জীবন জিজ্ঞাসা

ঈদে মীলাদুন্নবী প্রসঙ্গে:
মুহাম্মদ রাকিব হাসান, তামিরুল মিল্লাত কামিল মাদরাসা।
প্রশ্ন: আমি “নাজাতের পথে” নামক একটি বইতে পেয়েছি যে, শবে বারাআতের রাত্র ও শবে ক্বদরের রাত্র হতে ঈদে মীলাদুন্নবীর রাত্র উত্তম এবং দুইঈদ হতে ঈদে মীলাদুন্নবী উত্তম।
অথচ আমাদের পাঠ্য হাদীস আলিম প্রথম খ-ের “মিশকাতুল মাসাবীহ” এর ১৩৩ নং হাদীসের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে যে, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যুগে যা ছিল না, তা পালন করা বিদআত। এ হিসেবে তো ঈদে মীলাদুন্নবী বিদআত হয়। কেননা, তা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যুগে ছিল না। এ সম্পর্কে শরীয়তের হুকুম জানতে চাই।
উত্তর: মিশকাতুল মাসাবীহের উক্ত হাদীস সঠিক যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যুগে যে আমল ছিল না এবং সাহাবায়ে কিরামের যুগে যে আমল ছিল না সেটা বিদআত ও নাজায়িয।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম  জীবনে কোনদিন নিজের জন্মদিনে ঈদে মীলাদুন্নবী পালন করেননি, তেমনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতি সর্বাধিক ভালবাসা থাকা সত্ত্বেও সাহাবায়ে কিরাম রা. এ দিনে কোনো উৎসব পালন করেননি। তাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জন্ম তারিখে ঈদে মীলাদুন্নবী পালন করা বিদআত ও নাজায়িয।
যে কাজ জায়িযই নয়, সেটা শবে বারাআত ও শবে ক্বদর থেকে উত্তম হয় কিভাবে? তাই প্রশ্নে বর্ণিত, “নাজাতের পথে” নামক বইটিতে ঈদে মীলাদুন্নবী সম্পর্কে যা লিখা হয়েছে, তা ভুল ও মনগড়া। পবিত্র কুরআন ও হাদীসের সাথে এর কোনো মিল নেই।
[সূরা হাশর, আয়াত: ৭/ আবু দাউদ শরীফ, ২: ২৭৯/ মিশকাত, ৩১/ তিরমিযী শরীফ, ২: ৯২/ ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া, ৯: ৪০৯/ ইবনে মাজাহ, ৬/ ফাতাওয়ায়ে রশীদিয়া, ১১৪]

মসজিদে সালাম দেয়া প্রসঙ্গে:
আলহাজ্ব খায়রুল আলম, নবীনগর (পল্লি বিদ্যুৎ সংলগ্ন) সাভার, ঢাকা।
প্রশ্ন: মসজিদে সালাম দেয়া যাবে কিনা? দয়া করে জানালে কৃতজ্ঞ হবো।
উত্তর: মসজিদে লোকেরা যদি অবসর থাকে কোন ইবাদতে লিপ্ত না থাকে, তাহরে সালাম দেয়ায় কোন দোষ নেই। আপনার সালামে যদি কোন ইবাদতকারীর ধ্যানমগ্নতা বিনষ্ট হয়, তবে অবশ্যই সেটা নিষেধ। [আদাবুল মু’য়াশারাত]

সালাতুল হাজত প্রসঙ্গে:
খাইরুন নিছা পপলিন, তমরদি, হাতিয়া।
প্রশ্ন: হাজত পূরণের (নিজ প্রয়োজনের) জন্য কত রাকাত নামায পড়তে হয় ও তার নিয়মাবলী কি জানতে চাই।
উত্তর: যে কোন প্রকার হাজত বা প্রয়োজন দেখা দিলে, চাই তার সম্পর্ক আল্লাহর সঙ্গে হোক কিংবা মানুষের সঙ্গে, প্রথমে সুন্নত মুতাবিক সুন্দরভাবে অযু করবে। তারপর খুব দিল লাগিয়ে নিবিষ্ট মনে ইহতিরাম ও গুরুত্বের সাথে অন্যান্য নামাযের ন্যায়ই দুই রাকাত নামায পড়বে। অতঃপর আল্লাহ পাকের কিছু হামদ ও ছানা (প্রশংসা) করবে। তারপর দরূদ শরীফ পাঠ করতঃ নি¤েœর দোয়াটি কমপক্ষে একবার অথবা যতবার ইচ্ছা পড়বে। শেষে নিজের খাস উদ্দেশ্যের জন্য মহান দরবারে এলাহীতে দরখাস্ত পেশ করবে। লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহুল হালীমুল কারীম। সুবহানাল্লা-হি রাব্বিল আরশীল আযীম। ওয়াল হামদুলিল্লা গাণিমাতা মিন কুল্লি বিরীউ ওয়াচ্ছালামাতা মিন কুল্লি ইসমিন। লা তাদালী যামবান ইল্লা গাফারতাহু ওয়ালা হাম্মান ইল্লা ফাররাযতাহু ওয়ালা হাজাতান হিয়া লাকা রিযান ইল্লা-কাযাইতা ইয়া-আর হামার রা-হিমীন। [তিরমিযী শরীফ, ১ম খ-, ১০৮-১০৯পৃষ্ঠা]

অজু করে পুরুষের সামনে যাওয়া প্রসঙ্গে:
সালমা আক্তার সিনু, শ্রীপুর, গাজীপুর।
প্রশ্ন: আমি গার্মেন্টস এ চাকুরী করি। সেখানে থাকা অবস্থায় নামাযের ওয়াক্ত হলে টয়লেটে অজু করে দূরে কোথাও গিয়ে নামায আদায় করতে হয় এবং পুরুষদের সামনে দিয়েই যেতে হয়। এতে কি আমার অজুর কোন ক্ষতি হবে? অজু করার ভালো পরিবেশ না থাকায় এক অজুর দ্বারা দুই ওয়াক্তের নামাজ পড়া যাবে কি?
উত্তর: মহিলাদের অজু করার পর পুরুষদের সামনে দিয়ে কোথাও গেলে বা পরপুরুষের নজরে পড়লে অজু ভঙ্গ হবে না। এটা অজু ভঙ্গের কোন কারণ নয়।
তবে বেপর্দাভাবে পুরুষের সামনে যাওয়া গুনাহর কাজ। তাই পুরুষের সামন দিয়ে কোথাও যেতে হলে, পর্দা করে যাওয়া আপনার কর্তব্য।
[ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী, ১: ৯/ ফাতাওয়ায়ে শামী, ১: ১৪১]

পায়ে আঠাযুক্ত স্টিকার লাগা অবস্থায় নামায পড়া প্রসঙ্গে:
আঁখি মণি, স্কয়ার মাস্টার বাড়ি, ময়মনসিংহ।
প্রশ্ন: আমি গার্মেন্টস এ চাকুরী করি। সেখানে অনেক সময় নিজের অজান্তেই আমার পায়ে বিভিন্ন ধরনের আঠাযুক্ত স্টিকার লেগে যায়। অনেক সময় তা নামাজের পরে নজরে পড়ে। এমতাবস্থায় আমার অজু ও নামাজ হবে কি? নাকি পুনরায় অজু করে নামায আদায় করতে হবে?
উত্তর: উক্ত আঠালো স্টিকার লাগার কারণে যদি অজুর অঙ্গে পানি না পৌঁছে, তাহরে ওই স্টিকার তুলে অঙ্গ ধুয়ে বা পুনরায় অজু করে আবার নামাজ আদায় করতে হবে। এজন্য অজু করার আগেই অঙ্গগুলো ভালোভাবে লক্ষ্য করে স্টিকার থাকলে তা তুলে অজুর অঙ্গ সঠিকভাবে ধৌত করা আপনার কর্তব্য। [ফাতাওয়ায়ে শামী, ১: ৪০১/ ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী, ১: ৫৮]

কুরআন শরীফে লোকমার কাগজ লাগানো প্রসঙ্গে:
আতাউর রহমান, কুমিল্লা।
প্রশ্ন: যদি কুরআন শরীফ মুখস্থ করার সময় কোনো শব্দে ইয়াদের লোকমা থাকে, তাহলে খেয়াল রাখার জন্য লোকমার স্থানে ছোট রঙ্গিন কাগজ লাগানো জায়িয হবে কি? উল্লেখ্য যে, ছোট রঙ্গিন কাগজটি মুখের সামান্য লালা দিয়ে লোকমার স্থানে লাগানো হয়।
উত্তর: হাফেজ ছাত্রদের জন্য কুরআন শরীফ হিফজ করার সময় লোকমার স্থানটি চিহ্নিত করা প্রয়োজনীয় বিষয়। যাতে পরবর্তী লোকমার আয়াতটি বারবার তিলাওয়াত করে শুধরিয়ে নেয়া সম্ভব হয়।
তাই এর জন্য কুরআনের প্রতি আজমত-মহব্বত ঠিক রেখে লোকমার স্থানে ছোট কাগজের টুকরা চিহ্ন স্বরূপ রাখাতে কোন অসুবিধা নেই। তবে এক্ষেত্রে মুখের লালা ব্যবহার না করে পবিত্র পানি ব্যবহার করা উত্তম হবে। কেননা, মুখের লালাযুক্ত কাগজ কারো শরীরে লাগাতে চাইলে সে ঘৃণাবোধ করে। সুতরাং এরূপ কাগজ কুরআন শরীফে না লাগানোই শোভনীয় ও আদব।
[সূরাহ হজ্ব, ৩২/ ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী, ৫: ৩১৯]

মহিলাদের নামাযে খোঁপা বাঁধা প্রসঙ্গে:
ফাতেমা আক্তার, দুর্গাপুর, নেত্রকোনা।
প্রশ্ন: নামাযের মধ্যে মহিলাদের মাথার চুল কিভাবে রাখতে হবে, খোঁপা বেঁধে, নাকি চুল ছেড়ে দিয়ে? কেউ কেউ বলেন, খোঁপা বেঁধে নামাজ পড়তে হবে। চুল খুলে নামাজ পড়লে নাকি নামাজ হয় না। তাদের কথা কি ঠিক?
উত্তর: না, তাদের কথা সঠিক নয়। মহিলারা মাথায় চুল খোঁপা বেঁধেও নামায পড়তে পারবে, আবার চুল ছেড়েও নামাজ পড়তে পারবে।
তবে মহিলাদের চুল যেহেতু সতরের অন্তর্ভুক্ত, তাই নামাজ অবস্থায় মহিলাদের চুল সম্পূর্ণরূপে ঢেকে রাখা জরুরী। রুকু সিজদা বা অন্য কোনো অবস্থায় যাতে চুর বেরিয়ে না যায়, সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। কোনোভাবে চুল বেরিয়ে গেলে নামাজ ফাসিদ হয়ে যাবে। এজন্য সতর্কতার জন্য খোঁপা বেঁধে নামায পড়া ভালো।
[মা‘আরিফুস সুনান, ৩: ৪৭০/ ফাতাওয়া শামী, ১: ৪০৫/ আল-মুহিতুল বুরহানী, ২: ১৬]

প্রেম-ভালবাসা করা প্রসঙ্গে:
আতিকুর রহমান শামীম, মাইজদী, নোয়াখালী।
প্রশ্ন: কোনো মেয়েকে বিয়ে করার পূর্বে তার সঙ্গে প্রেম করা জায়িয আছে কি? যদি প্রেমিক যুগলের উদ্দেশ্য থাকে ভবিষ্যতে তারা বিয়ে করবেন এবং বিয়ের পূর্বে তাদের সম্পর্ক শুধুমাত্র দেখা করা, এক সঙ্গে চলাফেরা করা ও কথা বলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে এবং কোনো প্রকার শারীরিক সম্পর্ক হবে না। এমতাবস্থায় কি তা জায়েয হবে?
উত্তর: ইসলামের বিধান মতে, বিবাহের উদ্দ্যেশ্যে হোক বা যেকোন উদ্দেশ্যে হোক বিবাহ না করে বিবাহের আগে বেগানা ছেলে-মেয়ের প্রেম-ভালবাসা করা বা এ সংক্রান্ত কথাবার্তা বলা, একজন আরেকজনের নিকট আসা-যাওয়া করা, দেখা-সাক্ষাত করা ইত্যাদি নাজায়িয ও হারাম। কোনরূপ দৈহিক সম্পর্ক না হলেও উল্লিখিত কাজগুলোকেও হাদীস শরীফে যেনা-পাপ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আর দৈহিক সম্পর্ক হলে, তাতো চরম জঘন্য যিনা-মহাপাপ। এটা এত বড় পাপ কাজ যে, এর কারণে আল্লাহর আরশ কেঁপে উঠে। দুনিয়া ও আখেরাতে এর জন্য ভয়াবহ আজাব রয়েছে।
[সূরাহ নিসা: আয়াত ২৩/ ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী, ৫: ৩২৭]

পীরের নামে বন্দনা গাওয়া প্রসঙ্গে:
আবদুল মজিদ, বাবুরচর, ফরিদপুর।
প্রশ্ন: আমাদের ফরিদপুর জেলায় (সদরপুর থানায়) এক পীর সাহেবের বাড়ি হতে পীর সাহেবকে উপলক্ষ করে বিভিন্ন ধরনের বন্দনামূলক গজল পরিবেশিত হয়। যেমন “আমার ভরসা কেবল তুমি দয়াল বাবাজান, আমার ভরসা কেবল তুমি। শুনিয়াছি লোকেরই মুখে। তোমার যে যেখানে বসিয়া ডাকে, দাও দেখা তুমি তোমার নিজ গুণে! বাবা আমার দেলেরই কুরআন। সুবহে সাদিকের সময় জন্ম নিয়ে বাবা, ইয়া মুরিদ, ইয়া মুরিদ বলে ডেকে ওঠে…..।
পীর সাহেবের নামে এরূপ বন্দনামূলক গজল গাইলে গুনাহ হবে কি? এমন পীরের মুরীদ হওয়া যাবে কিনা?
উত্তর: পবিত্র কুরআনে পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করা হয়েছে মানুষের সকল ভরসাস্থল একমাত্র আল্লাহ তাআলা। একজন মানুষ তিনি যত বড় পীরই হোন না কেন, তিনি কারো ভরসাস্থল হতে পারেন না। তার নিজেরই তো কোন ভরসা নেই; তার ভালো-মন্দ, সুখ-দুঃখ, হায়াত-মউত ইত্যাদি ক্ষেত্রে আল্লাহ ছাড়া তার কোন ভরসা নেই। তিনি কি করে অন্যের ভরসাস্থল হতে পারেন? অথচ উক্ত গজলে ওই নামধারী পীরকে ভরসাস্থল বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এমনিভাবে ওই পীরকে হাজির-নাজির ও আলিমুল গাইব হিসেবে বুঝানো হয়েছে। কুরআনের সাথে তাকে তুলনা করা হয়েছে। অথচ একমাত্র আল্লাহ তাআলা ছাড়া অন্য কাউকে আলিমুল গাইব বা হাজির-নাজির বলা বা বিশ্বাস করা কুফর ও শিরকের অন্তর্ভুক্ত। তেমনি কোন পীরকে কুরআনের সাথে তুলনা করা মারাত্মক অন্যায়। তাই এ ধরনের গজল গাওয়া বা ভক্তি নিয়ে বিশ্বাসের সাথে তা শোনা সম্পূর্ণ নাজায়িয ও মারাত্মক গুনাহর কাজ। এতে ঈমান নষ্ট হওয়ার আশংকা রয়েছে। যে পীরের দরবারে এমন শিরকী গজল হয়, তিনি নিঃসন্দেহে ভ- পীর। এমন ভ- পীরের মুরীদ হওয়া যায়েজ হবে না। কারণ, এতে ঈমান ও আমলের মারাত্মক ক্ষতি হওয়ার আশংকা রয়েছে।
[সূরা তালাক: আয়াত ৩/ সূরা আরাফ: আয়াত ৩৬/ সূরা হাশর: আয়াত ৭/ সূরা বাকারা: আয়াত ৩৩/ সূরা আলে ইমরান: আয়াত ৪৪/ সূরা আনআম: আয়াত ৫০]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight