জীবন জিজ্ঞাসা

‘বিবাহ তো জীবনে একবারই হয়’ বলা প্রসঙ্গে:
মুহাম্মদ বেলাল হোসেন, কলমাকান্দা, নেত্রকোনা।
প্রশ্ন: আমাদের সমাজে অনেক মহিলা এমন আছেন যে, স্বামী মারা যাওয়ার পর আর অন্য স্বামীর সাথে বিবাহ বসতে চান না। তারা এটাকে লজ্জার বিষয় মনে করেন। অনেকে আবার এ কথাও বলেন, বিবাহতো জীবনে একবারই হয়। সুতরাং দ্বিতীয় বিবাহের প্রশ্নই উঠে না। বিবাহের কথা বললে তারা রাগ হয়ে যান। তাদের এ কাজটি কি সঠিক হচ্ছে? এ সম্পর্কে শরীয়তের হুকুম কী?
উত্তর: পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা মেয়ের অভিভাবককে স্পষ্ট আদেশ দিয়েছেন, “তোমাদের মধ্যে যারা বিবাহহীন, বিধবা অথবা তালাকপ্রাপ্তা তাদেরকে বিবাহ দিয়ে দাও, নেককার দাস-দাসীদেরকেও বিবাহ দিয়ে দাও। তারা যদি গরীব-অভাবী হয়, তবে আল্লাহ নিজ দয়ায় তাদেরকে অতি সত্বর সম্পদশালী করে দিবেন। [সূরা নূর: আয়াত ৩২]
তেমনিভাবে হাদীস শরীফে রয়েছে, হযরত উমর রা. এর মেয়ে হযরত হাফসা রা. যখন বিধবা হলেন, তখন তিনি নিজ কন্যার বিবাহের জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। এ প্রসঙ্গে তিনি হযরত আবু বকর রা. ও হযরত উসমান রা. এর নিকট সেই মেয়ের বিবাহের প্রস্তাব পেশ করেন। কয়েকদিন পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেই হাফসার বিবাহের প্রস্তাব দেন এবং তাঁর সাথে তার বিবাহ হয়ে যায়। [বুখারী শরীফ: হাদিস নং ৪৯৫১[
অপরদিকে হাদীস শরীফে বর্ণিত রয়েছে, একমাত্র হযরত আয়েশা রা. ছাড়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সকল স্ত্রীই বিধবা ছিলেন। উল্লিখিত কুরআনের আয়াত এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবায়ে কিরামের আমল দ্বারা শরীয়তের বিধান পরিষ্কার হয়ে যায় যে, বিধবা ও তালাকপ্রাপ্তা মেয়েদের পুনরায় বিবাহের ব্যবস্থা করা মুরুব্বীদের কর্তব্য। আর সেই বিধবা মেয়েদের জন্য এটাকে লজ্জার বিষয় মনে করা কিছুতেই উচিত নয়।
অবশ্য যদি কোনো মহিলা ইয়াতীম সন্তানের জন্য অন্যত্র বিবাহ না বসেন বা বিলম্বে বিবাহ বসেন, তাহলে তাতে কোনো অসুবিধা নেই।
‘বিবাহতো জীবনে একবারই হয়’ এ কথাটা সম্পূর্ণ শরীয়তবিরোধী ও ঈমানবিধ্বংসী। মূলত এটা হিন্দুয়ানী কথা। কারণ, হিন্দুধর্মে মেয়েদের দ্বিতীয় বিবাহের কোনো নিয়ম নেই। স্বামী মারা গেলে আজীবন বিধবাই থাকতে হয়। কিন্তু ইসলাম ধর্মের বিধান এমন নয়। বরং ইসলামে একজন মহিলা যদি একাধিকবার বিধবা বা তালাকপ্রাপ্তা হন, তাহলে প্রতিবারই তাকে নতুনভাবে বিবাহ বসার নির্দেশ দেয়া হয়েছে এবং তার অভিভাবকদেরকে এর ব্যবস্থা করতে আদেশ করা হয়েছে। কারণ, মেয়েদের মৃত্যু পর্যন্ত অনেক চাহিদা থাকে যা স্বামী ছাড়া আর কেউ পূরণ করতে পারে না। স্বামী ছাড়া অন্যের নিকট প্রকাশও করা যায় না। তাছাড়া বিবাহের উসীলায় তার কোলে এমন সন্তান জন্ম নিতে পারে, যা শুধু পিতামাতার চেহারাই নয়; বরং পুরা জাতির চেহারা আলোকিত করে দিবে। দুনিয়াবাসী তার থেকে অনেক খেদমত পাবে। বিবাহ না বসলে ওই মেয়ে এরূপ সৌভাগ্য কিভাবে লাভ করবেন? উল্টো তিনি বাপ-ভাইদের কাধে বোঝা হবেন। আর বিভিন্ন পরিস্থিতিতে তার নিজের দ্বীনদারী নষ্ট হওয়ারও আশংকা রয়েছে।
তাছাড়া ‘বিবাহতো জীবনে একবারই হয়’ একথাটির মধ্যে সূক্ষভাবে আল্লাহকে দোষারূপ করা হয়। কেননা, ওই কথার একপ্রকার অর্থ এই দাঁড়ায় যে, আল্লাহ তাকে একজন স্বামী দিয়ে বিনা অপরাধে আবার নিয়ে গেলেন। নাউযুবিল্লাহ, এখন আমি চলব কী করে? এটা কত মারাত্মক ঈমানধ্বংসী কথা! এভাবে বললে তো ঈমানই চলে যাবে। তাই উল্লেখিত কথা কোন অবস্থাতেই মুখে আনা উচিত নয়, বরং ছেলে হোক বা মেয়ে হোক, স্বামী বা স্ত্রী মারা গেলে বা বিবাহ ভেঙ্গে গেলে, নতুন করে বিবাহ করে নেয়া উচিত। এটাই ইসলামের আদেশ ও হুকুম। আর এতেই সকলের দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ নিহিত রয়েছে।
[সূরা নূহ, ৩২/ আহকামুল কুরআন লিল জাসসাস, ৩: ৩১৯/ তাফসীরে কুরতুবী ১২: ২৩৯]

 

নাচ-গানের অনুষ্ঠানে কুরআন তিলাওয়াত করা প্রসঙ্গে:
শাহাবুদ্দিন আলম, বীরগঞ্জ, দিনাজপুর।
প্রশ্ন: যে অনুষ্ঠানে নাচ-গান হবে সে অনুষ্ঠানে কুরআন তিলাওয়াত জায়িয আছে কি?
উত্তর: যে কোন অনুষ্ঠানে কুরআন তিলাওয়াত করা হয় বরকত হাসিলের জন্য। গান-বাদ্যের মতো হারাম কাজে বরকত হাসিল তো দূরের কথা, সেই নিয়ত করাও গোনাহের কাজ।
সুতরাং এ ধরনের অনুষ্ঠানে কুরআন তিলাওয়াত করলে কুরআনের সাথে উপহাস হওয়ার শামিল হবে। যা জঘন্য গোনাহ। [দ্র. সূরা মায়িদা: আয়াত ২# মিশকাত শরীফ:  হাদিস নং ২: ৪৩৬]

প্যাকেটজাত গোশতের হুকুম প্রসঙ্গে:
সিরাজুল ইসলাম, সাভার, ঢাকা।
প্রশ্ন: বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্যাকেটকৃত গোশত পাওয়া যায়। তা খাওয়া শরীয়ত সম্মত কি-না? বিস্তারিত জানালে উপকার হবে।
উত্তর: বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যে প্যাকেটকৃত গোশত পাওয়া যায়, তার সম্পর্কে যদি জানা থাকে যে, হালাল জন্তুর গোশত এবং এগুলো মুসলমানের হাতে শরীয়ত সম্মত পদ্ধতিতে যবেহ করা হয়েছে তাহলে উক্ত গোশত খাওয়া হালাল হওয়ার ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই।
আর যদি নিশ্চিতভাবে জানা যায় যে, এগুলো কোন কাফির বা মুশরিকের যবেহকৃত, অথবা মুসলমান, কিন্তু শরীয়ত সম্মত পন্থায় আল্লাহর নাম নিয়ে ধারালো চাকু বা অন্য কিছু দিয়ে যবেহ করা হয়নি, বরং মেশিনে বা অন্য কোন পন্থায় আল্লাহর নাম নেয়া ব্যতীত কাটা হয়েছে। আর বর্তমানে সাধারণতঃ এমনই হয়ে থাকে। তাহলে এসকল অবস্থায় ঐ প্যাকেটকৃত গোশত খাওয়া যাবে না এবং ঐ সব প্যাকেটকৃত গোশত থেকে সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরী।
আর যদি প্যাকেটকৃত গোশতের ব্যাপারে নিশ্চিতভাবে জানা না যায় যে, এটা মুসলমান, কাফির, না মুশরিকের যবেহকৃত গোশত, তাহলে এমতাবস্থায় উক্ত প্যাকেটকৃত গোশত পরিহার করা জরুরী। [দ্র. সূরা আনআম: আয়াত ১৪৫; বুখারী শরীফ: ১: ২৭৫]

সন্তান গ্রহণে বিলম্ব করা প্রসঙ্গে:
মুহাম্মদ এজাজুল করীম, উত্তর বাড্ডা, ঢাকা।
প্রশ্ন: সন্তান ভূমিষ্ট হওয়ার পর দ্বিতীয় সন্তান গ্রহণের পূর্বে দু’ তিন বৎসর পর্যন্ত সন্তান গ্রহণ বন্ধ রাখার জন্য বিশেষ কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা জায়িয আছে কি? জানিয়ে বাধিত করবেন।
উত্তর: যদি শরয়ী কোন উযর থাকে এবং কোন দ্বীনদার অভিজ্ঞ মুসলিম ডাক্তারের মতে মহিলার গর্ভধারণে স্বাস্থ্য অধিক খারাপ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে বা অন্য কোন শরয়ী উযর থাকে, তাহলে সাময়িকভাবে এ জাতীয় কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। কিন্তু প্রচলিত জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতিতে অধিকাংশ ক্ষেত্রে অভাব-অনটনের ভয়ে যদি সন্তান গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকে, তা হবে কুরআন-হাদীসের ভাবধারার সম্পূর্ণ বরখেলাফ এবং  মহান আল্লাহ তাআলা যে একমাত্র রিযিকদাতা এ বিশ্বাসের চরম পরিপন্থী। [দ্র. সূরা হুদ: আয়াত ৬; সূরা যারিয়াত: আয়াত ৫৮]

পাত্রীর গুণাবলী প্রসঙ্গে:
মুহা. হারুনুর রশিদ, লাকসাম, কুমিল্লা।
প্রশ্ন: বিভিন্ন ধর্মীয় বইয়ে বিবাহ সম্পর্কে পাত্রীর গুণাবলী সম্বন্ধে বিভিন্ন গুণের বর্ণনা দেয়া হয়েছে; যেমন (১) মেয়েকে ধার্মিক হতে হবে, (২) কুমারী হতে হবে, (৩) সতী এবং সম্ভ্রান্ত পরিবারের হতে হবে ইত্যাদি। কিন্তু স্বামী পরিত্যক্তা বা বিধবা নারীকে বিবাহ করা সম্পর্কে স্পষ্টভাবে তেমন লিখা নেই। স্বামী পরিত্যক্তা গরীব মেয়েকে বিবাহ করা কেমন হবে। স্বামী পরিত্যক্তা/ বিধবা নারীকে বিবাহ সম্পর্কিত বিষয়ে কুরআন/হাদীসের ব্যাখ্যা জানতে চাই। এ ক্ষেত্রে মা-বাবা এবং নিকট আত্মীয়-স্বজন নারায হলে কি করা উচিত? পাত্র নিজে বিয়ে করতে পারবে? তার বিস্তারিত জবাব চাই।
উত্তর: শরীয়তে বিধবা মহিলাকে বিবাহ করা জায়িয, কোন প্রকার দোষণীয় নয়। কুরআন ও হাদীসে বিধবা মহিলাকে বিবাহ করা জায়িয হওয়ার ব্যাপারে স্পষ্ট বর্ণনা রয়েছে। স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবায়ে কিরামের মধ্যে অনেকে বিধবা মহিলাকে বিবাহ করেছেন। এ ধরনের মেয়েদের উপকারার্থে তাদেরকে বিবাহ করা মহৎ কাজ। সুতরাং এ ক্ষেত্রে পিতা-মাতা ও আত্মীয়-স্বজনের নারায হওয়া উচিত নয়। আর বিধবা মহিলাকে বিবাহ করা দোষণীয় মনে করে নারায হলে শক্ত গুনাহগার হবে।
আর বিবাহকারীর জন্য উচিত হবে হেকমতের মাধ্যমে মাতা-পিতাকে বুঝিয়ে রাযী করে তারপর বিয়ে করা। এতে যদি পিতা-মাতা অন্য কোন শরয়ী উযর ছাড়াই রাযী না হয় আর পাত্রও যদি প্রাপ্ত বয়স্ক হয় তাহলে একা একা বিবাহ করলে অন্যায় হবে না। [দ্র. সূরা নূর: আয়াত ৩২; বুখারী শরীফ: ২: ৭৬০]

স্বামীর অজান্তে ফসল বা সম্পদ বিক্রি করে সন্তানের প্রয়োজন মেটানো প্রসঙ্গে:
ফাতেমা আক্তার, নেত্রকোনা।
প্রশ্ন: আমি স্বামীর অজান্তে স্বামীর বিভিন্ন ফসল বা সম্পদ  বিক্রি করে সন্তানদের প্রয়োজনে দেই। যদিও আমার স্বামী সন্তানদের প্রয়োজনীয় খরচের টাকা দেয়, তবুও অধিক স্বচ্ছলতার জন্য আমার পক্ষ থেকে উক্ত টাকা আমি স্বামীর অজান্তে সন্তানদের দিয়ে থাকি। স্বামীর উক্ত টাকা অন্য কাউকে দেই না। এটা জায়িয হবে? আশাকরি জানাবেন।
উত্তর: সন্তানরা যদি নাবালিগ হয় এবং স্বামী সন্তানদেরকে প্রয়োজনীয় খরচাদি ঠিকমত বা পুরোপুরি না দেন, তবে শুধু সে অবস্থায়ই আপনি স্বামীর ফসল-সম্পদ বিক্রি করে শুধু সন্তানদের প্রয়োজনীয় খরচাদি দিতে পারবেন। প্রশ্নে বর্ণিত অবস্থায় যেহেতু আপনার স্বামী সন্তানদের প্রয়োজনীয় খরচাদি দিচ্ছেন, তাই আপনার জন্য স্বামীর সম্পদ বা ফসলাদি বিক্রি করে সন্তানদের খরচাদি দেয়া জায়িয হবে না।
আর যদি সন্তানগণ বালিগ হয়, তাহলে চাই স্বামী তাদের প্রয়োজনীয় খরচাদি দেন, বা না দেন, আপনার জন্য স্বামীর ফসলাদি বিক্রি করে সন্তানদের খরচাদি দেয়া জায়িয হবে না। তবে কথাবার্তা ও আচার-আচরণের ভাব-ভঙ্গি ও ইশারা-ইঙ্গিতে স্বামীর পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে অনুমতি ও সম্মতি পাওয়া গেলে সর্বাবস্থায় তা জায়িয আছে। [দ্র. বুখারী শরীফ: ১: ২৯৪]

গেম খেলা প্রসঙ্গে:
সবুজ আহমদ, উত্তরা, ঢাকা।
প্রশ্ন: কম্পিউটারে বিভিন্ন গেমস খেলা কেমন? পড়াশুনা করতে করতে শরীরে অস্বস্তিবোধ করলে কিছু সময় গেম খেলা শরীয়াতের দৃষ্টিতে জায়িয হবে কি? জানাবেন।
উত্তর: অনর্থক খেলাধূলা ও রং তামাশা মুসলমানদের জন্য কখনো উচিত নয়। সুতরাং, অস্বস্তি দূর করার জন্য কিছু হাঁটা-চলা করা যেতে পারে বা যে কাজে লেগে আছে, সে কাজ বন্ধ রেখে অন্য কোন কাজ করতে পারে বা পরস্পরে কিছু আলাপ আলোচনা করতে পারে। অভিজ্ঞতায় প্রমাণিত হয়েছে যে, যে কোনো অবস্থায় কম্পিউটারের গেম স্বাস্থ্য, মন মানসিকতা ও চরিত্রের জন্য প্রচন্ড ক্ষতিকর। এটি এক ধরনের নেশা এবং ছাত্রদেরকে মনের অৎান্তেই বিপদগামী করে।  [দ্র. সূরা লুকমান: আয়াত ৬]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight