জীবনজিজ্ঞাসা

মুহাম্মাদ সামিউল হক, মীরপুর, ঢাকা
প্রশ্ন: কুফর এবং শিরক কাকে বলে? দু’টি একই বিষয় নাকি দু’টির মাঝে কোনো পার্থক্য আছে? পার্থক্য থাকলে কি কি? বিস্তারিত জানাবেন।
উত্তর: কুফল হলো, অকাট্য প্রমাণ দ্বারা সাব্যস্ত শরী‘আতের কোনো বিষয়কে অস্বীকার করা। আর শিরক হলো, আল্লাহ তা‘আলার একত্ববাদকে অস্বীকার করা। তার সত্ত্বা ও গুণাবলীতে অংশীদারিত্ব সাব্যস্ত করা। এ হিসেবে সকল শিরকই কুফর। কিন্তু সকল কুফর শিরক হওয়া জরুরী নয়। এই পার্থক্য পারিভাষিক অর্থ বিবেচনায়। বাকী পরিণামের দিক থেকে দু’টির মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। কারণ শিরক ও কুফর কোনোটিই আল্লাহ তা‘আলা কখনো মা করবেন না। উভয় অপরাধে অপরাধীরা চিরকাল জাহান্নামে থাকবে। সেখান থেকে কখনো মুক্তি পাবে না।- আল-মাউসূ‘আতুল ফিকহিয়্যাহ: ৩৫/১৪, হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ: ১/১৮৪, আল-জামি‘উ লি আহকামিল কুরআন লিল কুরতূবী: ৫/১১৮, ফাতাওয়া মাহমূদিয়া: ১/২৭৬, কিতাবুল ফাতাওয়া: ১/২৮০।
মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম, ফুলবাড়ীয়া, মোমেনশাহী
প্রশ্ন: বিদ‘আতে হাসানা কি কি? কেউ যদি বিদ‘আতে হাসানার কোনো কাজকে দ্বীনের অন্তর্ভূক্ত গণ্য করে সম্পাদন করে, তাহলে তার গুনাহ হবে কিনা?
উত্তর: মুহাক্কিক উলামায়ে কিরামের মতে প্রকৃতপে বিদ‘আতে হাসানা বলতে কোনো বিদ‘আত নেই। যারা তা বলেন, তারাও তা পারিভাষিক বা শরয়ী সংজ্ঞার দৃষ্টিকোণ থেকে বলেন না। বরং আভিধানিক অর্থ তথা নব উদ্ভাবিত হিসেবে বলেন, নতুবা বিদ‘আতের শরয়ী বা পারিভাষিক যে সংজ্ঞা রয়েছে, তার অন্তুর্ভূক্ত সকল বিদ‘আতই ঘৃণিত ও মারাত্মক গুনাহের কাজ। কেননা “নবী কারীম (সা.)- এর জীবদ্বশায়, সাহাবায়ে কিরাম (রা.)- এর যুগে এবং তাবিয়ীন ও তাবে তাবিয়ীনদের (রাহ.) সময় যা ছিলো না, এমন কোনো কাজকে কুরআন-হাদীসের দলীল ছাড়া দ্বীনের অন্তর্ভূক্ত গণ্য করে সাওয়াবের নিয়্যাতে করাকে” পারিভাষিক অর্থে বিদ‘আত বলা হয়। আর এই অর্থের কোনো বিদ‘আত হাসানা তথা ভালো হতে পারে না। অবশ্য আভিধানিক অর্থে অনেক বিদ‘আত এমন আছে, যা হাসানা তথা ভালো হিসেবে গণ্য। যেমন: মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করা, খানকাহের কার্যক্রম পরিচালনা করা ইত্যাদি। এগুলো শরয়ী পরিভাষায় বিদ‘আত নয়।- বুখারী শরীফ: ১/২৬৯, মেরকাত শরহে মেশকাত: ১/২১৬, ফাতাওয়া শামী: ১/৫৬০, বারাহীনে কাতি‘আহ: পৃষ্ঠা-৪৭, ফাতাওয়া হাক্কানিয়া: ২/৪২।

মুহাম্মাদ দিলাওয়ার হুসাইন, নবীনগর, বি-বাড়ীয়া
প্রশ্ন: বই-পুস্তকের শুরুতে অনেক লিখক বইটি তাদের জীবিত-মৃত প্রিয়জনদের নামে উৎসর্গ করার কথা লিখে থাকেন। উৎসর্গের ভাষা একেকজনের একেক রকম। কেউ কেউ অতি সংেেপ এরূপ লিখেন, “অমুকের দস্ত মুবারকে”। আবার অনেকে “অমুকের কমদ মুবারকে”ও লিখেন। এভাবে পুস্তক উৎসর্গ করার ব্যাপারে শরয়ী বিধান কি? কোনো কোনো আলিম বলছেন, এটি নাজায়িয। জায়িযও বলছেন অনেকে।
উত্তর: বই পুস্তক উৎসর্গ করার প্রচলিত রীতি ঠিক নয়। কেননা, দ্বীনি বই-পুস্তক লিখা অবশ্যই একটি সাওয়াবের কাজ। তাই কোনো বই পুস্তক “অমুকের দস্ত মুবারকে”, “অমুকের কদম মুবারকে” পেশ করা অর্থহীন। বরং কদমে উৎসর্গ করা বেয়াদবীও বটে। উপরন্তু এর দ্বারা যার নামে উৎসর্গ করা হয়, তিনি কোনো সাওয়াবের অধিকারী হন না। পান্তরে লেখকগণ যদি তাঁদের জীবিত-মৃত প্রিয়জনদের আমলনামায় লিখিত বইয়ের সাওয়াব উৎসর্গ করেন, তাহলে যতোদিন উক্ত বইয়ের পঠন-পাঠন বাকী থাকবে, ততোদিন তাঁদের আমলনামায় উক্ত নেক আমলের সাওয়াব পৌঁছতে থাকবে।- ফাতাওয়া শামী: ২/২৪৩, হিদায়া: ১/২৬৩, বাদায়িউস সানায়ি’: ২/২১২, আল-বাহরুর রায়িক: ৩/৫৯।
মুফতী শহীদুল্লাহ, কেরাণীগঞ্জ, ঢাকা
প্রশ্ন: আমি হিফজ পড়ার সময় একখানা কুরআন শরীফ কিনেছিলাম। সেই কুরআন শরীফ দিয়েই হিফজ শেষ করি এবং যথাযথ সম্মানের সাথে সংরণ করি। বর্তমানেও আমার নিকট সেটি সংরতি আছে এবং উক্ত কুরআন শরীফ দেখে এখনো তিলাওয়াত করি। কুরআন শরীফটি অনেক পুরাতন ছাপায় হওয়ার কারণে বর্তমানের কোন ছাপার সাথে এর মিল নেই। কুরআন মাজীদটির প্রতি আমার অন্তরে এতো মহব্বত জন্মেছে যা ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব। তাই আমার মন চাচ্ছে, আমার ইন্তিকালের পর দাফনের সময় উক্ত কুরআন শরীফ খানাটিকে আমার বুকের সাথে বেঁধে দেয়ার জন্য বলে যেতে। এটা শরী‘আতের দৃষ্টিতে জায়িয হবে কিনা, জানিয়ে বাধিত করবেন।
উত্তর: মাইয়্যিতের কপালে, বুকে, কাফনের কাপড়ে কোথাও কালি অথবা চিহ্ন হয় এমন কিছু দ্বারা কালিমা ও কুরআনে কারীমের কোনো আয়াত লিখা জায়িয নেই। এমনিভাবে দাফনের সময় মাইয়্যিতের সাথে সরাসরি কুরআন শরীফ দেয়াও নাজায়িয। কাজেই আপনার জন্য প্রশ্নোক্ত কথা বলে যাওয়া ঠিক হবে না। বলে গেলেও আপনার ওয়ারিশদের জন্য তা বাস্তবায়ন করা জায়িয হবে না।- আহসানুল ফাতাওয়া: ১/৩৫১, ৪/২২০, ফাতাওয়া শামী: ২/২৪২, ২৪৭।

মুহাম্মাদ জামাল হুসাইন, চরফ্যাশন, ভোলা
প্রশ্ন: বর্তমানে রোগীর শরীরে অন্যের দেহের রক্ত পোশ করা স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে অপারেশনের রোগীর েেত্র রক্ত দেয়া অনেকটা অপরিহার্য বিষয়। লোকজন মহৎ কাজ মনে করে স্বেচ্ছায় রক্ত দিতে এগিয়ে আসে। এ রক্তদান কার্যক্রমের ব্যাপারে শরয়ী বিধান কী? কারো দেহে অপরের রক্ত পোশ করার পর তাদের মাঝে এমন রক্তিয় সম্পর্ক স্থাপন হয়ে যায় কি না যদ্বারা উভয়ের মাঝে বিয়ে অবৈধ হয়ে যায়?
উত্তর: কারো দেহে রক্তের একান্ত প্রয়োজন দেখা দিলে তাকে রক্ত দেয়া জায়িয আছে। তবে কোনো অবস্থাতেই রক্ত বিক্রি করা বা রক্ত দিয়ে বিনিময় গ্রহণ করা জায়িয নেই। অবশ্য যথাসাধ্য চেষ্টা করেও বিনিময় ছাড়া রক্ত পাওয়া না গেলে একান্ত প্রয়োজনে বিনিময় দিয়ে হলেও রক্ত গ্রহণ করা জায়িয আছে। আর এর মাধ্যমে দু’জনের মাঝে রক্তের কোনো সম্পর্ক স্থাপন হয় না বিধায় তাদের মাঝে এ কারণে বিয়ে হারাম অবৈধ হয় না।- ফাতাওয়া আলমগীরী: ৫/৩৫৫, জাওয়াহিরুল ফিক্হ: ২/৩৮, ৪০, জাদীদ ফিকহী মাসায়িল: ১/৩২২, আফকে মাসায়িল আওর উনকা হল: ৪/১৭৪, কিফায়াতুল মুফতী: ৯/১৫৬।

মুহাম্মাদ শহীদুল ইসলাম, গফরগাঁও, মোমেনশাহী
প্রশ্ন: সরকার অনেক সময় রাস্তা ও সরকারী বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের জন্য জনগণের ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি একোয়ারের মাধ্যমে সরকারী করণ করে থাকে। অনেকে অসন্তুষ্টিচিত্তে সরকারকে জমি প্রদান করে। সরকার কর্তৃক এভাবে জনগণ থেকে জমি অধিগ্রহণের ব্যাপারে শরয়ী দৃষ্টিভঙ্গী কী?
উত্তর: রাষ্ট্রের একান্ত প্রয়োজনে সরকার জনগণ থেকে তাদের মালিকানাধীন জমি অধিগ্রহণ করা শরয়ী দৃষ্টিতে জায়িয আছে। তবে অবশ্যই জনগণের জমির ন্যায্য মূল্য প্রাপ্তি সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে। জনগণ তিগ্রস্ত হলে তিপূরণ প্রদান করতে হবে। নামমাত্র মূল্যে তা করা জায়িয নেই। এমনিভাবে বিভিন্ন স্তরে দায়িত্বপ্রাপ্তদের উৎকোচ, সেলামী, কমিশন প্রভৃতি গ্রহণের কারণে জনগণের হাতে জমির ন্যায্য মূল্য থেকে কম পৌঁছলে, তাও জায়িয হবে না। কেননা ন্যায্য মূল্য না পাওয়ার কারণে এতে জনগণের সন্তুষ্টি থাকে না। এ সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন, “হে ঈমানদারগণ! তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না এবং জনগণের সম্পদের কিয়দাংশ জেনে-শুনে পাপ পন্থায় আত্মসাৎ করার উদ্দেশ্যে শাসকবর্গের হাতে তুলে দিও না।”- সূরা বাকারা: ১৮৮, ফাতাওয়া শামী: ৪/১৮১, জাওয়াহিরুল ফাতাওয়া: ১/৬৬২।
মুহাম্মাদ শহীদুল ইসলাম, গফরগাঁও, মোমেনশাহী
প্রশ্ন: কোনো সরকার জনগণের ইচ্ছের বিরুদ্ধে নামমাত্র মূল্যে তাদের জমি রাষ্ট্রীয় মালিকানায় নিয়ে অযথা ফেলে রাখলে কিংবা তাতে কোনো কাজ করে ফেললে, পরবর্তীতে আসা নতুন সরকারের করণীয় কী? নতুন সরকারের উপর জনগণের জমি তাদেরকে ফেরত দেয়া জরুরী কিনা বিস্তারিত জানাবেন।
উত্তর: পূর্ববর্তী সরকার কোনো জুলুম অন্যায় করে থাকলে তা সংশোধন করা পরবর্তী সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ও কর্তব্যের অন্তর্ভূক্ত। কাজেই পূর্বের সরকার কর্তৃক নামমাত্র মূল্যে রাষ্ট্রীয় করণ করা জনগণের জমি যদি রাষ্ট্রের একান্ত প্রয়োজন হয়, তাহলে পরবর্তী সরকার জনগণকে সন্তুষ্ট করার পদপে নিবে। এ জন্য সরকারকে জমির ন্যায্য মূল্য জনগণের হাতে পৌঁছানোর সুব্যবস্থা করতে হবে। আর যদি এসব জমি রাষ্ট্রের প্রয়োজন হয়, তাহলে সেগুলো জনগণকে ফেরত দিয়ে পূর্বে জনগণকে দেয়া অর্থ ফেরত নিতে হবে।- সূরা হজ্জ: ৪১

মুহাম্মাদ সাখাওয়াতুল্লাহ, বাউফল, পটুয়াখালী
প্রশ্ন: জনৈক শিল্পপতি তার শিল্প প্রতিষ্ঠানের এলাকাতে একটি মসজিদ নির্মাণ করে যান এবং ভবিষ্যত প্রয়োজনের দিকে ল্য রেখে মসজিদের চতুর্দিকে খালি জায়গা রেখে দেন যাতে প্রয়োজনে ইমাম-মুয়াজ্জিনের জন্য বাসা নির্মাণ করা যায়। তিনি মারা যাওয়ার পর তার ছেলেরা মসজিদ এবং মসজিদের চতুর্দিকের খালি জায়গাও প্রতিষ্ঠানের মোট জমির মধ্যে গণ্য করে প্রতিষ্ঠানের সাথে বিক্রি করে দিয়েছে। তাদের এ বিক্রি সহীহ হয়েছে কিনা? উল্লেখ্য ছেলেদের বক্তব্য হলো, দলীলের মধ্যে মসজিদের নামে ওয়াকফ করা আলাদা কোনো জমি নেই।
উত্তর: কোনো স্থান মসজিদ হিসেবে প্রসিদ্ধ হওয়া, ইমাম-মুয়াজ্জিন নির্ধারিত থাকা, দীর্ঘদিন যাবত সরকারী-বেসরকারী লোকদের নামায আদায় করা এবং মসজিদের হেফাজত-সংরণ ও পরবর্তী প্রয়োজনের জন্য মসজিদের আশপাশের আরো কিছু জায়গাসহ মসজিদের একটি এলাকা নির্ধারিত থাকা এ কথার মজবুত স্যা দান করে যে, এটি একটি ওয়াকফকৃত শরয়ী মসজিদ। মসজিদ হওয়ার জন্য ওয়াকফ দলীলের প্রয়োজন নেই। মৌখিক ও কার্যতঃ সাীই যথেষ্ট। সুতরাং প্রশ্নোক্ত মসজিদ ও তৎসংশ্লিষ্ট জায়গা শরী‘আতের দৃষ্টিতে মসজিদের জায়গা হিসেবে গণ্য হবে। এর কোনো তি সাধন করা কিংবা তা বেচাকেনা করা সম্পূর্ণরূপৈ অবৈধ ও হারাম। মসজিদের ওয়াকফনামা দলীল না থাকলেও এবং স্থানটি ওয়াকফকৃত কিনা তা নিশ্চিতভাবে জানা না থাকলেও বর্ণিত স্থান মসজিদের বিবেচিত হওয়াতে কোনো বাধার সৃষ্টি হবে না। কেননা, উক্ত স্থান মসজিদের হওয়ার ব্যাপারে কোনো প্রত্যদর্শীর কোনোরূপ সন্দেহই থাকতে পারে না। এমন অসংখ্য মসজিদ পাওয়া যাবে, যেগুলোর লিখিত কোনো দলীল-দস্তাবিজ পাওয়া যাবে না, তাই বলে কি সেগুলো ওয়াকফকৃত শরয়ী মসজিদ নয়? অবশ্যই ওয়াকফকৃত শরয়ী মসজিদ।- ফাতাওয়া মাহমূদিয়া: ১/৪৮৪-৪৮৫।

একটি মন্তব্য রয়েছেঃ জীবনজিজ্ঞাসা

  1. এবারের প্রশ্নোত্তরগুলো পড়ে বেশ উপকার পেলাম। এই বিভাগটি নিয়মিত পেতে চাই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight