লাগে যা দেখা যায়- যেমন, রক্ত, মল বা এজাতীয় অন্য কিছু, তাহলে ধৌত করার মাধ্যমে উক্ত নাপাকী দূর হয়ে গেলেই কাপড় পবিত্র হয়ে যাবে। এক্ষেত্রে তিনবার ধৌত করার প্রয়োজন নেই। তবে সুন্নত হল, প্রত্যেকবার নিংড়িয়ে তিনবার ধুয়ে নেয়া। আর যদি তিনবার ধৌত করার পরও নাপাকী দূর না হয়, তবে তিনবারের অতিরিক্ত ধৌত করাও জরুরি।
উল্লেখ্য যে, আসল নাপাকী দূর হওয়ার পরও যদি নাপাকীর কোন আলামত বা চিহ্ন অবশিষ্ট থাকে এবং কষ্ট ব্যতীত তা দূর করা সম্ভব না হয়, তাহলে নাপাকীর উক্ত আলামত বা চিহ্ন দূর করার জন্য অতিরিক্ত কষ্ট করার প্রয়োজন নেই।
আর যদি নাপাকী দেখা না যায়, যেমন প্রস্রাব বা তরল জাতীয় অন্য কোন নাপাকী, তাহলে তিনবার ধৌত করে ভালভাবে নিংড়ানোর দ্বারাই এজাতীয় নাপাকী হতে কাপড় পবিত্র হয়ে যাবে।
কাপড় পাক-পবিত্র করার উল্লেখিত পন্থা দু’টি কেবলমাত্র সে সময়ের জন্য প্রযোজ্য, যখন নিশ্চিতভাবে জানা যায় যে, নাপাকী অমুক জায়গায় লেগেছে, কিন্তু নাপাকী কোথায় লেগেছে তা যদি জানা না যায়, তাহলে সম্পূর্ণ কাপড় ধৌত করা জরুরি।
(খ) যদি কোনভাবে জানা যায় যে, নতুন কাপড়ে নাপাকী লেগে আছে, তাহলে উক্ত কাপড় পরিধান করে নামাজ আদায় করলে তা সহীহ হবে না। আর যদি নিশ্চিতরূপে জানা যায় যে, নতুন কাপড়ে নাপাকী নেই, তাহলে এরূপ নতুন কাপড় পরিধান করে নামাজ আদায় করলে তা সহীহ হবে।
তেমনিভাবে নতুন কাপড়ে নাপাকী লেগে আছে কি নেই, যদি কোনটাই জানা না থাকে, তাহলে এরূপ কাপড় পরিধান করে  নামাজ আদায় করা জায়েয আছে। তবে ধৌত করে নেয়া উত্তম। [তাহাবী শরীফ : ৪১, ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী : ১/৪১, ফাতহুল কাদীর : ১/১৬৮, হিদায়া : ১/৭৭-৭৮]
প্রশ্ন : কালেমা শরীফ বিনা অজুতে হাটতে বসতে পড়া যাবে কি না?
মুহিব্বুল্লাহ, নান্দাইল, ময়মনসিংহ।
উত্তর : কালেমা শরীফ, দরূদ শরীফ, জিকির ইত্যাদি বিনা অজুতে হাঁটা, বসা দাঁড়ানো, শয়ন সর্বাবস্থায়ই পড়া জায়েয। তবে উজু অবস্থায় পড়া মুস্তাহাব। [সূরা আলে ইমরান : ১৯১, ফাতাওয়া শামী : ১/১৭৪]

প্রশ্ন : ফজরের পরে বেলা ওঠা আরম্ভ হওয়ার পরে কতক্ষণ বা কত মিনিট নামাজ পড়া নিষেধ? প্রচলিত ক্যালেন্ডারে যে ২৩ মিনিট বিলম্ব করার কথা লেখা থাকে তার ভিত্তি কি?
তানিয়া আক্তার, শিবপুর, চিটাগাং।
উত্তর : ফজরের পরে সূর্য ওঠা আরম্ভ হওয়ার পর থেকে এক তীর পরিমাণ (যার পরিমাণ নির্ভরযোগ্য মত অনুযায়ী ৯ মিনিট) নামাজ পড়া নিষেধ। তবে প্রচলিত ক্যালেন্ডারে সতর্কতার জন্য কিছু বেশি বিলম্ব করে লেখা হয়েছে। হযরত মাওলানা আবরারুল হক সাহেব হারদূয়ী হুজুর (দাঃ বাঃ) ১৫ মিনিট বিলম্বের কথা বলে থাকেন। আমলের জন্য এটাই উত্তম। [আহসানুল ফাতাওয়া : ২/১৪১, ফাতাওয়া মাহমুদিয়া : ২/২৩৮, শামী : ১/৩৬৬-৭১]

প্রশ্ন : জনৈক ইমাম সাহেব চার রাকাত ফরজ নামাজের চতুর্থ রাকাতের দুই সিজদার মধ্যে এক সিজদা আদায় করেছেন এবং শেষ বৈঠকে তাশাহহুদ পড়ে সিজদায়ে সাহু আদায় করেছেন। তখন ইমাম সাহেবকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন, দ্বিতীয় সিজদা ফরজ নয় ওয়াজিব। তাই আমার জানার বিষয়টি হল, সিজদা উভয়টি ফরজ কি না?
ইবনে মুশফিক, ত্রিশাল।
উত্তর : নামাজের প্রতি রাকাতে দুটি সিজদাই ফরজ। অর্থাৎ প্রথম সিজদা যেমন ফরজ, দ্বিতীয় সিজদাও ঠিক তেমনি ফরজ। তাই উল্লিখিত ইমাম সাহেবের কথাটি সত্য নয় এবং প্রশ্নে বর্ণিত চার রাকাত ফরজ নামাজ ইমাম ও মুক্তাদিগণের মধ্য হতে কারোই আদায় হয়নি। প্রত্যেকেরই এই নামাজ পুনরায় পড়তে হবে। অন্যথায় এক ওয়াক্ত নামাজ না পড়ার গুনাহ হবে। উল্লেখ্য যে, যদি নামাজের কোন এক রাকাতে ভুল বশতঃ একটি সিজদা ছুটে যায়, তাহলে নিয়ম হল নামাজের ভিতরে স্মরণ হওয়ামাত্রই ছুটে যাওয়া সিজদাটি আদায় করে নেয়া এবং শেষ বৈঠকে আত্তাহিয়্যাতু পড়ে সিজদায়ে সাহু আদায় করা। এর দ্বারা নামাজ আদায় হয়ে যাবে। ইমাম সাহেব যেহেতু ছুটে যাওয়া সিজদা আদায় না করে শুধুমাত্র সিজদায়ে সাহু করেছেন, তাই নামাজ আদায় হয়নি। [আলমগীরী : ১/৭০ ও ১২৮, শামী : ১/৪৪২, আল বাহরুর রায়িক : ১/২৯৩, তাহতাবী : ১৮৫, বাদায়ি উস সানায়ি : ১/১৬৭]

প্রশ্ন : আমি একজন মাদরাসার ছাত্র। আমি যখন নামাজ পড়ি এবং কুরআন তিলাওয়াত করতে বসি, তখন আমার মনে আজেবাজে কথা স্মরণ হয়। মন অন্যদিকে চলে যায়। আমি এ অবস্থায় কি আমল করতে পারি?
আলামিন, কুমিল্লা।
উত্তর : নামাজের মধ্যে বা কুরআন তিলাওয়াতের সময় মনে আজেবাজে চিন্তা আসা বা মন এদিক সেদিক ছুটে যাওয়া স্বাভাবিক ব্যাপার। অনেকেরই এমন অবস্থা হয়। তবে এসময় মনকে ধরে এনে আবার নামাজে বা কুরআন তিলাওয়াতে বসাতে পারলে, পরিপূর্ণ নামাজের সওয়াব পাওয়া যায়।  কুরআন তিলাওয়াতের সময় মনকে স্থির রাখার উপায় হল, তিলাওয়াতের পূর্বে পাক-পবিত্র অবস্থায় মিসওয়াক ও উজু করবে। গোলমাল শূন্য নীরব স্থানে কিবলামুখী হয়ে নামাজে বসার ন্যায় আদবের সাথে বসে প্রথমে কয়েকবার দরূদ শরীফ পড়ে আউজুবিল্লাহ ও বিসমিল্লাহ পূর্ণ পড়ে তিলাওয়াত আরম্ভ করবে। অন্তরে কালামে পাকের মাহাত্ম্য সম্বন্ধে এ চিন্তা করবে যে, মহান সর্বশক্তিমান আল্লাহ তা’আলারই এ কালাম। অর্থ না বুঝলেও প্রতি অক্ষরে দশটি করে নেকী পাবে এবং নিজের কান দু’টিকে একনিষ্ঠ করে নিবে। মনে করবে যে, আল্লাহর আদেশে কুরআন পাঠ করে তাঁকে শুনাচ্ছ। সুতরাং সুন্দর আওয়াজে, তাজবীদের সাথে তিলাওয়াত করবে। এভাবে তিলাওয়াত করলে আশা করা যায় মন স্থির থাকবে।
আর নামাজের মধ্যে মন স্থির রাখার উপায় হল, নামাজের তাকবীরে তাহরীমা বলার সময় আল্লাহ তা’আলার আজমত ও মহত্বের কথা খেয়াল রেখে তাকবীরে তাহরীমা বলবে এবং মনে মনে খেয়াল করবে যেম সব কিছু থেকে আমার আল্লাহ বড়। সুতরাং তার খেয়াল ছেড়ে কমদামী বা আজেবাজে জিনিসের চিন্তা চরম নির্বুদ্ধিতা। অতঃপর কিরাত, রুকু, সিজদা ইত্যাদি খুবই মনযোগ সহকারে ঠিক মতো আদায় করবে। যা কিছু মুখে পড়বে, সেদিকে খুবই খেয়াল রাখবে। আর যদি ইমামের কিরাত না শুনা যায়, তাহলে দিলে দিলে সূরা ফাতিহা আওড়াতে থাকবে। এতেও নামাজের মধ্যে একাগ্রতা সৃষ্টি হয়। উল্লেখ্য, নামাজে ও তিলাওয়াতে একাগ্রতা সৃষ্টি করতে গোনাহ পরিত্যাগ করা একান্ত কর্তব্য। বিশেষ করে কুদৃষ্টির অভ্যাস থাকলে, তা ত্যাগ করা জরুরি। [শামী : ১/৫৪৫-৪৬]

প্রশ্ন : কবরের উপরে বাতি জ্বালানো জায়িয কি?
রবিউল আলম, পল্টন, ঢাকা।
উত্তর : কবরের উপরে বা কবরের পার্শ্বে বাতি দেয়া শরীয়তে কু-সংস্কার বলে আখ্যায়িত হয়েছে। বস্তুতঃ এটা হিন্দুয়ানী প্রথা, যা অগ্নিপূজক পৌত্তলিকদের সাদৃশ্য। এ কারণে হাদিস শরিফে এ ব্যাপারে কঠোরভাবে নিষেধাজ্ঞা এসেছে।
ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐ সমস্ত লোকদের অভিসম্পাত করেছেন, যারা কবর জিয়ারতের জন্য কবরস্থানে উপস্থিত হয় এবং ঐ সমস্ত লোকদের, যারা কবরের উপর সৌধ তৈরি করে ও বাতি প্রজ্জ্বলিত করে। [আবু দাউদ শরীফ : ২/৪৬১, নাসায়ী : ১/২২২, মিশকাত : ১/৭১, রাহে সুন্নাত : ১৯২]
অন্য এক হাদিসে হযরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘কেউ যদি ইসলাম ধর্মের মধ্যে এমন কিছু আবিষ্কার করে, যা ইসলামের মধ্যে নেই, তাহলে তা গর্হিত।’ সুতরাং কবরে বাতি দেয়া জঘন্য অপরাধ ও কুসংস্কার। তাই এ থেকে নিজেও বাঁচতে হবে এবং অন্যদেরকেও সতর্ক করতে হবে। [ফাতাওয়া মাহমুদিয়া : ১০/৮৭]

4 মন্তব্য রয়েছেঃ জীবন জিজ্ঞাসা

  1. মাসুম says:

    প্রশ্নঃ যে মেয়ে বিয়ের আগে প্রেম ভালবাসায় তার সব হারায়ছে ..এমন মেয়ে কে কি বিয়ে করা যায় ইসলামি মতে ??????????????????

    • mahbubur Rahman says:

      হ্যা বিয়া করা যায়। তবে সেক্ষেত্রে যিনাকারী যিনাকারিণী মহিলাকে করবে।

  2. মুস্তাকিম মেহমুদ says:

    গোসলের পর ওজু না করে নামাজ পরা কি জায়েজ ?

    • mahbubur Rahman says:

      গেোসলের পর কোন কারণবশত পবিত্রতা নষ্ট না হলে গোসলদ্বারাই নামায পড়া জায়েয আছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight