জীবন-জজ্ঞিাসা

মীলাদের হুকুম ও তার উৎপত্তির ইতিহাস প্রসঙ্গে
আলমগীর হোসেন, পূর্ব রাজদিয়া, সিরাজদিখান।
প্রশ্ন : বর্তমানে যে মীলাদ ও কিয়াম করা হয় তা জায়িয আছে কি না?
যদি জায়িয থাকে তাহলে প্রমাণসহ জানতে চাই। আর যদি জায়িয না থাকে তাহাও দলীল-প্রমাণ দ্বারা জানতে চাই। মীলাদ-কিয়াম সাহাবারা করেছেন কি-না এবং বর্তমানে যে মীলাদ কিয়াম হয়ে থাকে তা কোথা থেকে কার থেকে সূচনা হয়েছে জানতে ইচ্ছুক। আর যদি ইজমা-কিয়াস দ্বারা সাবেত থাকে তা জানাবেন।
উত্তর : মীলারে শাব্দি অর্থ জন্ম। মীলাদুন্নবী মাহফিল এর উদ্দেশ্য নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জন্ম বৃত্তান্ত আলোচনা। মীলাদের উদ্দেশ্য যদি এই হয় যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জীবনী আলোচনা করা এবং শেষে প্রত্যেকে দরূদ পড়ে দুআ করে নেয়া , তাহলে এতে শরীয়তের দৃষ্টিতে কোন অসুবিধা নেই। দরূদ শরীফ দাড়ানো বসা ও শোয়া সর্বাবস্থায় পড়া জায়িয। এমনকি বিনা উযুতেও দরূদ শরীফ পড়তে কোন অসুবিধা নেই।
কিন্তু আমাদের দেশে মীলাদ ও কিয়াম সাধারণত যে নিয়মে হয়ে থাকে, তাওয়াল্লুদ, কিয়াম কতগুলি আজগুবি বাংলা, উর্দূ, ফার্সী কবিতা গাওয়া ‘ইয়ানবী সালামু আলাইকা’ ধরনের শাব্দিক ও অর্থগত ভুল দরূদ সালাম পাঠ করা ইত্যাদি তা বিভিন্ন দিক দিয়ে অত্যন্ত আপত্তিকর এবং কুরআন, হাদীস, ইজমা ও কিয়াসের নীতি বহির্ভূত।
হিজরী ষষ্ঠ শতাব্দী পর্যন্ত প্রচলিত মজলিসে মীলাদের কোন অস্তিত্ব ছিল না। ৬০৪ হিজরীতে ইরবিলের ফাসিক বাদশাহ আবূ সাঈদ মুযাফ্ফারুদ্দীন কুকুরী আবুল খাত্তাব উমর ইবনে দিহয়া নামক জনৈক দরবারী আলেম দ্বারা রাজকীয় ব্যবস্থাপনায় প্রথম মীলাদ মাহফিলের ইন্তেজাম করে। এ থেকেই প্রচলিত মাহফিলে মীলাদের সূত্রপাত। দ্রষ্টব্য: ওয়াফায়াতুল আ’য়ান, ৪:১১৭।
সে সময় থেকেই হক্কানী উলামায়ে কিরাম এ বিদ’আতের প্রতিবাদে কিতাবাদী রচনা করতে থাকেন। এর প্রতিবাদে আরবী, ফার্সী, উর্দূ ও বাংলা প্রতিটি ভাষায় কিতাবাদী রচিত হয়েছে। প্রচলিত মীলাদ মাহফিল সম্পর্কে আল্লামা আবদুর রহমান মাগরিবী রহ. লিখেন, প্রচলিত মীলাদ মাহফিল অনুষ্ঠিত করা নিঃসন্দেহে বিদ’আত। কেননা, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উক্ত কাজের নির্দেশ দেননি বা তিনি তা করেননি। এমনিভাবে খুলাফায়ে রাশেদীন, সাহাবাগণ রা. আইম্মায়ে মুজতাহিদীনও তা করেননি। [আশশির‘আতুল ইলাহিয়্যা ২৫৩ পৃ]
আল্লামা আহমদ বিন মুহাম্মদ মিসরী রহ. লিখেন মাযহাব চতুষ্টয়ের উলামাগণ এ কাজ তথা মাহফিলে মীলাদের জঘন্যতার উপর একমত পোষণ করেন। [রাহে সুন্নাত ২৫৩ পৃঃ]
বিশেষত উলামায়ে কিরাম এ কাজকে এজন্য বিদআত বলেছেন যে, যে কাজ দীন বলে প্রমাণিত নয় এমন কাজকে দীনে অনুপ্রবেশ করানো তথা সাওয়াবের কাজ বলে মনে করা মারাত্মক অপরাধ। তা বিদআত ও অবশ্য বর্জনীয়। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যদি কেউ আমার এই দীনের মধ্যে এমন কোন কিছু আবিষ্কার করে ও তা দীনে প্রবেশ করায় যা দীনের কাজ নয়, তাহলে সে কাজ হবে প্রত্যাখ্যাত। কিছুতেই তা গ্রাহ্য হবে না। [বুখারী ও মুসলিম শরীফ, মিশকাত শরীফ, ২৭ পৃঃ]
উল্লেখ্য যে, অনেক মীলাদে কিয়ামও করে থাকে। মীলাদে এই কিয়াম কেন করা হয় এ ব্যাপারে কারো কারো বিশ্বাস এই যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐ মাহফিলে উপস্থিত হন। তাই তাঁর সম্মানার্থে কিয়াম করা হয়। এ ধারণা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং এতে শিরকের আশংকা রয়েছে।
আবার কেউ কেউ বলে থাকেন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জন্ম আলোচনার সম্মানার্থে কিয়াম করে থাকে। একাথাটি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। কেননা, যদি তাই হয়ে থাকে, তাহলে যখন ওয়াজের মাহফিলে হাদীস তাফসীর পড়া-ও পড়ানোর সময় ঘন্টার পর ঘন্টা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জন্ম বিষয়ক আলোচনা করা হয়, তখন কোন কিয়াম করা হয় না? তখন কি সম্মান প্রদর্শনের প্রয়োজন থাকে না? তাই প্রচলিত মীলাদ ও কিয়াম নাজায়িয ও বিদআত। যে কোন কাজ তখনই গ্রহনযোগ্য হয় যখন তা শরীয়ত সমর্থিত পন্থায় তথা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক প্রবর্তিত তরীকা মুতাবেক হয়। আর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর তরীকা মুতাবেক না হলে তা অগ্রাহ্য ও বাতিল বলে গণ্য হবে। [ই’তিসাম, ১:১১৪# তালবীসে ইবলীস, পৃঃ ৯,# আল-ফাতহুর রব্বানী, ১:১৪# তাফসীরে কবীর, ৮: ২৪৩]
 
আযান ও নামাযে মাইক বা লাউড স্পিকারের ব্যবহার প্রসঙ্গে
উমর ফারুক, বারহাট্টা রোড, নেত্রকোনা।
প্রশ্ন : আযান ও নামাযে মাইক ব্যবহার করা কুরআন ও হাদীসের আলোকে কতটুকু সহীহ?
উত্তর: নামায যেহেতু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত, তাই উক্ত ইবাদতকে সুন্নাত তরীকা মুতাবিক সাদাসিধেভাবে আদায় করাই বাঞ্ছনীয়। এ কারণে বর্তমানে মুফতীগণ বিনা প্রয়োজনে ছোট জামা’আতে নামাযে মাইক ব্যবহার করাকে খেলাফে আওলা বলে আখ্যায়িত করেছেন। তবে বড় জামা’আত হলে নামাযে মাইক ব্যবহার করা যায়। এতে কোন অসুবিধা নেই। তেমনিভাবে আযানের এক উদ্দেশ্য হল আওয়ায দূরে পৌঁছানো। তাই মাইকে আযান দেওয়াতেও কোন অসুবিধা নেই। [ফাতাওয়ায়ে শামী, ১:৫৮৯# ইমদাদুল ফাতাওয়া, ১:৮৪৫# ফাতাওয়ায়ে রহীমিয়া, ১:৯০-৯৪]
 
পেট হতে অতিমাত্রায় গ্যাস বের হলে করণীয় প্রসঙ্গে
জুনাইদ, নন্দীবাড়ী, (মধ্যপাড়া), মুক্তাগাছা।
প্রশ্ন : আমি ইস্তিঞ্জা করার পর উযু করে নামায পড়তে দাঁড়াই, কিন্তু বার বার গ্যাস বের হওয়ায় আমি বারবার উযু করতে বাধ্য হই। কিন্তু সবসময় উযু করা সম্ভব হয় না। একবার উযু করার পর বারবার গ্যাস বের হয়। এতে আমার করণীয় কি? বিস্তারিত জানালে উপকৃত হব।
উত্তর : যদি নামাযের ওয়াক্ত হওয়ার পর পূর্ণ এক ওয়াক্তই আপনার এই অবস্থা থাকে এবং এতটুকু সময় না পাওয়া যায়, যে সময় আপনি উক্ত ওয়াক্তের ফরয ও ওয়াজিব নামায আদায় করতে পারেন, তখন আপনাকে শরীয়তের ভাষায় মাযূর বলা হবে। আর মাযূরের হুকুম হল, প্রত্যেক নামাযের ওয়াক্ত হওয়ার পর নতুনভাবে উযু করে নামায আদায় করতে হবে এবং যতক্ষণ ঐ ওয়াক্ত থাকে, গ্রাস বের হওয়ার কারণে উযু নষ্ট হবে না। সুতরাং ওয়াক্তের মধ্যে ঐ উযু দিয়ে সব ধরনের নামায পড়তে পারবেন এবং এক ওয়াক্ত চলে গেলে ঐ ওয়াক্তের উযু দ্বারা অন্য ওয়াক্তের কোন নামায আদায় করা যাবে না। উল্লেখ্য যে, উপরিউক্ত মাসআলা তখন প্রযোজ্য হবে, যখন সঠিকভাবে জানা যায় বা দৃঢ় বিশ্বাস হয় যে, সত্যিই তার গ্যাস বের হয়ে থাকে। আর তা জানার পদ্ধতি হল আওয়াজ শুনতে পাওয়া বা দুর্গন্ধ পাওয়া বা অন্য কোনভাবে তার দৃঢ়বিশ্বাস হওয়া যে, ঠিকই তার গ্যাস বের হয়। অন্যথায় যদি শুধু বাতাস বের হওয়ার মত মনে হয় এবং সন্দেহ হয় তাহলে শুধু সন্দেহের ভিত্তিতে এদিকে ভ্রুক্ষেপ না করা উচিত, বরং এই অবস্থায় সময় মত শান্তভাবে নামায পড়ে নিবেন। কেননা, এধরনের অবস্থা কোন কোন সময় শয়তানের পক্ষ থেকে হয়ে থাকে যা নিছক ওয়াসওয়াসা বা কুমন্ত্রণা ছাড়া কিছুই নয়। কেননা, শয়তান মানুষকে আল্লাহ তাআলা থেকে দূরে সরানোর জন্য এ ধরনের অনেক কিছু করে থাকে। এখন আপনি আপনার অবস্থা অনুযায়ী মাযূর কিনা তা ঠিক করে নিন। বাস্তবে যে অবস্থা হয়, সে অনুযায়ী আমল করতে পারেন। [মিশকাত শরীফ, ১:৪০# আদ্দুররুল মুখতার, ১:৩০৬# হালবী কবীর, ১:১৩৩# হিদায়া, ১:৬৭-৬৯]
 
বিবাহের জন্য পাত্রী দেখার নিয়ম প্রসঙ্গে
আফওয়ান আহমেদ, গুনই, বানিয়াচং, হবিগঞ্জ।
প্রশ্ন : মেয়ে দেখে পছন্দ হলে, বিবাহ করবে এবং পছন্দ না হলে বিবাহ করবে না, এরূপ মানসিকতা নিয়ে কোন ছেলে কোন মেয়েকে দেখা ও তার সাথে কথা বলা শরীয়তের দৃষ্টিতে জায়িয কি না? জানিয়ে বাধিত করবেন।
উত্তর : বিয়ের আগে শরীয়তসম্মত ভাবে কনে দেখতে হলে, তার নিয়ম এই যে, প্রথমে দ্বীনদারী ও আনুসাঙ্গিক অন্যান্য বিষয়ে মনঃপূত হওয়ার পর শুধু দেখা অবশিষ্ট রেখে পছন্দের ভিত্তিতে বিয়ের ইরাদা করে নিতে হবে। অতঃপর বর নিজেই বেশি জানাজানি না করে কোন বাহানা বা সুযোগে মেয়েকে দেখে নিবে। অথবা নিজের নির্ভরযোগ্য কোন মহিলাকে পাঠিয়ে খবর জেনে নিবে। এছাড়া অন্য কোন পুরুষের জন্য বরের পক্ষে কনে দেখা শরীয়ত সিদ্ধ নয়। চাই বরের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় যেমন, পিতা কিংবা অন্য কেউ হোন না কেন। তাদের কেউ বরের পক্ষে কনে দেখলে, অবশ্যই তাকে গুনাহগার হতে হবে। আনুসাঙ্গিক সকল বিষয় অবগত হওয়ার পর বরের জন্য বিয়ে করার পুরোপুরি ইচ্ছা করার পর কোন বাহানায় মেয়েকে দেখা শরীয়তে অনুমতি আছে। কনে দেখার পর যদি অনিবার্য কোন কারণে সে বিয়ে অনুষ্ঠিত না হয়, তবে বরকে গুনাহগার হতে হবে না। কিন্তু বিয়ে না করার প্রত্যয় নিয়ে যদি বিয়ে করবো এমন বাহানায় কোন নারীকে শুধু দেখার সুযোগ গ্রহণ করে আত্মতৃপ্তি লাভ করে, তাহলে অবশ্যই তাকে এহেন জঘন্য কর্মের দায়ে গুনাহগার হতে হবে। উল্লেখ্য, বিয়ের আগে জীবনসঙ্গীনীকে কোন বাহানায় এক নযর দেখে নেয়া শরীয়তে মুস্তাহাব, জরুরী নয়। অবশ্য বিভিন্ন দেশে ঘটা করে মেয়ে দেখার যে পদ্ধতি চালু আছে, এটা শরীয়তে প্রমাণিত নয়। মোদ্দাকথা, শরীয়তে কোন বাহানায় দেখা প্রমাণিত আছে। কিন্তু প্রচলিত নিয়মে দেখা বা দেখানোর প্রমাণ শরীয়তে নেই।
কারণ, এভাবে ঘটা করে দেখানোর পর যদি কোন কারণবশত বিবাহ না হয়, তাহলে ঐ মেয়েকে বিবাহ দেয়া রীতিমত বিপদ হয়ে দাঁড়ায়। পরবর্তী সময়ে অন্যেরা মেয়ের ব্যাপারে নানা রকম সন্দেহের মধ্যে পড়ে।
[ফাতাওয়া মাহমুদিয়া,৩:২১২# মুসলীম শরীফ,১:৪৫৬# আবুু দাঊদ শরীফ, ১:২৮৪]
 
পায়ের গিরা ঢেকে পোশাক পরিধান প্রসঙ্গে।
জাকারিয়া হারুন, মুক্তাগাছা ময়মনসিংহ।
প্রশ্ন: (ক) উপর থেকে লুঙ্গি, পায়জামা, প্যান্ট এবং নীচ থেকে মোজার দ্বারা পায়ের টাখনু ঢাকা নাজায়িয। এই বাক্যটি কি শরীয়ত সম্মত? বাংলাদেশের মানুষ যে সকল মোজা পরিধান করে তাতে পায়ের গিরা ঢেকে যায়। এভাবে গিরা ঢাকলেও কি গোনাহ হবে?
উত্তর: সর্বাবস্থাতেই লুঙ্গি, পায়জামা, সেলোয়ার, প্যান্ট, জুব্বা, আবা-কাবা ইত্যাদি উপরের দিক থেকে টাখনুর নীচে ঝুলিয়ে পরা হারাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, কিয়ামতের দিবসে আল্লাহ তাআলা ঐ ব্যক্তির প্রতি (রহমতের) নজর করবেন না, যে লুঙ্গি বা কোন কাপড় টাখনুর নীচে পরিধান করে। তবে মোজা দ্বারা পায়ের টাখনু ঢাকা নাজায়িয, এ কথা ঠিক নয় বা শরীয়ত সম্মত নয়। কারণ হাদীস শরীফে আছে যে, স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মোজা পরিধান করেছেন। আর সে মোজা অবশ্যই টাখনু আবৃত করে নিত। এ কারণে, এমন মোজা ও জুতা পরিধান করা, যা দ্বারা নীচের দিক থেকে টাখনু ঢেকে যায়, তা সর্বসম্মতিক্রমে জায়িয। এতে কারো কোন দ্বিমত নেই। সুতরাং, এ নিয়ে কোনরূপ বিতর্ক সৃষ্টি করা ঠিক হবে না। বরং, দ্বীনের মধ্যে নতুন হুকুম আবিষ্কার বলে গণ্য হবে। [বুখারী শরীফ, ২: ৮৬১-৮৬৩, আবু দাউদ শরীফ, ২: ৫৬৬]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight