জীবন জিজ্ঞাসা

মুহাম্মাদ মাহদী হাসান, কসবা, বি-বাড়িয়া
প্রশ্ন: আমাদের এলাকায় কবরে লাশ দাফন করার পর, কবরের  উপর কিছু পানি ঢেলে দেয়া হয়। এভাবে পানি ঢেলে দেয়া শরী‘আত সম্মত কিনা?
উত্তর: দাফন সম্পন্ন হওয়ার পর কবরের উপরাংশের মাটি যেন সরে না যায় সে জন্য পানি ছিটিয়ে দেয়া মুস্তাহাব। এটাকে জরুরী মনে করার কোনো সুযোগ নেই। বরং মাটি সরে যাওয়ার আশংকা না থাকলে না দেয়া চাই।- ইবনে মাজাহ: ১১১, আদ্-র্দুরুল মুখতার মা‘আ ফাতাওয়া শামী: ২/২৩৭, ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ১/২৬৬।

মুহাম্মাদ আব্বাস আলী, ভাংগা, ফরিদপুর
প্রশ্ন: গ্রামাঞ্চলে লোকজন বলে থাকে, মহিলাদের হাতে চুড়ি পরতে হয়। তাদের হাতে চুড়ি না পরে থাকা ভালো নয়। এমনকি এও প্রসিদ্ধ আছে যে, স্ত্রী যদি হাতে চুড়ি না পরে, তাহলে তার স্বামীর হায়াত কমে যায়। আরো বলা হয়ে থাকে, মহিলাদের চুড়ি বিহীন হাতে কাউকে পানি পান করতে দেয়া ভালো নয়। এতে অনেক সমস্যা দেখা দেয়। প্রচলিত এসব কথা এবং ধারণা সঠিক কিনা? চুড়ি পরার ব্যাপারে শরয়ী বিধান কি?
উত্তর: শরী‘আতের দৃষ্টিতে মহিলাদের চুড়ি পরা জায়িয আছে; জরুরী নয়। আর প্রশ্নোক্ত কথা “স্ত্রী যদি হাতে চুড়ি না পরে, তাহলে তার স্বামীর হায়াত কমে যায়; চুড়ি বহীন হাতে কাউকে পানি পান করতে দেয়া ভালো নয়, এতে অনেক সমস্যা দেখা দেয়”। এগুলোর কোনো ভিত্তি নেই। এসব ভুল ধারণা। তবে পুরুষদের সাথে পার্থক্য বিধানের জন্য মহিলাদের অলংকারাদি ব্যবহার করা চাই। আজকাল এক শ্রেণীর আধুনিক মহিলা বিজাতীয় ফ্যাশনের অনুকরণ করতে গিয়ে হাত, নাক, কান ইত্যাদিতে কোনো অলংকার পরিধান করে না। এটা ইসলাম সম্মত নয়।- ই’লাউস্ সুনান: ১৭/২৯৩, মিশকাত শরীফ: ২/৩৮০, আহসানুল ফাতাওয়া: ৮/৭২।

মুহাম্মাদ উবায়দুল্লাহ, আটপাড়া, নেত্রকোণা
প্রশ্ন: অনেক লোক আরবী সফর মাসে বিয়ের আকদ করাকে খারাপ মনে করে। তাদের এ বিশ্বাস শরী‘আতের দৃষ্টিতে কেমন? অনুগ্রহ করে জানাবেন।
উত্তর: লোকদের এই ধারণা-বিশ্বাস হাদীসের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। এ মাসে বিয়ের আকদ করা খারাপ কিছু নয়। তাই এ ধরনের বিশ্বাস পোষণ করা যাবে না।- তিরমিযী শরীফ: ২/৩৬, কিফায়াতুল মুফতী: ১/৭৫, আহসানুল ফাতাওয়া: ১/৪৭, ফাতাওয়া রহীমিয়া: ১/১১৭।

মুহাম্মাদ আব্দুর রহমান, শ্রীপুর, গাজীপুর
প্রশ্ন: বর্তমানে বাজারে কুরআনে কারীমের আকৃতিতে তৈরী এক ধরনের ঘড়ি পাওয়া যায়। এসব ঘড়ি বাসা-বাড়ীতে ব্যবহার করা যাবে কিনা?
উত্তর: কুরআনে কারীমের আকৃতিতে তৈরী ঘড়িতে সাধারণত বিভিন্ন আয়াত বা পূর্ণ সূরা লিখা থাকে। অপরদিকে ঘড়ি ধরা-ছোঁয়া এবং রাখার ক্ষেত্রে কোনো সতর্কতা অবলম্বন করা হয় না। যদ্বরুণ কুরআনের আয়াত সম্বলিত এই ঘড়ি ব্যবহার করলে কখনো বিনা উযুতে আবার কখনো নাপাকী অবস্থায়ও ধরে ফেলার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। আর তা সম্পূর্ণরূপে নাজায়িয। তাছাড়া কুরআনে কারীমের মতো একটি পবিত্র ঐশীগ্রন্থের আকৃতিতে নিছক একটি ঘড়ি তৈরী করাতে, কুরআন মাজীদের প্রতি চরম অসম্মান প্রদর্শন হয়, যা মারাত্মক গর্হিত কাজ। কাজেই এ জাতীয় ঘড়ি প্রস্তুত, ক্রয়-বিক্রয় এবং ব্যবহার সবই নাজায়িয। কোনো’টিই করা যাবে না।- আদ্-র্দুরুল মুখতার মা‘আ ফাতাওয়া শামী: ৬/৪৩১, ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ৫/৩১৫, ফাতাওয়া খানিয়া: ৪/৩৭৬, আল-আশবাহ ওয়ান নাযায়ির: ৫৩।

মুহাম্মাদ লোকমান হুসাইন, ভৈরব, কিশোরগঞ্জ
প্রশ্ন: আযান ও তিলাওয়াতের এলার্ম বিশিষ্ট এক ধরনের ঘড়ি পাওয়া যায়। এসব ঘড়ি বিভিন্ন কাজে এলার্মের প্রয়োজনে ব্যবহার করা যাবে কিনা? এমনিভাবে আযান, সালাম ও তিলাওয়াত সম্বলিত যেসব কলিংবেল পাওয়া যায়, সেগুলো ব্যবহার করা যাবে কিনা? অপরদিকে মেমোরি সেট মোবাইলে অতি সহজেই আযান ও তিলাওয়াত এলার্ম হিসেবে সেট করা যায়। এভাবে মোবাইলে আযান ও তিলাওয়াতকে রিং টোন এবং এলার্ম হিসেবে ব্যবহার করা কতোটুকু শরী‘আত সম্মত?
উত্তর: আযান ইসলামী শরী‘আতের সম্মানজনক প্রতীকগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি প্রতীক (শি‘আর)। এটাকে নামাযের জন্য জমায়েত করার উদ্দেশ্যে বিধিবদ্ধ করা হয়েছে। এটি একটি ইবাদাত। এমন একটি (শি‘আর) প্রতীকের ধ্বনিকে বিভিন্ন কাজে এলার্ম বা টোন হিসেবে ব্যবহার করা খুবই গর্হিত কাজ। তাছাড়া অনেক সময় এতে নামাযের সময় হয়ে গেছে বলেও বিভ্রান্তি ঘটতে পারে। তাই আযান সম্বলিত কলিংবেল ও ঘড়ি এলার্মের কাজে ব্যবহার করা এবং মোবাইলে টোন বা এলার্ম হিসেবে আযান ব্যবহার করা সবই নাজায়িয।
তিলাওয়াত তো আযানের চেয়েও অধিক মর্যাদার বিষয়। গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদাত। তিলাওয়াতকে অপাত্রে ব্যবহার এবং এর প্রতি সামান্যতম অসম্মান প্রদর্শন মারাত্মক গুনাহ। আর প্রশ্নোক্ত দুনিয়াবী কাজগুলোতে তিলাওয়াত রেকর্ড করে তা ব্যবহার করার দ্বারা তিলাওয়াতকে চরমভাবে অপাত্রে ব্যবহার এবং এর প্রতি চরম অসম্মান প্রদর্শন বৈ কিছু নয়। তাছাড়া রিং টোন হিসেবে তিলাওয়াত ব্যবহার করলে অনেক সময় টয়লেটে বা অন্য কোনো আপত্তিকর জায়গাতেও কল আসলে তিলাওয়াত শুরু হয়ে যায়, এতে তিলাওয়াতের অবমাননা হয়, যা কোনো মুসলমান করতে পারে না। সুতরাং ঘড়ি, মোবাইল, কলিংবেল ইত্যাদিতে তিলাওয়াত রেকর্ড করত তা এলার্ম বা টোন হিসেবে ব্যবহার করা কোনো অবস্থাতেই জায়িয হবে না।
এমনিভাবে সালাম একটি ইসলামী কৃষ্টি বা রীতি। এটিও একটি ইবাদাত। এটাকেও কোনো পার্থিব কাজে ব্যবহার করার অর্থ হলো এর বিকৃতি সাধন। কারো বাসায় প্রবেশের পূর্বে সালাম প্রদানের যে বিধান ইসলামে রয়েছে, তা পবিত্র কুরআনে কারীমের স্পষ্ট আয়াত দ্বারা সরাসরি স্বয়ং আগন্তুককে প্রদানের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে যন্ত্র তথা কলিংবেলের মাধ্যমে সালাম বাজালে কখনোই সেই নির্দেশ পালন হবে না। বরং সেই নির্দেশ পালনের উদ্দেশ্যে তা করা হলে, সালামের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি নির্দেশের সাথে বিদ্রƒপ করা হবে। সুতরাং কলিংবেল, মোবাইল ইত্যাদির কোনো কিছুতেই সালামকে টোন হিসেবে ব্যবহার জায়িয হতে পারে না।- ফাতাওয়া রহীমিয়া: ১০/৩৩৫-৩৩৬, ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ৫/৩১৫, ফাতাওয়া খানিয়া: ৪/৩৭৬, আল-আশবাহ ওয়ান নাযায়ির: ৫৩।

মুহাম্মাদ আবূ নাঈম, লৌহজং, মুন্সিগঞ্জ
প্রশ্ন: ষ্টীলের প্লেটে খানা খাওয়া জায়িয আছে কিনা?
উত্তর: হ্যাঁ, ষ্টীলের থালা-বাসনে পানাহার করা জায়িয আছে।- ফাতাওয়া শামী: ৬/৩৪৩, হিদায়া: ৩/৪৫৩, আল-বাহরুর রায়িক: ৮/১৮৬, আহসানুল ফাতাওয়া: ৮/১২০, জাদীদ ফিকহী মাসায়িল: ১/৩১৭।

মাহমূদ হাসান, সাথিয়া, পাবনা
প্রশ্ন: টিভি ও রেডিওতে যে সালাম দেয়া হয়, তার উত্তর দেয়া জরুরী কিনা?
উত্তর: টিভি ও রেডিওতে যেসব অনুষ্ঠান প্রচারিত হয়, এগুলোর প্রায় সবই পূর্বে ধারণকৃত। যদ্বরুণ এসব অনুষ্ঠানের শুরুতে দেয়া সালাম সরাসরি সালাম নয়। তাই এর উত্তর দেয়া জরুরী নয়। অবশ্য জায়িয। তবে সরাসরি সম্প্রচারিত অনুষ্ঠানে প্রদত্ত সালাম এবং ধারণকৃত অনুষ্ঠান প্রচার শুরু করার পূর্বে সরাসরি যে সালাম দেয়া হয়, সতর্কতা স্বরূপ তার উত্তর দেয়া উত্তম।- জাওয়াহিরুল ফিকহ: ৫/১৬৭, আহসানুল ফাতাওয়া: ৮/১৩৮, কিফায়াতুল মুফতী: ৯/২১৬।

মুহাম্মাদ সুলাইমান, হালুয়াঘাট, ময়মনসিংহ
প্রশ্ন: টিভি ও রেডিওতে অনেকের মৃত্যু সংবাদ প্রচার করা হয়। এসব মৃত্যু সংবাদ শুনে ‘ইন্নালিল্লাহি ….’ বলতে হবে কিনা?
উত্তর: টিভি ও রেডিওতে প্রচারিত মৃত্যু সংবাদ শুনে ইন্নালিল্লাহি….’ বলা উত্তম। কেননা, সামান্যতম কোনো মুসীবতের কথা শুনলেও এটি পড়তে বলা হয়েছে।- ফাতাওয়া শামী: ১/৬২০, বেহেশতী জেওর: ৭/৪।

মুহাম্মাদ রিফাত হুসাইন, জামালপুর সদর
প্রশ্ন: টিকটিকি মারা জায়িয আছে কিনা? অনেকে বলেন, টিকটিকি মারলে সাওয়াব হয়। সঠিক মাসআলা জানাবেন।
উত্তর: হ্যাঁ, টিকটিকি মারা জায়িয আছে এবং মারলে সাওয়াব হবে। বুখারী শরীফে বর্ণিত এক হাদীসে এসেছে, টিকটিকি হযরত ইবরাহীম (আ.)- এর আগুনে ফুঁক দিয়েছিলো। এ জন্য নবী কারীম (সা.) টিকটিকি মারতে বলেছেন। মুসলিম শরীফে এক হাদীসে বর্ণিত আছে, এক প্রহারে টিকটিকি মারলে একশত নেকী লাভ হয়।- বুখারী শরীফ: ১/৪৭৪, মুসলিম শরীফ: ২/২৩৬, তিরমিযী শরীফ: ১/২৭৩, আল-জামি’উ লি আহকামিল কুরআন: ১১/৩০৪, আহসানুল ফাতাওয়া: ৮/১৮৬।
মুহাম্মাদ মুবারক হুসাইন, ঘাটাইল, টাঙ্গাইল
প্রশ্ন: কোনো ফকীরকে ঝুটা খানা দেয়া জায়িয আছে কিনা?
উত্তর: ফকীরকে ঝুটা খানা দেয়া জায়িয আছে। তবে ভালো খানা দেয়ার দ্বারা যে সাওয়াব হবে তা দিলে সে সাওয়াব পাওয়া যাবে না। সুতরাং ফকীরকে খানা দিলে ভালো খাবার দেয়া উচিত। হ্যাঁ, ঝুটা খানা নষ্ট করে ফেলে না দিয়ে কোনো গরীব ব্যক্তি বা কোনো প্রাণীকে দিয়ে দেয়া সর্বাবস্থায়ই উত্তম।- সুরা আল-ইমরান: ৯২, তাফসীরে রূহুল মা‘আনী: ২/২২২, তাফসীরে মাযহারী: ২/৮৭, তাফসীরে কাবীর: ৮/১৪৪, আহসানুল ফাতাওয়া: ৮/১১২।

মুহাম্মাদ মাসউদ হাসান, স্বরুপকাঠি, পিরোজপুর
প্রশ্ন: আমাদের দেশে বিভিন্ন সময় যেসব মেলা বসে যেমন বৈশাখী মেলা, গাড়ী মেলা ইত্যাদি মেলায় যাওয়া এবং সেখান থেকে কিছু ক্রয় করা শরী‘আতের দৃষ্টিতে জায়িয আছে কিনা? এমনিভাবে ভারত এবং বাংলাদেশে প্রায় সময় হিন্দুদের উদ্যোগে বিশেষ মেলার আয়োজন করা হয়। ব্যবসার উদ্দেশ্যে এসব মেলায় অংশ গ্রহণ করা জায়িয আছে কিনা?
উত্তর: বর্তমানে আমাদের দেশে যেসব মেলা হয়, সেগুলো অশ্লীলতা ও বেহায়াপনায় ভরপুর থাকে। তাই এসব মেলার আয়োজক মুসলিম হোক বা অমুসলিম হোক, এগুলোতে যাওয়া এবং ক্রয়-বিক্রয় করা জায়িয নেই। এমনিভাবে হিন্দুদের উদ্যোগে আয়োজিত মেলা যদি তাদের ধর্মীয় উৎসব উপলক্ষ্যে হয়, তাহলে তা অশ্লীলতামুক্ত হলেও যে কোনো উদ্দেশ্যে সেখানে যাওয়া নাজায়িয। এ ছাড়া যেসব মেলায় অশ্লীলতা নেই, যেমন বৃক্ষমেলা কিংবা অন্য কোনো জাতীয় বা আন্তর্জাতিক পণ্য মেলা সেগুলোতে প্রয়োজনে যাওয়া যাবে।- ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ৫/৩৪৬, কিতাবুল ফিকহি আলাল মাযাহিবিল আরবা‘আ: ২/৪১, ইমদাদুল ফাতাওয়া: ৪/২৬৯, কিফায়াতুল মুফতী: ৯/৫৫, ফাতাওয়া রশীদিয়া: ৫৫৬, ফাতাওয়া মাহমূদিয়া: ১২/৩০৫ ও ১৪/৪০৪।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight