জীবন জিজ্ঞাসা

মুহাম্মাদ নাঈমুর রহমান, গাজীপুর
প্রশ্ন: অনেক এলাকায় মাইকে কুরআন খতমের আয়োজন করা হয়। একে তাদের পরিভাষায় শবীনা বলা হয়। এক শ্রেণীর হাফেজ এ শবীনায় অংশগ্রহণ করে থাকে। এভাবে মাইকে কুরআন খতম করা এবং করানো জায়িয আছে কিনা? একে নাজায়িয বলা হলে, তারা বলে তাহলে তো মাইকে কিরাআত পড়া এবং হদর তিলাওয়াতও নাজায়িয হওয়া চাই! তাদের এ কথায় আমাদের মধ্যে সন্দেহের সৃষ্টি হয়ে যায়। কাজেই এ ব্যাপারে শরী‘আতের সঠিক বিধান বিস্তারিতভাবে জানানোর বিনীত আবেদন করা গেলো!
উত্তর: মাইকে কুরআন খতম করা ও করানো দু’টিই নাজায়িয। যে তা করে এবং করায় উভয় শ্রেণীই গুনাহগার হয়। কারণ মাইকে কুরআন খতম করলে এলাকাবাসীর ইবাদাত ও আরামে ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়। তাছাড়া কুরআনে কারীমের তিলাওয়াতের আওয়াজ যাদের কানে পৌঁছে, তাদের উপর আদবের সাথে গুরুত্বসহকারে তিলাওয়াত শ্রবণ করা জরুরী। এর বিপরিত করা গুনাহ। অথচ এলাকাবাসী তাদের নিজ নিজ পেশা ও কাজে ব্যস্ত থাকায় তাদের পে এতো দীর্ঘ সময়ের তিলাওয়াত গুরুত্বের সাথে শ্রবণ করা সম্ভবপর হয় না। এতে কুরআনে কারীমের অবমাননা হয়। আর এর গুনাহ খতমকারী এবং আয়োজক সকলের উপর বর্তায়।
পান্তরে মাইকে কিরাত বা হদর তিলওয়াত সাধারণত কোনো অনুষ্ঠানে হয়ে থাকে এবং একেবারে স্বল্প সময় হয়। তাই মাইকে কুরআন খতম নাজায়িয হওয়ার উল্লিখিত কারণসমূহ কিরাত ও হদর তিলাওয়াতে পাওয়া যায় না বিধায় এর অনুমতি আছে।- ফাতাওয়া শামী: ২/২৯৮, খুলাসাতুল ফাতাওয়া: ১/১০৩, ফাতাওয়া তাতারখানিয়া: ১/৫০৪, কিফায়াতুল মুফতী: ৩/৪০২।

মুহাম্মাদ নূরুজ্জামান, ফুলাবাড়ীয়া, মোমেনশাহী
প্রশ্ন: বিদআতে সাইয়িআহ কি কি? কেউ যদি বিদআত কোনো কাজকে দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত গণ্য না করে সম্পাদন করে, তাহলে তার কেমন গুনাহ হবে? বিস্তারিত জানাবেন।
উত্তর: প্রত্যেক নবআবিষ্কৃত কাজ শরীআতে যার কোনো ভিত্তি নেই, সাহাবায়ে কিরাম রা., তাবিয়ী ও তাবেতাবিয়ীনে কিরাম যা করেননি অথচ সেটাকে শরীআতের অন্তর্ভুক্ত গণ্য করে সাওয়াবের কাজ হিসেবে করা হয় শরীআতের পরিভাষায় তা বিদআত। এর অন্তর্ভুক্ত সবই ঘৃণিত ও মারাত্মক গুনাহের কাজ। এখানে হাসানা বলতে কিছু নেই। বরং উক্ত সংজ্ঞার আওতাযুক্ত সকল বিদআতই সাইয়িআহ। একে নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যায় সীমাবদ্ধ করা সম্ভব নয়। এ রকম কয়েকটি বিদআত যেমন, ঈদে মীলাদুন্নবী পালন করা, কারবালার দিন তাযিয়া বানানো ও তাযিয়া মিছিল বের করা, শবে বরাত-শবে কদর ও মুহাররমে হালুয়ার আয়োজন করাকে দ্বীন মনে করা, ঈসালে সাওয়াবের জন্য দিন তারিখ নির্ধারণ করা, যেমন তিনদিনা, সাতদিনা, চল্লিশা ইত্যাদি জঘন্য বিদআত। সকল বিদআত মারাত্মক কবীরা গুনাহ। তাই এ থেকে বিরত থাকা এবং তাওবা করা জরুরি।- কাওয়ায়িদুল ফিক্হ: পৃষ্ঠা: ২০৪, আদ্-র্দুরুল মুখতার: ২/২৯৯, বারাহিনে কাতিআহ: পৃষ্ঠা-৪৭, ফাতাওয়া আযীযিয়া: পৃষ্ঠা-১৮৫, কিফায়াতুল মুফতী: ১/২৫৩-২৫৬।

মুহা. হাসান ফায়সাল, বাইতুল আমান হাউজিং, শ্যামলী, ঢাকা
প্রশ্ন: অফিস থেকে যাতায়াতের জন্য গাড়ি ক্রয় বাবদ টাকা দেয়া হয়। তাতে নিুোক্ত অংশগুলো থাকে। ১. ব্যাংকের সুদ এবং আসল। ২. তেলের খরচ। ৩. রণাবেণের খরচ। ইতিপূর্বে ১নং অংশ দেয়া হতো না। কারণ গাড়ি অফিসের মালিকানায় থাকতো। বর্তমানে গাড়ি মালিকানায় দেয়া হচ্ছে। তাই উপরিউক্ত তিন অংশের টাকা দেয়া হয়।
গাড়ি ক্রয়ের উল্লিখিত টাকা মাসিক কিস্তিতে দেয়া হয়। তাই গাড়ি ক্রয় করতে ব্যাংক থেকে সুদি ঋণ নেয়ার প্রয়োজন পড়ে। এ জন্য অফিস সুদের টাকা প্রদান করে। অতএব জানার বিষয় হলো, (ক) অফিস কর্তৃক প্রদত্ত তিন খাতের টাকা গ্রহণ করা জায়িয হবে কিনা? ব্যাংক থেকে সুদি ঋণ নিয়ে গাড়ি ক্রয় বৈধ হবে কিনা?
উল্লেখ্য, অফিস থেকে প্রদেয় সমস্ত কিস্তি জমা করে সরাসরি এ টাকা দিয়েও গাড়ি ক্রয় করা যাবে। তবে এই মুহূর্তে আমার গাড়ির খুব দরকার বিধায় সেই সময় পর্যন্ত অপো করা আমার জন্য খুবই কষ্টকর। সঠিক বিধান জানিয়ে বাধিত করবেন।
উত্তর: (ক) যাতায়াতের জন্য গাড়ি ক্রয় বাবদ অফিস থেকে প্রদত্ত টাকা গ্রহণ করা জায়িয হবে। তবে ব্যাংকের সুদ পরিশোধের অংশ হিসেবে প্রদত্ত টাকা গ্রহণ করা যাবে না।
(খ) ব্যাংক থেকে সুদি ঋণ নিয়ে গাড়ি ক্রয় করা জায়িয হবে না। কেননা সুদি লেনদেনে জড়িত হওয়া একটি মহাপাপ। ইহ ও পর উভয় জগতে এর পরিণাম ভয়াবহ। কাজেই কষ্ট করে হলেও সকল কিস্তি জমা করে সরাসরি তা দিয়ে গাড়ি ক্রয় করুন! অথবা সম্ভব হলে কোনো ব্যক্তি বিশেষ থেকে সুদহীন ঋণ নিয়ে গাড়ি ক্রয় করুন কিংবা কোনো কোম্পানী থেকে কিস্তিতে গাড়ি ক্রয় করুন। কিস্তিতে ক্রয় করলে অফিস থেকে প্রদত্ত ব্যাংক সুদ হিসেবে প্রদত্ত টাকাও গ্রহণ করা জায়িয হবে।- মেশকাত শরীফ: ২৪৪,  তাবয়ীনুল হাকায়িক: ৪/৮৫, ফাতাওয়া মাহমূদিয়া: ৪/২৪২, ইসলাম আউর জাদীদ মাআশী মাসায়িল: ৮৬।

মুহাম্মাদ মাহফুজুর রহমান, দোহার, ঢাকা
প্রশ্ন: কুরআনে কারীমের আয়াত না লিখে শুধু তরজমা ছাপানো জায়িয আছে কিনা বিস্তারিত জানালে উপকৃত হবো।
উত্তর: কুরআনে কারীমের শুধু তরজমা ছাপানো জায়িয নেই। অবশ্য কোনো বিষয়ের প্রয়োজনে এক-দুই আয়াতের তরজমা ছাপানোর অনুমতি আছে। এ েেত্রও তরজমার অংশটুকুতে কুরআনে কারীমের হুকুম প্রযোজ্য হবে। তরজমার স্থানে অজু ছাড়া স্পর্শ করা যাবে না এবং অংশটুকু যথাযথ আদবের সাথে হেফাজত করা জরুরি।- আদ্-র্দুরুল মুখতার মাআ ফাতাওয়া শামী: ১/৪৮৬, ফাতহুল কাদীর: ১/২৪৮, জাওয়াহিরুল ফিকহ: ১/৯৭, কিফায়াতুল মুফতী: ৯/৬৫-৬৬।

মুহাম্মাদ শাহজাহান, পটুয়াখালী
প্রশ্ন: আমি বেশ কিছু দিন পূর্বে এক ব্যক্তির কিছু খাবার তাকে না বলে খেয়েছি। এখন লজ্জায় তার কাছে মাও চাইতে পারছি না এবং তাকে খাবারের মূল্যও দিতে পারছি না। এমতাবস্থায় খাবারের আনুমানিক মূল্য গরীবদের মাঝে সদকা করে দিলে চলবে কিনা?
উত্তর: না, খাবারের মূল্য সদকা করলে আপনি দায়মুক্ত হবেন না। দায়মুক্তির সহজ পন্থা হলো, আপনি যা খেয়েছেন, তাকেও এ জাতীয় সেই পরিমাণ খাবার কৌশলে খাওয়ান কিংবা যে কোনো উপায়ে এর মূল্য বা সমমূল্যের কোনো বস্তু তার হাতে পৌঁছে দিন। এ েেত্র ইতিপূর্বে আপনি তার খাবার খেয়েছেন, তা তাকে বলার প্রয়োজন নেই।- রিয়াযুস সালিহীন: ১১।

মুহাম্মাদ আব্দুল কাইয়ুম, কেন্দুয়া, নেত্রকোণা
প্রশ্ন: আমার পরিচিত এক লোকের নাম আব্দুন্নবী। এ থেকে আমার প্রশ্ন জাগে যে, আব্দুন্নবী, আব্দুর রাসূল এ জাতীয় নামে নাম করণ শরীআত সম্মত কি না?
উত্তর: আব্দুন্নবী, আব্দুর রাসূল এ জাতীয় নামে আব্দ-এর সম্বোধন গাইরুল্লাহ-এর দিকে হওয়ার কারণে শিরকের আভাস পাওয়া যায়। তাই এ জাতীয় নাম রাখা শরী‘আত সম্মত নয়। তবে এমন নামের ব্যক্তিকে মুশরিক বলা যাবে না। কেননা আব্দ দ্বারা খাদেম, অনুসারী প্রভৃতি অর্থও উদ্দেশ্য নেয়া সম্ভব।- মিরকাত শরহু মিশকাত: ৯/১০৬, ফাতাওয়া শামী: ৯/৫৯৯, ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ৫/৩৬২, ফাতাওয়া সিরাজিয়া বিহামিশি ফাতাওয়া খানিয়া: ৩/১২, আহসানুল ফাতাওয়া: ৮/১৭৪।

মুহাম্মাদ মামুনুর রশীদ, উত্তর কেরানীগঞ্জ, ঢাকা।
প্রশ্ন: আমার স্ত্রী আমার এক ছেলের নাম রেখেছে সান্জিদ। উক্ত নামের অর্থ কী এবং এটি শরয়ী দৃষ্টিতে ভালো নাম কি না? উত্তর দিলে উপকৃত হবো।
উত্তর: সান্জিদ শব্দের অর্থ হচ্ছে চিন্তাশীল, গম্ভীর, বিবেচক ইত্যাদি। আর শরয়ী দৃষ্টিতে এটি খারাপ নাম নয়।- কামূসুল ওয়াহীদ: ১৬১১, ফিরুজুল লুগাত: ৮১২।

মুহাম্মদ হাবীবুর রহমান, রৌমারী, কুড়িগ্রাম
প্রশ্ন : তেলাওয়াতের অযোগ্য ছেঁড়াফাটা কুরআন মাজীদ কী করা চাই। সঠিক বিধান জানিয়ে উপকৃত করবেন।
উত্তর : পড়ার অযোগ্য পুরাতন কুরআন মাজীদ এবং কুরআনের ছেঁড়াফাটা কাগজ শরীআতের বিধান অনুযায়ী পবিত্র কাপড়ে পেঁচিয়ে কোথাও এমনভাবে ছাদ তৈরি করে দাফন করতে হবে যেন কুরআন মাজীদে মাটির চাপ না লাগে। যেভাবে মুসলমানের মৃতদেহ দাফন করা হয়। আর যদি কুরআন মাজীদ এমন কালিতে লিখিত হয় যা ধুলে মুছে যায় তবে উত্তম হলো প্রথমে পানি দিয়ে ধুয়ে লেখাগুলো মুছে নেওয়া আর কাগজগুলো উল্লিখিত নিয়মে দাফন করা। আর কুরআন-ধোয়া পানিটুকু মানুষ পদদলিত না করে এমন স্থানে ফেলা অথবা প্রবহমান পানিতে ফেলা। দাফনের ব্যবস্থা না থাকলে ভারী বস্তুতে বেঁধে সসম্মানে গভীর নদী, পুকুর বা কূপে ফেলে দেয়া। তবে কুরআন মাজীদ সাধারণ অবস্থায় আগুনে পোড়ানো যাবে না। কারণ, এতে সর্বসাধারণের মাঝে ফেতনা সৃষ্টি আশঙ্কা থাকে। তবে যদি দাফন করলে কিংবা গভীর পানিতে ফেললে কুরআন মাজীদের হেফাজতের নিশ্চয়তা না থাকে; বরং আশঙ্কা থাকে যে, পুকুর, নদী, কূপ ইত্যাদি শুকিয়ে এমনিতেই ভেসে উঠবে কিংবা অন্য কোনোভাবে বেইজ্জতির শিকার হবে, তাহলে ইজ্জতের সঙ্গে আগুন জ্বালিয়ে ছাইগুলো কোনো পবিত্র স্থানে দাফন করে দিতে হবে অথবা পানিয়ে ভাসিয়ে দিতে হবে। মনে রাখতে হবে, এটি অত্যন্ত অপারগতায় তৃতীয় পর্যায়। -বুখারী শরীফ : ২/৭৪৭; আদ-দুররুল মুখতার  মাআ ফাতাওয়ায়ে শামী : ১/১১৭; ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া : ৫/৩২৩; আল-বাহরুর রায়িক : ১/১০২; ফাতাওয়ায়ে রহীমিয়া : ১/৮৫; আহসানুল ফাতাওয়া : ৮/৪১।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight