জীবন জিজ্ঞাসা ও পরামর্শ

প্রশ্ন :  আমরা জানি মানুষের মৃত্যুর পর তার রূহ আল্লাহ পাকের নিকট চলে যায়। উক্ত ব্যক্তির দাফনের পর রূহকে কবরে এনে সওয়াল-জওয়াব করা হয়? আমার প্রশ্ন হচ্ছে এই যে, তারপর রূহ কি পুনরায় কবর হতে নিয়ে যাওয়া হয়? আর সেখান থেকে রূহ নেয়া না হলে উক্ত রূহ আমাদেরকে দেখতে পায় কি-না? অনেকে বলে, মৃত ব্যক্তির রূহ বৃহস্পতিবার দিন তার আত্মীয়-স্বজনের নিকট দু’আর জন্য আসে। তা কতটুকু সঠিক জানতে ইচ্ছুক। যেসব বিধর্মীকে দাফন করা হয় না তাদের বিধান কি?                                                            সফিক আহমদ, রাজদিখান, নেত্রকোনা।
উত্তর : মানুষের মৃত্যুর পর রূহ অন্য এক জগতে চলে যায়। যাকে শরীয়তের ভাষায় ‘আলমে বরযখ’ বলা হয়। সেখানকার পূর্ণ অবস্থা সম্পর্কে অবগত হওয়ায় অসম্ভব। তবে হাদীস শরীফের আলোকে বলা যায় যে, মৃত ব্যক্তি যদি নেককার হয়, তাহলে তার রূহকে সাত আকাশের উপরে অবস্থিত ইল্লিয়্যীন নামক স্থানে পৌঁছানো হয়। আর যদি বদকার বা কাফির হয়, তাহলে তার রূহকে সাত যমীনের নিচে সিজ্জীন নামক স্থানে জেলখানায় মারাত্মক কষ্ট দিয়ে বন্দী করে রাখা হয়। ওখান থেকে মৃত ব্যক্তির রূহকে শরীরের সাথে, চাই শরীর যেখানেই হোক না কেন, বিশেষ একটা সম্পর্ক করে দেয়া হয়। যার দ্বারা তার কবরে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় এবং সে প্রশ্নের উত্তর দেয় বা আফসোস করতে থাকে। সেখানকার  সুখ-দুঃখ, একে অপরের সঙ্গে সাক্ষাৎলাভ এবং তাদের সালামের উত্তর দেয়ার মত ক্ষমতা দান করা হয়। আর কোন কোন নেক্কারের রুহকে বরযখী জগতে আল্লাহর পক্ষ হতে বিচরণের অনুমতি দেয়া হয়। উল্লেখিত বর্ণনা থেকে বুঝা যায় যে, মানুষের রূহকে স্ব-স্ব স্থানে নিয়ে যাওয়ার পর তা মৃত ব্যক্তির শরীরে দ্বিতীয় বার ফিরিয়ে দেয়া হয় না। বরং শুধু শরীরের সাথে রূহের এক প্রকার বিশেষ সম্পর্ক করে দেয়া হয়। যদ্বারা তার প্রশ্নোত্তর সংশ্লিষ্ট কার্যাদি ফেরেশতাগণ সমাধা করে নেন এবং এর দ্বারা একথাও প্রতীয়মান হয় যে, মৃতু ব্যক্তি সে অবস্থায় আমাদেরকে চিনেন, কবরে সালাম দিলে উত্তরও দেন। যেহেতু রূহকে কবরে ফিরিয়ে দেয়া হয় না। সুতরাং তা দ্বিতীয়বার নিয়ে যাওয়ার প্রশ্নই আসে না। আবার অনেকে যে বলে থাকে, প্রতি বৃহস্পতিবার রূহ আত্মীয়-স্বজনের নিকট সাওয়াবের জন্য এসে থাকে, তাদের এ ধারণা সম্পূর্ণ ভুল ও ভিত্তিহীন। এ ধরনের আকীদা থাকলে তাওবা ইস্তিগফার করে নেয়া জরুরী। উল্লেখ্য যে, শীরের সাথে রূহের ক্ষীণ সম্পর্কের জন্য শরীর সম্পূর্ণ অক্ষত অবস্থায় বহাল থাকা জরুরী নয় এবং পানাহারের প্রয়োজন হওয়াও জরুরী নয়। [প্রমাণ : সূরা আলে ইমরান : ১৭০, মা’রিফুল কুরআন : ২/২৩৬, মিশকাত শরীফ : ১/২৪, ফাতাওয়া রশীদিয়া : ২৫৫, আপকে মাসায়িল : ১/৩১১, আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব : ৪/৩৬৭-৩৬৯]
প্রশ্ন : শবে বারাতের অর্থ ও ইতিহাস কি? আমরা যে শবে বারাতের প্রচলিত আমল করি তার গ্রহণযোগ্যতা শরীয়তে কতটুকু? বিস্তারিত জানালে খুশি হব।
আমিুনল ইসলাম ১৩৮, গুলশান এভিনিউ, গুলশান-২ ঢাকা।

উত্তর : চন্দ্রবর্ষের গুরুত্বপূর্ণ একটি মাস শা’বান। এর মধ্যরাতকে হাদীসের ভাষায় ‘লাইলাতুননিসফি মিন শা’বান’ তথা অর্ধ-শাবানের রাত বলা হয়। এতদঞ্চলে এ রাতটি ‘শবে বারাআত’ তথা মুক্তির রজনী নামেই সমধিক প্রসিদ্ধ। কেননা, এ রাতে গুনাসমূহ থেকে মুক্তি লাভ হয় এবং পাপের অশুভ পরিণাম থেকে রেহাই পাওয়া যায়।
এ রাতে ভারসাম্যপূর্ণ আমলের কথা বিভিন্ন হাদীস ও আছার দ্বারা প্রমাণিত। সম্মিলিত কোন রূপ না দিয়ে এবং এ রাত উদযাপনের বিশেষ কোন পন্থা উদ্ভাবন না করে শক্তি ও সামর্থ্য অনুযায়ী এ রাতে বেশি বেশি ইবাদত করা নির্ভরযোগ্য রিওয়ায়াত দ্বারা প্রমাণিত। এখানে এ সংক্রান্ত কিছু হাদিস উদ্ধৃতিসহ উল্লেখ করা হলো-
– হযরত মু’আয ইবনে জাবাল রা. বলেন, রাসূলে কারীম সা. ইরশাদ করেছেন- ‘আল্লাহ তা’আলা অর্ধ শা’বানের রাতে (শা’বানের চৌদ্দ তারিখ দিবাগত রাতে) সৃষ্টির দিকে (রহমতের) দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষপোষণকারী ব্যতীত সবাইকে ক্ষমা করে দেন।’ [সহীহ ইবনে হিব্বান- হা.৫৬৬৫, সুনানে বাইহাকী- হা. ৩৮৩৩, সিলসিলাতুল আহাদিসিস সহীহাহ্ : ৩/৩১৫]
এ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত হচ্ছে যে, এ রাতে আল্লাহ তা’আলার পক্ষ থেকে মাগফিরাতের দ্বার ব্যাপকভাবে উন্মুক্ত করা হয়। কিন্তু র্শিকী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত ব্যক্তি এবং অন্যের ব্যাপারে হিংসা-বিদ্বেষপোষণকারী মানুষ এই ব্যাপক রহমত,মাগফেরাত ও সাধারণ ক্ষমা থেকে বঞ্চিত থাকে।
যদি শবে বারাআতের ব্যাপারে অন্য কোন হাদীস না-ও থাকতো, তবুও এই হাদিসটিই এ রাতের ফযীলত ও মর্যাদা প্রমাণ করার জন্য এবং এ রাতে মাগফিরাতের উপযোগী নেক আমলের গুরুত্ব প্রমাণিত হওয়ার জন্য যথেষ্ট হতো। তদুপরি দশজন সাহাবী থেকে শবে বারাআতের ফযীলত, মর্যাদা ও আমল সম্পর্কে হাদিস বর্ণিত হয়েছে। অবশ্য এর কোন কোনটির সনদ দুর্বল। আর এই সনদগত দুর্বলতার কারণে কেউ কেউ বলে দিয়েছেন, এ রাতের ফযীলত ভিত্তিহীন। কিন্তু মুহাদ্দিসগণ ও ফকীহগণের ফয়সালা হলো, কোন একটি হাদিস যদি সনদগতভাবে দুর্বল হয়, তারপর বিভিন্ন হাদিস দ্বারা তা সমর্থিত হয়, তাহলে এ সমর্থনের কারণে তার দুর্বলতা দূর হয়ে যায়। [প্রমাণ : ফাতহুল কাদীর : ১/৪৬৭, ইসলাহী খুতবাত : ৪/২৬৬]
প্রশ্ন : শবে বারাত সম্পর্কে চার মাযহাবের ইমামগণের মতামত কি? জানালে কৃতজ্ঞ থাকবো।
ইরশাদউল্লাহ, ফুলপুর, ময়মনসিংহ।
উত্তর : ফিকহে হানাফীর দৃষ্টিতে শবে বারাত : আল্লামা শামী, ইবনে নুজাইম, আল্লামা শরমবুলালী, শাইখ আব্দুল হক দেহলভী, হাকীমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী, মাওলানা আব্দুল হক লাখনভী, মুফতী মুহাম্মদ শফী রহ. শাইখুল ইসলাম মুফতী তাকী উসমানী দা.বা. সহ উলামায়ে হানাফীদের মত হলো, শবে বারাআতে শক্তি-সামর্থ অনুযায়ী জাগ্রত থেকে একাকীভাবে ইবাদত করা মুস্তাহাব। তবে এ জন্য জামা’আতবদ্ধ হওয়া যাবে না। [প্রমাণ : আদ-দুররুল মুখতার : ২/২৪-২৫, আল বাহরুর রায়িক : ২/৫২, মা সাবাতা বিস-সুন্নাহ : ৩৬, মারাকিল ফালাহ : ২১৯]
ফিকহে শাফেয়ী : ইমাম শাফেয়ী রহ. -এর মতে শা’বানের ১৫তম রাতে অধিক পরিমাণে দু’আ কবুল হয়ে থাকে। [প্রমাণ : কিতাবুল উম্ম : ১/২৩১] ফিকহে হাম্বালী : শাইখ ইবনে মুফলিহ হাম্বলী রহ. আল্লামা মানসূর আল বাহুতী এবং ইবনে রজর হাম্বলী রহ. প্রমুখ হাম্মলী উলামায়ে কিরামের নিকট শবে বারাআতে ইবাদত করা মুস্তাহাব। [্অল মাবদা : ২/২৭, কাশফুল কিনা : ১/৪৪৫, লাত্বায়িফুল মা’আরাফি : ১৫১]
ফিকহে মালিকী : ইবনে হাজ্ব মালিকী রহ. বলেন, সালফে সালিহীনগণ এ রাতকে যথেষ্ট সম্মান করতেন এবং এর জন্য পূর্ব থেকে প্রস্তুতি গ্রহণ করতেন। [আল মাদখাল : ১/২৯২]
শাইখ ইবনে তাইমিয়ার অভিমত : শাইখ আবুল আব্বাস আহমদ ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন, ‘পনেরো শাবানের রাতের ফযীলত সম্পর্কে একাধিক মারফু’ হাদিস ও আসারে সাহাবা দ্বারা বর্ণিত রয়েছে। এগুলো দ্বারা ওই রাতের ফযীলত ও মর্যাদা প্রমাণিত হয়। সালফে সালিহীনের কেউ কেউ এই রাতের নফল নামাযের ব্যাপারে যতœবান হতেন। আর শা’বানের রোযার ব্যাপারে তো সহীহ হাদিসসমূহই রয়েছে।’ [ইকতিযাউস সিরাতিল মুস্তাকিম : ২/৬৩১]
প্রশ্ন : আমাদের দেশে অনেক মেয়েলোক ট্যাবলেট খেয়ে মাসিক বন্ধ করে দেয়। এভাবে হায়েয বন্ধ করে রোযা পালন করা বা স্বামী-স্ত্রীর সহিত মেলামেশা করা শরীয়ত মুতাবিক জায়িয আছে কি? ট্যাবলেট খেয়ে মাসিক বন্ধ করা বৈধ কি-না?
ফারিহা ইয়াছমিন শান্তা, টাঙ্গাইল।
উত্তর : ট্যাবলেট খেয়ে হায়েয বন্ধ করে রোযা রাখলে রোযা হয়ে যাবে। ট্যাবলেট দ্বারা হায়েয বন্ধ হলে স্বামীর সাথে মেলামেশাও করতে পারবে। তবে মেয়েদের স্বাভাবিক অবস্থার বিরুদ্ধে এ নিয়মকে শরীয়ত পছন্দ করে না। কারণ, এর দ্বারা শরীরের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। তাই ট্যাবলেট না খাওয়াই উত্তম; বরং, হায়েয চালু থাকতে দিবে এবং পরবর্তীতে রোযা কাযা করে নিবে। মনে রাখবেন, এতে রমযানের রোযার সওয়াব কমবে না। [প্রমাণ : আলমগীরী : ১/৩৮, ১/১৯১, ফাতাওয়া রহীমিয়া : ৬/৪০৪]
প্রশ্ন : শবে বারাতের আমল কিভাবে করবো ?                                                        শফিকুল ইসলাম, মুক্তাগাছা, ময়মনসিংহ।
উত্তর : রাতে ইবাদত করা :  হযরত আলা ইবনে হারিস রহ. থেকে বর্ণিত, হযরত আয়িশা রা. বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ সা. নামাযে দাঁড়ান এবং এত দীর্ঘ সিজদা করেন যে, আমার ধারণা হয়, তিনি হয়তো মৃত্যুবরণ করেছেন। আমি তখন উঠে তাঁর বৃদ্ধাঙ্গুলি নাড়া দিলাম। তখন তাঁর বৃদ্ধাঙ্গুলি নড়লো। যখন তিনি সিজদা থেকে উঠলেন এবং নামায শেষ করলেন, তখন  আমাকে লক্ষ্য করে বললেন হে আয়িশা অথবা ও হুমাইরা! তোমার কি এ আশঙ্কা হয়েছে যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তোমার হক নষ্ট করবেন? আমি বললাম, তা নয়, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার দীর্ঘ সিজদা থেকে আমার আশঙ্কা হয়েছিলো, আপনি মৃত্যুবরণ করেছেন কিনা। নবীজী সা. জিজ্ঞেস করলেন, তুকি কী জানো, এটা কোন রাত? আমি বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সা. ভাল জানেন। রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করলেন, এটা হল অর্ধ শা’বানের রাত। আল্লাহ তা’আলা অর্ধ শা’বানের রাতে তার বান্দাদের প্রতি মনোযোগ দেন এবং ক্ষমা প্রার্থনাকারীদেরকে ক্ষমা করেন। অনুগ্রহ প্রার্থীদের প্রতি অনুগ্রহ করেন। আর বিদ্বেষ পোশণকারীদেরকে ছেড়ে দেন তাদের অবস্থাতেই। [বাইহাকী : ৩/৩৮২]
এ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত হলো, এ রাতে দীর্ঘ নফল নামায পড়া উত্তম, যাতে সিজদাও দীর্ঘ হবে । এছাড়াও এ রাতে কুরআন তিলাওয়াত, জিকির-আযকার ইত্যাদি আমল করা যায়।
প্রশ্ন : শবে বারা’আতের রোযা রাখার ব্যাপারে কোন হাদিস বা আয়াত আছে কি ? জানালো উপকৃত হবো।
আবু হাফসা, খিলক্ষেত নামাপাড়া, ঢাকা

উত্তর : পরদিন রোযা রাখা : হযরত আলী ইবনে আবু তালিব রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, ‘পনেরো শাবানের রাত (চৌদ্দ তারিখ দিবাগত রাত) যখন আসে, তখন তোমরা রাতটি ইবাদত-বন্দেগীতে কাটাও এবং দিনে রোযা রাখো। কেননা, এ রাতে সুর্যাস্তের পর আল্লাহ তা’আলা প্রথম আসমানে আসেন এবং বলেন, কোনো ক্ষমাপ্রার্থী আছে কি? আমি তাকে ক্ষমা করবো। আছে কি কোনো রিযিকপ্রার্থী? আমি তাকে রিযিক দেবো। এভাবে সুবহে সাদিক পর্যন্ত আল্লাহ তা’আলা মানুষের প্রয়োজনের কথা বলে তাদেরকে ডাকতে থাকেন। ’ [সুনানে ইবনে মাজাহ- হা. ১৩৮৪, বাইহাকী : ৩৮২৩]
এই রিওয়াতটির সনদ যঈফ। কিন্তু মুহাদ্দিসীনে কিরামের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হলো, ফাজায়িলের ক্ষেত্রে যঈফ হাদিস গ্রহণযোগ্য। তাছাড়া শা’বান মাসে বেশি বেশি নফল রোযা রাখার কথা বহু হাদিসে এসেছে এবং ‘আইয়ামে বীয’ তথা প্রতি চান্দ্রমাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে রোযা রাখার বিষয়টি সহীহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। [ইসলাহী খুতবাত : ৪/২৬৬]
প্রশ্ন : শবে বারাআতের রাত্রে ইবাদত কিভাবে করতে হবে বিস্তারিতভাবে জানালে উপকৃত হবো।
তাহমিদা আক্তার, ঝনঝনিয়া, বাসাইল, টাঙ্গাইল।
উত্তর : ইবাদত করতে হবে নির্জনে : এ বিষয়টি মনে রাখতে হবে যে, এ রাতের আমলসমূহ বিশুদ্ধ মতানুসারে সম্মিলিত নয়; নির্জনে একাকীভাবে করণীয়। পুরুষগণের জন্য ফরয নামায তো অবশ্যই মসজিদে আদায় করতে হবে। তারপর তারা এবং মহিলারা যা কিছু নফল পড়ার তা নিজ নিজ ঘরে একাকী পড়বেন। এসব নফল আমলের জন্য দলে দলে মসজিদে এসে সমবেত হওয়ার কোনো প্রমান হাদিসে নেই। আর সাহাবায়ে কিরামের যুগেও এর রেওয়াজ ছিলো না। [ইকতিযাউস সিরাতিল মুস্তাকিম : ২/৬৩১, মারাকিল ফালাহ : ২১৯]
তবে কোন ঘোষণা ও আহ্বান ছাড়া এমনিতেই কিছু লোক যদি মসজিদে এসে যান, তাহলে প্রত্যেকে নিজ নিজ আমলে মশগুল থাকবেন। একে অন্যের আমলে ব্যাঘাত সৃষ্টির কারণ হবেন না।
স্মার্তব্য যে, শাইখুল হাদিস মুফতী তাকী ইসমানী দা. বা. বলেন, ইমাম আযম আবু হানীফা রহ. বলেছেন, নফল ইবাদত এমনভাবে করবে যে, সেখানে কেবল তুমি আছো আর আছেন তোমার প্রভু প্রতিপালক। তৃতীয় কেউ নেই। সুতরাং যে কোন নফল ইবাদতের ক্ষেত্রেই শরীয়তের অন্যতম মূলনীতি হলো, তাতে জামা’আত করা মাকরূহে তাহরীমী ও নিষিদ্ধ। কারণ, আল্লাহ তা’আলা তো এই বলে আহ্বান জানান, তোমাদের মধ্যে ক্ষমাপ্রার্থী আছো কেউ, যাকে আমি ক্ষমা করে দেবো ? উল্লিখিত বাক্যটিতে ‘মুসতাগফির’ শব্দটি এক বচন ব্যবহার করা হয়েছে। এর মধ্যে ইঙ্গিত করা হয়েছে, বান্দা আল্লাহর দরবারে মাগফিরাত ও রহমত কামনা করবে একাকী, নির্জনে-নিভৃতে।’ [ইসলাহী খুতবাত : ৪/২৬৮]
প্রশ্ন : ‘মাসবুক’ যদি ইমামের সাথে শেষ বৈঠকে তাশাহহুদের পর দরূদ শরীফ পড়ে ফেলে, তাহলে একাকী অবশিষ্ট নামায শেষ করার পর সিজদায়ে সাহু দিতে হবে কি-না?
মাহবুব আলম, খুলশী, চট্টগ্রাম।
উত্তর : মুক্তাদী যদি ইমামের পিছনে কোন সাহু অর্থাৎ ভুল করে ফেলে তাহলে মুক্তাদীর জন্য সিজদায়ে সাহু ওয়াজিব হয় না। সুতরাং ‘মাসবুক’ (যে মুসল্লীর কিছু রাক’আত ছুটে গেছে) যদি ইমামের সাথে শেষ বৈঠকে দরূদ শরীফ পড়ে ফেলে তাহলে পরে একাকী নামায শেষে সিজদাযে সাহু আদায় করতে হবে না। [প্রমাণ : ফাতাওয়া শামী : ২/৮২, ফাতাওয়া দারুল উলূম : ৪/৪০৪]
প্রশ্ন : ফজরের নামাযের সুন্নাত যদি ফরজের পূর্বে পড়ার সময় না পাওয়া যায়, তাহলে সূর্য উদিত হওয়ার পর উক্ত সুন্নাত আদায় করা, না করা সম্পর্কে শরীয়তের বিধান কি?
আমিনুল ইসলাম, ঝালকাঠি, বরিশাল।
উত্তর : সূর্য উদিত হওয়ার পর হতে আরম্ভ করে সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে যাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত সময়ের মাঝে তা আদায় করা যাবে। তবে এ নামায নফল হিসেবে গণ্য হবে। [প্রমাণ ; হিদায়া : ১/১৫২]
প্রশ্ন : শবে বারাতের জন্য বিশেষ পদ্ধতির নামায বলতে কিছু ইসলামে আছে কি?
খুরশিদ আলম, উত্তরা, ঢাকা।
উত্তর :  এ রাতের কিছু ভিত্তিহীন কাজকর্ম : ইসলামে এ রাতের নামাযের বিশেষ কোন নিয়ম-নীতি নির্ধারিত নেই। যেমন- আমাদের সমাজে কেউ কেউ শবে বারাআতের জন্যে আলাদা পদ্ধতির নামায আছে বলে মনে করেন। তারা মাকসূদুল মুমিনীন নামক কিতাবের বরাত দিয়ে বলেন, এই নামাযের নিয়ম-নীতি ভিন্ন। যেমন- প্রথম রাকা’আতে অমুক সুরাহ পড়তে হবে, দ্বিতীয় রাক’আতে পড়তে হবে অমুক সূরাহ। এ জাতীয় কথা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। মনে রাখতে হবে, মাকসুদুল মুমিনীন -এর ওই বিশেষ পদ্ধতির নামায ও এর বর্ণিত রিওয়াতগুলো সবই অমুলক ও মউযূ। উক্ত কিতাবে কতগুলো একেবারে ভিত্তিহীন ও জাল রিওয়াত লিখে কোনটাতে মিশকাত, কোনোটাতে তিরমিযী, আবার কোনোটাতে বুখারী ইত্যাদির নাম লিখে দেয়া হয়েছে। অথচ এসব কিতাবে ওসব রিওয়ায়াতের নাম-নিশানা পর্যন্ত নেই এবং এগুলো ভিত্তিহীন ও বাতিল।
এসব পরিহার করে এই রাতে ব্যক্তিগত পর্যায়ে সাধারণ নফল নামাযের মতো নফল নামায পড়া উচিত। হাদিস দ্বারা শুধু এতটুকুই প্রমাণিত হয় যে, এ রাতের নফল হবে লম্বা, সিজদা হবে দীর্ঘ দীর্ঘ। দু’রাক’আত করে তবে মোট কত রাকাআত তা সংখ্যায় নির্দিষ্ট নেই। কোন নির্দিষ্ট সূরার সীমাবদ্ধতাও নেই। [মারাকিল ফালাহ : ২১৯]
উল্লেখ্য এই রাতে খিচুড়ি বণ্টন, হালুয়া রুটির প্রথা, মসজিদে আলোকসজ্জা করা ইত্যাদি নাজায়িয ও বিদ’আত কাজ। এগুলো শয়তানের ধোঁকা। মানুষকে আসল কাজ থেকে বিরত রাখার জন্য শয়তান এসব অযথা কাজকর্মে মানুষকে লাগিয়ে দেয়। এসব থেকে আমাদের দূরে থাকতে হবে।
প্রশ্ন : চুলকানীর রোগ থাকলে, নামাযের মধ্যে চুলকালে তার কি হুকুম?                                     শফিকুল ইসলাম, দুর্গাপুর, নেত্রকোনা।
উত্তর : যদি নামাযের মধ্যে চুলকানো এমন জরুরী হয় যে, চুলকানো ব্যতীত খুশু-খুজুই ঠিক থাকবে না, তাহলে১/২বার চুলকালে নামায মাকরূহ হবে না। আর যদি ৩বার এমনভাবে চুলকায় যে, প্রতি দুই বারের মাঝে এক রুকন (তিন তাসবীহ পরিমাণ) সময়ও বিরতি না হয়, তবে নামায নষ্ট হয়ে যাবে। [প্রমাণ : আহসানুল ফাতাওয়া : ৩/৪১৬]

প্রশ্ন : আমার জীবনে ছুটে যাওয়া নামাযগুলো কিভাবে আদায় করব? জানালে উপকৃত হব।
রফিকুল ইসলাম, সাতকানিয়া, চট্টগ্রাম।
উত্তর : ওয়াক্তিয়া ও জীবনের ছুটে যাওয়া নামায আদায় করার মধ্যে তেমন কোন পার্থক্য নেই। তবে নিয়তের বেলায় এভাবে বলবে যে আমার জীবনের প্রথম ফজর/যোহর/ আসর এর কাযা আদায় করছি। প্রত্যেক ওয়াক্তে এভাবে নিয়ত করতে থাকবে। কত দিনের কাযা পড়বে তার হিসাব করার নিয়ম হচ্ছে প্রথমে গভীর ভাবে চিন্তা করবে। চিন্তা করে নিজের প্রবল ধারণা অনুযায়ী কত বছর কতমাস হয় তার সিদ্ধান্ত করে নিবে। এরপর উক্ত হিসাবটা নোট করে নিবে এবং এ হিসাবকেই চূড়ান্ত হিসাব ধরে নিতে হবে। অতঃপর নিজের সুবিধা মত যখন যে নামাযের কাযা পড়ার সুযোগ হয় তাই পড়বে। তবে প্রত্যেক ওয়াক্তের সাথে ঐ ওয়াক্তের জীবনের ছুটে যাওয়া কাযা আদায় করা হিসাব রাখার জন্য সুবিধাজনক। কোন ওয়াক্ত ছুটে গেলে রাত্রে তা পুরা করে নিবে। এভাবে এক দিনে কমপক্ষে এক দিনের ছুটে যাওয়া নামাজের কাযা পড়ে নিবে। এভাবে সব নামায আদায় হয়ে গেলে ভাল। নতুবা যিন্দেগীর শেষ মুহূর্তে অবশিষ্ট নামাযের ফিদয়া দেয়ার অসিয়ত করে যাবে।
উল্লেখ্য: সুন্নাত নামাযের কাযা নেই।   [প্রমাণ :ফাতহুল বারী শরহে বুখারী, তাহাবী শরীফ, মারাকিল ফালাহ : ৩৬২-৩৬৩, ফাতাওয়া আলমগীরী : ১/৩০৩-৩০৪, হিদায়া : ১/১৫৫, হালবী কাবীর : ৫২৯, ফাতাওয়া শামী : ২/৬৮, দারুল উলূম : ৪/৩৩২, ইমদাদুল ফাতাওয়া : ১/৩৩৭, কিফায়াতুল মুফতী : ৩/৩৩৭]

পরামর্শ 

                                                    সৈয়দা সুফিয়া খাতুন

জিজ্ঞাসা : আপু, রোডে বের হলে বড় বড় সাইন বোর্ডে মেয়েদের মডেলিং ছবি দেখ যায়, এতে আমাদের মনে অনেক কু-চিন্তা জন্ম দেয়, তাতে কি কি ক্ষতি হতে পারে?
কামাল, মুন্সিগঞ্জ।
পরামর্শ :  বিরাট ক্ষতি। যেমন চোখের জিনা, মনের জিনা, গাড়ির ড্রাইভার যখন গাড়ি চালায় তখন তার চোখ ঐ মডেল কন্যাদের ছবির দিকে চলে যায় তাতে ড্রাইভার অন্য মনস্ক হয়ে যায় তখন এক্সিডেন্ট করতে পারে। এক্সিডেন্ট করলে দোষ হয় ড্রাইভারের। কিন্তু আসলে দোষ হল ঐ মডেল কন্যাদের। প্যাসেঞ্জারের অবস্থা হলো, যখন ঐ ছবির দিকে তাকায় তখন সে ভাবে এমন যৌবনবতী কন্যাকে যদি পেতাম, আমার বউ যদি এমন হতো, এরূপ নানান প্রশ্ন মনে জাগে। ঘরে গিয়ে স্ত্রী যখন সংসারের কাজ করতে করতে ক্লান্ত ও এলোমেলো হয়ে থাকে তখন তার স্ত্রীকে আর ভাল লাগেনা। তারপর যা হবার তাই হয়। পথচারীদের অবস্থা হলো, ছবির দিকে তাকিয়ে অন্যমনস্ক হয়ে নিজেও বলতে পারে না যে সে গাড়ির সাথে ধাক্কা খেল, না মানুষ কি জানোয়ারের সাথে ধাক্কা খেলো। ঐ মডেল কন্যাদের যে সৌন্দর্য এটা আসল সৈান্দর্য নয়। তারা মেকাপ গেটাপ ও ক্যামেরায় সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে থাকে। এটা শুধু চোখের সুন্দর, প্রকৃত সুন্দর নয়, প্রকৃত পক্ষে নিজের স্ত্রীরাই আসল সুন্দরী। আমার কথা হল যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ঐ ছবিগুলে নামিয়ে ফেলা উচিত। এই কবীরা গুনাহ থেকে নিজেও বাঁচো অন্যকেও বাচাও এবং জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করো। শুধু যে মডেল কন্যাদের বলবো তা নয়, মডেল বয়দেরকে-ও দেখা যাচ্ছে এরূপই বোর্ডে।
জিজ্ঞাসা :  আপু, এই মধুমাসে আম, লিচু খেতে ভয় লাগে। খেতে ইচ্ছে করে না। কারণ, এতে বিষ (ফরমালিন) মিশানো থাকে। তাই কি করি বুঝি না।                                                                        শারমিন আক্তার, ঢাকা।
পরামর্শ : আমরা সবাই মিলে যদি স্টাইক করি যে, আম, লিচু খাব না, তাহলে ওদের আক্কেল হবে। ওরা বেশি লাভ করতে গিয়ে যখন ভাতে মারা যাবে তখন বুঝবে। তারপর আর বিষ মিশাবেনা। যারা খাদ্যে বিষ মিশায় তারা মানুষ নামের কলংক; অমানুষ, জালিম। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া সকলের কর্তব্য। কারণ ওরা খুনি।
যারা খাদ্যে ভেজাল মিশ্রিত করে তাদের কাছে আমার প্রশ্ন, তোমাদের ছেলে-সন্তান আত্মীয়-স্বজন কি এই খাদ্য খাচ্ছে না! তাহলে কেন নিজের সন্তান, আত্মীয়-স্বজনদেরকে নিজেই হত্যার দিকে ঠেলে দিচ্ছ? সর্ব শ্রেষ্ট জাতি হিসেবে এক মানুষ কিভাবে অন্য মানুষের ক্ষতি করা সম্ভব!
ভেজাল খাদ্য খাওয়ার দ্বারা শরীরের কল-কব্জা, হাড় জোড়া ইত্যাদি নষ্ট হয়ে জীবন বিপন্ন হয়ে যায়। তাদের বেঁচে থাকা দায় হয়ে যায়। ডাক্তারের কাছে দৌড়ে অর্থকরী ও জীবন নষ্ট হয়ে যায়।
জিজ্ঞাসা : আপু, যারা সবসময় পাপ করে, আবার তাওবা করে তাদের তাওবা কি কবুল হবে?                                 সেলিনা, ফরিদপুর।
পরামর্শ : তওবা করার জন্য শর্ত হলো বান্দা এমনভাবে তওবা করবে যে, সে যে গুনাহ থেকে তওবা করছে সে গুনাহ আর কোন দিন করবে না। এখন যদি সে ঐ গুনাহ থেকে তওবা করে আবার গুনাহ করে আবার তওবা করে, আর এটা বার বার করতে থাকে তাহলে তো সেটা একরকম মশকরা করা হলো, তওবা হবে কি করে? এ তাওবা কারুন, নমরুদ বিপদে পড়লে  করতো আবার বিপদ চলে গেলে আগের মতই পাপ কাজে লিপ্ত হত। পরে তারা ধ্বংস হয়ে যায়।
জিজ্ঞাসা : আপু, আমার ছেলে আমাকে বাদ দিয়ে বউ, শশুর শাশুড়িকে বেশি ভালবাসে। আমার কাছে আসে না এতে করে আমার অনেক কষ্ট হয়, আমার এই কষ্ট আল্লাহ ছাড়া কাউকে বুঝাতে পারি না।
খাদিজা, ঢাকা।
পরামর্শ : বোন, আপনি আল্লাহর কাছে দোয়া করতে থাকুন মায়ের দোয়া বৃথা যায় না, একদিন আপনার সন্তান আপনার কাছেই ফিরে আসবে ইনশাআল্লাহ। আর যে সন্তান  মা-বাবা কে বাদ দিয়ে অন্যের মা বাবাকে ভালবাসে সে সন্তান ভুল পথে আছে। আল্লাহ তা’আলা কুরআন এবং হাদিসে মা-বাবাকে খুশি করার কথা বলেছেন শশুর শ্বাশুড়ির কথা বলেন নি। আল্লাহ তা’আলা বড়ই ন্যায় বিচারক। তারা উড়ে এসে জুড়ে বসেছে বসিয়াছে।  ওরে খোকা  তুমি যখন অসহায় ছিলে, জ্ঞানহীন ছিলে তখন তোমার বউ, শ্বাশুড়ি কোথায় ছিল?  ফিরে এসো মায়ের সন্তান মায়ের বুকে। মা-যে তোমার কাদে ধুঁেক ধুঁেক। তুমি যখন একদিন বাবা মা হবে তখন বুঝবে মায়ের কাছে সন্তানের কত মূল্য। মায়ের কাছে সন্তান অমূল্য ধন। তারা মা বাবার মত কোন সময় হতে পারবে না। স্বার্থের ব্যাঘাত ঘটুক তবেই দেখবে আসল চেহারা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight